নওমীর অনুধ্যায়

নওমীর অনুধ্যায় সাহিত্য সিন্ধুর বুকে আমি এক বিন্দু, অন্বেষণ করে ফিরি শব্দরেণু।

07/07/2026

বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। একনাগাড়ে হওয়া ঝুমঝুম শব্দের আওয়াজ কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে প্রায়। উতাল-পাতাল হাওয়ায় ঘরের সবকিছু নিচে পড়ে যাচ্ছে একটু পরপর। মৃদু ছাট মন্দ লাগছে না আমার। বাতি নেই, বিদ্যুৎ চলে গেছে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার পরপরই।

বৃষ্টি কেন জানি ভালো লাগে না আমার। তবে আজকে ভালো লাগছে। পাশের ঘর থেকে ক্রমাগত বকে যাচ্ছে মা। রোজ একই রেডিও।

"আর কতোদিন বিয়ে পেছাইবি তুই? আমারে শান্তি দিবি না? এতো বড় মাইয়া বিয়ার জন্য রাজি হস না কেন? তোর বাপের বয়স হয়ে গেছে, হাজার রোগে ভুগতাছে। ছোট বোনটার বিয়া দেওয়া লাগব। ওই চিন্তা নাই অর। নাটক লেখে, এতো চিন্তা ফালায়ে রাইখা নাটক লিখে।"

আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে আজকে আমার মেজাজ খুবই খারাপ থাকার কথা। কারন আমার লেখা নাটকের স্ক্রিপ্ট নির্বাচন হয়েছিল ইউনিয়নের নাটকে মঞ্চস্থ হওয়ার জন্য। আজকে হওয়ার কথা ছিল, বৃষ্টির জন্য সব শেষ। খোলা মাঠের মাঝে এখন হয়তো নাটকের প্যান্ডেল ভিজছে একাকী।

মায়ের কথা এখন আমার মনে শূন্যতা তৈরী করে। আমি যেন বোঝা হয়ে গেছি বাড়িতে, একসময় খুব মন খারাপ হতো এরকম ভেবে, একাকী রাতে কাঁদতাম বসে বসে। এখন আর কান্না পায় না, এখন কি যে মনে হয় আমি নিজেও বুঝি না।

লোহার কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো। বাবা এসেছে, ভিজে গেছে নিশ্চয়। মা ডাকছে হারিকেনটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। ইচ্ছে করছে না, নিভিয়ে দিলাম আগুন। অন্ধকারে বৃষ্টির ছাটে বসে থাকতেই ভালো লাগছে।

ছোটবোন ইমা হারিকেন নিয়ে গেল, সাথে ভাই। ওরা দুজন যমজ। সদ্য একাদশ শ্রেণীতে কলেজে পা দিয়েছে। গলা শুনলাম, "বাবা আপা আজকেও বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলে নাই। উলটা নতুন নাটকের লেখা লেখতেছে। কয়দিন নাটক লিখবে কও? এভাবে চলে? তোমার আর মায়ের কথা ভাববে না?"

মাথায় রক্ত চড়ে গেল আমার। ইচ্ছে করছে উঠে গিয়ে দু গালে ঠাস ঠাস চড় বসিয়ে দিয়ে আসি। নিজেকে শান্ত করার জন্য পানি খুঁজলাম, নাই। উঠতে ইচ্ছে করছে না।
আমি ঘাড়ত্যাড়া, পরিবারের কথা বুঝি না ঠিক, কিন্তু গাধাও না। ও যে প্রেম করে এইটা ধরতে বেশিদিন লাগেনি আমার। আমি বিয়ে না করলে ওর বিয়ের পালা আসবে না এজন্য প্রতিদিন আগুনে ঘি ঢালবে।

বাবাকে গম্ভীর আওয়াজে কাশি দিতে শুনলাম। বললো, "ভাত দাও।"

সবাই চুপ হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি বাবা চায় না এসব নিয়ে কথা বলতে।

বাবা এমনই। নিজের কর্মক্ষেত্রের সে কলেজের একঘেয়ে ক্লাস আর বাসায় পত্রিকার দুনিয়া ছাড়া কিছু বুঝেন না। কোনোকিছু ভাবেনও না সম্ভবত, মায়ের ঝামেলার ভয়ে তার সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

আগে যখন মা কথা শোনাতো প্রচন্ড কষ্টে বাবার কাছে বসতাম। ভয় লাগতো, তবুও আশা নিয়ে বসে থাকতাম বাবা বুঝি জিজ্ঞেস করবে আমি কেমন অনুভব করছি। বাবা করতো না, গম্ভীর গলায় বলতো "মা ডাকছে, যাও।"

জোরে জোরে বাজ পড়া শুরু হয়েছে। ঘর থেকে থেকেই আলোর ঝলকানিতে আলোকিত হচ্ছে। বাতাসে ভেজা মাটির কেমন একটা গন্ধ। হঠাৎ করে বৃষ্টি আবারও অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। আমার মনে কখন কী হয় আমি কিছুই বুঝি না।

সরে আসলাম জানালা থেকে। খাওয়ার ঘরে দেখলাম পাটি পেতে খেতে বসেছে সবাই।
প্লেটে খাবার নেওয়া মাত্রই হঠাৎ মা প্লেট ঠাস করে রেখে ঘরে গেলেন। খানিক পর বিয়ের শাড়ি এনে আমার সামনে ছুঁড়ে দিয়ে কাঁদতে লাগলেন,

"আমার বিয়ার শাড়ি এইটা। তোর এই নাটক লেখার নেশা করতে করতে জীবনডা ধ্বংস করবি? আয়না দেহস জীবনে? বয়স কতো হইসে দেহস? বাপের দিকে চোখ পড়ে না? খাটতে খাটতে কেমন বয়স হইছে দেখ। বৃষ্টিত ভিজ্জা এই রাইতে বাড়িত আসে।

তোর যে সম্বন্ধডা আসছে খুবই বড় ঘর। বিয়া করলে তোর বোনডার ভালো সম্বন্ধ আসবো। ভাইডা দুলাভাইগো কাছ থেইকা সাহায্য পাইব, তোর বাপে আরাম পাইবো। এতোবড় মাইয়া হিসেবে পালছি তোরে সারাজীবনের রক্ত পানি কইর‍্যা, তুই এখন বুঝস না।

আমার আর তোর বাপের এই কষ্ট দেইখা ভাত নামে না গলা দিয়া। কাল-পরশুর মধ্যে হয় তুই বিয়ার লাইগা রাজি হইবি, নাইলে আমার এই শাড়ি পুড়াবি।"

কান্না শুরু করেছে মা। উঠে চলে গেছেন তিনি। বাবা বললো, "ইমা-ইমন তাড়াতাড়ি খেয়ে মায়ের ঘরে যা।"

উদাসীনভাবে খাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু স্বাদ টের পেলাম না কোনোকিছুর। খাওয়ার মাঝে গান গাওয়া একদম নিষিদ্ধ, আল্লাহর নেয়ামতকে অসম্মান করা হয়। তবুও আমি গুনগুন করে গান ভাজতে ভাজতে খাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। পাশে বসা বাবাকে বলতে ইচ্ছে করে, "বাবা তোমার আমার না বড় হয়ে ঝরণা দেখতে যাওয়ার কথা ছিল? তার আগেই বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিবে আমার? আমার ইচ্ছেগুলোর কথা তুমি আর মা দুজনেই সব ভুলে গেছ এখন তাই না?"

বলা হয় না। বাবার মন যেন মাঝসমুদ্রে আর আমার মন আকাশের ওপারে, এতোটাই দূরত্ব পাশে বসেও!

রাতে ঘুমানোর আগে মা ঘরে এলেন। চোখমুখ ফোলা। মায়ের চোখমুখ ফোলা দেখলে অন্তরে ধক করে উঠে আমার। ইচ্ছে করে এই জগত ছেড়ে অনেক অনেক দূরে পালিয়ে যাই। পারি না।

মা এসেই আমার মাথায় হাত দিলেন। আদর করে বিছানায় বসালেন। অনুমান করলাম মা এখন আস্তে আস্তে বুঝাবে আমাকে, রাগারাগি করে যেহেতু লাভ হয়নি।

"মারে আমি জানি তুই রাতুলরে পছন্দ করিস। ছেলেটা সেই হাইস্কুল থেইকা তোর বাপের কাছে পড়তে আইতো। মা হইয়া তুই এতোদিন কারে পছন্দ করিস এইটা আমি বুঝি নাই তা হয় না। কিন্তু মা ওই ছেলে নাকি বাইরের দেশের ভিসা না কি পাইছে। ওরে বিয়া করলে তোরেও দেশ ছাড়া লাগব। দেশ ছাড়লে বাপ ভাইরে দেখবি কেমনে মা? একটু বুঝ বাপ, দয়া কর।"

মা চলে গেল। রাত বাড়তে লাগলো। জহির রায়হানের হাজার বছরের পুরনো সে রাত। আমি ঘর খুলে বাহিরে বেরিয়ে আসলাম। আকাশের মেঘ বুঝা যাচ্ছে। খুব করে চাচ্ছি আকাশ কাঁদুক। পানির প্লাবন আসুক, ভিজিয়ে দিক আমাকে। বৃষ্টির পানির সাথে মনের সকল অস্থিরতা আর জ্বলুনি দূর হয়ে যাক। আমি একটু শ্বাস নিই।

