15/05/2026
প্রায় সময় সবকিছুতে লেট করা মেয়েটা রাত ২টায় ঘুমিয়েও দ্বিতীয় দিন ভোর ৪:৪৫ এ শিফা আপুর এক ডাকে ঘুম থেকে উঠে পরেছিলাম। যাস্ট কানে আসছিল, আর ১৫ মিনিটের মধ্যে আমাদের বের হতে হবে। দিনটি ছিল ৩ মে। সেই ভোর ৫টায় রেডি হয়ে চলে গিয়েছিলাম ট্রেন স্টেশনে। আকাশের গাঢ় আঁধারের ক্যানভাসে লালচে রঙের ছটা দেখেই বুঝেছিলাম সূর্যোদয় হতে চলেছে।
আমি এর আগে সূর্যোদয় দেখেছি কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে আর সাজেকে পাহাড়ের কোল ঘেষে মেঘের মাঝে। এবারে সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য হলো Katunayaka রেল স্টেশনে, সামনে ছিল এয়ারপোর্ট, ফ্লাইটগুলো দাঁড়িয়ে ছিল বিস্তীর্ণ মাঠে, আকাশে ওড়ার অপেক্ষায়। কাঁটাতারের বেড়া, অপেক্ষমান ফ্লাইট আর সবুজ ঘাসের মাঝে দেখা সূর্যোদয়! মনে হয়েছিল সেদিন, আমি সত্যিই ভাগ্যবতী!
নয়তো, আমার মত ঘুম কাতুরের জীবনেও এত এত বিচিত্র সূর্যোদয়ের সাক্ষী হওয়া!
ট্রেন ছুটে চলল, স্টেশনের পর স্টেশন পার হয়ে। পাশে এক শ্রীলঙ্কান মহিলা বসে। কথা বলতে গিয়ে দেখলাম, ইংরেজি বোঝেন নাহ। তামিল ভাষাভাষী। আকারে ইঙ্গিতে বললাম। প্রতিটা স্টেশনে নাম উচ্চারণের চেষ্টা করেছিলাম, আর উনি বারবার হেল্প করছিলেন!
রেল লাইন ছিল গ্রামের মধ্যে থেকে। শহরের দেখা পাইনি তখনও। মানুষের অতি সাধারণ ঘরবাড়ি, উঠোন, ফুলের গাছ, ভোরের আলোয় খবরের কাগজ হাতে চেয়ারে বসা বৃদ্ধ। এই অতি সাধারণ দৃশ্যগুলোর মাঝেও অদৃশ্য এক বৈচিত্র্য ছিল, অজানা, অচেনা।
আমরা কলম্বো স্টেশনে গিয়ে নামলাম। গন্তব্য গলে। প্রথমবারের মতো দেখা মিলল, রাবণ রাজ্যের বর্তমান রাজধানীর। ছিমছাম, স্টেশনের ধারে স্ট্যাচু, বাস আর টুকটুকের চলাচল, আমার কাছে ইন্ডিয়া মনে হচ্ছিল তখন এই শহরটাকে। স্টেশনের ধাঁচ পুরনো ব্রিটিশ আমলের। তখনকার মোটা কাঠ আর লোহার তৈরি পুরনো স্টেশন দেখে মনে হয়েছিল, শ্রীলঙ্কা হয়ত এখনও সেই পুরনো যুগে পরে আছে, পুরনো স্থাপত্যকে আঁকড়ে রেখে। কিন্তু এই ভুল ভেঙেছিল আমার বাকি দিনগুলোয়। শ্রীলঙ্কা ঐতিহ্য ধরে রেখেও কতটা এগিয়ে গিয়েছে, তার প্রমাণ পেয়েছিলাম বার বার।
গলের ট্রেনে উঠে বসলাম। সবাই যে যার মতো কথা বলছি, আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ চোখ পরলো বাইরে, এ যে সমুদ্র!! কি সব বলছি, ভারত মহাসাগর!! আমাদের ট্রেন তখন ছুটে চলেছে ভারত মহাসাগরের তীর ঘেঁষে। যে আমি কুয়াকাটার ঘোলা জল দেখে অভ্যস্ত, সে এই জীবনে প্রথম দেখলাম, সমুদ্রের নীলচে জল। গাঙচিল উড়ে যাচ্ছিল। ঢেউ আছড়ে পরছিল পাথরের উঁচু নিচু টালমাটালে। আমি অভিভূত হয়ে দেখছিলাম। যদিও আমার সীট জানালার পাশে ছিল না। পাক্কা ঘন্টা তিনেক জার্নি শেষে গলে পৌঁছে গেলাম। ততক্ষণে