23/08/2026
"আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে চড়ে ঘুরে বেড়ানো। ১৯২৮ সালে সেই সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যাই, অসাধারণ সেই ট্রেন যাত্রার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।"
এই কথাগুলো আগাথা ক্রিস্টির। রহস্য উপন্যাসের রানীর জীবনের সবচেয়ে বড় শখ ছিল দামি এই ট্রেনে চড়া। অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস (Orient Express) ছিলো ১৮৮৩ সালে চালু হওয়া ইউরোপের অত্যন্ত বিলাসবহুল দূরপাল্লার ট্রেন সেবা।
এটি প্যারিস থেকে ইস্তাম্বুল (কনস্টান্টিনোপল) পর্যন্ত যাতায়াত করত। মাঝেমধ্যে এথেন্স, ব্রাসেলস আর লন্ডনের যেতো। ২০০৯ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
বাগদাদের ধুলোবালি মাখা এক প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে ঘুরতে গিয়ে ব্রিটিশ তরুণী আগাথা ক্রিস্টি'র দেখা হয়ে যায় ম্যাক্স ম্যালোন নামে এক সুদর্শন প্রত্নতাত্ত্বিকের সাথে। তারপর যা হয়, প্রেম, বিয়ে, এবং বিয়ের পর বরের সাথে সাথে আরও বেশি করে ট্রেনে ঘোরাঘুরি। ভদ্রমহিলা ট্রেনে ঘুরতে ঘুরতেই ভেবে ফেলেছিলেন তার বিখ্যাত 'মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' গল্পের প্লট।
গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বলছে, আগাথা ক্রিস্টি হলেন পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের লেখক। এই জায়গায় শুধু উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার ধারে কাছে আসতে পারেন। গিনেস রেকর্ডসের তথ্যে, তাঁর ৭৮টি ক্রাইম উপন্যাস প্রায় ২ বিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে, আর তাঁর বই ৪৪টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু বিক্রির হিসাব নয়, এগুলো পাঠকের বিশ্বমানচিত্রও বটে—কারণ ক্রিস্টি একা ইংরেজি সাহিত্যের সীমানা পেরিয়ে গোটা পৃথিবীর পাঠাভ্যাসে ঢুকে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রত্যেকের ঘরে ১০ কপি করে থাকার কথা।
আর এই বিপুল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্নগুলোর একটা হলো "মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস"।
১৯৩৪ সালে বইটা বের হয়। গল্পটা খুব সোজা, আবার খুবই জটিল। শীতকালে ইস্তাম্বুল থেকে লন্ডন যাচ্ছিল রাজকীয় অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস। বাইরে তুষারপাত হচ্ছে, ট্রেন আটকে গেছে যুগোস্লাভিয়ার মাঝখানে, কোথাও জনমানব নেই।
বছরের অফ সিজন তখন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ট্রেন প্রায় ভর্তি। নানা দেশের, নানা ভাষার লোক। তার মধ্যে আছেন আমাদের প্রিয়, মাথায় ডিমের মতো টাক আর গোঁফে তা দেওয়া বেলজিয়ান গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো।