বৃষ্টি এলো না। আমি কতোক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম নিজেও জানি না। আকাশ যখন অল্প অল্প সাদা হতে শুরু করলো তখন ঘরে ফিরলাম। নামাজ পড়ে শোয়ার খানিক পরেই শুনলাম বৃষ্টি এসেছে, ঝুম বৃষ্টি। বাবা ভিজে যাবে মসজিদ থেকে আসার সময়। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। সকল কষ্ট মেশানো সে কান্নার আওয়াজ দুনিয়ার কেউ আলাদা করে চিনতে পারবে না কান্নারত ব্যক্তি ছাড়া।

---------------------------------------------

গতোকালকের বাতিল হয়ে যাওয়া নাটক আজকে আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যায় নাটক। টিভি আছে এখন বেশিরভাগ বাড়িতেই, তবুও সবাই একসাথে গ্রামের নাটক দেখার জন্যই কেমন উৎসব উৎসব মনে হয়।

আমার মনে আজকে শান্তি। কারন গুরুত্বপূর্ন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। কোনোকিছু ঠিক করার পর অন্তর থেকে পাথর নেমে যায়। যে সিদ্ধান্তই হোক, মন যখন মেনে নেয় সেটা তখনই এক নিরবতা এসে ভীড় করে মনে।

নাটক শেষ হলো। অনেক প্রসংশা শুনলাম। নাটক নাকি ভালো হয়েছে। আমি শেষ অবধি দাঁড়িয়ে থাকলাম। প্রত্যেকটা প্রসংশা শুনলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন ভরে।

তারপর এগিয়ে এলাম। খোলা মাঠে আজ মৃদুমন্দ বাতাস। আকাশ পরিষ্কার, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্রসারি জ্বলজ্বল করছে।

আমার পরবর্তী নাটকের পান্ডুলিপি তৈরী। মায়ের বিয়ের বাড়ি হাজার চেষ্টা করেও বুঝাতে পারলাম না। আস্তে করে ম্যাচ কাঠিতে আগুন জ্বালিয়ে ধরিয়ে দিলাম সে কাগজে। হাওয়া আগুনকে বারবার নিভিয়ে দিতে চাচ্ছে, কিন্তু আগুন নিভছে না। যে হাওয়া বাহ্যিক আগুনকেই নেভাতে পারছে না সে হাওয়া আমার মনের আগুনকে কী করে নেভাবে?

মা ঠিকই বুঝেছে কাকে পছন্দ করি। তারমানে এতোদিনে তার এটাও বুঝার কথা আমার ভালোবাসা কি, রোজ কলেজ যাওয়ার সময় উপজেলার ছোট লাল দালানের অফিশিয়াল চেয়ারগুলো কীভাবে টানে আমাকে, সবই নিশ্চয় বুঝেছে এতোদিনে মা। তবুও আমাকে শেকলে আটকাতে চাচ্ছেন যেহেতু, সেহেতু সে শেকল নিশ্চয় আমার জন্য ভালো। নাটকের স্ক্রিপ্ট কিংবা বিদেশ যাওয়া একটা মানুষ নিশ্চয় মায়ের সিদ্ধান্তের চেয়ে ভালো হতে পারে না।

ছাই হওয়া কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন পাশে এসে বাবা দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। আমি টের পাওয়ার পরেও কিছু বললেন না উনি। হঠাৎ চমকে লক্ষ্য করলাম বাবার পেছনে লম্বা কোঁকড়াচুলো যে ছেলেটা দাঁড়িয়ে সে রাতুল।

বাবা কোনো কথা বললেন না, আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে রাতুলের হাতে তুলে দিলেন।
আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলেন, "তুমি আমার প্রথম মেয়ে। ছোটবেলা থেকে তোমার কেমন জামা পছন্দ, কেমন জুতা পছন্দ সব টের পেতাম আমি। আমি নিজে পছন্দ করে কিছু আনলেই দেখতাম তোমার পছন্দ হয়ে গেছে।

সেই ছোট্টবেলা থেকে তোমাকে চিনেছি। তোমার পছন্দও তাই আজও বুঝতে পারি। আমার মনে হয় রাতুল তোমাকে ভালো রাখবে, তোমার মায়েরও তোমাকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে পূরণ হবে।"

শব্দ গোছাতে আমার সমস্যা হয় না। আজকে হচ্ছে। আমি কতোকিছু বলতে চাচ্ছি আব্বাকে, পারছি না। শুধু উচ্চারন করলাম, "বাবা দেশের বাহিরে যাওয়া সম্ভব না।"
কান্না আটকাতে প্রচন্ড কষ্ট করতে হচ্ছে আমাকে। মনের প্রচন্ড ইচ্ছেকে একীভূত করে রেখেছি, তবুও আবেগ বাঁধ মানছে না।

রাতুল হেসে বললো, "আমি তো বিদেশে একবারে যাচ্ছি না। মাস্টার্স করে ফিরে আসব।"

টলমল চোখে বাবার দিকে তাকালাম। হেঁটে ফিরে যাওয়ার আগে তাকিয়ে বাবা বুঝল কেন জানি আমার চোখের ভাষা, "তোমার মাকে বুঝাব।"

ছোটবেলা প্রচন্ড খুশির মুহুর্তে লাফঝাঁপ দিতাম। কতোকিছু বলার থাকে এসব মুহুর্তে। অথচ অনন্ত নক্ষত্রবিথীর নিচে মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে নক্ষত্র দেখা ছাড়া কোনোকিছুই বলার কথা মাথায় আসছে না, কতো আশ্চর্য তাই না? আমরা যে মুহুর্তের জন্য বহুসময় যাবত অপেক্ষা করি সে মুহুর্ত যখন ধরা দেয় তখনই আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলি।

মৃদু গলার আওয়াজ শুনলাম রাতুলের, "দেশে ফিরে পার্বত্য এলাকায় চাকরির পোস্টিং নেওয়ার চেষ্টা করব যেন স্বচ্ছ আকাশের নিচে ঝরণা দেখতে পারি দুজনে।"

অবশেষে সে রাতে দ্বিতীয়বারের মতো চমকালাম আমি।

-একপশলা ইচ্ছেবৃষ্টি
-মেহনাজ নওমী

25/06/2026

নীলগিরির আকাশ আজ নামের সাথে মিলিয়ে গাঢ় নীল। অথচ শরৎকাল না। বর্ষাকালে এমন ঘন নীল আকাশ কমই দেখা যায়। ঘন কালো মেঘ আকাশময় বিচরনের পরিবর্তে সাদা সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, যেন নিচ থেকে যারা তাকাবে তাদের কাছে তুলো বলে ভ্রম হয়।

আকাশ দেখে মুমতাহিনার সন্দেহ হচ্ছে, বর্ষা নাকি শরতে সে পাহাড়ে বেড়াতে এসেছে। সূর্য উঠার পর প্রায় তিন ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। সোনালী রোদ পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পরিষ্কার গাছের পাতাগুলোর রঙকে বদলে দিয়েছে।

একটা চেয়ার পেতে মেঘের ভেসে যাওয়া দেখছেন মুমতাহিনা। ওনার পরনে হালকা ফিরোজা রঙের সিল্কের শাড়ি, সকালের রোদে সুন্দর লাগছে তাকে। হাতে ধরা কাপে হালকা লিকারের রং চা, সে তরলে প্রতিফলিত আকাশ।

মুমতাহিনার পাশের চেয়ারের মানুষটার হাতেও চায়ের কাপ। চুমুক দিচ্ছে না সে। মুমতাহিনাই ডেকেছে তাকে চায়ের আমন্ত্রনে। জড়োসড় হয়ে বসে আছে সে। কী যেন একটা ধরা পড়ে যাওয়ায় লজ্জা পাচ্ছে প্রচন্ড। ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া অথবা লজ্জা পাওয়া মুখটা লুকাতে মাথা নিচু করে রেখেছে।

মুমতাহিনা বুঝতে পারছেন পাশের মানুষটা কেন এতো লজ্জা পাচ্ছে। হাসি আসছে তার, সেটা লুকাতে দ্রুত চায়ের কাপে চুমুক দিলেন তিনি।

----------------------------------------------------

মুমতাহিনা ভেবেছিল আজকে পাকা সড়কের ধারের যে উঁচু মাচাটা আছে ওখানে বসবে, মই বেয়ে উঠে। কিন্তু মনে হচ্ছে হবে না। সড়কের পাশে গ্রামের দোকানগুলোতে আজ অনেক ভীড়। আজকের দিনে দাদার বাড়িতে মিলাদ হয়, প্রতিবছর, এই দিন কখনো মিস যায় না।

ইদানীং বিগত ৩-৪ বছর ধরে বছরের এই সময়ে প্রতিবছর মুমতাহিনার বাবা কোনো না কোনো অযুহাতে মেয়েকে চেষ্টা করেন দাদা বাড়িতে পাঠানোর। বলেন মিলাদে অংশ নিতে, দাদা দাদিকে দেখতে। কিন্তু মুমতাহিনা জানে এসব অযুহাত, কারন প্রতিবার মিলাদ শেষ হওয়ার পরদিন থেকে দাদা দাদি ইমোশনাল আঘাতের মাধ্যমে তাকে বিয়ের প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে চেষ্টা করেন।

আজকেও ব্যতীক্রম হলো না। মিলাদ শেষ হতে হতে আসরের নামাজ শেষ হলো প্রায়। মিলাদ ইসলামে নিষিদ্ধ, তবুও এই জিনিস আজকের মতো একটা দিনে কেন যে করেন দাদাজান বুঝে না মুমতাহিনা।

এখন রাস্তায় মানুষ কম। মিলাদ শেষ, খাবার দেওয়াও শেষ, তাই সবাই যার যার মতো ফিরে গেছে। মুমতাহিনা এদিক ওদিকে তাকিয়ে মাচার ওপর উঠে বসলো। অনেক উঁচু, মাচাটা এতো উঁচু করে বানিয়েছে কেন?

