07/07/2026
বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। একনাগাড়ে হওয়া ঝুমঝুম শব্দের আওয়াজ কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে প্রায়। উতাল-পাতাল হাওয়ায় ঘরের সবকিছু নিচে পড়ে যাচ্ছে একটু পরপর। মৃদু ছাট মন্দ লাগছে না আমার। বাতি নেই, বিদ্যুৎ চলে গেছে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার পরপরই।
বৃষ্টি কেন জানি ভালো লাগে না আমার। তবে আজকে ভালো লাগছে। পাশের ঘর থেকে ক্রমাগত বকে যাচ্ছে মা। রোজ একই রেডিও।
"আর কতোদিন বিয়ে পেছাইবি তুই? আমারে শান্তি দিবি না? এতো বড় মাইয়া বিয়ার জন্য রাজি হস না কেন? তোর বাপের বয়স হয়ে গেছে, হাজার রোগে ভুগতাছে। ছোট বোনটার বিয়া দেওয়া লাগব। ওই চিন্তা নাই অর। নাটক লেখে, এতো চিন্তা ফালায়ে রাইখা নাটক লিখে।"
আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে আজকে আমার মেজাজ খুবই খারাপ থাকার কথা। কারন আমার লেখা নাটকের স্ক্রিপ্ট নির্বাচন হয়েছিল ইউনিয়নের নাটকে মঞ্চস্থ হওয়ার জন্য। আজকে হওয়ার কথা ছিল, বৃষ্টির জন্য সব শেষ। খোলা মাঠের মাঝে এখন হয়তো নাটকের প্যান্ডেল ভিজছে একাকী।
মায়ের কথা এখন আমার মনে শূন্যতা তৈরী করে। আমি যেন বোঝা হয়ে গেছি বাড়িতে, একসময় খুব মন খারাপ হতো এরকম ভেবে, একাকী রাতে কাঁদতাম বসে বসে। এখন আর কান্না পায় না, এখন কি যে মনে হয় আমি নিজেও বুঝি না।
লোহার কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো। বাবা এসেছে, ভিজে গেছে নিশ্চয়। মা ডাকছে হারিকেনটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। ইচ্ছে করছে না, নিভিয়ে দিলাম আগুন। অন্ধকারে বৃষ্টির ছাটে বসে থাকতেই ভালো লাগছে।
ছোটবোন ইমা হারিকেন নিয়ে গেল, সাথে ভাই। ওরা দুজন যমজ। সদ্য একাদশ শ্রেণীতে কলেজে পা দিয়েছে। গলা শুনলাম, "বাবা আপা আজকেও বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলে নাই। উলটা নতুন নাটকের লেখা লেখতেছে। কয়দিন নাটক লিখবে কও? এভাবে চলে? তোমার আর মায়ের কথা ভাববে না?"
মাথায় রক্ত চড়ে গেল আমার। ইচ্ছে করছে উঠে গিয়ে দু গালে ঠাস ঠাস চড় বসিয়ে দিয়ে আসি। নিজেকে শান্ত করার জন্য পানি খুঁজলাম, নাই। উঠতে ইচ্ছে করছে না।
আমি ঘাড়ত্যাড়া, পরিবারের কথা বুঝি না ঠিক, কিন্তু গাধাও না। ও যে প্রেম করে এইটা ধরতে বেশিদিন লাগেনি আমার। আমি বিয়ে না করলে ওর বিয়ের পালা আসবে না এজন্য প্রতিদিন আগুনে ঘি ঢালবে।
বাবাকে গম্ভীর আওয়াজে কাশি দিতে শুনলাম। বললো, "ভাত দাও।"
সবাই চুপ হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি বাবা চায় না এসব নিয়ে কথা বলতে।
বাবা এমনই। নিজের কর্মক্ষেত্রের সে কলেজের একঘেয়ে ক্লাস আর বাসায় পত্রিকার দুনিয়া ছাড়া কিছু বুঝেন না। কোনোকিছু ভাবেনও না সম্ভবত, মায়ের ঝামেলার ভয়ে তার সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
আগে যখন মা কথা শোনাতো প্রচন্ড কষ্টে বাবার কাছে বসতাম। ভয় লাগতো, তবুও আশা নিয়ে বসে থাকতাম বাবা বুঝি জিজ্ঞেস করবে আমি কেমন অনুভব করছি। বাবা করতো না, গম্ভীর গলায় বলতো "মা ডাকছে, যাও।"
