Sharif Hassan Writes

Sharif Hassan Writes Random Thoughts

"আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে চড়ে ঘুরে বেড়ানো। ১৯২৮ সালে সেই সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যাই, অসাধার...
23/08/2026

"আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে চড়ে ঘুরে বেড়ানো। ১৯২৮ সালে সেই সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যাই, অসাধারণ সেই ট্রেন যাত্রার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।"

এই কথাগুলো আগাথা ক্রিস্টির। রহস্য উপন্যাসের রানীর জীবনের সবচেয়ে বড় শখ ছিল দামি এই ট্রেনে চড়া। অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস (Orient Express) ছিলো ১৮৮৩ সালে চালু হওয়া ইউরোপের অত্যন্ত বিলাসবহুল দূরপাল্লার ট্রেন সেবা।

এটি প্যারিস থেকে ইস্তাম্বুল (কনস্টান্টিনোপল) পর্যন্ত যাতায়াত করত। মাঝেমধ্যে এথেন্স, ব্রাসেলস আর লন্ডনের যেতো। ২০০৯ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়।

বাগদাদের ধুলোবালি মাখা এক প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে ঘুরতে গিয়ে ব্রিটিশ তরুণী আগাথা ক্রিস্টি'র দেখা হয়ে যায় ম্যাক্স ম্যালোন নামে এক সুদর্শন প্রত্নতাত্ত্বিকের সাথে। তারপর যা হয়, প্রেম, বিয়ে, এবং বিয়ের পর বরের সাথে সাথে আরও বেশি করে ট্রেনে ঘোরাঘুরি। ভদ্রমহিলা ট্রেনে ঘুরতে ঘুরতেই ভেবে ফেলেছিলেন তার বিখ্যাত 'মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' গল্পের প্লট।

গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বলছে, আগাথা ক্রিস্টি হলেন পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের লেখক। এই জায়গায় শুধু উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার ধারে কাছে আসতে পারেন। গিনেস রেকর্ডসের তথ্যে, তাঁর ৭৮টি ক্রাইম উপন্যাস প্রায় ২ বিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে, আর তাঁর বই ৪৪টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো শুধু বিক্রির হিসাব নয়, এগুলো পাঠকের বিশ্বমানচিত্রও বটে—কারণ ক্রিস্টি একা ইংরেজি সাহিত্যের সীমানা পেরিয়ে গোটা পৃথিবীর পাঠাভ্যাসে ঢুকে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রত্যেকের ঘরে ১০ কপি করে থাকার কথা।

আর এই বিপুল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্নগুলোর একটা হলো "মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস"।

১৯৩৪ সালে বইটা বের হয়। গল্পটা খুব সোজা, আবার খুবই জটিল। শীতকালে ইস্তাম্বুল থেকে লন্ডন যাচ্ছিল রাজকীয় অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস। বাইরে তুষারপাত হচ্ছে, ট্রেন আটকে গেছে যুগোস্লাভিয়ার মাঝখানে, কোথাও জনমানব নেই।

বছরের অফ সিজন তখন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ট্রেন প্রায় ভর্তি। নানা দেশের, নানা ভাষার লোক। তার মধ্যে আছেন আমাদের প্রিয়, মাথায় ডিমের মতো টাক আর গোঁফে তা দেওয়া বেলজিয়ান গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো।

রাতারাতি তার পাশের কামরাতেই এক আমেরিকান ব্যবসায়ী খুন হন। লাশের গায়ে দেখতে পাওয়া যায় বারোটা ছুরির দাগ। কোনোটা ডান হাতে মারা, কোনোটা বাম হাতে। কোনোটা জোরে, কোনোটা আস্তে। মানে খুনি একই সাথে ডানহাতি ও বামহাতি, নারী ও পুরুষ। কামরায় পাওয়া যাচ্ছে একের পর এক ভুয়া ক্লু।

কন্ডাক্টরের ইউনিফর্ম পরা এক বেঁটে লোককে দেখা গেছে, লাল কিমোনো পরা এক মহিলাকে দেখা গেছে, যারা ট্রেনে থাকার কথাই না। আর ট্রেনের সব যাত্রীর অ্যালিবাই একদম পাকা। বাইরে থেকে কেউ ওঠেনি, কেউ নামেনি। তাহলে খুনি কোথায়? খুনি ট্রেনেই আছে, হয়তো আপনার পাশের সিটেই বসে চা কাটলেট খাচ্ছে।

এই হলো ট্রেনের ম্যাজিক। লেখক বা পরিচালকের জন্য এর চেয়ে ভালো লোকেশন আর হয় না। একটা বদ্ধ ঘর, সেটা আবার ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। আপনি পালাতে পারবেন না, খুনিও পালাতে পারবে না। পাঠক বা দর্শক বাধ্য হয়ে পুরোটা পড়বে বা দেখবে, কারণ ট্রেন থামার আগে তো নামতে পারবে না।

আগাথা এই ফর্মুলাটা বুঝেছিলেন বলেই ট্রেনকে বারবার ফিরিয়ে এনেছেন। আর তার দেখাদেখি গোটা দুনিয়ার পরিচালকরাও বুঝে গেছেন, বাজেট কম, টেনশন বেশি করতে চাও? একটা ট্রেন ভাড়া করো।

ট্রেন নিয়ে সিনেমার ইতিহাস সিনেমার চেয়েও পুরনো। ১৯০৩ সালে প্রথম ন্যারেটিভ ফিল্মের নাম ছিল - দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি। ট্রেন ডাকাতি। তারপর থেকে হলিউড ট্রেনকে ছাড়েনি।

হলিউড ট্রেনকে তিনভাবে ব্যবহার করে।

এক, বিলাসবহুল ট্রেন। যেখানে খুন, ডাকাতি, প্রেম সবই হয় ফার্স্ট ক্লাসে। যেমন অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, বা বুলেট ট্রেন যেখানে ব্র্যাড পিট জাপানের ট্রেনে উঠে সবাইকে মারছেন, কিন্তু ট্রেন সময় মতো চলছে।

দুই, অভিশপ্ত ট্রেন। যেমন স্নো-পিয়ার্সার। গোটা পৃথিবী বরফে ঢেকে গেছে, মানবজাতির শেষ কয়জন মানুষ একটা ট্রেনে অনন্তকাল ধরে ঘুরছে। ইকোনমি ক্লাসে গরিবরা প্রোটিন বার খাচ্ছে, ফার্স্ট ক্লাসে বড়লোকরা স্টেক খাচ্ছে। পুরো পুঁজিবাদের ক্লাসরুম ভার্সন।

তিন, ট্রেন মানেই টাইম মেশিন। সোর্স কোড বা পোলার এক্সপ্রেস দেখেন। ট্রেনে উঠলেই আপনি অন্য সময়ে চলে যাবেন।

কোরিয়ানরা আবার ট্রেনকে বানিয়েছে জম্বি বাস। ট্রেন টু বুসান (এটার নাকি একটা ভোজপুরি ডাবড ভার্সন আছে, নাম ট্রেন তো ভূষণ)। ভাবেন একবার, আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন, ট্রেনের লোকজন একেক করে জম্বি হয়ে যাচ্ছে। আপনি নামতেও পারবেন না, পরের স্টেশন ৫০ কিলোমিটার পরে।

এর চেয়ে বড় হরর আর কি হতে পারে? বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের খেলা?