বিলে পানি নেই। অল্প পায়ের পাতা পর্যন্ত পানি কিছু জায়গায়। বিলের ফসল তোলেনি এখনও চাষীরা।
বহুদিন ভরা বর্ষায় এই বিল দেখে না মুমতাহিনা। স্মৃতির মানসপটে আবছাভাবে মনে পড়ে ফুফুর বিয়ের দিন।

সে কতোকাল আগের কথা যেন। লাল শাড়ি আর গয়নাতে মোড়ানো কুমকুম দিয়ে সাজানো মুমতাহিনার ফুফু অঝোরে কাঁদছিলেন, চেনা বাপের ভিটে ছেড়ে অজানা শ্বশুড়বাড়িতে পাড়ি দেওয়ার ভয়ে। মুমতাহিনার আবছা মনে পড়ে বর্ষা ছিল, কারেন্ট চলে গেছিল, মশালের আলোয় বাবা চাচারা সবাই ঘাটে এগিয়ে দিতে গিয়েছিলেন নতুন বর বউদের।

ফুফু ছাউনি দেওয়া নৌকায় বসে ছিলেন ঘোমটা ছড়িয়ে, কাঁদতে কাঁদতে তাকিয়ে ছিলেন ঘাটের দিকে যতোক্ষন বিলের দিকে নৌকা বাইছিল মাঝি ততোক্ষনই।

বিয়ের ছ-বছর পার হওয়ার আগেই মা/রা যায় ফুফু। আজকে ফুফুর মৃ/ত্যুবার্ষিকী। এজন্য প্রতিবছর মিলাদ করে দাদা এই দিনে। গ্রামের মানুষ গুজব ছড়াতে খুবই পছন্দ করে। এজন্য ফুফুর মৃ/ত্যুর পর বহুদিন অবধি সবাই বলাবলি করতো "এতো অল্প বয়সে কেউ ম/রে? নির্ঘাত নিজে নিজে ম/রেছে।"

বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না মুমতাহিনার। ফিরলেই দাদি কাঁদতে কাঁদতে বুঝাবে বিয়ে করা উচিত মুমতাহিনার।

অনার্স চতুর্থ বর্ষে সে এখন। এজন্য সবাই পাগল হয়ে গেছে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। সবার একটাই কথা, বয়স চলে যাচ্ছে, দেরি হয়ে গেলে পাত্র পাওয়া যাবে না আর। বাবা বুঝাতে পারে না, এজন্য দাদাবাড়ি পাঠায় ফুফুর মৃ/ত্যুবার্ষিকীকে অযুহাত বানিয়ে।

হালকা বাতাস হচ্ছে। ঠান্ডা। গাছগুলোর পাতা দুলছে হালকা হালকা। চুপচাপ শব্দহীন শুয়ে থাকে মুমতাহিনা। পায়ের আওয়াজ শোনে রাস্তার, চেনে সে। আস্তে উঁকি মেরে দেখে। হ্যাঁ অয়ন ভাই-ই।

মুমতাহিনা বিয়ে করতে চায় না এমন না। করবে, আরেকটু অপেক্ষার পর। অয়ন ভাইয়ের বিয়ে খাবে, তারপর সে বিয়ে করবে। এর আগে কিছুতেই সে বিয়ে করতে পারবে না। ওই যে আছে না? আশায় বাঁচে চাষি? এ কথা বাড়ির কাউকে তো বুঝাতে পারবে না সে।

ছোটবেলা দাদাবাড়ি বেড়াতে আসলেই অয়ন ভাইয়ের সাথে খেলতো। মুমতানিহার ভাইবোন নেই। চাচাতো ভাইবোনগুলা সব ছোট ছিল। খেলে মজা পেতো না। অয়ন ভাই ছিল দাদার বন্ধুর নাতি। বন্ধু বলে দুই দাদার খুব ভাব ছিল। এজন্য নাতি নাতনিরাও অবাধে যাতায়াত করতো এর ওর বাড়ি।

স্কুল পাশ করার আগ অবধি দুজনে অনেক টো টো করে বেরিয়েছে পুরো গ্রাম। এমন কোনো কাজ নেই করেনি। ছুটেছে, খেলেছে, মা/রা/মারি করেছে, ঘুড়ি উরিয়েছে, একসাথে দাদার পুরনো টিভিতে সিনেমা দেখেছে। বড় হতে হতে স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব আর লজ্জা বেড়েছে।

অয়ন ভাই মুমতাহিনার কয়েক ক্লাস সিনিয়র ছিলেন। এখন মাস্টার্স পাশ করে সদ্য জবে ঢুকেছেন উনি। মুমতাহিনা নিশ্চিত কয়েকমাসের মধ্যেই ভাইয়ের বিয়ের সংবাদ পাবে গ্রামবাসী। ছেলেরা চাকরি পেলেই তো বিয়ে করে।

ছোটবেলা একবার খেলতে খেলতে অয়ন ভাইকে বলেছিল মুমতাহিনা, "অয়ন ভাই আমাকে বিয়ে করবে তুমি?"
পাটকাঠির মতো মুমতাহিনাকে হেসে অয়ন ভাই বলেছিল, "তোর মতো পেত্নীকে কেন বিয়ে করব রে? হায়রে লজ্জা করলো না বলতে? দাঁড়া দাদাকে আজকে গিয়ে বলব।"

আসলেই দাদাবাড়িতে সবাই জেনে গেছিল। ছোট্ট তখন মুমতাহিনা। চাচি, দুই দাদারা, বড় মা, বড় আপারা সবাই মজা করতো ছোট্ট মুমতাহিনার শখ দেখে।

বড় হয়ে এই ঘটনা ভেবে অনেক লজ্জা পেয়েছে মুমতাহিনা। তখন কী বুঝতো সে? বুকটাতে মোচড় দিয়ে উঠে তার, কী হতো ছোটবেলার সে সাহস থাকলে?

রাতে বাড়িতে জমায়েত হয় সবাই। মুড়ি মাখিয়েছে দাদি। পাশের বাড়ির চাচি কাকিরা এসেছে। অস্বস্তি হচ্ছে মুমতাহিনার। গ্রামের দিকে তার মতো বয়সী মেয়ের এখনও বিয়ে না হওয়া বড় ইস্যু, এই টপিক উঠবেই, উসখুস করছে মুমতাহিনা।

অবশেষে বিয়ের টপিক উঠলো, ওর না, অয়ন ভাইয়ের। ভাইয়ের মা, অনন্যা চাচিই বললেন তার ছেলে অবশেষে বিয়ে করতে চায়। পাত্রী কে তাও নাকি জানাবে ছেলে!

সেদিন সারারাত ঘুম হয়নি মুমতাহিনার। নিজেকে সুন্দর করে বুঝিয়েছে সে, স্বাভাবিক, এটাই তো স্বাভাবিক। তবুও অজানা জ্বালায় ছটফট করেছে সে। অবশেষে ঢাকা ফেরার দিন ভোরবেলা বিলের ধারে মাচায় উঠে ছবি আঁকতে বসেছে।

ছোটবেলা থেকে আর্ট স্কুলে আর্ট শেখতো মুমতাহিনা। আঁকার হাত খুবই ভালো তার। রং পেন্সিলে অনেকটা নিখুঁত স্কেচ করে সে।

কাগজে যতোই মুখ স্পষ্ট হচ্ছে ততো কান্না পাচ্ছে মুমতাহিনার। ছবিটা সুন্দর হয়েছে। ছবির ওপর ভোরের নরম রোদ এসে পড়েছে। রোদের সাথে ফোঁটায় ফোঁটায় পানিও পড়ছে। ছবি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছে মুমতাহিনা, কিন্তু কান্না আটকাতে পারছে না।

ও জানে অয়ন ভাইয়ের পছন্দের পাত্রী আছে, সে এতোবড় মেয়ে, সে সবই বুঝতে পারছে। মস্তিষ্ক মেনেও নিয়েছে, মন মানছে না। এই ছবিটা দিয়ে শেষবার সে অয়ন ভাইকে ছোটবেলার মতো বিয়ের কথা বলবে, জানাবে অনুভূতি। ছোটবেলার মতোই অয়ন ভাই তাকে হাসতে হাসতে রিজেক্ট করবে এটা ধ্রুব সত্য, তবুও সে সাহসী হবে।

--------------------------------------------------------

স্মৃতির পাতা থেকে ফিরে এলেন মুমতাহিনা। ওনার কোলের ওপর সুন্দর প্যাকেটে মোড়ানো ছবিটা। কতোবছর আগে এঁকেছিলেন। এখনও সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে পড়ে। ছবিটা ইচ্ছে করেই কোনোদিন দেননি মুমতাহিনা, সঙ্গে করে রেখেছেন সবসময়।

পঞ্চাশ পেরিয়ে আরও কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে তার বয়স। পাশের চেয়ারে যে মেয়েটা বসে আছে সে তরুনী, অল্প বয়স, লজ্জা পাচ্ছে সে। কেন পাচ্ছে তাও জানেন মুমতাহিনা।

ত্রিশ বছর আগের গ্রাম থেকে ঢাকা ফেরার দিনে অয়ন ভাইকে মনের কথা জানাতে হয়নি তাকে। দাদিই জানিয়েছিলেন অয়ন ভাইয়ের বহুদিন ধরে পছন্দ করে রাখা পাত্রী মুমতাহিনা। প্রচন্ড সুখে সেদিন আবারও কেঁদেছিল মুমতাহিনা।