জোরে জোরে বাজ পড়া শুরু হয়েছে। ঘর থেকে থেকেই আলোর ঝলকানিতে আলোকিত হচ্ছে। বাতাসে ভেজা মাটির কেমন একটা গন্ধ। হঠাৎ করে বৃষ্টি আবারও অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। আমার মনে কখন কী হয় আমি কিছুই বুঝি না।
সরে আসলাম জানালা থেকে। খাওয়ার ঘরে দেখলাম পাটি পেতে খেতে বসেছে সবাই।
প্লেটে খাবার নেওয়া মাত্রই হঠাৎ মা প্লেট ঠাস করে রেখে ঘরে গেলেন। খানিক পর বিয়ের শাড়ি এনে আমার সামনে ছুঁড়ে দিয়ে কাঁদতে লাগলেন,
"আমার বিয়ার শাড়ি এইটা। তোর এই নাটক লেখার নেশা করতে করতে জীবনডা ধ্বংস করবি? আয়না দেহস জীবনে? বয়স কতো হইসে দেহস? বাপের দিকে চোখ পড়ে না? খাটতে খাটতে কেমন বয়স হইছে দেখ। বৃষ্টিত ভিজ্জা এই রাইতে বাড়িত আসে।
তোর যে সম্বন্ধডা আসছে খুবই বড় ঘর। বিয়া করলে তোর বোনডার ভালো সম্বন্ধ আসবো। ভাইডা দুলাভাইগো কাছ থেইকা সাহায্য পাইব, তোর বাপে আরাম পাইবো। এতোবড় মাইয়া হিসেবে পালছি তোরে সারাজীবনের রক্ত পানি কইর্যা, তুই এখন বুঝস না।
আমার আর তোর বাপের এই কষ্ট দেইখা ভাত নামে না গলা দিয়া। কাল-পরশুর মধ্যে হয় তুই বিয়ার লাইগা রাজি হইবি, নাইলে আমার এই শাড়ি পুড়াবি।"
কান্না শুরু করেছে মা। উঠে চলে গেছেন তিনি। বাবা বললো, "ইমা-ইমন তাড়াতাড়ি খেয়ে মায়ের ঘরে যা।"
উদাসীনভাবে খাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু স্বাদ টের পেলাম না কোনোকিছুর। খাওয়ার মাঝে গান গাওয়া একদম নিষিদ্ধ, আল্লাহর নেয়ামতকে অসম্মান করা হয়। তবুও আমি গুনগুন করে গান ভাজতে ভাজতে খাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। পাশে বসা বাবাকে বলতে ইচ্ছে করে, "বাবা তোমার আমার না বড় হয়ে ঝরণা দেখতে যাওয়ার কথা ছিল? তার আগেই বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিবে আমার? আমার ইচ্ছেগুলোর কথা তুমি আর মা দুজনেই সব ভুলে গেছ এখন তাই না?"
বলা হয় না। বাবার মন যেন মাঝসমুদ্রে আর আমার মন আকাশের ওপারে, এতোটাই দূরত্ব পাশে বসেও!
রাতে ঘুমানোর আগে মা ঘরে এলেন। চোখমুখ ফোলা। মায়ের চোখমুখ ফোলা দেখলে অন্তরে ধক করে উঠে আমার। ইচ্ছে করে এই জগত ছেড়ে অনেক অনেক দূরে পালিয়ে যাই। পারি না।
মা এসেই আমার মাথায় হাত দিলেন। আদর করে বিছানায় বসালেন। অনুমান করলাম মা এখন আস্তে আস্তে বুঝাবে আমাকে, রাগারাগি করে যেহেতু লাভ হয়নি।
"মারে আমি জানি তুই রাতুলরে পছন্দ করিস। ছেলেটা সেই হাইস্কুল থেইকা তোর বাপের কাছে পড়তে আইতো। মা হইয়া তুই এতোদিন কারে পছন্দ করিস এইটা আমি বুঝি নাই তা হয় না। কিন্তু মা ওই ছেলে নাকি বাইরের দেশের ভিসা না কি পাইছে। ওরে বিয়া করলে তোরেও দেশ ছাড়া লাগব। দেশ ছাড়লে বাপ ভাইরে দেখবি কেমনে মা? একটু বুঝ বাপ, দয়া কর।"
মা চলে গেল। রাত বাড়তে লাগলো। জহির রায়হানের হাজার বছরের পুরনো সে রাত। আমি ঘর খুলে বাহিরে বেরিয়ে আসলাম। আকাশের মেঘ বুঝা যাচ্ছে। খুব করে চাচ্ছি আকাশ কাঁদুক। পানির প্লাবন আসুক, ভিজিয়ে দিক আমাকে। বৃষ্টির পানির সাথে মনের সকল অস্থিরতা আর জ্বলুনি দূর হয়ে যাক। আমি একটু শ্বাস নিই।