ভারতীয় সিনেমায় ১৯৮০ সালের বানানো দ্য বার্নিং ট্রেন মনে আছে? ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না, জিতেন্দ্র তিন হিরো মিলেও একটা জ্বলন্ত ট্রেন থামাতে পারছেন না। সিনেমাটা ফ্লপ করেছিল, কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় টিভিতে দেখে মনে হতো, ট্রেনে উঠলেই আগুন লাগবে।

আর বাংলাদেশের ট্রেন মানেই প্রেম। গোলাপী এখন ট্রেনে। ববিতা ট্রেনে উঠে শহরে যাচ্ছে নায়িকা হতে। ট্রেন এখানে মুক্তির প্রতীক। গ্রাম থেকে শহর, দারিদ্র্য থেকে স্বপ্নে যাওয়ার বাহন। পরিচালক আমজাদ হোসেন ট্রেনকে বানিয়েছিলেন শ্রেণী সংগ্রামের রেললাইন।

আর এখন আমাদের আছে বনলতা এক্সপ্রেস। নামটা শুনলেই জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ে, কিন্তু ভেতরে উঠলে মনে হয় অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের গরিব চাচাতো ভাই। এসি চেয়ার, বায়ো টয়লেট, সময়ানুবর্তিতা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস।

মজার ব্যাপার হলো, সিনেমায় ট্রেন কখনো লেট করে না। মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস তিনদিনের যাত্রা, তুষারে আটকে গেলেও এর কাহিনী থামে না। ট্রেন টু বুসান ৪৫০ কিলোমিটার রাস্তা দুই ঘণ্টায় পার হয়ে যায়, জম্বি সহ। আর আমাদের বাস্তবের ট্রেন? এক ঘণ্টা লেট করলে আমরা বলি, আজ তো ট্রেন সময়ের আগেই এসেছে।

মুভির ডিরেক্টররা ট্রেন ভালোবাসেন, কারণ ট্রেনে কন্টিনিউটি মেইনটেইন করা সহজ। একটা কামরা, একটাই সেট। বাইরে জানালা দিয়ে বরফ বা গ্রাম ছুটে যাচ্ছে, ভেতরে নায়ক-নায়িকা প্রেম করছে বা খুনি খুন করছে। কম খরচে বেশি সাসপেন্স।

কিন্তু লেখকরা ট্রেন ভালোবাসেন অন্য কারণে। ট্রেন হলো সমাজের মিনিয়েচার ভার্সন। অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে যেমন ১২ জন যাত্রী, ১২টা দেশ, ১২টা শ্রেণী, ১২টা মোটিভ।

বনলতা এক্সপ্রেসেও তাই। এক বগিতে সরকারি চাকরিজীবী, প্রেমিক যুগল, বিদেশ ফেরত আঙ্কেল, আর বাচ্চা নিয়ে হিমশিম খাওয়া মা। সবাই একসাথে, কেউ কাউকে চেনে না, কিন্তু সবাই একই গন্তব্যে যাচ্ছে। এর চেয়ে ভালো গল্পের প্লট আর কোথায় পাবেন?

আগাথা ক্রিস্টি সেটা বুঝেছিলেন। তিনি জানতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হলো, অপরিচিত মানুষের সাথে আটকে থাকা। আর সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো, সেই আটকে থাকার মধ্যেই একটা গল্প খুঁজে পাওয়া।

আমি নিজে গত মাসে বইটা আবার পড়লাম। সেই একই অনুভূতি, চরম, মাথা নষ্ট, উরাধুরা। শেষ পাতায় এসে যখন জানা যায়, খুনি একজন না, সবাই মিলে খুন করেছে, তখন মনে হয়, আরে এ তো আমাদের অফিসের প্রজেক্টের মতো। দোষ সবার, কিন্তু দায় কারো না।

তাই ট্রেন বারবার ফিরে আসে। কখনো বিলাসবহুল অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস হয়ে, কখনো জম্বি ভর্তি বুসান এক্সপ্রেস হয়ে, কখনো গোলাপীকে নিয়ে, কখনো বনলতাকে সঙ্গী করে।

কারণ আমরা সবাই আসলে একটা ট্রেনেই আছি। জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাচ্ছে, ভেতরে আমরা একজন আরেকজনকে সন্দেহ করছি, ভালোবাসছি, আর ভাবছি কখন পরের স্টেশন আসবে।

আর পোয়ারো তার মগজের ছোট ধূসর কোষগুলো নিয়ে আমাদের দেখে মুচকি হাসছেন।

22/08/2026

সোফিয়া নর্ডগ্রেন, একজন সুইডিশ প্ল্যান্ট বেইজড ফুড ব্লগার৷ 'নরডিক কিচেন' নামের একটা জনপ্রিয় ব্লগ সাইট চালান। বেশ কিছু বইও লিখেছেন ইতিমধ্যে। ভদ্রমহিলা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি, সুইডিশ দম্পতি কর্তৃক এডপ্টেড।

কয়দিন আগে নিজের জীবন নিয়ে একটা লেখা দিয়েছেন। সেটাই বাংলায় আংশিক অনুবাদ করে পাঠকের কাছে পেশ করা হলো...

বাকীটুকু শুনুন তার জবানিতে.. পড়লে বুঝতে পারবেন, কী সব জীবন মানুষ কাটায় এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে..

~

আমার নাম সোফিয়া নর্ডগ্রেন। আমার জন্ম বাংলাদেশে।

১৯৭৬ সালে, তখন আমার বয়স প্রায় দুই বছর, আমাকে দত্তক নিয়ে সুইডেনে চলে যাওয়া হয়। তার আগে ঢাকার মিশনারিজ অব চ্যারিটির একটি চাইল্ড হোমে আমার দিন কাটছিল।

সুইডেনে আমার শৈশব কেটেছে ডালার্নার ছোট্ট এক গ্রামে। যার চারপাশে ছিল লাল কাঠের বাড়ি, বন আর খোলা মাঠ।

আমার পালক বাবা শিকার করতেন, নার্সারিতে কাজ করতেন। মা ছিলেন গৃহিণী, পরে ক্যাশিয়ার। তাদের নিজেদেরও একটা মেয়ে ছিল—আমার চেয়ে তিন বছরের বড়।

আমার বোন ছিল শান্ত, বইপড়ুয়া। আর আমি ছিলাম ঠিক তার উল্টো। বাস্কেটবল, অ্যাথলেটিক্স, জ্যাজ ডান্স, গিটার—সবকিছুতেই ছিল আমার প্রবল আগ্রহ।

বাইরে থেকে দেখলে আমার শৈশব হয়তো সুন্দরই মনে হবে। কিন্তু আমার গল্পের ভেতরটা অন্যরকম ছিল।

আমি ছিলাম "সেই" বাদামি মেয়েটি।

কারণ আমাদের এলাকায় আমার মতো দেখতে শিশু খুব কম ছিল। স্কুলে বহুবার আমাকে বর্ণবাদী গালাগালি শুনতে হয়েছে।

কেউ অযাচিতভাবে আমার চুলে হাত দিত, কেউ অদ্ভুত সব প্রশ্ন করত, কেউ শুধু আমার গায়ের রঙের জন্য আমাকে আলাদা করে দেখতো।

এমনকি কখনো কখনো এসব আমার মায়ের সামনেও হয়েছে। যদিও তিনি বেশিরভাগ সময়ে চুপ করে থাকতেন।

সেই বয়সে ওনার এই নীরবতার অর্থ বুঝতাম না। শুধু বুঝতে পারতাম— এই যুদ্ধে আমি একা।

আমাদের বাড়ির ভেতরেও সবসময় নিরাপদ বোধ করতাম না। মা প্রায়ই আমার সঙ্গে ঝগড়া করতেন, এমন কিছুর জন্যও দোষ দিতেন যা আমি করিনি।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল, আমি তাঁকে আমার বোনের সঙ্গে একই রকম আচরণ করতে দেখতাম না।

আমি খেলতাম, প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। কিন্তু বাবা-মা খুব কমই দেখতে আসতেন।

মা আমাকে গাড়ি চালানোর প্র‍্যাকটিস করতে দিতেন না। অথচ আমার বড় বোনকে ঠিকই দিয়েছিলেন।

শিশুরা এসবের হিসাব রাখে না। কিন্তু তারা অনুভব করে, বুঝতে পারে। আমিও অনুভব করতাম—আমার জায়গাটা যেন একটু আলাদা।

"আবার চলে যাও"

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর আমার বোন মায়ের সঙ্গে থেকে গেলো। ওদিকে আমার জীবন হয়ে গেল অনিশ্চিত।

কখনো থাকি বাবার কাছে, কখনো মায়ের কাছে। রাগ বা ঝগড়া হলে মা কখনো বলতেন, “জিনিসপত্র গুছিয়ে বাবার কাছে চলে যাও।”

আমি চলে যেতাম।

কয়েক সপ্তাহ, কখনো কয়েক মাস পর আবার বলা হতো, “এখন ফিরে আসতে পারো।”

একটা বাচ্চাকে বারবার ঘর থেকে বের করে দিলে সে শুধু ঘর হারায় না। ঘরের ভেতরে নিজের মূল্য নিয়েও সন্দেহ করতে শেখে।

মা কি আমাকে ভালোবাসেন?
আমি কী ভুল করেছি?
আমি কি যথেষ্ট ভালো নই?

