06/12/2024
আমি মনে করি এখন বাংলাদেশের প্রয়োজন........
’কুটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা’
আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি বা বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে আমাদের বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নেই; আমরা এ বিষয়ে আমেরিকাকে সমর্থন করতে পারি। কিন্তু আমাদের গুরুত্ব দিতে হচ্ছে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি নিয়ে। বাংলাদেশ তিন দিকে ভারতবেষ্টিত এবং এক দিকে বার্মা। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। আমাদের দেশটি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বিষয়টি মাথায় নিয়ে আমাদের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
ভারত মোটেও কোনো ভালো বন্ধু দেশ নয়; ভারতের সঙ্গে তার কোনো প্রতিবেশীরই সুসম্পর্ক নেই এবং তার একমাত্র কারণ ভারতের আগ্রাসী ও বড় ভাইসুলভ পররাষ্ট্রনীতি।
ভারত প্রতিবছর বাংলাদেশকে প্রতি অর্থবছরে নামকাওয়াস্তে একটি ‘অনুদান’ প্রদান করে যা আমরা প্রত্যাখ্যান করবো, ভারতের কোনো অনুদান আমাদের প্রয়োজন নেই।
আমাদের অর্থনীতি, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, আমাদের প্রতিরক্ষানীতি শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। ভারত কোনোকালেও বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে নাই; তারা শুধুই একতরফাভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে নোংরা মানসিকতা দেখিয়ে গেছে। এটা প্রতিহত করতে হবে। আর তা প্রতিহত করার জন্য আমাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী প্রয়োজন হবে, নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের আমেরিকার সঙ্গে কথা বলতে হবে; আমেরিকা যদি ভারত বাংলাদেশে কোনোদিন আক্রমণ করবে না এবং আক্রমণ করলে আমেরিকা তা প্রতিহত করবে এমন কোনো চুক্তিতে রাজি থাকে তাহলে আমরা আমেরিকাকে প্রাইওরিটি দিয়ে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করবো। আমেরিকা যদি আমাদেরকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখতে চায় বা আমাদের নিরাপত্তা গ্যারান্টি না দেয় বা ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্ব দেয়; তাহলে আমাদের সঙ্গে আমেরিকার কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজন নেই।
সেক্ষেত্রে আমরা পাকিস্তান এবং চায়নার সঙ্গে একটি সামরিক জোট তৈরির চিন্তা করবো। যে ত্রিদেশীয় সামরিক জোটটি হবে অনেকটা নেটোর আদলে। অর্থাৎ আমাদের কোনো একটি দেশকে যদি ভারত আক্রমণ করে তাহলে আমরা সেটাকে তিন দেশের উপরই ভারতের আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করবো এবং তিন দেশ মিলে সম্মিলিতভাবে ভারতকে প্রতিহত করবো। ভারতকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এরপরই আমরা আমাদের অভিন্ন নদীগুলোর পানি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবো। ভারত যদি তারপরও আমাদেরকে পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে রাজি না হয় সেক্ষেত্রে আমরা তাদের অবৈধ ব্যারেজগুলো শক্তি প্রয়োগ করে উড়িয়ে দিবো। আমাদের ন্যায্য হিস্যা আমরা আদায় করে নিবো যে কোনো মূল্যে। প্রয়োজনে আমরা ত্রিদেশীয় সামরিক চুক্তির আওতায় ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করবো। ভারতকে খবরদারি থেকে বের হয়ে আসতে বাধ্য করবো।
আলোচ্য ‘ত্রিদেশীয় সামরিক চুক্তি’টি আমাদের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারের কাজে দিবে।
ভারতকে দেওয়া বর্তমান ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের চুক্তিগুলো আমাদের বাতিল করতে হবে। ভারতকে আমরা ট্রানজিট দিতে রাজি হবো, তবে সেজন্য ভারতের থেকে কিছু জরুরি বিষয় আদায় করে তার বিনিময়ে ট্রানজিসহ অন্যান্য সুযোগগুলো দিবো।
যেমন: প্রথম কাজ হবে ভারতকে সবগুলো অভিন্ন নদীতে আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করতে হবে। এটি নিশ্চিত হলে তারপর আমরা ভারতের সঙ্গে অন্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনায় বসবো। সকল একতরফা বাঁধ বা ব্যারেজ অপসারণ করে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করার আগে ভারতকে কোনো সুবিধা দেবার প্রশ্নই আসবে না।
ভারতকে আমরা হিলি থেকে আগরতলা পর্যন্ত সড়ক ‘প্যাসেঞ্জার বাস ও কার ট্রানজিট’ দিবো, কিন্তু সেজন্য প্রথমত উপযুক্ত টোল আদায় করবো, তাদের গাড়িগুলো চেক করবো তাতে কী যাচ্ছে। এবং বিনিময়ে ভারতকে পঞ্চগড় থেকে চিকেন নেক-এর নিচ দিয়ে (সাবওয়ে) নেপালের কাঁকরভিটা পর্যন্ত ৪ লেনের সড়ক এবং ১ লেনের রেল রোড ব্যবহারের জন্য ‘সাবওয়ে করিডোর’ প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ ঐ ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সাবওয়ে করিডোর দিলেই আমরা ভারতকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা দিবো। ঐ সাবওয়ে করিডোর দিয়ে আমাদের দেশের গাড়ি, ট্রেন নেপালে যাতায়াত করবে। ভারত কোনো খবরদারি করতে পারবে না।