ঘুমে ঢুলুঢুলু একেকজন, গরম, বাতাসে চুলে এলোমেলো। নেমেই দেখলাম, আমাদের রিসিভ করতে এসেছেন একজন Toastmaster. ওনার গাড়ি করেই পৌঁছে গেলাম গলের ঐতিহাসিক সিটিতে। ডাচদের নির্মিত পুরনো শহর। সাদা বাড়িঘর, পুরনো ধাঁচের কারুকাজ, আর পরিচ্ছন্ন রাস্তা। মাঝে মাঝে শোভা বাড়াচ্ছে বাগানবিলাস আর কাঠগোলাপ। শহরের কোথাও রেস্তোরাঁ, কোথাও শপ, স্টোনের অনেক শপ ছিল। রাস্তার ধারেই পাতা রয়েছে রেস্তোরাঁর চেয়ার টেবিল।সবটাই যেন এতদিন ধরে স্ক্রিনে দেখে আসা, ছবিতে দেখে আসা চমৎকার কিছু চোখের সামনে ধরা দিল। অবিশ্বাস্য ছিল আমার জন্য! পুরো ইউরোপের কোনো শহরে এসে পরেছি মনে হয়েছিল। সাথে চারপাশে প্রচুর ফরেনার ছিল।
Toastmaster এর বাড়িটাও পুরনো ডাচ আমলের। ওনার ওয়াইফ আপ্যায়ন করলেন ঠান্ডা জুস দিয়ে। এতো আন্তরিক তারা। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম ভদ্রমহিলার ইংরেজি শুনে। আমি ইংরেজি বলে অভ্যস্ত নই। হ্যাঁ আমি বুঝি। কিন্তু বলতে গেলেই থেমে যাই। ওনার সাথে বাকিরা কথা বলছিল, অথচ আমি আটকে যাচ্ছিলাম।
বাড়ির ভেতরটাও ঘুরে দেখলাম। মনে হচ্ছিল, ছবিতে আঁকা কোনো ঘর। যেমনটা এতদিন স্ক্রিনে দেখেছি, তেমন। পুরনো ধাঁচের। কিন্তু তাও অসাধারণ এক অনুভূতি। আমি যেন কোথাও হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে, এতদিন ধরে দেখে আসা কোনো এক কল্পনার জগতে।
সোফাসেট, বইয়ের তাক, চেয়ার, কাঠের সিঁড়ি, কাঁচের লন্ঠন আর সাদা পাথুরে দেয়াল সাথে কাঠের কারুকাজ।
বের হয়ে সামনেই শহরের শেষ রাস্তাটুকু মিলিয়ে গিয়েছে উঁচু ডাচ ফোর্টে। ভাবলাম সামনে কি এমন। এগিয়ে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই সামনে সুবিশাল Indian Ocean!! সামনে অদূরে বিশাল এক পাথরের চাঁই, সাথে আধ ভাঙা ছোট বড় পাথর বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে, তাতে আবার নারকেল গাছ। হাতের বা পাশে লাইটহাউজ!! ইয়েস! লাইটহাউজ!! ছোটবেলার স্বপ্ন, লাইটহাউজ দেখার, ঐ ওপরে ওঠার, আর যার নিচে বারবার আঁচড়ে পরছে সমুদ্রের ঢেউ। পাশেই প্রাচীন এক ধবধবে সাদা মসজিদ। অনেকটা উঁচু জায়গায়। নিচেই গলে বীচ।
নীলচে সবুজাভ জল, ঢেউ আর রাশি রাশি কোরাল ছড়িয়ে আছে।
সেইন্ট মার্টিন দেখার সৌভাগ্য হয়নি আগে, কোরালও নাহ। লাইফে প্রথমবারের মতো দেখা মিলল কোরালের। ঢেউয়ের সাথে এসে আছড়ে পরছে তীরে। কিন্তু ভয়ের বিষয় হচ্ছে হুটহাট বিশাল বিশাল ঢেউ এসে পরে সাথে কোরাল, পায়ের ওপর আছড়ে পরে তীক্ষ্ণ কোরাল।
সময় স্বল্পতার জন্য আর জলে নামা হলো নাহ। পা ভিজিয়েই ফিরতে হলো। নয়তো গলে বীচ ছেড়ে আসার ইচ্ছে আমাদের কারো ছিল না। সাথে অদেখা রয়ে গেল, ডাচদের গলে সিটি, মিউজিয়াম আর সুন্দর সুন্দর সুভেনির দোকান!