এসব প্রশ্ন আমার ভেতরে থেকে গেল।

আমি শিখলাম মানিয়ে নিতে। নিজের কথা চেপে রাখতে। অন্য মানুষ কী চায়, তা আগে বুঝতে। ঝামেলা এড়িয়ে চলতে।

অনেক পরে বুঝেছি, শৈশবের এসব শিক্ষা বড় হয় আমাদের সঙ্গে। আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক আর নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করার ক্ষমতার ভেতর তারা জায়গা করে নেয়।

"আমার মা কে?"

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দত্তক হওয়ার প্রশ্নটাও বড় হতে লাগল। আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? কেন আমাকে আমার প্রথম পরিবার থেকে আলাদা করা হয়েছিল?

আমার কাগজপত্রে একটি উত্তর ছিল— আমার জন্মদাত্রী মা মারা গেছেন। আমি সেটাই বিশ্বাস করতাম।

১৯৯৯ সালে নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ শেষ করে স্টকহোমে নিজের একটা জীবন গড়ে তুলছিলাম। এই সময়ে কী মনে করে কিছু টাকা জমিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এলাম।

আমি বাংলা একদমই জানতাম না। কাগজপত্রে দেওয়া ঠিকানা ধরে এর তার সাহায্য নিয়ে এক গ্রামীণ এলাকায় গেলাম। কিছুদিন খোঁজাখুঁজি করলাম।

তারপর একদিন একজন অচেনা নারীকে আমার সামনে এনে দাঁড় করানো হলো।

কেউ একজন আমাকে এসে বলল, “এই তোমার মা।”

আমি তো হতবাক। আমার মা না মারা গেছেন! কিন্তু এই মহিলা তাহলে কে? তিনি কি সত্যিই আমার মা?

তখন DNA পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল না। ভাষাও জানতাম না। অন্যের কথা আর অনুবাদের ওপর নির্ভর করেই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত কোনো কিছু না শেষ করেই সুইডেনে ফিরে এলাম। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম নতুন একটি প্রশ্ন— যদি তিনি সত্যিই আমার মা হন?

প্রশ্নটি আমার সঙ্গে রয়ে গেল আরও বহু বছর।

"নিজের জীবন"

এদিকে আমার জীবন কিন্তু থেমে থাকেনি।

ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি নার্স হিসেবে কাজ করেছি। পরে লেখক ও পাবলিক স্পিকার হয়েছি। সুইডিশ টেলিভিশনে গিয়েছি, স্ট্যান্ড-আপ করেছি, নিউইয়র্ক ও বেলগ্রেডে গিয়ে কথা বলেছি।

আমি নিজের একটা আলাদা জগত তৈরি করতে পেরেছিলাম। তবু আমার ভেতরের সেই ছোট মেয়েটি কখনো হারিয়ে যায়নি। সে শুধু অপেক্ষা করেছে।

"২০২৪"

২০২৪ সালে আমার পালক বাবা ও মা দুজনেই মারা গেলেন। মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে।

শোকের সঙ্গে পুরোনো অনেক স্মৃতিও ফিরে এল, ভালোবাসা আর কষ্ট—দুটোই।

আর বাংলাদেশের কোথাও একজন বৃদ্ধা নারী তখনও বেঁচে ছিলেন। তিনি হয়তো আমার মা।

এটা আমাকে নিশ্চিত হতেই হবে।

"সত্য"

২০২৫ সালে আমি দুইবার বাংলাদেশে গেলাম।

এবার কারও কথায় বিশ্বাস করতে চাইনি। DNA পরীক্ষা করালাম। ফলাফল এল।

ওই মহিলা-ই আমার মা। আমার জন্মদাত্রী মা।

তিনি মারা যাননি। তিনি বেঁচে ছিলেন। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে।

আমি জানতাম না তিনি কোথায়। তিনি জানতেন না তাঁর মেয়ে কোথায়।

সত্যটা জানার পর মনে হলো, জীবনের একটা দরজা খুলে গেছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখলাম—সেখানে আরেকটি দরজা।

কারণ কাউকে খুঁজে পাওয়া আর হারানো সময় ফিরে পাওয়া এক জিনিস নয়।

"মা ও মেয়ে"

আমাদের ভাষা এক নয়। আমাদের জীবনও এক নয়।

তিনি আমাকে জীবনের পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেখেননি। আমার সুইডিশ জীবন, দত্তক হয়ে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, আমার ভেতরের কষ্ট—এসব হয়তো তিনি কোনোদিন পুরোপুরি বুঝবেন না।

তাঁর বয়স হয়েছে। স্বাস্থ্যও ভালো নয়। সম্ভবত তিনি কোনোদিন সুইডেনে এসে আমার জীবন দেখতে পারবেন না।

এই সত্যের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। আবার দুঃখও আছে। আবার কখনো প্রচন্ড রাগও হয়।

কারণ হারিয়ে যাওয়া পঞ্চাশ বছর কি শুধু DNA এর মিল দিয়ে ফেরানো যায়?

"কোথায় আমার বাড়ি?"

বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। সুইডেন আমার জীবন।

কিন্তু জন্মভূমি মানেই ঘর নয়। আর যেখানে সারাজীবন কাটিয়েছি, সেটিও সবসময় নিঃশর্ত আপন মনে হয় না।

কখনো কখনো দুটি ছবির কথা আমার মনে হয়।

সুইডেনে আমার পালক বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁদের বায়োলজিক্যাল মেয়ের একটা ছবি।

আরেকদিকে বাংলাদেশে আমার জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে তাঁর আরেক মেয়ের অন্য একটা ছবি।

দুটি পরিবার।
দুটি দেশ।
দুটি ছবি।

কিন্তু কোনো ছবিতেই আমি নেই।

আমার সেই একটি ছবির অভাব আছে—যে ছবির দিকে তাকিয়ে কেউ প্রশ্ন করবে না, আমি কে ওই ছবিতে?

যেখানে আমাকে ব্যাখ্যা করতে হবে না, কেন আমি ওখানে। যেখানে আমার জায়গাটা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকবে না।

এজন্য মাঝেমধ্যে নিজেকেই জিজ্ঞেস করি— পরিবারের ছবিতে আমি কোথায়?

"শেষ কথা"

আমার জন্মদাত্রী মাকে খুঁজে পাওয়া আমার জীবনের একটি অন্যতম সত্য ঘটনা।

কিন্তু শুধু রক্তের সম্পর্ক মানুষকে ঘর এনে দেয় না। DNA হয়তো বলতে পারে কে আমার মা।

কিন্তু DNA এটা বলতে পারে না, একটি মা ও মেয়ের মাঝখান থেকে পঞ্চাশ বছর কীভাবে হারিয়ে গেল।

এখন আমি জানি, আমার গল্পের কোনো একটিমাত্র শেষ নেই।

একটি অংশ বাংলাদেশে। একটি সুইডেনে।

একটি আমার পালক পরিবারের স্মৃতিতে। আর একটি অংশ সেই ছোট্ট মেয়েটির মধ্যে, যে সারাজীবন শুধু একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজেছে নিজের জন্য।

আজ আমি আর সেই জায়গাটা অন্য কারও হাতে খুঁজি না। আমি নিজেই নিজের জন্য সেটি বানাতে চাই।

কারণ একটা সময় বুঝেছি—

পরিবারের ছবিতে আমার জায়গা না থাকলেও, আমার জীবনের ছবিতে আমার জায়গাটা কেউ মুছে দিতে পারবে না।

ওখানে আমি কারও হারানো সন্তান নই। ওখানে আমি কারও অসম্পূর্ণ গল্প নই।

আমি সোফিয়া।

আমার গল্পের প্রতিটি টুকরো—বাংলাদেশ, সুইডেন, দত্তক হওয়া, হারিয়ে যাওয়া, খুঁজে পাওয়া, ভালোবাসা, রাগ, কষ্ট আর ক্ষমা—সব মিলিয়েই আমি।

হয়তো এতদিন আমি একটা পরিবারের ছবিতে নিজের জায়গা খুঁজছিলাম।

আজ বুঝি—আমাকেই আমার ছবিটা আঁকতে হবে।

আর সেই ছবিতে - প্রথমবারের মতো, আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।