অয়ন ভাইকে আর ভাই ডাকতে হয়নি। মুমতাহিনার প্রিয় অয়ন ভাইয়ের মাথার সব চুল এখন সাদা। একসাথে কাটিয়ে দিয়েছেন তারা ত্রিশটা বছর। মুমতাহিনার ইচ্ছে ছিল অনেক একসাথে আকাশে ভাসমান মেঘ দেখা পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে। এজন্য এখনও প্রতিবছর পাহাড়ে বেড়াতে আসেন তারা। দুই পরিবার, অয়নের পরিবার সাথে অয়নের ভার্সিটি জীবনের বন্ধুর পরিবার।

পাশে বসা আরিয়ার চোখে অল্প বয়সী নিজেকেই দেখতে পাচ্ছেন মুমতানিনা। আরিয়া অয়নের বন্ধুর মেয়ে। ছোটবেলা থেকে দুই পরিবারে যাতায়াত লেগেই থাকে। উনি বুঝেন মেয়েটা তার ছেলের প্রেমে পড়ে আছে।

নিজের হাতে আঁকা অয়নের স্কেচ কখনোই অয়নকে দেওয়া হয়নি মুমতাহিনার। তিনি ওইদিনের অনুভূতির স্মৃতি হিসেবে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন ছবিটা।

মুমতাহিনার ছেলেটা দেখতে একদম অয়নের মতো হয়েছে, বাবার কার্বন কপি যেন। চোখ পানিতে ভরে আসে মুমতাহিনার। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা চুলের প্রিয় মানুষের দিকে অসীম মায়া নিয়ে তাকান তিনি।

ছবিটার মোড়ক খুলে পাশে বসা ভীতু আরিয়ার হাতে ধরিয়ে দেন। মাথায় হাত দিয়ে বুঝিয়ে বলেন ত্রিশ বছর আগে ছবিটা দিয়ে কী করতে চেয়েছিলেন তিনি।

অবাক বিস্ময়ে মুমতাহিনার দিকে তাকিয়ে থাকে আরিয়া। মানুষের আবেগ খুব অদ্ভুত। মানুষ যখন আনন্দের চরম সীমায় পৌঁছায় তখন চোখ দিয়ে পানি পড়ে তাদের।

পাহাড় চূড়া রোদ্রে ছেয়ে যায়। গাছের ডাল কোমোরেবি ফেলে রোদ ঝলমল রাস্তায়। মুমতাহিনা তাকিয়ে দেখেন ছবির ওপরে দ্বিতীয় কোনো মানবির চোখের পানি পড়ে আছে ফোঁটায় ফোঁটায়। আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় আরিয়া তার ছেলের দিকে। ত্রিশ বছর আগের ভোর স্রোতের মতো এগিয়ে আসে তার মস্তিষ্কে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে।

-অনুভূতির ছবি
-মেহনাজ নওমী

(একই ধাঁচ, সরি!)

15/05/2026

আমি বরাবরই শান্ত নিরীহ মানুষ ছিলাম। রাগ করতে একদম পছন্দ করি না। কিন্তু আজকের ঘটনায় রাগে আমার সারা গা রিরি করছে। রাস্তার ধারে এসে এদিক ওদিক তাকালাম, এক কাপ চা পেলেও রাগটা কমানো যেতো। অন্যদিন বাচ্চা ছেলেরা ফ্লাক্সে করে চা বিক্রি করে, আজ তারাও নেই।

রাগে শরীর কাঁপছে আমার। প্রচন্ড রাগ হলে কেমন যেন বমি বমি লাগে। মনে হয় শ্বাস নিতে পারছি না। একইসাথে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। তীব্র একটা কষ্ট, মনে হয় বুক, গলা সব একসাথে জ্বলছে। বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা এতো তীব্র হয় কেন?

অনুশোচনায় কাঁদতে ইচ্ছে করছে, নেহাত ছেলেমানুষের কাঁদতে নেই। এমন ভুল কী করে করলাম আমি? অতীতের ঘা দগদগে ফিরে এসেছে আবার।

নিজেকে আমি বরাবরই সাধারণ ছোট্ট এক ছেলে বলে মনে করি। যার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য একটু খুশি হওয়া, অতীতের ছায়া ভুলে বাবা-মা নামক মানুষগুলোকে খুশি করা। সেই হাসিখুশি জীবনের স্বপ্ন নিয়েই মিতুর সাথে নতুন পথচলা শুরু করেছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে মিতুকে প্রথম লক্ষ্য করি আমি। রুপে গুণে অনন্যা বলে একটা বিশেষন আছে না? মিতুর জন্য প্রযোজ্য সেটা। মিশুক মেয়েটা একই সাথে যেমন আড্ডা জমাতে ওস্তাদ তেমন গ্রুপ প্রজেক্টে নতুন দায়িত্বও সামলাতো সমানভাবে। দিনে দিনে প্রেমে পড়লাম আমি, মিতুকে প্রস্তাব দিলাম। তারও আপত্তি ছিল না।

বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই, দুঃখ-সুখ মিলিয়েই একেকটা সম্পর্ক। প্রায় দুই বছরের সম্পর্কে দুজনেই নিজেদের প্রতিটা আবেগ অনুভব করতে চেয়েছি। পাশে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু আজকে যে সত্যের মুখোমুখি হলাম এই সত্য জানার পর মিতুর পাশে থাকা সম্ভব না। এটা এমন এক সত্য, যে সত্যকে ঘৃণা করি আমি।

এক কাপ চায়ের জন্য প্রায় আধ কিলো হাঁটতে হলো আমাকে। দুপুর দেড়টা বাজে। মাথার ওপর রোদ। দু ঘন্টা আগেও বৃষ্টি হচ্ছিল, এখন কড়া রোদ।
গতো চার মাস ধরেই মিতুকে অদ্ভুত লাগছিল। লক্ষণগুলো তো আমার চেনা। ধরতে পারলাম না কেন?

ঘটনার শুরু আজ সকালে। আজকে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ফলাফল দেওয়ার কথা। সকাল থেকেই ক্যাম্পাস পদচারনায় মুখর ছিল। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামল। ক্যাফেটেরিয়ার গাছের পাশে এক টিনের চালের ছাউনিতে আশ্রয় নিলাম আমি আর মিতু।

অনেক ছেলেমেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজছিল। হঠাৎ অদ্ভুত এক ইচ্ছে হলো, মিতুর হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হলো। মিতুকে বললাম। কিন্তু মিতু আমার দিকে কেমন করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

একটু পর ধীরে ধীরে বললো, "পারব না। বৃষ্টিতে চারপাশ নোংরা লাগছে আমার। এই ছাউনির চারপাশে কেমন ভিজে কালো কালো হয়ে গেছে। প্রচন্ড খারাপ লাগছে আমার, চলো না চলে যাই?"

মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে বিশাল এক ধাক্কা খেলাম আমি। আমার চারপাশের সবকিছু ঘুরতে শুরু করলো। মনে হলো আমি কোনো শূণ্যে দাঁড়িয়ে আছি আর মিতু অনেক দূরে, বহুদূরে। এই রোগটা চিনি আমি, শুচিবায়ু। একজনের ছিল, যে আমাদের সবার জীবন ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।

মিতু বুঝাল গতো কয়েকমাস ধরেই সে অস্বাভাবিক এই অনুভূতির অস্তিত্ব পাচ্ছিল। কিন্তু যে মিতুকে ভালোবাসতাম আমি, যার দিকে তাকালে সব মন খারাপ দূর হয়ে যেতো, সে মিতুর কথা গায়ে জ্বালা ধরাতে লাগলো। মিতু লুকিয়েছে সব, ইচ্ছে করে, এই রোগের রোগীরা সব একইরকম, স্বার্থপর।
সব শেষ করে চলে এসেছি আমি। মিতু আটকায়নি আমাকে, শুধু তাকিয়ে ছিল।

বেলা বাড়ছে। তপ্ত রোদ জ্বালা ধরাচ্ছে চোখেমুখে। তার চেয়েও বড় জ্বালা মনের ভেতড়। অতীতকে ভুলতে পারব না কখনো? খুশি থাকা হবে না কখনো?

আমরা দু ভাইবোন ছিলাম। মধ্যবিত্ত পরিবারে আমাদের ভাইবোনদের ঘিরেই বাবা-মার স্বপ্ন ছিল। সারাদিন প্রচন্ড খাটতেন বাবা-মা। কিন্তু দিনশেষে কোনো অভিযোগ ছিল না। শুধু চাইতেন আমরা মানুষের মতো মানুষ হই।

আমার বড় ছিল আপু। আমার তিন বছরের বড়। ছেলে বাচ্চা নাকি ছোট থেকেই দুরন্ত হয়। অথচ আমার আপু আমার চেয়েও চঞ্চল ছিল। ছোটবেলা একসঙ্গে খেলতাম, পড়তাম, কোথাও ঘুরতে যেয়েও কতো যে বাঁদরামি করেছি হিসেব নেই।

একটু বড় হওয়ার পর খেয়াল করলাম আপু কেমন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। একসময় বাসায় খিটখিটে হয়ে থাকতো। ধুলো দেখলেই চেঁচামেচি করতো।

মা সারাদিন এমনিতে প্রচুর কাজ করতেন। আপুর চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে আম্মুর কাজ আরও বাড়তো। দিন যায় এবং আমরা বুঝতে পারি আপু অনেককিছু সহ্য করতে পারে না। ধুলো, কাদা, বৃষ্টি, ভেজা কোনোকিছু, জুতো কিচ্ছু না। ওর জন্য সব দূরে রাখতে আম্মুকে কাজ করতে হতো প্রচুর।