ভারত আমাদের সাবওয়ে করিডোর না দিলে আমরা ভারতকে কোনো ট্রানজিট সুবিধা দিবো না।
ভারতকে আমরা আমাদের উপর দিয়ে মালামাল পরিবহণ করতে পারবে, সেই ট্রানজিট আমরা দিবো, কিন্তু সেজন্য ভারতকে তাদের আগরতলা এয়ারপোর্ট আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব একটি ট্রার্মিনাল করে দিবে যা দিয়ে বাংলাদেশের যাত্রীরা আগরতলা এয়ারপোর্ট ব্যবহার করবে; আমাদের বিমানগুলো আগরতলা এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই করতে পারবে।
ভারতকে আমরা আমাদের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে দিবো; বিনিময়ে আমাদেরকে ভুটানের সঙ্গে সড়কপথে শেয়ার করিডোর দিতে হবে যেন আমাদের গাড়িগুলো ভুটানে অবাধে যাতায়াত করতে পারে।
কমনওয়েলথ থেকে বের হয়ে আসতে হবে আমাদের। কমনওয়েলথ বাস্তবে বাংলাদেশের একটি সরকারি পিকনিক পার্টির বাইরে কোনো কাজ আসে না। আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে কমনওয়েলথ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ব্রিটেনের সঙ্গে আমার সুবন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ থাকবে। বিদেশে আমাদের হাই কমিশনগুলোকে ‘অ্যাম্বাসি’তে উন্নিত করতে হবে।
থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের বহুমুখী সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এমন ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে যেন অত্যন্ত অল্প খরচে দেশদুটিতে ভ্রমণ করা যায়। থাইল্যান্ডে চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত উন্নত এবং ব্যয়বহুল নয়। ভারতমুখী প্রবণতা থেকে বের হয়ে আমাদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন পর্যন্ত থাইমুখী হতে হবে এবং দেশের চিকিৎসাসেবা উন্নতকরণের দিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে। চট্টগ্রাম ও কক্সেসবাজার থেকে ব্যাংকক বিমানভাড়া আসা-যাওয়া ১০০ ডলারের মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। তার বাস্তবায়ন করতে হবে।
’সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’, এটা কোনো কৌশলী কথা হতে পারে না।
কুটনীতি করতে হবে মেধা এবং কুটনৈতিক ভাষা দিয়ে। শত্রুর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কৌশলী কথা বলাটাই হচ্ছে কুটনীতি। আবার বন্ধু বা শত্রু স্থায়ী নয় কখনোই। আজ যে বন্ধু, কাল সে তার স্বার্থে আমার শত্রু হবে না, এটা শুধুমাত্র বোকারাই ভাবতে পারে। কুটনীতিতে বোকামির কোনো স্থান হবে না।
আমাদের প্রতিবেশীদেশগুলো বিশেষ করে ভারত, মিয়ানমার এবং নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান এবং চায়নার সঙ্গে একটি কুটনীতিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। কার সঙ্গে আমরা কীভাবে স্বার্থ আদায় এবং রক্ষা করবো তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। সকলের সংকে একভাষায় কথা বলা যাবে না। ভারত ও মিয়ানমার আমাদের সরাসরি ক্ষতি করতে পারবে কিন্তু অন্য দেশগুলোর সে সুযোগ অনেক কম। সুতরাং আমাদের চিন্তাও টেকসই হতে হবে।
একদিকে আমাদের চেষ্টা থাকতে হবে দেশদু’টির সঙ্গে সর্বোচ্চ সুসম্পর্ক রাখা। কিন্তু ভারত বা মিয়ানমার যদি সুসম্পর্ক না চায়, তখন আমাদেরও বিকল্প ঠিক রাখতে হবে। সবসময় আমাদের একটিভ প্লান-বি এবং প্লান-সি নিয়ে তৈরি থাকতে হবে।
নেগোসিয়েশনে আমাদের দক্ষতা অর্জন করতে হবে এবং কুটনৈতিকদের সেই দক্ষতা অর্জন সবচে বেশি জরুরি।
আমরা চাইবো অত্যন্ত সহজে শুধুমাত্র পাসপোর্ট এন্ট্রি করে (নো ভিসা রিকোয়ার্ড) দেশদুটেতে যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি করা। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় এমনটাই অত্যন্ত জরুরি। আজ থেকে ১০০ বছর পর হয়তো অন্য কিছু ভাবতে হবে; সুতরাং এই ব্যবস্থা স্থায়ী হতে পারবে না; হতে হবে ১০ বছর পর পর নবায়যোগ্য।
আমরা নিকট প্রতিবেশী বাদবাকি দেশগুলোর সঙ্গেও অনুরূপ চুক্তি করতে পারি। থাইল্যান্ড যেতে কয়েক বছর আগেও কোনো ভিসার প্রয়োজন হতো না বাংলাদেশিদের জন্য। এখন প্রয়োজন হয়, আমার ভিসা ফ্রি বিষয়টি আবারও থাইল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনায় তুলতে পারি। তবে সেক্ষেত্রে আমাদের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা ঠিক করাটা অত্যন্ত জরুরি।
যে টুরিস্ট হিসেবে বাইরে যাচ্ছে, ওখানে যেয়ে যেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে কালো দাগ ফেলতে না পারে সেজন্য একটি কঠোর নীতিমালা বা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করতে হবে। আমরা কিছু মানদন্ড তৈরি করে দিতে পারি, আমরা যা থেকে সহজেই বুঝতে পারবো আসলে ভ্রমণকারী কী চাচ্ছে?