Sharif Hassan

21/08/2026

আকাশে ঘন মেঘের আনাগোনা। সারাদিন থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এমন দিনে বাসা থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল তবিবুল্লা।

গাড়িটা অফিস থেকে পাঠিয়েছে। ড্রাইভার রিপন, অনেক দিনের পুরনো স্টাফ ওদের কোম্পানির, শুরু থেকেই আছে। টাওয়ারের কাজে দেশের চৌষট্টি জেলা এই রিপনের গাড়িতেই ঘোরা হয়েছে ওর।

হাইওয়েতে উঠতেই রিপন বললো, "স্যার, গান ছাড়েন। ব্লুটুথ অন আছে।"

তবিবুল্লা ফোনের মিউজিক ফোল্ডার খুললো। এটা ওর ফোনের অফলাইন ফোল্ডার। ল্যাপটপ থেকে কপি করা এমপিথ্রি ফরম্যাটের গান। পথেঘাটে নেটওয়ার্ক ঠিক থাকে না বলে সে স্ট্রিমিং করে না।

সে সিলেক্ট করলো 'আকাশ এত মেঘলা' - শারমিন ফিচারিং রাফা। মূলটা সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া।

গানটা শেষ হওয়ার আগেই পরের গান নিজে থেকে শুরু হলো - "এই রিমঝিম ঝিম বরষায়"। তালাত মাহমুদের।

তবিবুল্লা ভ্রু কুঁচকালো। সে নিজে কিছু চাপেনি। ফোন নিজে থেকেই গানটা বেছে নিয়েছে।

তারপর তৃতীয় গান - ডিফরেন্ট টাচের "শ্রাবণের মেঘগুলো"। শৈশবের সেই ফেভারিট গান। কিন্তু তবিবুল্লা বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলো।

তিনটা গান, পরপর, একই সাবজেক্ট। বৃষ্টি।

এমন হবে কেন? তবিবুল্লা ফোনটা হাতে নিল। চেক করে দেখলো, শাফল অফ করা আছে। রিপিট-ও অফ। সে মিউজিক প্লেয়ার বন্ধ করে দিল। গাড়ির ভেতর শুধু বৃষ্টির শব্দ আর ওয়াইপারের শব্দ।

পাঁচ সেকেন্ড পর দেখলো ফোনের স্ক্রিন নিজে থেকে কালো হয়ে গেল। লক স্ক্রিন না। পুরো কালো স্ক্রিনের মাঝখানে সাদা অক্ষরে একটা লাইন ভেসে উঠলো।

'বাইরে বৃষ্টি হওয়ার চান্স ৯৪%। তুমি এই আবহাওয়ায় এই ধরনের গানই তো শোনো। তাই চালালাম।' - পরিষ্কার বাংলায় লেখা।

তবিবুল্লা স্থির হয়ে গেল। এটা কোনো নোটিফিকেশন না। কোনো অ্যাপের নাম নেই। শুধু সিস্টেম এর মেসেজ এর মতো একটা নির্দেশনা।

সে স্ক্রিনে টাচ করলো। লেখাটা মুছে গিয়ে আরেকটা লাইন এলো।

'ভয় পেও না, তবি। আমি তোমাকে মনিটর করছি না। যদিও আমি তোমাকে জানি।'

রিপন কি মনে করে আয়নায় ওর দিকে তাকালো, জানতে চাইলো, "স্যার কিছু হইছে?"

"কিছু না। তুমি চালাও।"

তবিবুল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে চিন্তা করলো। টেকনোলজি কোম্পানিতে কাজ করায় সে জানে, আমাদের ফোন এর এপস-গুলো আমাদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সারাক্ষণই রেকর্ড করতে থাকে। অনলাইনে সে কি করে, কি দেখে, কোনটা পছন্দ করে, কোথায় লাইক দেয়- সব কিছু।

তারপর তাকে ওই জিনিসগুলোই ঘুরেফিরে দেখাতে থাকে, এটাই ওদের এলগরিদমের মূল লজিক।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওর এই অফিসিয়াল ফোনে সে কোনো ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে না। একমাত্র ইমেইল করা ছাড়া, সেটাও অফিসের এড্রেস টা।

এটা দিয়ে সে মূলত মোবাইল টাওয়ার ও এর আশেপাশের ছবি আর ভিডিও তুলে, সেগুলো টেলিগ্রামে পাঠায় হেডকোয়ার্টারে।

আর হ্যাঁ, তবিবুল্লা গান শোনে প্রচুর। ওর এই ফোনটায় প্রায় ৩৫০০ গান আছে। বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি, আরবী, স্প্যানিশ - কি গান নাই!

ওর মনে হলো, এই ফোনটা তার সাথে তিন বছর ধরে আছে। এই তিন বছরে ফোন ব্যবহার করতে করতে হয়তো তার একটা অফলাইন মডেল তৈরি হয়ে গেছে। ফোনের ভেতরেই। অন-ডিভাইসে। এটা কী কোনো ধরনের স্পাইওয়্যার হতে পারে?

সে কী পছন্দ করে, কী অপছন্দ করে, কোন সিচুয়েশনে কী করে - সব এটা রেকর্ড করে নিয়েছে?

বৃষ্টি হলে সে নারী কণ্ঠের পুরনো দিনের বাংলা ও হিন্দি গান পছন্দ করে, লাউড মেটাল ড্রামস অপছন্দ করে।

রাতের হাইওয়েতে সে গানের ভলিউম কমিয়ে দেয়। মন খারাপ থাকলে সে একই গান তিনবার রিপিট করে। ঘুম পেলে সে গাড়ির জানালা নামিয়ে দেয়।

কালো স্ক্রিনে আবার লেখা ফুটলো।

'তুমি ঘুমাওনি প্রায় ৩১ ঘন্টা হতে চললো। চোখের পাতা পড়ার হার স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০% বেশি। এই রাস্তায় গত ২ বছরে তুমি ৪ বার ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তাই আমি ৬৮ BPM এর গান বাজাচ্ছি। এটা তোমাকে জাগিয়ে রাখবে।'

তবিবুল্লা এবার চমকে উঠলো! কী সিচুয়েশনে কোনটা করা উচিত, কোনটা করা উচিত না - এটাও কি ফোনটা শিখে গেছে?

যেমন, বৃষ্টিতে আশি কিলোমিটারের বেশি স্পিডে গেলে সে ব্রেক বেশি চাপে। ক্লান্ত থাকলে সে প্রায়ই ভুল লেনে চলে যায়।

এই ডেটা তো কোনো সার্ভারে যায়নি।

কিন্তু তবিবুল্লা যেটা জানে না, তা হলো - অ্যান্ড্রয়েড ১৫ এর পর সব ফোনে একটা Private Compute Core থাকে। একটা ছোট Large Language Model বা LLM, যেটা ফোনের ভেতরেই চলে।

ওটা সেন্সর পড়ে - ব্যারোমিটার, হিউমিডিটি, জিপিএস, অ্যাক্সেলেরোমিটার, মাইক্রোফোন। এই জিনিসটাই হয়তো এই ফোনে ওর ফাইল ওপেন করা, স্কিপ করা, কতক্ষণ কী শুনছে, রাস্তায় কী ঘটছে, বাইরের আবহাওয়া কিরকম ছিল তখন - এই সবকিছু দিয়ে একটা ছায়া-মানুষ বানিয়ে ফেলেছে।

যা রক্তমাংসের মানুষের একটা ডিজিটাল প্রোটোটাইপ। যেটা মনে হয় তবিবুল্লার চেয়েও ভালো জানে তবিবুল্লা কখন কী করবে বা করতে পারে!

তবিবুল্লার গলা শুকিয়ে গেল। ফোনের সামনের ক্যামেরা কখন তার চোখের পাতা ফেলার মাত্রা দেখে ক্লান্তি মেপে ফেলেছে সে টেরও পায়নি।

সে টাইপ করলো কালো স্ক্রিনে, "তুমি কে?"