রাতারাতি তার পাশের কামরাতেই এক আমেরিকান ব্যবসায়ী খুন হন। লাশের গায়ে দেখতে পাওয়া যায় বারোটা ছুরির দাগ। কোনোটা ডান হাতে মারা, কোনোটা বাম হাতে। কোনোটা জোরে, কোনোটা আস্তে। মানে খুনি একই সাথে ডানহাতি ও বামহাতি, নারী ও পুরুষ। কামরায় পাওয়া যাচ্ছে একের পর এক ভুয়া ক্লু।
কন্ডাক্টরের ইউনিফর্ম পরা এক বেঁটে লোককে দেখা গেছে, লাল কিমোনো পরা এক মহিলাকে দেখা গেছে, যারা ট্রেনে থাকার কথাই না। আর ট্রেনের সব যাত্রীর অ্যালিবাই একদম পাকা। বাইরে থেকে কেউ ওঠেনি, কেউ নামেনি। তাহলে খুনি কোথায়? খুনি ট্রেনেই আছে, হয়তো আপনার পাশের সিটেই বসে চা কাটলেট খাচ্ছে।
এই হলো ট্রেনের ম্যাজিক। লেখক বা পরিচালকের জন্য এর চেয়ে ভালো লোকেশন আর হয় না। একটা বদ্ধ ঘর, সেটা আবার ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। আপনি পালাতে পারবেন না, খুনিও পালাতে পারবে না। পাঠক বা দর্শক বাধ্য হয়ে পুরোটা পড়বে বা দেখবে, কারণ ট্রেন থামার আগে তো নামতে পারবে না।
আগাথা এই ফর্মুলাটা বুঝেছিলেন বলেই ট্রেনকে বারবার ফিরিয়ে এনেছেন। আর তার দেখাদেখি গোটা দুনিয়ার পরিচালকরাও বুঝে গেছেন, বাজেট কম, টেনশন বেশি করতে চাও? একটা ট্রেন ভাড়া করো।
ট্রেন নিয়ে সিনেমার ইতিহাস সিনেমার চেয়েও পুরনো। ১৯০৩ সালে প্রথম ন্যারেটিভ ফিল্মের নাম ছিল - দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি। ট্রেন ডাকাতি। তারপর থেকে হলিউড ট্রেনকে ছাড়েনি।
হলিউড ট্রেনকে তিনভাবে ব্যবহার করে।
এক, বিলাসবহুল ট্রেন। যেখানে খুন, ডাকাতি, প্রেম সবই হয় ফার্স্ট ক্লাসে। যেমন অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, বা বুলেট ট্রেন যেখানে ব্র্যাড পিট জাপানের ট্রেনে উঠে সবাইকে মারছেন, কিন্তু ট্রেন সময় মতো চলছে।
দুই, অভিশপ্ত ট্রেন। যেমন স্নো-পিয়ার্সার। গোটা পৃথিবী বরফে ঢেকে গেছে, মানবজাতির শেষ কয়জন মানুষ একটা ট্রেনে অনন্তকাল ধরে ঘুরছে। ইকোনমি ক্লাসে গরিবরা প্রোটিন বার খাচ্ছে, ফার্স্ট ক্লাসে বড়লোকরা স্টেক খাচ্ছে। পুরো পুঁজিবাদের ক্লাসরুম ভার্সন।
তিন, ট্রেন মানেই টাইম মেশিন। সোর্স কোড বা পোলার এক্সপ্রেস দেখেন। ট্রেনে উঠলেই আপনি অন্য সময়ে চলে যাবেন।
কোরিয়ানরা আবার ট্রেনকে বানিয়েছে জম্বি বাস। ট্রেন টু বুসান (এটার নাকি একটা ভোজপুরি ডাবড ভার্সন আছে, নাম ট্রেন তো ভূষণ)। ভাবেন একবার, আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন, ট্রেনের লোকজন একেক করে জম্বি হয়ে যাচ্ছে। আপনি নামতেও পারবেন না, পরের স্টেশন ৫০ কিলোমিটার পরে।
এর চেয়ে বড় হরর আর কি হতে পারে? বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের খেলা?