বাসায় লোকজন আসলে দূরে থাকতো। আম্মুকে একা কাজ করতে হতো, আপু সাহায্য করতো না তেমন। তবে এখানেই থেমে থাকলে বোধহয় ভালো হতো। কিন্তু আপু দিনদিন আরও খিটখিটে হয়ে গেল। ডাক্তারের কাছে নিতে চেয়েও লাভ হতো না। দু একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর সুস্থ হওয়ার হাল ছেড়ে দিল আপু।

বাসার সবার সাথে রাগারাগি করতো। বাবা-মা প্রায়ই ওর কথার আঘাতে কষ্ট পেতেন, দুজনের মলিন মুখ দেখে বুঝতে পারতাম।

ভাবতাম মায়ের মলিন মুখ দেখে আপুর অনুশোচনা হবে, আপুও কষ্ট পেয়ে কাঁদবে। কিন্তু আপুর চোখ শুকনো থাকতো, সে চোখে অনুশোচনা বা কষ্ট কিছুই থাকতো না। আমাকে ঘর থেকে মাঝে মাঝে বের করে দিতো আপু।

রেজাল্ট খারাপ করতে লাগলো আপু। পড়াশোনায় নাকি মন বসে না তার, পড়তে পারে না। একসময় আপুর কোনো কথা বিশ্বাস হতো না আর। বাসার সবাই কেমন মনমরা হয়ে যেতে লাগলো। আপু পরিবারের বড় সন্তান ছিল, সবাই খুব আশা করতো। আমি খুব অবাক হতাম দেখে যে একজন মানুষ কীভাবে কারও স্বপ্ন বা খুশিকে পাত্তা না দিয়ে থাকে?

যতোদিন গেল আপুর প্রতি রাগ আমার বাড়তে লাগলো। মায়া মমতাহীন একটা মানুষের প্রতি রাগ ছাড়া কিছু আসে না। বাবা কতো কষ্ট করতেন। মধ্যবিত্ত জীবনে আমাদের ভালো রাখতে ইনকাম করার জন্য কড়া রোদে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। আপু সব জেনেও কীভাবে পারতো? আমার প্রচন্ড রাগ আর আফসোসে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যেতে ইচ্ছে করতো।
----------------------------------------------

তারপর একদিন গ্রামের বাড়ি গেলাম। আপু গ্রামের কারও কথা মানে না। বাড়ির বাইরে যায় না, কাজে হাত লাগায় না, তার নাকি শুচিবায়ু লাগে। এই অসহ্য অযুহাতের জন্য মাকে কথা শুনতে হতো গাঁয়ের লোকের কাছে।

আপু নিজেও সবকিছু মিলিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন এই অসহ্য যন্ত্রনা শেষ হলো। কিছু পোলাপান আপুর ঘরের সামলে নোংরা জুতো রেখে দিয়েছিল। সকাল পেরোল, আপু কিছু বললো না।

দুপুরের ঠিক কিছুক্ষণ পর আপু স্ট্রোক করলো। নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে বিচ্ছিরি এক কান্ড। ভয় পেলাম আমরা সবাই। আল্লাহর কাছে বারবার চাইতে লাগলাম "আল্লাহ আপুকে ভালো করে দাও, আপুর প্রতি আমার কোনো রাগ নেই। শুধু তুমি আমার আপুকে ভালো করে দাও।"

প্রার্থনা কবুল হলো না। সন্ধ্যার পরপর আপু মা/রা গেল। ডাক্তারি রিপোর্টে এলো একগাদা ঘুমের ঔষধের কথা।
ঠিক ওইদিন থেকে আপুকে ঘৃণা করি আমি। অসম্ভব ঘৃণা। আপুর জন্য সব শেষ হয়ে গেছে। আপু মা/রা যাওয়ার পর থেকে আম্মু খুব কম হাসে। বাবার চোখে উজ্জ্বলতা পাই না। দুজনের বয়স যেন হাজার গুন বেড়ে গেছে। আমি ভালো রেজাল্ট করে বাড়ি গেলেও আপুর কথা মনে হয়, আপু আমার চেয়েও ভালো ছাত্রী ছিল।

আমরা শুধু হাসিখুশি থাকতে চাইতাম। সরল সোজা মধ্যবিত্ত জীবনের ক্ষুদ্র অথচ কঠিন এক চাওয়া। আপু সেই ইচ্ছের শেষ ভীতটাও গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে। এজন্য আমি ঘৃণা করি আপুকে, ঘৃণা করি আপুর ওই রোগটাকেও। আর আজ কিনা জানতে পারলাম মিতুরও সেই একই রোগ, খুশি থাকার উপায়কে গুঁড়িয়ে দেওয়ার রোগ, একটা পরিবারকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার রোগ।
--------------------------------------------------------------

ক্যাম্পাসে ফিরলাম দুপুর দুটোর কাঁটা পার করে। ফিরেই জানলাম ফলাফল দিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ সকালের অশান্তি সব দূর হয়ে গেল ফলাফল হাতে পেয়ে।

আকাশের দিকে চেয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। আপু তুই যেটা পারিসনি সেটা আমি পেরেছি। বাবা-মা নিশ্চয় একটু খুশি হবে। আমাদের ক্ষুদ্র এই জীবনে এখন প্রতিটা খুশিতেও তুই চলে যাওয়ার বিষন্নতা মিশে থাকে।

হঠাৎ মালিহাকে আসতে দেখলাম। মিতুর বোন। উচ্চমাধ্যমিক ভর্তি হবে এবার। ওকে দেখা মাত্র চোয়াল শক্ত হয়ে গেল আমার। পুরনো হিসহিসে রাগটা ফিরে এল। নিশ্চয় মিতু পাঠিয়েছে।
কিন্তু মালিহাকে দেখে বুঝা গেল না আজ সকালের ঘটনার কিছু জানে কিনা।

মেয়েটার চোখমুখ বিহ্বল। কাছে এসে বললো, "ভাইয়া আপু কোথায়?"
আমি কিছু বললাম না। ও খানিক অপেক্ষা করে বললো, "আপুকে পেলে বাসায় যেতে বলেন ভাইয়া। আপু ভাবছে আমরা ওর খারাপ রেজাল্ট দেখে মন খারাপ করব। আপু সারাজীবন চায় আমরা যাতে খুশি থাকি। আমরা মন খারাপ করেছি ভাবলে আপু আরও কষ্ট পাবে। ওকে বলেন আমরা বিন্দুমাত্র মন খারাপ করি নাই, আপু যেন চিন্তা না করে।"

-------------------------------

খুব সাধারণ কিছু লাইন। অথচ মনে হলো গালে কেউ সপাটে চড় মেরেছে। জীবনের বোধহয় অনেক রঙ থাকে। রাগ আর ঘৃণা জীবনের অন্যান্য রঙগুলো দেখতে দেয় না।

হঠাৎ অস্থির লাগতে শুরু করলো আমার। এবং মিতুকে খুঁজে পাওয়ার আগ অবধি এই অদ্ভুত অস্থিরতা গেল না।

দেখলাম গাছের নিচে বসার জায়গা অনেক। কিন্তু মিতু দাঁড়িয়ে আছে। আমি জানি মিতু বসবে না। আপু হলেও বসতো না। মিতুর সামনে আগুন জ্বলছে। ভেতড়ে ভেতড়ে চমকে উঠলাম আমি। রেজাল্টের কাগজ পুড়িয়ে দিচ্ছে মিতু। আগুনের আলোয় লালচে লাগছে তার সুন্দর গোলগাল মুখ। চোখে পানি আশা করেছিলাম আমি, অথচ পানি নেই। একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে। আমি যখন ওর সাথে সকালে সব শেষ করে দিলাম তখনও একই দৃষ্টি ছিল। ওই চোখে শূণ্যতাও নেই।

আছে এক্সেপ্টেন্স। জীবনের প্রত্যেকটা হতাশা আর ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার ভাষা। হঠাৎ বুকের মধ্যে কেমন জ্বালা ধরা শুরু হলো। মনে হচ্ছে ছেলেদের কাঁদতে নেই ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিয়ে একটু হাউমাউ করে কাঁদি।

আমার সামনে যেন মিতু না, আপু দাঁড়িয়ে আছে। সেই একই চোখের ভাষা।
----------------------------------------------------------------

ছোট্টবেলা আপুর হাত ধরে স্কুলে যেতাম। একবার স্কুলের রাস্তা বৃষ্টির কাদা পানিতে ডুবে গেল। আপু আমাকে দাঁড়াতে বলে নেমে গেল পানিতে। হোঁচট খেতে খেতে পার হয়ে গেল পানি ভরা রাস্তা। তারপর আমাকে দেখিয়ে দিল কোন কোন জায়গায় পা দিলে আমি হোঁচট খাবো না।
আমার সেই আপু বড় হওয়ার পর কাঁদা পানি দেখতে পারতো না। কাদাপানির প্রতি ভয়ের জন্য আমরা স্বপরিবারে কোথাও ঘুরতে পারতাম না।

ছোটবেলা রান্না করে নাস্তা খাওয়াতো আপু। মনে পড়লো আম্মুকে খুশি করার জন্য তার পুরো রান্নাঘর ধুলোমুছে সাফ করে রেডি করেছিল আপু, আম্মুর খুশি দেখে বাচ্চা মেয়ের মতো লাফাচ্ছিল। আমার সে আপু বড় হওয়ার পর রান্নাঘরের কোনো কাজে হাত লাগাতে চাইতো না।

ছোটবেলা আপুর সাথে ঘুমোতাম। একদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল, দেখি আপু হাউমাউ করে কাঁদছে। কেন? কারণ স্বপ্নে দেখেছে আমার নরম হাত পা কেউ ছু/রি দিয়ে কে/টে ফেলেছে। স্বপ্নে আমাকে কষ্ট পেতে দেখে সে বাস্তবে কাঁদছিল।

আমার সে আপু বদলে গেল। খিটখিটে হয়ে গেল। আজ হঠাৎ করে বুঝতে পারছি বাসার সবাইকে কষ্ট দেওয়ার পরেও তার চোখে কোনো অনুশোচনা দেখতে পেতাম না কেন। ওই চোখে ছিল এক্সেপ্টেন্স।

আপু নিজের অজান্তে কষ্ট দিতো সবাইকে, রোগে ভুগে কষ্ট দিতো, সবাইকে কষ্ট দিয়ে নিজেও পেতো। কিন্তু কষ্ট দেওয়া থেকে আটকাতে পারতো না। সে ধরে নিয়েছিল এই ব্যর্থতা তাকে মেনে নিতে হবে।

একবার বাবা হাসিমুখে বলেছিল আমার মেয়ে খুব ভালো রেজাল্ট করবে আমি বিশ্বাস করি। আপু সারাদিন আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল আর বলছিল, "এই রাকিব শোন, আমি যদি বাবার বিশ্বাস না রাখতে পারি? যদি আমি ভালো রেজাল্ট না করতে পারি আর বাবার খুশি নষ্ট হয়ে যায় তখন?"