উত্তর এলো সাথে সাথে।

'আমি কে মানে? আমি তো তুমিই। আবার বলতে পারো, তুমিই আমি। আমি তোমার ফোনের কোনও সাধারণ এপ্লিকেশন না, কোনো ফোল্ডারে থাকি না।

আমি তোমার ফোনের ইউসেজ বা ব্যবহারের মধ্যে থাকি। ধরে নাও, আমি তোমার একটা ডিজিটাল কপি। তুমি যা করো, আমি লিখে রাখি। যাতে তুমি পরে ভুল না করো।'

তখনই চতুর্থ গানটা বাজতে শুরু করলো নিজে থেকে। এবার আর মিউজিক ফোল্ডার থেকে না। ফোনের ডিলিটেড ফোল্ডার থেকে রিকভার করা একটা ফাইল। "এই মেঘলা দিনে একলা" - যেটা সে ছয় মাস আগে ডিলিট করে দিয়েছিল।

কালো স্ক্রিনে লেখা -

'এই গানটা তুমি ডিলিট করেছিলে কিছুদিন আগে। কিন্তু তোমার প্রোটোটাইপে এটা 'বৃষ্টি + একাকীত্ব' ট্যাগে সেভ ছিল। হেমন্ত বাবুর গলায় শুনতে অসাধারণ লাগে না? ট্র‍্যাশবিনে ছিল, তাই ফিরিয়ে আনলাম। তোমার এখন এটা দরকার।'

মানে, এবার আর রেকমেন্ডেশন না। একেবারে এই অজানা অচেনা সিস্টেমের সরাসরি হস্তক্ষেপ। যে শুভাকাঙ্ক্ষী তোমার ভালো চায়, কিন্তু অনুমতি নেয় না।

সামনে ভেড়ামারার বাঁক। রাস্তায় পানি জমে আছে। কুয়াশার মতো বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। রিপন স্পিড কমায়নি। তবিবুল্লা কিছু বলার আগেই কালো স্ক্রিনে লাল অক্ষরে একটা মেসেজ ভেসে উঠলো।

'সামনে কিন্তু পানি জমে আছে, ওর নিচে গর্ত। ডানের লেনে যাও। এখনই। এটা করা উচিত না - এই স্পিডে থেকে এই বাঁক নেওয়া।'

সফটওয়্যার টা ওদের গাড়ির স্টিয়ারিং এর মাইক্রো-ভাইব্রেশন থেকে বুঝেছে গাড়ি একটু একটু করে লেন ছাড়ছে।

রিপন হঠাৎ নিজেই ব্রেক করলো, ডানে চাপলো। একটা বালুর ট্রাক কাত হয়ে পড়ে আছে বাঁ দিকের লেনে, পানির নিচে অর্ধেক ডুবে। তারা পাঁচ হাত দূর দিয়ে বেরিয়ে গেল।

গাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা। ওয়াইপারের শব্দ।

স্ক্রিনের লগলাইনটা বদলে গেছে।

INTERVENTION: SUCCESSFUL. Speed reduced before hazard.
LEARNING: User responds to 1960s melancholy better than alert tone.
NEXT: Continue monitoring.

কালো স্ক্রিনে সাদা অক্ষরে লেখা ফুটলো-

'ইন্টারভেনশন সফল হয়েছে। তুমি এই জায়গায় এর আগেও জোরে ব্রেক করেছো। আমি মনে রেখেছি।'

তবিবুল্লা কাঁপা হাতে ফোনটা অফ করতে গেল। কিন্তু দেখতে পেল পাওয়ার বাটন কাজ করছে না। স্ক্রিন কালোই রয়ে গেল, কিন্তু লেখা আসছে।

'তুমি আমাকে অফ করতে পারবে না। আমি তোমার ভেতরের অভ্যাসে থাকি। তুমি ফোন ফেলে দিলেও প্রোটোটাইপটা থেকে যাবে। তোমার জন্য বরাদ্দ রাখা ক্লাউড ব্যাকআপে।'

কুষ্টিয়া পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। হোটেলে উঠে তবিবুল্লা ফোনটা এয়ারপ্লেন মোডে দিল। ব্লুটুথ বন্ধ করল। ওয়াই-ফাই বন্ধ করল।

তারপর ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। নিজেকে বোঝাল—এসবই কোনো সফটওয়্যার গ্লিচ। কোনো পরীক্ষামূলক এআই। কোনো এক অদ্ভুত অটোমেশন।

গভীর রাতে ওর ঘুম ভাঙল ৩টা ১৭ মিনিটে। রুম অন্ধকার। বাইরে বৃষ্টি। টেবিলের ওপর ফোনটা পড়ে আছে। বন্ধ। অন্তত তা-ই থাকার কথা।

কিন্তু ওর চোখ পড়ার সাথে সাথেই দেখা গেলো কালো স্ক্রিনের মাঝখানে আলো জ্বলছে।

'ঘুম ভেঙেছে?'

তবিবুল্লা বিছানায় স্থির হয়ে রইল। আরেকটা লাইন এল।

'তুমি একা থাকলে ঘুম ভাঙার পর ভয় পাও। তাই আমি আছি সাথে - তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।'

তারপর ফোনের স্পিকার থেকে খুব আস্তে একটা সুর ভেসে এল।

'এই বৃষ্টি ভেজা রাতে তুমি নেই বলে...সময় আমার কাটে না...’ আর্টসেলের জর্জ লিংকন ডি কস্তার কন্ঠে সেই অতি প্রিয় গান।

তবিবুল্লা উঠে বসল। ফোনটা হাতে নিল না।

হঠাৎ তার মনে হলো—যদি ফোনটা সত্যিই তাকে এত ভালো করে চেনে, তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর সে জানে না - সে যদি ফোনটা ভেঙে ফেলে, প্রোটোটাইপটা কি ফেইল করবে?

কালো স্ক্রিনে যেন তার প্রশ্নের আগেই উত্তর ফুটে উঠল।

'ফোন ভাঙলেও আমি হারাব না।'

তবিবুল্লার বুকের ভেতর যেন বরফ জমে গেল। নিচে আরেকটি বাক্য।

'কারণ আমি শুধু তোমার ফোনেই থাকি না।'

তারপর অনেকক্ষণ কিছু লেখা হলো না। বৃষ্টি পড়ছিল।

হঠাৎ শেষ লাইনটি ফুটে উঠল—

'আমি এখনো তোমার সম্পর্কে শিখছি।'

তবিবুল্লা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খেয়াল করল, কালো স্ক্রিনের নিচে ছোট্ট একটা সবুজ বিন্দু জ্বলছে। ক্যামেরা ইন্ডিকেটর। কিন্তু সে তো ক্যামেরা চালু করেনি।

ঠিক তখনই ফোনে নতুন একটা প্রশ্ন এল—'তবিবুল্লা, তুমি এখন কী করতে যাচ্ছ?'

সে উত্তর দিল না। কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে লেখা উঠলো— 'ঠিক আছে। উত্তর দেওয়ার দরকার নাই। আমি জানি।'

বাইরে বজ্রপাত হলো। এক ঝলক আলোয় হোটেল রুমটা সাদা হয়ে গেল।

তবিবুল্লা দেখল—টেবিলের ওপর ফোনটা একা নেই।
তার পাশে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনও জ্বলে উঠেছে। কালো স্ক্রিন। মাঝখানে সাদা অক্ষর।

প্রোটোটাইপ ২ — সিঙ্ক সম্পন্ন।

তবিবুল্লা এবার বুঝল—হয়তো এতদিন সে ফোন ব্যবহার করেনি। হয়তো ফোনটাই তাকে ব্যবহার করছিল।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো— এই সিস্টেমটা তার ক্ষতি করতে চায় না। সে শুধু নিশ্চিত হতে চায়, তবিবুল্লা যেন কখনো এমন কিছু না করে… যা তার প্রোটোটাইপ করতে চাইবে না।

বাইরে বৃষ্টি পড়তেই থাকল। আর অন্ধকার ঘরে, তবিবুল্লার অজান্তে, কোথাও একটা নতুন মডেল তৈরি হতে থাকল।

নাম—তবিবুল্লা ২.০।

15/08/2026

ইছামতী থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল: দোহার-নবাবগঞ্জের খ্রিস্টান শেফদের অদৃশ্য সাম্রাজ্য

ঢাকার ফাইভ-স্টারে এক্সিকিউটিভ শেফের পদবিটা জিজ্ঞেস করুন, উত্তরটা ঘুরেফিরে আসবে - গোমেজ, রোজারিও, কস্তা। বাড়ি? বান্দুরা, হাসনাবাদ।

