27/12/2025
২০২৫ শেষ হলো আমার ২৫ তম জন্মদিনের উপহার হিসাবে পাওয়া একটি অসাধারণ বই পড়ে যার নাম 'ম্যান উইদাউট অ্যা কান্ট্রি' (A Man Without a Country)। যা মূলত কার্ল ভনেগার্ট নামক একজন ভদ্রলোকের লেখাগুচ্ছ ও কিছু ব্যক্তিগত চিঠির সংকলন। বইটি অসাধারণভাবে অনুবাদ করেছেন মাহীন হক।
কার্ল ভনেগার্ট এমন একজন লেখক, যাকে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা কঠিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখা এই মানুষটি সারা জীবন মানুষের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে কৌতুক করে গেছেন। 'ম্যান উইদাউট অ্যা কান্ট্রি' (A Man Without a Country) কোনো উপন্যাস নয়, বরং ভনেগার্টের জীবনের শেষ বেলায় লেখা কিছু ধারালো ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রবন্ধের সংকলন। মাহীন হকের সাবলীল অনুবাদে বইটি বাংলা পাঠকদের জন্য এই খ্যাপাটে লেখকের মস্তিস্কে ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছেন।
এই বইটিতে ভনেগার্ট কোনো কাল্পনিক গল্প বলেননি, বরং সমসাময়িক আমেরিকা, রাজনীতি এবং আধুনিক সভ্যতার কদর্যতা নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন। তিনি নিজেকে একজন 'দেশহীন মানুষ' হিসেবে কল্পনা করেছেন কারণ তার প্রিয় দেশটি (আমেরিকা) তার চোখে নীতিহীন হয়ে উঠছিল। পরিবেশ ধ্বংস, যুদ্ধবাজ রাজনীতি আর মানুষের আত্মিক শূন্যতা—সবকিছুই তিনি তুলে ধরেছেন তার চিরচেনা ব্যঙ্গাত্মক ঢঙে।
তার বিশ্লেষণ করা ও ভালো লাগার দিকগুলোর ভেতর আমার কাছে মনে হয়েছে,ভনেগার্ট কঠিন সত্যকে এমনভাবে কৌতুকের ছলে বলেন যে, পাঠক হাসতে হাসতে থমকে দাঁড়ায়। তার ভাষায়, ক্ষমতার লোভ কীভাবে বিবেককে গিলে খায়, তা এই বইয়ে স্পষ্ট। একজন হিউম্যানিস্ট হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন ধর্ম বা রাষ্ট্রের চেয়েও দয়া (Kindness) কত বেশি জরুরী। কোনো গুরুগম্ভীর তাত্ত্বিক কচকচানি নেই। ভনেগার্টের ছোট ছোট বাক্য এবং রসিকতা বইটিকে অত্যন্ত সুখপাঠ্য করে তুলেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রবন্ধগুলোতে তার নিজের শৈশব, ধূমপানের অভ্যাস এবং ড্রেসডেন যুদ্ধের স্মৃতি এমনভাবে মিশে আছে যে মনে হয় সরাসরি লেখকের সাথে আড্ডা দিচ্ছি।
বইয়ের কিছু অসাধারণ প্রিয় উদ্ধৃতি হচ্ছে,
• "আমরা পৃথিবীতে এসেছি মূলত সময় কাটাতে বা অলস ঘোরাঘুরি করতে, এর বাইরে কেউ অন্য কিছু বললে বিশ্বাস করবেন না।"
• "বুশ এবং হিটলারের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো হিটলার নির্বাচিত হয়েছিলেন।" এবং
• "শিল্পচর্চা করুন শুধু ভালো হওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের আত্মাকে বড় করার জন্য।"
ভনেগার্টকে পড়ার পরে যে অর্থ বুঝতে পেলাম তা হলো জগতের নিষ্ঠুর সত্যগুলোকে হাসিমুখে মেনে নিতে শেখা। তিনি শিখিয়েছেন যে পৃথিবীটা হয়তো একটা পাগলাগারদ, কিন্তু সেখানেও আমরা একে অপরের প্রতি একটু দয়ালু হতে পারি। তার লেখার স্টাইল ছিল খুব সাধারণ! ছোট ছোট বাক্য, সহজ শব্দ, কিন্তু তার গভীরে থাকতো তীব্র দর্শন।
তার বইগুলো স্যাটায়ার এবং সায়েন্স ফিকশনের সংমিশ্রণ। তার লেখার থিম: যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এবং মানবতাবাদ।
এই বইটি মূলত তাদের জন্য যারা সমাজ, রাজনীতি ও যুদ্ধের অন্তরালের নিষ্ঠুর সত্যগুলোকে সহজ ভাষায় বুঝতে চান। যারা ভাবেন মানুষের জীবনের কোনো মহৎ উদ্দেশ্য আছে এবং সেই গাম্ভীর্যের আড়ালে ভনেগার্টের মজার দর্শন উপভোগ করতে চান তাদের জন্য।
বছর শেষ হলো চমৎকার একটি বই পড়ে!!