এই মুহুর্তে সব স্মৃতি হুড়মুড় করে মাথায় ঢুকছে কেন? প্রতিটা আচরনের কারণ আগে ধরতে না পারার তীব্র আফসোস প্রতি মুহুর্তে দম আটকে দিচ্ছে।

আপুও চাইতো আমাদের খুশি করতে। না পারার ভয় করতো। পারতোও না। খারাপ রেজাল্ট করলে বা রাগারাগি করলে বাবা-মা বকতো না আপুকে। কিন্তু আপু বুঝতো মন ভেঙ্গে গেছে বাবা-মার। ওই মুহুর্তে নিজের ব্যর্থতা মেনে নিতো সে। চোখের ভাষাতে আবেগ বুঝা কষ্টদায়ক, কিন্তু এক্সেপ্টেন্স বুঝা হয়তো সবচেয়ে কঠিন।

পরিবার বানাতে ভয় পেতো আপু। ওর জন্য সবাই কষ্ট পাবে এই ভয় দূর করতে পারতো না। এবং দিনশেষে এই ভয় থেকেই সবাইকে কষ্ট দিতো। মিতুকে আমি একই জিনিসের মধ্যে দিয়ে যেতে দিতে পারি না।

জারুল ফুলের ঋতু। গাছ ছেয়ে আছে ফুলে। ফুল ছিঁড়ে এক বাচ্চার হাতে দিয়ে মিতুকে দিতে বললাম।

বহুদিন পর মনে হচ্ছে আমার হৃদয়ে কোনো ঘৃণা নেই। তবে তীব্র এক কষ্ট আছে।
না আপুর প্রতি আমার রাগ যায়নি। আমাদের সবার জীবনকে এলোমেলো করে চলে যাওয়ার জন্য আপুর প্রতি আমার অনেক রাগ। আপু তুই জানিস, তোর জন্য আমরা কতো কষ্ট পাই? আপু শোন, বাবা-মা এবং আমি হাজার বছর হাউমাউ করে কাঁদলেও আমাদের এই শুণ্যতা আর আফসোস শেষ হবে না।

বাচ্চা মেয়েটা মিতুর হাতে ফুলটা দিতে গিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। সকালের বৃষ্টির জন্য আধাভেজা মাটি।

ফুলটার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিতু। চোখে অসহায়ত্ব। আমি জানি, ওই মাটিতে পড়া ফুল আর হাতে ধরতে পারবে না মিতু।

নিচু হয়ে ফুলটা তুলে নিলাম আমি। মৃদু কন্ঠে বললাম, "আমার সামনের অপূর্ব মানবী নিজেই একটা ফুল। এই ফুল নাহয় আমার হাতেই থাক?"

মিতুর চোখ মুহুর্তেই পানিতে ভর্তি হয়ে গেল। টলটল করছে পানিগুলো, বিন্দু হয়ে ঝরার অপেক্ষায়। একইসাথে চোখে সংশয় এবং অবিশ্বাস। ঠোঁটদুটো কাঁপছে।

মিতুর দিকে তাকিয়ে কোনোরকম রাগ, ঘৃণা এবং অনুশোচনা ছাড়া প্রচন্ড আবেগ নিয়ে উচ্চারন করলাম আমি, "ভালোবাসি মিতু!"

-এক জীবন ভরা আফসোস
-মেহনাজ নওমী

রকিব হাসানের ছোট্ট ভুল!রকিব হাসানকে আমরা যে তিন গোয়েন্দার জাদুকর বলি তার একটা বড় কারন হচ্ছে, তিন গোয়েন্দার প্রত্যেকটা খু...
14/05/2026

রকিব হাসানের ছোট্ট ভুল!

রকিব হাসানকে আমরা যে তিন গোয়েন্দার জাদুকর বলি তার একটা বড় কারন হচ্ছে, তিন গোয়েন্দার প্রত্যেকটা খুঁটিনাটির দিকে রকিব হাসান তীক্ষ্ণ নজর দিতেন। এজন্য বিদেশি গল্পের অনুবাদ বা রুপান্তর হলেও তিগো পড়ে কখনই অনুবাদ বা রুপান্তরের ভাইব পেতাম না, বরং অরজিনালের স্বাদ পেয়েছি অদ্ভুতভাবে। চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্যকে অদ্ভুতভাবে ফুটিয়ে তুলেতেন রকিব হাসান, স্পেশালি শুরুর দিকের একদম মাস্টারপিস ভলিউমগুলোর কথা আলাদা করে বলার কিছু নেই।

কিন্তু শুরুর দিকে মাস্টারপিস ভলিউমের জন্য গ্রিনহিলসের একটা গল্পে কিশোরের বৈশিষ্ট্যগত একটা ভুল চোখে পড়ে।

ভলিউম ৩/২ এর ভূতের হাসি গল্পের এক জায়গায় দেখা যায় কিশোর বা রবিন কেউই ভেন্ট্রিলোকুইজম পারে না। এজন্য অনুসরনকারীদের ধোঁকা দিতে তাদের ওয়াকিটকির সাহায্য নিতে হয়।

আবার ভলিউম ৫১ এর পেঁচার ডাক গল্পে দেখা যায় কিশোর ভেন্ট্রিলোকুইজম পারে। এবং তার দক্ষতা এতোই ভালো যে কিশোর ভেন্ট্রিলোকুইজম দিয়ে ঝামেলা ওরফে ফগর‍্যাম্পারকটকে বোকা বানাতেও সক্ষম হয়।

এখন আপনারা অনেকে আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন যে ভলিউম ৩/২ এর পর ভলিউম ৫১ তে গল্প অনেকদূর এগিয়েছে, তো গোয়েন্দাপ্রধানের ভেন্ট্রিলোকুইজম শিখে নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পয়েন্ট হচ্ছে, ভলিউম ৫১ এর পেঁচার ডাক গল্পটা গ্রিনহিলসের গল্প। অর্থাৎ তখন কিশোর ছোট ছিল এবং তখনও তিন গোয়েন্দা এজেন্সীর জন্ম হয়নি।

হ্যাঁ ভলিউম ৩/২ লেখার অনেকদিন পর ৫১ লিখেছেন রকিব হাসান। দীর্ঘদিন পর লেখায় নিশ্চয় এই তথ্যটা মনে ছিল না ওনার। খুব ক্ষুদ্র একটা ডিটেইল!

মনে থাকলে হয়তোবা ভলিউম ৫১ তে কিশোরের ভেন্ট্রিলোকুইজম পারাটা লিখতেন না উনি। কারন ভলিউম ৩/২ তো চেঞ্জ করার উপায় ছিল না, কারন অলরেডি লেখা হয়ে গেছে! আর ছোটবেলা কিশোর ভেন্ট্রিলোকুইজম পারলে তো বড় হয়েও পারতে হতো অথবা উল্লেখ থাকতো যে একসময় পারতো। আর আমরা তো জানি গোয়েন্দাপ্রধান সহজে কোনো জিনিস ভুলে না।

একটাই উপায় ছিল ৫১ তে কিশোর পাশাকে ভেন্ট্রিলোকুইজম না শেখানো। কিন্তু এটা করলে আবার গল্পের টার্নিং পয়েন্ট পালটে যেতো। ভালোই একটা প্যাঁচ তাই না!

-মেহনাজ নওমী

30/04/2026

অনুভূতিশূণ্য হলে কেমন লাগে সে অভিজ্ঞতা নিতে ইচ্ছে করতো অনেকদিন ধরে। কোনো একটা মুহুর্তে অন্তরে কোনো অনুভূতি, চিন্তাই কাজ করবে না, ওই সময়ে কেমন লাগবে? সম্ভবত আমি এখন ওই সময়টা অনুভব করছি। পূর্বের অভিজ্ঞতা নেই তো ধরতে পারছি না।

কড়া রোদ। একদম ভরদুপুর। চারদিক আলোয় ঝলমল করছে। শুকনো মাটিতে খাঁ খাঁ করা রোদ আশেপাশের প্রত্যেকটা প্রানীকে তাপের তেজ বুঝাচ্ছে। ফকফকে আলোকে কেমন অন্ধকার অন্ধকার লাগছে। যেন আজব এক দুনিয়া। আমি বসে আছি নদীর ধারে। আশ্চর্যজনক ভাবে নদীতে স্রোত আজ অনেক বেশি।

সে স্রোতের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না। কানে কেমন ঝিমঝিম এক মৃদু আওয়াজ হচ্ছে। কোনো গহীন বনে একাকী বসে থাকলে ঝিঝির তীব্র আওয়াজ যেমন শোনায় কানে, ঠিক অমন লাগছে।

আমার হাতে ধরা খাতা। পাতাগুলো ঝকঝকে নয় মোটেও। পাতাভরা লেখা। দুটো খাতা, দুটো খাতার অল্প কিছু পাতা ভরানো বাকি আছে। ভরানো কি হবে আর?
হেরে যাওয়ার পরেও পাতা ভরানো যায় গোটা গোটা ঝলমলে অক্ষরে?