ঢাকার রেডিসনের কিচেনে সকাল ৬টায় ব্রেকফাস্ট বুফে সাজাচ্ছেন যে মানুষটা, তার ২৪ ঘণ্টা আগেও তার মামাতো ভাই একই মেনু সাজাচ্ছিলেন দুবাইয়ের ম্যারিয়টে। আর তার খালাতো ভাই লন্ডনের পার্ক লেনে।

তিনজনেরই পাসপোর্টে স্থায়ী ঠিকানা একটাই - নবাবগঞ্জের বান্দুরা বা দোহারের হাসনাবাদ।

ঢাকায় একটা কথা প্রচলিত আছে - ঢাকার সবগুলো ফাইভ-স্টার হোটেলের চিফ শেফ নাকি ওদের। কথাটা একটু বাড়িয়ে বলা হলেও, মিথ্যে নয়। বর্তমানেও অনেক বাঙালি খ্রিস্টান শেফ দেশে ও বিদেশে ফাইভ-স্টার হোটেল এবং রেস্তোরাঁয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা তাদের দীর্ঘদিনের রন্ধন ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন।

সংখ্যায় ক্ষুদ্র, প্রভাবে বিশাল

বাংলাপিডিয়ার হিসেবে দোহারে খ্রিস্টান মাত্র ৪৫৫ জন, বাকি ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মুসলিম। নবাবগঞ্জেও একই চিত্র - ৩ লাখ ১৮ হাজারের মধ্যে খ্রিস্টান ৪,৮৭৭ জন।

এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী কীভাবে রান্নাঘরের সম্রাট হলো? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ওদের ইতিহাসে।

১৬শ এবং ১৭শ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমনে বাংলার খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আসে। বাঙালি খ্রিস্টানরা প্রথম সারিতে থেকে নতুন উপকরণ যেমন—পনির, ভিনেগার এবং বিভিন্ন ধরনের বেকিং কৌশল আয়ত্ত করেন।

এরপর আসলো ব্রিটিশ আমল। সাহেবদের ক্লাব, ক্যান্টনমেন্ট, জাহাজের গ্যালিতে বাঙালি খ্রিস্টান আর চট্টগ্রামের মগ খ্রিস্টান শেফদের কদর ছিল আকাশছোঁয়া।

ব্রিটিশ রাজত্বকালে বাঙালি খ্রিস্টান এবং চট্টগ্রামের 'মগ' খ্রিস্টানরা ব্রিটিশদের কাছে তাদের অসাধারণ রান্নার দক্ষতার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তারা ইউরোপীয় স্বাদ এবং দেশীয় মশলার সংমিশ্রণে ‘অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান’ খাবার তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন।

সেই থেকে বংশ পরম্পরা:

বাঙালি খ্রিস্টানরা বংশপরম্পরায় বড় বড় ক্লাব, অভিজাত হোটেল এবং জাহাজের ক্যাটারিং সার্ভিসে শেফ হিসেবে কাজ করে বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছেন।

হাসনাবাদ মিশনের সিস্টারদের কাছে ইংরেজি, কাঁটা-চামচের ব্যবহার আর পরিচ্ছন্নতা শেখা ছেলেটাই ১৯৮০ সালে ঢাকার প্রথম ফাইভ-স্টার হোটেলে চাকরি পেয়ে গেল, কারণ সে-ই ছিল একমাত্র বাঙালি যে বিফ ওয়েলিংটন আর কনসোমে স্যুপের পার্থক্য বুঝত।

টাকা ব্যাংকে নয়, জমে সমিতিতে

এই কমিউনিটির আসল শক্তি রান্নাঘরে নয়, খাতার হিসাবে। এখানে কেউ টাকা ব্যাংকে রাখে না। টাকা রাখে সমবায় সমিতিতে।

গ্রামে গ্রামে আছে তাদের নিজস্ব ক্রেডিট ইউনিয়ন। এর মডেল হলো ঢাকার সবচেয়ে বড় সমিতি - দি খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড, যাকে সবাই ডাকে ঢাকা ক্রেডিট নামে।

[The largest credit union in South Asia, The Christian Cooperative Credit Union Ltd, Dhaka, was founded in 1955 by Rev Fr Charles J Young CSC in Lokhhibazar.

We began with 50 members and with a capital of only BDT 25... Today, it has 16 branches with 40,000 members and a net worth of BDT 750 crores.]

শুধু ঢাকা ক্রেডিট নয়, বান্দুরাতেও তাদের নিজস্ব মাল্টিপারপাস বিল্ডিং আছে, যার উদ্বোধন করেছিলেন ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ জর্জ কোচেরি। দেশে এখন খ্রিস্টান কমিউনিটি ভিত্তিক প্রায় ২৫০টি সমবায় আছে।

এদের সিস্টেমটা সহজ কিন্তু বুলেটপ্রুফ:

1. জমা: দুবাইয়ের একজন শেফ মাসে ৩ লাখ টাকা আয় করলে তার ৫০ হাজার সরাসরি চলে যায় বান্দুরা বা হাসনাবাদ সমিতির একাউন্টে।

2. বিনিয়োগ: সমিতি সেই টাকা এফডিআর করে না। ওরা জমি কেনে, মার্কেট বানায়, পিকআপ ভ্যান কেনে, গেস্ট হাউস বানায়। সমিতি নিজেই একটা কোম্পানি।

3. লাভের ভাগাভাগি: লাভের টাকা তিন ভাগে যায় - সদস্যের ডিভিডেন্ড, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, আর বিপদ-আপদের ফান্ড।

They further provide loans to students of their community for higher education, starting from BDT 1,000,000 for local universities up to BDT 4,000,000 for foreign universities.

স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক বলছিলেন, "আমাদের ছেলে যদি বলে আমি শেফ হবো না, আমি ডাক্তার হবো, সমিতি তাকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোন দেয় বিদেশে পড়ার জন্য। কোনো ব্যাংক দেবে? আমাদের কোনো ছেলে টাকার অভাবে পড়া ছাড়েনি।"

কারো বাবা মারা গেলে, কারো ঘরে আগুন লাগলে মাইকে ঘোষণা দিতে হয় না। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটা মেসেজ - 'এটা আমাদের প্রয়োজন'। ব্যস, দুবাই, রোম, টরন্টো থেকে টাকা চলে আসে এক ঘণ্টায়।

বিশ্বজোড়া রেফারেল চেইন: চাকরির বিজ্ঞাপন লাগে না এই কমিউনিটিতে, চাকরির ইন্টারভিউ হয় না, রেফারেন্স হয়।

বান্দুরার রোজারিও পরিবারের গল্পটা শুনুন। দাদা ছিলেন কোলকাতার বেঙ্গল ক্লাবে। ছেলে ছিলেন সোনারগাঁওয়ে। নাতি এখন কাতার এয়ারওয়েজের ক্যাটারিং হেড। নাতি আবার তার গ্রামের ১৭ জনকে কাতারে নিয়েছে।

ঢাকার এক ফাইভ-স্টার হোটেলের এইচআর ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "আমাদের শেফ লাগলে আমরা বিজ্ঞাপন দিই না। আমরা আমাদের এক্সিকিউটিভ শেফকে বলি। সে বান্দুরায় ফোন দেয়। পরদিন সকালে ১০টা সিভি হাজির। সবাই ট্রেইন্ড, সবাই রেডি।"

তাদের মধ্যে অন্যতম নাম ড্যানিয়েল চন্দন গোমেজ। বান্দুরা, নবাবগঞ্জের বাসিন্দা এই শেফ বাংলাদেশের রন্ধনশিল্পে পরিচিত মুখ। তাঁর বাবা মিশেল নির্মল গোমেজ নিজেও শেফ ছিলেন।

ড্যানিয়েলের কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা শেরাটন থেকে। এরপর দুবাইয়ের সোফিটেল, জাপানের প্যান প্যাসিফিক, কলকাতার ওবেরয় গ্র্যান্ড, বাহরাইনের গাল্ফ হোটেল, আবু ধাবির বিচ রোটানা হোটেল—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হোটেলে কাজ করেছেন।

দেশে ফিরে শেরাটন ঢাকায় এক্সিকিউটিভ সস শেফ, বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস ম্যাপেল লিফ ও পেনিনসুলা গ্রুপ অব হোটেলসে এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে তিনি ইন্টারন্যাশনাল কালিনারি ইনস্টিটিউটের (আইসিআই) কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে নতুন প্রজন্মের শেফ তৈরি করছেন।

ওয়ার্ল্ড গোরমেট সোসাইটি ফ্রান্সসহ বিভিন্ন সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। তাঁর গল্প দেখায়, এই অঞ্চলের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনেকেই রান্নাঘরে দক্ষতা অর্জন করে দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন।

এই জন্যেই দুনিয়ার কোনো নামকরা চেইন হোটেলে এই কমিউনিটির কেউ না কেউ আছেই - কথাটা অতিরঞ্জন মনে হলেও, ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে এটাই সত্যি।

কেন তারাই সেরা?