এসবি’র পুলিশ অফিসাররা যথেষ্ট যোগ্য নয় যে, তারা অগণিত যাত্রী থেকে মুখ দেখেই বুঝে ফেলবে কে কেন কোথায় যাচ্ছে! সুতরাং তাদের দিয়ে নয়, বরং একটি শক্তিশালী টিম গঠন করতে হবে এবং তারা একটি ইন্টারভিও এর মাধ্যমে অনুমতি প্রদান করবে।
এবং এতে করে বিমানবন্দরে যেন কাউকে হয়রানি করা না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
যে মানুষটি জীবনে কোনোদিন ঢাকা শহরেও আসেনি বা কক্সেসবাজারে যায়নি সে যদি হঠাৎ একদিন টুরিস্ট ভিসায় কম্বোডিয়া বা ব্রাজিল যেতে চায়, তাকে ছাড়পত্র দেবার কোনো মানে হয় না। এসব বাংলাদেশকেই নিশ্চিত করতে হবে। আবার এয়ারপোর্ট ১০০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে যে কোনো দেশে ফ্লাই করার অনুমতির ব্যবস্থা স্থায়িভাবে বন্ধ করতে হবে।
সবচে বড় কথা, প্রতিটি সেক্টরে আমাদের দক্ষতা ও যুক্তি এবং মেধার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। বর্তমান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের এই গুণগুলো নেই। সুতরাং নতুন করে সব ভাবতে হবে। এবং ভাববার জন্য সরকারেরও সেই জ্ঞান রয়েছে কি না, সেটা জানাও অত্যন্ত জরুরি।
রোহিঙ্গা তথা যে কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চায় তাহলে তাদেরকে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করা হবে এবং যদি তার নিজ দেশের সমস্যা প্রমাণিত হয় এবং তার জীবন বিপন্ন বলে প্রতীয়মান হয় তাহলে তাকে স্থায়িভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হবে এবং ৫ বছর পর নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগ দেওয়া যাবে। এজন্য স্বতন্ত্র ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট খুলতে হবে। আবার একই সংগে বার্মা যেন কোনভাবেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিতে না পারে সেজন্য আমাদের সামরিক বাহিনী যুদ্ধাবস্থায় থাকতে হবে। চেষ্টা করা হলো প্রয়োজনে যুদ্ধের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করার সামর্থ গড়ে তুলতে হবে। নইলে এতো টাকার বাজেটে সেনাবাহিনী আছে কি করতে?
বাংলাদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান যদি যোগ্য কোনো ইমপ্লয়ী দেশে খুঁজে না পায়; তাহলে তারা বিদেশ থেকে ইমপ্লয়ী আনতে পারবে; ঢালাও ভাবে অনিবন্ধিত বিদেশী কর্মী আসা চলবে না। সেক্ষেত্রে সরকার যথাযথভাবে চুক্তিকালীন মেয়াদের জন্য নির্ধারিত ফি নিয়ে ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করবে এবং তা ফ্রি দিয়ে নবায়নযোগ্য হবে। কোনো বিদেশি যদি বাংলাদেশে টানা ১০ বছর ওয়ার্ক পার্মিট নিয়ে বসবাস করে, কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে তাহলে সে নাগরিকত্ব পাবার জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে, এসব নাগরিকরা ডুয়েল সিটিজেনশিপ যোগ্য হবেন।
আমাদের একটি আদর্শ ও মানবিক রাস্ট্র গড়ে তুলতে হবে।
বদলে যাবার সুযোগ
ওয়েক আপ বাংলাদেশp