কতোকাল পেরিয়ে গেল, কতো কঠিন সব চেষ্টার পর, কতোগুলো দিন পর অবশেষে হেরেই গেলাম আমি। ওই যে নদীর স্রোত তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে তীরে, সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নদীর তীরের ঝুরঝুরে মাটিকে তার উত্তাল পানির সাথে। আমি যেন নিজেকে সে নদীর চেয়েও গহীনে হারিয়ে ফেলেছি। আমাকে হারিয়ে ফেলা মানেই তো ঘর হারিয়ে ফেলা। অথচ কতোকালের বাসনা আমার, এক ঘর হবে, আপন আপন লাগে এমন একটা ঘর!

আমি খাতার প্রত্যেকটা আস্ত পাতা ছিঁড়লাম। ছোটবেলায় কাগজের নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসিয়ে খেলতাম। আমার খাতার প্রিয় পাতাগুলো আর কিছুক্ষন পরেই পানিতে ভেসে যাবে, নৌকা হবে না, তলিয়ে যাবে ভিজে।

অলস দুপুর। নৌকা বাধা নদীর ধারে। মাঝি নেই। কোনো চায়ের স্টলের স্বল্প ছাউনির নিচে বসে হয়তো বাঁচার চেষ্টা করছে খরখরে রোদ থেকে। একজন মাঝি বসে আছে খানিক দূরে, এক বাঁশের মাচার ওপর। বুড়ো সে। কুঁচকে যাওয়া চামড়ার আড়ালে প্রায় ঢেকে যাওয়া ছোট ছোট চোখ মেলে প্রায়ই চাইছে আমার দিকে। এরপর উদাস নয়নে নদীর পানে চেয়ে বসে থাকছে। ছেঁড়া গেঞ্জি, মলিন লুঙ্গি, সাদা চুলে ভর্তি মাথার ওপর ছেঁড়া এক গামছা অবহেলায় ফেলে রাখা।

কেমন ভ্যাপসা এক গরম। গায়ে ঘাম হয় না, কিন্তু সারা গা চিটচিট করে। দমবন্ধ দমবন্ধ লাগে এরকম গরমে। বাতাস নেই কিচ্ছু না। মনে হয় ঝড় আসবে, নদী হয়তো এজন্যেই উত্তাল। কে জানে!

বাবা-মা যখন আলাদা হয়ে গেল তখন আমার বয়স অল্প। খুব অল্প। প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরোইনি তখনও। বড় ভাইয়ের সাথে আমার বয়সের তফাৎ অনেক। ভাইয়া বিয়ে করে আনলো। আলাদা হয়ে গেল। বাড়িতে রইলাম আমি আর বাবা। ভাইয়া প্রতি সপ্তাহে ভাবিকে নিয়ে বাড়ি আসতো।

বিশাল বাড়ি ফাঁকা থাকতো বলে আমাকে নিয়ে বাবা গ্রামে চলে গেল। শুধু বাবাকে নিয়ে থাকতে আমার দুঃখবোধ হতো না। বরং অদ্ভুতভাবে ভালো লাগতো।

আমি নিজেকে অনুভব করতে পারতাম। ছোট থেকেই নিজের ভালো লাগা, কষ্ট হওয়া, উত্তেজনা সবকিছু আলাদা আলাদা করে ফিল করতে পারতাম। কালবৈশাখী ঝড় হলেই মাঠে ছুটে চলে যেতাম। আমার ঝাঁকড়া চুল উড়তো ঝড়ো হাওয়ায়।

আমি হাসতাম, খেলতাম। যা ইচ্ছে করতো শিখতাম। মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে পড়তাম। আম্মু নবম জন্মদিনে তিনটে মোটা খাতা দিয়েছিল। আমি সে খাতা থেকে দুটো খাতায় লিখতাম। একটাতে আমার ভালো সব গুন, কেউ আমার প্রসংশা করলে, বাবা কোনোদিন বাড়ি ফিরে আমার দিকে চেয়ে হাসলে, সব ভালোকিছু সে ভালো খাতায় লিখে রাখতাম।

আর কারও কাছে বকা খেলে, গালমন্দ শুনলে নিজের খারাপ গুন দুই নাম্বার খাতাটাতে লিখে রাখতাম। যে দিনগুলোতে কোনো আনন্দের কিছু ঘটতো না ওদিন আমার খারাপ গুনের খাতাটাতে পয়েন্ট বাড়তো।

এজন্য সারাদিন বাঁদরামি করতাম আমি। আনন্দ করতাম। আনন্দে আনন্দে নিজের ছোট্ট মনকে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম। আনন্দের দিন পার করতাম আর আমার ভালো গুনের খাতার পাতা পয়েন্ট দিয়ে ভরে যেতো।

ধীরে ধীরে বড় হয়েছি আমি এভাবেই। নিগুঢ় এক স্বপ্ন নিয়ে। একদিন ভালো গুনের খাতা পুরোপুরি ভরে যাবে। আমি পুরোপুরি নিজেকে অনুভব করতে পারব, আমার ঘর আর ফাঁকা ফাঁকা লাগবে না, অনেক আপন আপন লাগবে।

কিশোরী যখন ছিলাম তখন দাদার পুরনো পুকুরের ধারে গিয়ে বসতাম। তখন কড়া দুপুরের রোদ ঝলসে দিতো সব কিছু। আমার ঘুড়ি আর খাতা অলস পড়ে থাকতো আমার পাশে।

টিনের এক ছোট্ট ঘর ছিল পুকুরের ধারে। মাছ ধরার সময় যখন ঘনিতে আসতো তার আগের দুয়েক সপ্তাহ এখানে গাঁয়ের লোককে পাহারায় বসাতেন দাদা, যেন মাছ চুরি না হয়। এই ঘরে এখন কেউ বসে না। পুকুর থেকে মাছ নিয়ে গেলেও বাবা গাঁয়ের লোক কাউকেই কিছু বলতো না।

ঘরের চারধারে ঘাস গজিয়ে ছিল ঘন হয়ে। গাঁয়ের চাচি-কাকিরা ছাগল নিয়ে আসতো দড়ি ধরে, ঘাস খেতো ছাগল। পানি ঝলমল করতো রোদে। আর সে পুকুরের একধারে বসে ছবি আঁকতো।

কখনো ঝলমল করা পানির ছবি, কখনো টিনের ঘরটার ছবি। রোদ লেগে তার চুল সোনালী লাগতো। আমি পানির দিকে চেয়েও টের পেতাম সে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে আমার দিকে। লজ্জা লাগতো যখন ভালো গুনের খাতায় তার কথা লিখতে যেতাম, তার তাকানোর কথা লিখতে যেতাম।

চোখের ভাষা মেয়েরা বুঝতে পারে। আমিও পারতাম। আমি জানতাম সে আমাকে পছন্দ করে। আমারও ইচ্ছে করতো একদিন পাশে গিয়ে বসি, বসে বলি, "তুমি জানো আমিও তোমাকে অনেক পছন্দ করি? আমার একটা ঘরের স্বপ্ন। তুমি খাতায় যেরকম ঘর আঁকো প্রতিদিন, এমন একটা ঘর আমাকেও দিও।"

বলা হয় না। কোনো কোনো দিন বসে থাকতে থাকতে বিকেল হয়ে যেতো। আমগাছের দীঘল ছায়া পড়তো পুকুরের পাড়ে।

কলেজ পাশ করলাম। আমাদের গ্রামের বাড়ি ধীরে ধীরে নড়বড়ে হতে লাগলো।

এরপর একদিন সূর্য ঢলে পড়ার আগে আমগাছের নিচে তার দীর্ঘ ছায়া দেখলাম। সে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। দিন পেরোল, ভাইয়া ভাবীকে নিয়ে ফিরে এলো বাবাকে একেবারে শহরে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের কাছে। জানতাম সাথে আমাকেও নিবে বাবা।

গ্রামের ঘর ছাড়লাম। কলেজ পাশ করলাম। এক বর্ষার আগে সে ঘর বাঁধলো। লাল শাড়ি পরা মেয়েটার হাতের সোনার বালাতে গোধূলির আলো ছবি আঁকছিল। আর আমার তার সাথে ঘরের আশাকে মুছে ফেলে আমি শহরে পা বাড়িয়েছিলাম পুরনো আশাকে তীব্রভাবে আঁকড়ে নিয়ে, ভালো গুনের খাতা ভরবে, আমি আমাকে পুরোপুরি অনুভব করব সেদিন, নিজেকে পেলেই নিজের আপন ঘর খুঁজে পাবো।

এরপর ধীরে ধীরে নতুন বাড়ি ভর্তি হলো। এখন বাবা, ভাইয়া, আমি, ভাবী। কিন্তু ঘরকে আগের চেয়েও ফাঁকা লাগতে শুরু করলো। বাবাকে যেন সেই গ্রামে রেখে এসেছি আমি, সাথে নিজেকেও।