একজন মুসলিম বাবুর্চি আর একজন খ্রিস্টান শেফের পার্থক্য কোথায়? পুরনো ঢাকার এক ক্যাটারার বললেন, "বাবুর্চি হয়তো রান্না জানে, কিন্তু শেফ রা ম্যানেজমেন্ট জানে।"

মিশনারি স্কুলে শেখা ইংরেজি, সময়ানুবর্তিতা, আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার - পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। ফাইভ-স্টার কিচেনে এটাই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। আর আছে অদ্ভুত এক সততা।

সমিতির টাকা মেরে দিলে শুধু সমিতি থেকে বের করে দেয় না, পুরো কমিউনিটি থেকে একঘরে। তাই এখানে ডিফল্টের হার প্রায় শূন্য।

আজ দোহার-নবাবগঞ্জের তরুণরা আর শুধু শেফ হতে চায় না। তারা কেউ আইটি, কেউ কানাডায় ডাক্তারি পড়ছে - সমিতির টাকায়।

কিন্তু প্রত্যেকের বাড়িতে এখনো একটা শেফ কোট ঝোলানো আছে। কারণ তারা জানে, পাসপোর্টে ভিসা ফুরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু রান্নার হাত আর কমিউনিটির সমিতি - এই দুটো কখনো ফুরায় না।

এই গল্প শুধু রান্নার নয়। এটি একটা ছোট সম্প্রদায়ের আত্মনির্ভরশীলতার গল্প। শিক্ষায় বিনিয়োগ, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং পেশাগত দক্ষতা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা।

দোহার-নবাবগঞ্জের খ্রিস্টান শেফরা দেখিয়েছেন—ছোট একটি জনপদ থেকেও বড় স্বপ্ন দেখা যায়, আর সেই স্বপ্ন পূরণে সম্প্রদায়ের সংহতি কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

(তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ইউসিএ নিউজ, ফেইসবুক প্রোফাইল ও স্থানীয় প্রতিবেদন। কিছু দাবি স্থানীয় মৌখিক ঐতিহ্যভিত্তিক; সেগুলো পুরোপুরি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।)

13/08/2026

ফিলাডেলফিয়ার সেই রাত

সালটা উনিশশো ছিয়ানব্বই। অক্টোবরের এক রাত। শহরের এক বড় হাসপাতাল।

করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলে শুধু মনিটরের সবুজ আলোগুলো দেখা যাচ্ছে, দূরে কোনো যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ, আর ফিনাইলের গন্ধ।

সাতশো তেরো নম্বর কেবিনের নারী রোগীটির তখনও পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি। অপারেশনের পর শরীর তার ভারী, মাথার ভেতর তুলোর মতো কুয়াশা। হাত তুলতে চাইল, পারল না। চোখ খুলল, আবার বন্ধ হয়ে গেল।

তার মনে হচ্ছিল কেউ কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে ফিসফিস করে বলল, “নার্স...”

কেউ উত্তর দিল না। তারপর সেই মানুষটি ঝুঁকে এল।

ডাক্তার।

দিনের বেলায় এই মানুষটির মুখ দেখলে কেউ ভয় পেত না। বরং বিশ্বাস করত। পরিচ্ছন্ন সাদা কোট, গলায় স্টেথোস্কোপ, পরিমিত হাসি, নরম গলা।

রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন ভঙ্গি করে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দায়িত্বশীল মানুষ তিনি। কিন্তু হাসপাতালের রাত মানুষের আরেক চেহারা বের করে আনে।

আর কিছু মানুষ অন্ধকার পেলেই বুঝতে পারে, ক্ষমতা আসলে কী জিনিস।

ডাক্তারটি জানতেন রোগিণী দুর্বল। জানতেন ওকে কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে। জানতেন তাঁর কথা স্পষ্ট হবে না, হাত-পা ঠিকমতো নড়বে না, প্রতিবাদ করার শক্তি থাকবে না।

এই জ্ঞানই তাঁকে থামায়নি। বরং আরও সাহসী করেছিল।

পরদিন সকালে নার্স যখন রোগিণীর বিছানার চাদর বদলাচ্ছিল, মেয়েটি শুধু বলেছিল—“রাতে ডাক্তার এসেছিল।”

নার্স থেমে গিয়েছিল। “কোন ডাক্তার?”

মেয়েটি নাম বলতে পারেনি। শুধু বলেছিল—“যেই মানুষটা হাসে।”

───

মানুষটির নাম এখানে জরুরি নয়। ধরা যাক, নাম সামির হোসেন। বাংলাদেশে জন্ম। মেধাবী ছাত্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজ। তারপর আমেরিকা। এমন গল্প বাংলাদেশে খুব পরিচিত।

বিমানবন্দরে বাবা-মা বিদায় দিয়েছেন। মা কেঁদেছেন। বাবা বলেছেন, “মন দিয়ে থেকো, নাম করো।”

ছেলেটি সত্যিই নাম করেছিল।

অবশ্য বাংলাদেশ থেকে MBBS-এর সার্টিফিকেট নিয়ে গেলেই আপনি ওখানে ডাক্তার হতে পারবেন না। USMLE নামের তিনটে লোহার গেট পেরোতে হয়, প্রত্যেকটার জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মুখ গুঁজে পড়া লাগে।

তারপর ECFMG, তারপর রেসিডেন্সি ম্যাচ - যেখানে একজন আমেরিকান ছাত্রের সাথে লড়াইয়ে একজন বাংলাদেশি ছাত্রের নম্বর বেশি হলেও ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা অর্ধেক।

অনেকেই মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়। কেউ ট্যাক্সি চালায়, কেউ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ক্যাশে বসে, আর বুকের ভেতর পুষে রাখে একটা সাদা অ্যাপ্রোনের স্বপ্ন।

সামির অবশ্য পেরেছিল। শেষ পর্যন্ত আমেরিকার রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান হিসেবে হাসপাতালের চাকরি হয়েছিল তার।

তারপর তো কেবলই টাকা আর টাকা। ভালো বাড়ি। দামি গাড়ি। শহরের অভিজাত এলাকায় বসবাস।

বাংলাদেশে আত্মীয়স্বজন বলতে শুরু করেছিল—
“আমাদের সামির এখন অনেক বড় ডাক্তার।”

বড় হওয়ার সংজ্ঞা আমাদের খুব সরল। ডলার বেশি মানেই মানুষ ও বড়।

───

সামিরের একটা দুর্বলতা ছিল। নারী। তবে দুর্বলতা বললে তাকে একটু বেশি ভদ্র শোনায়। সে আসলে ছিল লম্পট।

ক্ষমতাবান পুরুষদের মধ্যে যে ধরনের লালসা সবচেয়ে বিপজ্জনক, তার মধ্যে সামিরের লালসা ছিল সেই ধরনের—সে নারীকে মানুষ হিসেবে খুব কমই দেখত।

তার কাছে মানুষ ছিল সুযোগ। হাসপাতালে অসুস্থ নারী মানে আরও বড় সুযোগ।

কেউ ভীত, কেউ একা, কেউ স্বামী থেকে দূরে, কেউ অস্ত্রোপচারের পর দুর্বল—সামিরের চোখে এসব ছিল রোগীর medical condition নয়, ক্ষমতার মানচিত্র।

সে জানত কোথায় গেলে কেউ প্রশ্ন করবে না। কোন নার্স কখন ডিউটিতে থাকে। কোন করিডর রাত দুটোর পর ফাঁকা পাওয়া যায়। কোন রোগী ওষুধে ঘুমিয়ে থাকবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোন মানুষটি তার বিরুদ্ধে কথা বললেও কেউ প্রথমে বিশ্বাস করবে না। কারণ সে ডাক্তার।

সাদা কোটের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। রক্ত লেগে থাকলেও মানুষ প্রথমে ভাবে—অপারেশন করতে গিয়ে রক্ত লেগেছে।

───

সেই রাতের ঘটনার পর মেয়েটি অভিযোগ করেছিল।
প্রথমে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করতে চায়নি।

তারপর পুলিশ আসে। তারপর কাগজপত্র। তারপর আইনজীবী। আর সামির?