ভারতীয় সিনেমায় ১৯৮০ সালের বানানো দ্য বার্নিং ট্রেন মনে আছে? ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না, জিতেন্দ্র তিন হিরো মিলেও একটা জ্বলন্ত ট্রেন থামাতে পারছেন না। সিনেমাটা ফ্লপ করেছিল, কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় টিভিতে দেখে মনে হতো, ট্রেনে উঠলেই আগুন লাগবে।
আর বাংলাদেশের ট্রেন মানেই প্রেম। গোলাপী এখন ট্রেনে। ববিতা ট্রেনে উঠে শহরে যাচ্ছে নায়িকা হতে। ট্রেন এখানে মুক্তির প্রতীক। গ্রাম থেকে শহর, দারিদ্র্য থেকে স্বপ্নে যাওয়ার বাহন। পরিচালক আমজাদ হোসেন ট্রেনকে বানিয়েছিলেন শ্রেণী সংগ্রামের রেললাইন।
আর এখন আমাদের আছে বনলতা এক্সপ্রেস। নামটা শুনলেই জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ে, কিন্তু ভেতরে উঠলে মনে হয় অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের গরিব চাচাতো ভাই। এসি চেয়ার, বায়ো টয়লেট, সময়ানুবর্তিতা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস।
মজার ব্যাপার হলো, সিনেমায় ট্রেন কখনো লেট করে না। মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস তিনদিনের যাত্রা, তুষারে আটকে গেলেও এর কাহিনী থামে না। ট্রেন টু বুসান ৪৫০ কিলোমিটার রাস্তা দুই ঘণ্টায় পার হয়ে যায়, জম্বি সহ। আর আমাদের বাস্তবের ট্রেন? এক ঘণ্টা লেট করলে আমরা বলি, আজ তো ট্রেন সময়ের আগেই এসেছে।
মুভির ডিরেক্টররা ট্রেন ভালোবাসেন, কারণ ট্রেনে কন্টিনিউটি মেইনটেইন করা সহজ। একটা কামরা, একটাই সেট। বাইরে জানালা দিয়ে বরফ বা গ্রাম ছুটে যাচ্ছে, ভেতরে নায়ক-নায়িকা প্রেম করছে বা খুনি খুন করছে। কম খরচে বেশি সাসপেন্স।
কিন্তু লেখকরা ট্রেন ভালোবাসেন অন্য কারণে। ট্রেন হলো সমাজের মিনিয়েচার ভার্সন। অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে যেমন ১২ জন যাত্রী, ১২টা দেশ, ১২টা শ্রেণী, ১২টা মোটিভ।
বনলতা এক্সপ্রেসেও তাই। এক বগিতে সরকারি চাকরিজীবী, প্রেমিক যুগল, বিদেশ ফেরত আঙ্কেল, আর বাচ্চা নিয়ে হিমশিম খাওয়া মা। সবাই একসাথে, কেউ কাউকে চেনে না, কিন্তু সবাই একই গন্তব্যে যাচ্ছে। এর চেয়ে ভালো গল্পের প্লট আর কোথায় পাবেন?
আগাথা ক্রিস্টি সেটা বুঝেছিলেন। তিনি জানতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হলো, অপরিচিত মানুষের সাথে আটকে থাকা। আর সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো, সেই আটকে থাকার মধ্যেই একটা গল্প খুঁজে পাওয়া।
আমি নিজে গত মাসে বইটা আবার পড়লাম। সেই একই অনুভূতি, চরম, মাথা নষ্ট, উরাধুরা। শেষ পাতায় এসে যখন জানা যায়, খুনি একজন না, সবাই মিলে খুন করেছে, তখন মনে হয়, আরে এ তো আমাদের অফিসের প্রজেক্টের মতো। দোষ সবার, কিন্তু দায় কারো না।
তাই ট্রেন বারবার ফিরে আসে। কখনো বিলাসবহুল অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস হয়ে, কখনো জম্বি ভর্তি বুসান এক্সপ্রেস হয়ে, কখনো গোলাপীকে নিয়ে, কখনো বনলতাকে সঙ্গী করে।
কারণ আমরা সবাই আসলে একটা ট্রেনেই আছি। জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাচ্ছে, ভেতরে আমরা একজন আরেকজনকে সন্দেহ করছি, ভালোবাসছি, আর ভাবছি কখন পরের স্টেশন আসবে।
আর পোয়ারো তার মগজের ছোট ধূসর কোষগুলো নিয়ে আমাদের দেখে মুচকি হাসছেন।