লাঞ্চ ছিল অসাধারণ। কারণ, খেতে গিয়ে শুনলাম খাবার কিন্তু অনেক ঝাল, শ্রীলঙ্কানরা প্রচুর ঝাল খায়। আপনারা সেই বুঝে খাবার সিলেক্ট করবেন।
ভাবলাম, আমি নিজেই তো ঝালখোর, কি এমন ঝাল দিবে!! বেছে বেছে স্পাইসি ডিশেস নিলাম। ব্রাউন রাইস, টুনা ফিস, ৩ ধরনের স্পাইসি সবজি, আমের চাটনি, পাপড় সাথে নিজে ভাব দেখিয়ে ২ খানা শুকনো লঙ্কাও নিলাম।
কিন্তু খেতে বসে আসলেই রাবণ রাজ্যে হেরে গেলাম। সার্থক নাম লঙ্কা! আমার নেয়া শুকনো লঙ্কা প্লেটেই রয়ে গেল, আর এতো ঝাল যে খাবার শেষ করা সম্ভব হলো না।
এরপরের অংশটা ছিল লাইফের অন্যতম সুন্দর সময়। দৌড়ে ট্রেন ধরলাম আমরা কয়েকজন। ট্রেনের মধ্যে হাঁটছি তো হাঁটছি, আমাদের বাকি সদস্যদের দেখা পাচ্ছি না আর কোনো ফাঁকা সীটও পাচ্ছি নাহ। অবশেষে কয়েকজনের দেখা পেলাম। এল আন্টি জানালার পাশের সীটে নিজের ব্যাগ রেখে বসেছিল। কেউ আছে কি না জিজ্ঞেস করতেই ব্যাগ উঠিয়ে নিল। জানালার ধারে বসে গেলাম। প্রচুর রোদ ছিল।একটু পরে স্টেভান বলল, আপু ভালো সীটে বসেছেন, সী বীচ ঐ সাইডেই পরবে। এরপরের কথা আর কি বলব!! নীল সমুদ্র, বেলাভূমি, রিসোর্টের সারি, লোকাল ঘরবাড়ি, ক্যাফে, রেস্তোরা, গাছের সারি- ট্রেন ছুটে চলল যেন এক অজানা গন্তব্যে।
হিক্কাদুয়া সী বীচে নেমে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। ট্রেন চলছিল, কখনো একদম মহাসাগরের তীর ঘেঁষে, জানালার নিচেই পাথরের চাঁইয়ে আছড়ে পরছে ঢেউ, কখনো বা রিসোর্ট,লোকাল ঘরবাড়ির ফাঁকা দিয়ে অদূরে দেখা দিচ্ছে নীল সমুদ্র। নারকেল বাগান, বিভিন্ন প্রজাতির ফুল আর অসীম নীলে ডুবতে থাকা সূর্য!!
ইচ্ছে হচ্ছিল কাউকে না জানিয়ে অজানা কোনো এক স্টেশনে নেমে যাই....
এক সময় দূর থেকে দেখা মিলল, সমুদ্র তীরে দাঁড়িয়ে আছে রূপকথার গল্পের এক ঝলমলে নগরী!! কলম্বো সিটি!! পোর্ট সিটি, টুইন টাওয়ার, লোটাস টাওয়ার। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সেই স্বপ্নের শহরে। স্টেশনে গিয়ে শুনলাম ট্রেন দেড় ঘন্টা পরে। স্টেশনের লোকাল মার্কেটে ঢুকলাম। কেনার মতো তেমন কিছু পেলাম নাহ। ঢাকার গাউছিয়া নিউমার্কেটের ফুটপাত মনে হলো। আশা আপু বললো, চলো, গলে ফেস গ্রীন বীচে যাই। হাঁটা শুরু করলাম দুজনে। বাকিদের খবর নেই। একটু পরে ফাহিম এলো। তিনজন চলে গেলাম কলম্বো বীচে। একধারে বিশাল ভারত মহাসাগর, উঁচু বাঁধ, তার ওপর পা ঝুলিয়ে লোকজন বসে আছে, সারি সারি ফুড কার্ট, আর পেছনে সুউচ্চ অট্টালিকা।
কিন্তু কার্টের বেশির ভাগ খাবার হচ্ছে চিংড়ির। আমি আর আশা আপু দুজনেই ট্রাই করলাম ওদের লোকাল ফুড। টেস্টি ছিল।
ফুড কার্টের পরে মাঠ, লোকজন বসে আছে, বাচ্চার ছুটাছুটি করছে, এরপরে মেইন রোড, আর তার পরেই সিটি। হাওয়া আসছিল চমৎকার।
সময় ছিল কম। বসার সুযোগ হলো না। স্টেশনে ফিরে এলাম। ট্রেন ধরে পৌঁছে গেলাম নিগাম্বোতে।
#শ্রীলঙ্কা_ভ্রমণ