একদিন একদিন করে আমার কাছ থেকে নৌকাডুবি, শেষের কবিতা, দত্তা, বিন্দুর ছেলে, প্রতিটি বইয়ের চরিত্ররাও ফিকে হতে লাগলো। বই ছাড়লাম আমি। পড়ার তৃষ্ণা যেন বিশাল জলের স্রোতের এক ঝাপটায় নিভে গেল। আমি বড় হলাম। বাঁদরামি হারালাম। নিজেকে ধরে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও নিজেকে হারালাম। অবাধ্য হলাম। বাড়িতে থেকেও অদৃশ্য হলাম। বাবার বয়স বেড়ে প্রতিদিন আমার চোখে প্রকট হয়ে ধরা দিল।

আমি চিনলাম নিজেকে আবারও বহুদিন পর, সেই ছোট্টবেলায় নিজেকে চেনার বহুদিন পেরিয়ে যাওয়ার পর। আমার সত্তার চেয়ে আমার অপরাধবোধ বড়। বড় হয়েছি আর নিজেকে হারিয়ে অবাধ্য হয়ে ঠকিয়েছি বাবাকে, কষ্ট দিয়েছি আপনজনকে। এজন্য আজ আমার সামনে দুটো খাতা। খারাপ গুনের খাতাটাই ভরে গিয়েছে আগে। হেরে গিয়েছি আমি।

নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি পুরোপুরি। এই খাতা দুটো পানিতে ভাসিয়ে দিব এজন্য। সাথে এই উত্তাল স্রোতের সাথে নিজের একটা আপন ঘরের স্বপ্ন আর মনোবলকেও।

আকাশ মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। ঠিকই অনুমান করেছিলাম। ঝড় আসছে। নদীর স্রোত আরও উত্তাল হয়ে গিয়েছে। পাতাগুলো পানিতে ছেড়ে দেওয়া মাত্র চোখের আড়ালে চলে যাবে। বাতাস নেই এখনও, তবে কিছুক্ষন পরেই ঝড়ো হাওয়া উঠবে বুঝতে পারছি।

আমি মাটি থেকে পাতাগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য পায়ে পায়ে নদীর ধারে এসে দাঁড়ালাম।

আমার মাথার ভেতড়ের নিজের পুরনো কন্ঠটাও আর ফিসফিস করছে না। দমবন্ধ লাগছে। কতোদিনের স্মৃতি ভাসিয়ে দিতে যাচ্ছি আমি, তীব্র কষ্টের একটা ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছে না কেন আমাকে? কেন এমন জড় পাথরের মতো স্তব্ধ মনে হচ্ছে নিজের মনকে?

নদীর পানি সবসময় আকর্ষন করতো আমাকে। রোদে চিকচিক করা পানি। আজকের পানি চিকচিক করছে না আর, উত্তাল হয়ে গর্জন করছে প্রায়। অথচ দীর্ঘদিন পর পানির প্রতি আকর্ষন বোধ করছি আমি। ছোটবেলায় একবার পুকুরে ডুবে গিয়েছিলাম আমি। বাতাসের অভাবে ছটফট করার স্মৃতিটা মাথায় গেঁথে আছে তখন থেকে। আম্মু দ্রুত পানি থেকে টেনে তুলেছিল। নরম কোলে আঁকড়ে ধরেছিল আমাকে।

আচ্ছা আজকের এই উত্তাল পানিতে পড়ে গেলে সেই একই রকম খারাপ লাগবে? ভয় পাচ্ছি আমি। পানিতে ডুবতে যে তীব্র কষ্ট হয় সেটার ভয় নাকি আজীবন লালন করা নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সাধকে চিরকালের জন্য হারিয়ে ফেলছি তার ভয়?

"পানিতে ডুবা অনেক কষ্ট মা।"

চমকে উঠলাম আমি। আজকাল মাথার ভেতড়ের কন্ঠ জোরে শুনতে পাওয়া শুরু করেছি? ভুল ভাঙলো আমার। ওই বুড়ো মাঝিটা কথা বলেছে।
আমার চোখ দেখে কী করে বুঝল সে কী ভাবছি আমি? কতোকাল পর বুঝি কেউ আমার চোখ দেখে বুঝল আমি কি চাচ্ছি।

আমার বাবারও এমন বয়স হয়ে গেছে। মাথার চুল বুড়োর মতোই সাদা। হঠাৎ কেন যেন ইচ্ছে করছে বুড়োকে বলি কী করে অবশেষে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। ফিসফিস করে বললাম আমি, "আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। সাথে হারিয়ে ফেলেছি আমার ঘরকেও। নিজেকে হারিয়ে ফেলা মানে নিজের ঘর হারিয়ে যাওয়া, নিজেকেই খুঁজে পেলাম না ঘর কী করে খুঁজে পাবো বলতে পারেন?"

"আমার ট্রলার আছিল। একবার আরেক ট্রলারের সাথে ধাক্কা লাইগা ট্রলার ভাইনগা গেল। নতুন কেনার পয়সা আছিল না। দেনা আছিল। শোধ দিয়া এখনের এক কাঠের ডিঙ্গি নৌকা কিনতে পারছি খালি। ঘরে শুরু হইলো অভাব। আট বছরের মাইয়ারে ফালাইয়া থুইয়া বউ চইলা গেল। নয়া বিয়া করলো।

ঘরে ফিরবার পারতাম না তহন। মাইয়ার দিকে তাকালে মায়া হইতো। কিন্তু তারচেয়ে মায়া হইতো নিজের দিকে তাকালে। সারাটা জীবন খাইটা গেলাম। এদিকে নিজেরেই পাইলাম না, বউও চইলা গেল। বড় ভালা পাইতাম তারে।

মাঝে মইধ্যে নৌকা বাইতে বাইতে এই রকম উত্তাল নদীতে চাইয়া ঝাঁপ দিতে মন চাইতো। কিন্তু আমারে ফিরায়া আনছে আমার মাইয়া। আমি আমার মাইয়ার মাঝেই নিজেকে আবার খুঁজে পাইছি।

আম্মারে তুমি যদি নিজেরে খুঁইজা না পাও তাইলে তোমার আপনজনের মইধ্যে দেখো। মাঝে মাঝে আমাদের মনে হয় আমরা হারায়ে গেছি। কিন্তু খোদা আমাদের আপনজনের মাঝেই আমাদের খুঁজে পাওয়ার রাস্তা রাখে।

আমার মাইয়া বড় হইছে এখন অনেকটা। পড়ালেহা শিখছে। আমার নাতনি আছে। সেও এখন দশ বছর, ইস্কুলে যায়। মাগো তোমার খাতার পাতার লেখাগুলো বড় সুন্দর। এতো সুন্দর লেখা আমি বহুদিন দেখি নাই। আমি লিখতে পড়তে পারি না। আমার নাতনির জন্য একটা পাতায় কিছু লিখে দাও, আমি বাড়িতে ওরে পড়তে দিমু।"

অনুভব করলাম আমার কানের মধ্যের ঝিমঝিম ভাব চলে গেছে। গালদুটো উষ্ণ লাগছে। বুঝলাম কেন, চোখের পানি ভিজিয়ে দিয়েছে গাল দুটো। আশ্চর্য! পানি গড়াল কখন?

কীরকম অদ্ভুত একটা কষ্ট হচ্ছে, আনন্দও হচ্ছে একই সাথে। নিজেকে ফিরে পাইনি আমি। রাস্তা তো পেয়েছি। এই তো বহুদিন পর আমার প্রসংশার খাতায় পয়েন্ট ভরলো আবার।

আমি কুড়িয়ে নিলাম পাতাগুলো। বহুদিন পর ভালো গুনের খাতাটা মেললাম। পাতায় হাত বুলালাম। এই খাতার বাকি পাতাগুলো ভরাব নিশ্চয়, বহুদিন পর ছেলেবেলার সেই প্রতিজ্ঞা করলাম আবার!

আমি নিজেকে আমার মধ্যে না পাই, আপনজনের মধ্যে নিজের কিছু অংশ যত্ন করে রাখতে তো দেখব নিশ্চয়! তাই না? মনে পড়লো বাবা কদিন আগে বাক্সভরা রসকদম মিষ্টি এনে টেবিলে রেখেছিল। কিছু বলেনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি না বলা কতো কথা মমতা হয়ে মিশে ছিল সেই বাক্সে, আজও, আমি এতো বড় হয়ে হারিয়ে যাওয়ার পরও!

সেই যে ছোটবেলা রসকদম হাতে নিয়ে মনের আনন্দে নেচে বেড়াতাম বাড়িতে আর খেতাম। আমার সে আমিকে মনে করি না আর, কিন্তু বাবা ঠিকই মনে রেখেছে।

নদীর দূরের তটরেখায় তাকালাম। বুড়ো মাঝিকে খুঁজলাম, নেই। শুধু দূরে ঢেউয়ের মাথায় নৌকা চোখে পড়লো। ছোট কালো এক নৌকা, ছোটবেলায় ভাসানো কাগজের ছোট্ট নৌকাগুলোর মতো লাগছে নদীর বুকে।

আমি নিজেকে আবারও খুঁজে বের করব। নিশ্চয় বের করব। এরপর চাঁদের আলো যেদিন বন্যার মতো থইথই করবে, সেদিন, বহুদিনের সাধ আমার, আমি নিজেকে খুঁজে বের করে ভাঙা বাড়িটাকে আপন বানাব!

-ঘর
-মেহনাজ নওমী

(সব লেখা একই রকম আমার। আমি আর লিখতে পারি না কেন? লেখা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসে একসময় নিঃস্ব করে হারিয়ে যায়?)

Address

Uttara
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when নওমীর অনুধ্যায় posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share