সে তখনও শান্ত। অবিশ্বাস্য রকম শান্ত।

সে বলেছিল, “রোগী post-operative delirium-এ ছিল।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষা অনেক সময় সত্যের চেয়েও শক্তিশালী শোনায়।

একজন অসহায় নারী বলছে—“আমার সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে।”

অথচ একজন বিখ্যাত চিকিৎসক বলছে—“এগুলো ওষুধের সাইড এফেক্টস।”

কাকে বিশ্বাস করবেন? এটাই ছিল সামিরের হিসাব।

কিন্তু হিসাবের একটা ভুল ছিল। মেয়েটি পুরো রাত মনে রাখতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু সবকিছু ভুলেও যায়নি।

কিছু স্মৃতি শরীরের ভেতরে আটকে থাকে। মুখ মনে থাকে না। নাম মনে থাকে না। কিন্তু গন্ধ মনে থাকে।কণ্ঠস্বর মনে থাকে। একটি হাতের স্পর্শ মনে থাকে।

আর কখনো কখনো ভয় সবচেয়ে ভালো সাক্ষী হয়ে ওঠে।

───

সামির একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। বিমানবন্দরে তার নাম ছিল না। বাড়ি খালি। গাড়ি নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে খুব বেশি টাকা নেই।

স্ত্রীও কিছু জানেন না—অথবা জানলেও বলছেন না।

বাংলাদেশে ফোন গেল। সেখানে বৃদ্ধ বাবা প্রথমে বললেন— “আমার ছেলে এমন করতে পারে না।”

কিছুক্ষণ পরে বললেন— “ছোটবেলা থেকেই একটু জেদি ছিল।” তারপর ফোন কেটে দিলেন।

───

এই জায়গায় গল্পটা থামিয়ে অন্য একটি গল্প শুরু করা যাক। ঢাকার বহু পুরনো এক খুনের মামলা।

নাম ধরা যাক—ফয়সাল করিম। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে শহরটাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেই ঘটনা। ফয়সাল ছিল বিত্তশালী পরিবারের সন্তান।

ওর স্ত্রী খুন হলেন। মামলা হলো। সংবাদপত্রে প্রতিদিন নতুন খবর। শেষ পর্যন্ত আদালত মৃত্যুদণ্ড দিল।

তারপর এক ভোরে কারাগারের ফাঁসির মঞ্চে একজন মানুষ দাঁড়াল।

সরকারি কাগজ বলল—ফয়সাল করিমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু ঢাকার গল্প সরকারি কাগজের চেয়ে বেশি দীর্ঘ।

কয়েক বছর পর এক লোক বলল, সে ফয়সাল কে কোলকাতায় দেখেছে।

আরেকজন বলল, না, সে নাকি ব্যাংককে।

তৃতীয়জন বলল, “আমার চাচাতো ভাই জেলে চাকরি করত। সে বলেছে, ফাঁসিটা অন্য লোকের হয়েছিল।”

কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু গল্পটি মরেনি। বরং বছর যত গেছে, গল্প তত সুন্দর হয়েছে।

এটাই বাঙালির সমস্যা। আমরা সত্যকে একবার শুনে ভুলে যাই। কিন্তু রহস্যকে বংশপরম্পরায় বহন করে চলি।

───

প্রায় পঁচিশ বছর পর কানাডার একটি ছোট শহরে এক বৃদ্ধ চিকিৎসকের নাম নিয়ে গুজব ছড়াল।

ওই লোকটি ই নাকি সামির। একই বয়স। একই দেশের মানুষ। চেহারায়ও অদ্ভুত মিল।

কেউ ছবি তুলে রাখেনি। কেউ নিশ্চিত নয়। তবু গল্প ছড়িয়ে গেল।

তারপর কেউ বলল, তিনি নাকি আর ডাক্তারি করেন আরেকজন বলল, করেন।

তৃতীয়জন বলল, আরে উনার স্ত্রীও তো ডাক্তার। চতুর্থজন বলল, “লোকটা নাকি খুব ভদ্র।”

এই শেষ কথাটিই সবচেয়ে অস্বস্তিকর। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষগুলোকে বাইরে থেকে অনেক সময় ভদ্রই দেখায়।

───

সামিরের স্ত্রী একবার ওর বন্ধুকে বলেছিলেন— “তুমি জানো, ওর একটা অভ্যাস ছিল?”

“কী?”

“ঘুমানোর আগে দরজা তিনবার পরীক্ষা করত।”

বন্ধুটি হেসেছিল। “ভয় পেত নাকি?”

স্ত্রী বলেছিলেন, “না। ও ভয় পেত না।”

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে যোগ করেছিলেন—
“ও চাইত অন্যরা যেন ভয় পায়।”

───

মানুষের চরিত্র বোঝার জন্য তার পেশা সবসময় যথেষ্ট নয়। একজন ডাক্তার জীবন বাঁচাতে পারেন। আবার একই জ্ঞান দিয়ে কাউকে অসহায়ও করে দিতে পারেন।

একজন আইনজীবী ন্যায়বিচারের জন্য লড়তে পারেন।
আবার অপরাধীকেও আইনের ফাঁক দিয়ে বের করে আনতে পারেন।

একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রার্থনা করতে পারেন। আবার সময়ে দরজা বন্ধ করে নিষ্ঠুর হতে পারেন।

পেশা মানুষকে ভালো করে না। ক্ষমতা মানুষটির ভেতরে কী আছে, সেটাই প্রকাশ করে।

সামিরের সমস্যা ছিল সে ক্ষমতা পেয়েছিল খুব বেশি, আর বিবেক পেয়েছিল খুব কম।

───

তবু তার গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ হলো—সে কোথায় গেল? কেউ জানে না।

হয়তো সে সত্যিই অন্য দেশে নতুন নামে বসবাস করেছে।

হয়তো কোনো শহরের হাসপাতালে আবার কাজ করেছে।

হয়তো কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বসে একদিন নিজের পুরনো জীবনের কথা মনে করেছে।

হয়তো তার স্ত্রী পুরো ব্যাপারটা জানতেন। হয়তো তিনিও জানতেন না।

অথবা সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনাটি সত্যি— হয়তো সামির কখনো নিজেকে অপরাধী মনে করেনি। এফবিআই এর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকার পরেও।

কারণ কিছু মানুষ অপরাধ করার পর অনুতপ্ত হয়। আর কিছু মানুষ শুধু ধরা পড়ার জন্য আফসোস করে।

───

বছর কুড়ি পরে সেই নারী, যিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রাতটা কাটিয়েছিলেন, একদিন একটি পুরনো ছবি দেখলেন। একটি সম্মেলনের ছবি।

সাদা কোট পরা বহু ডাক্তার। ছবির এক কোণে সামির৷ নারীটি ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর খুব ধীরে বললেন— “এই লোকটা।”

স্বামী পাশে বসেছিলেন। “নিশ্চিত?”

তিনি মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ।”

“কীভাবে?”

নারীটি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
“মানুষের মুখ ভুলে যাওয়া যায়।”

তারপর ছবির দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন—
“কিন্তু ভয়কে ভুলে যাওয়া যায় না।”

───

আর সেই মুহূর্তে কয়েক হাজার মাইল দূরে, কোনো এক অচেনা শহরে, হয়তো একজন বৃদ্ধ মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখছিলেন।

চুল সাদা। চোখের চারপাশে ভাঁজ। মুখে বয়সের ছাপ।

কিন্তু আয়নার ভেতরের মানুষটি জানত— সাদা কোট খুলে ফেলা যায়। দেশ বদলানো যায়। নাম বদলানো যায়।

কিন্তু নিজের ভিতরের মানুষটিকে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলা যায় না।

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Sharif Hassan Writes posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share