বৃষ্টি এলো না। আমি কতোক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম নিজেও জানি না। আকাশ যখন অল্প অল্প সাদা হতে শুরু করলো তখন ঘরে ফিরলাম। নামাজ পড়ে শোয়ার খানিক পরেই শুনলাম বৃষ্টি এসেছে, ঝুম বৃষ্টি। বাবা ভিজে যাবে মসজিদ থেকে আসার সময়। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। সকল কষ্ট মেশানো সে কান্নার আওয়াজ দুনিয়ার কেউ আলাদা করে চিনতে পারবে না কান্নারত ব্যক্তি ছাড়া।
---------------------------------------------
গতোকালকের বাতিল হয়ে যাওয়া নাটক আজকে আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যায় নাটক। টিভি আছে এখন বেশিরভাগ বাড়িতেই, তবুও সবাই একসাথে গ্রামের নাটক দেখার জন্যই কেমন উৎসব উৎসব মনে হয়।
আমার মনে আজকে শান্তি। কারন গুরুত্বপূর্ন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। কোনোকিছু ঠিক করার পর অন্তর থেকে পাথর নেমে যায়। যে সিদ্ধান্তই হোক, মন যখন মেনে নেয় সেটা তখনই এক নিরবতা এসে ভীড় করে মনে।
নাটক শেষ হলো। অনেক প্রসংশা শুনলাম। নাটক নাকি ভালো হয়েছে। আমি শেষ অবধি দাঁড়িয়ে থাকলাম। প্রত্যেকটা প্রসংশা শুনলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন ভরে।
তারপর এগিয়ে এলাম। খোলা মাঠে আজ মৃদুমন্দ বাতাস। আকাশ পরিষ্কার, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্রসারি জ্বলজ্বল করছে।
আমার পরবর্তী নাটকের পান্ডুলিপি তৈরী। মায়ের বিয়ের বাড়ি হাজার চেষ্টা করেও বুঝাতে পারলাম না। আস্তে করে ম্যাচ কাঠিতে আগুন জ্বালিয়ে ধরিয়ে দিলাম সে কাগজে। হাওয়া আগুনকে বারবার নিভিয়ে দিতে চাচ্ছে, কিন্তু আগুন নিভছে না। যে হাওয়া বাহ্যিক আগুনকেই নেভাতে পারছে না সে হাওয়া আমার মনের আগুনকে কী করে নেভাবে?
মা ঠিকই বুঝেছে কাকে পছন্দ করি। তারমানে এতোদিনে তার এটাও বুঝার কথা আমার ভালোবাসা কি, রোজ কলেজ যাওয়ার সময় উপজেলার ছোট লাল দালানের অফিশিয়াল চেয়ারগুলো কীভাবে টানে আমাকে, সবই নিশ্চয় বুঝেছে এতোদিনে মা। তবুও আমাকে শেকলে আটকাতে চাচ্ছেন যেহেতু, সেহেতু সে শেকল নিশ্চয় আমার জন্য ভালো। নাটকের স্ক্রিপ্ট কিংবা বিদেশ যাওয়া একটা মানুষ নিশ্চয় মায়ের সিদ্ধান্তের চেয়ে ভালো হতে পারে না।
ছাই হওয়া কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন পাশে এসে বাবা দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। আমি টের পাওয়ার পরেও কিছু বললেন না উনি। হঠাৎ চমকে লক্ষ্য করলাম বাবার পেছনে লম্বা কোঁকড়াচুলো যে ছেলেটা দাঁড়িয়ে সে রাতুল।
বাবা কোনো কথা বললেন না, আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে রাতুলের হাতে তুলে দিলেন।
আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলেন, "তুমি আমার প্রথম মেয়ে। ছোটবেলা থেকে তোমার কেমন জামা পছন্দ, কেমন জুতা পছন্দ সব টের পেতাম আমি। আমি নিজে পছন্দ করে কিছু আনলেই দেখতাম তোমার পছন্দ হয়ে গেছে।
সেই ছোট্টবেলা থেকে তোমাকে চিনেছি। তোমার পছন্দও তাই আজও বুঝতে পারি। আমার মনে হয় রাতুল তোমাকে ভালো রাখবে, তোমার মায়েরও তোমাকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে পূরণ হবে।"
শব্দ গোছাতে আমার সমস্যা হয় না। আজকে হচ্ছে। আমি কতোকিছু বলতে চাচ্ছি আব্বাকে, পারছি না। শুধু উচ্চারন করলাম, "বাবা দেশের বাহিরে যাওয়া সম্ভব না।"
কান্না আটকাতে প্রচন্ড কষ্ট করতে হচ্ছে আমাকে। মনের প্রচন্ড ইচ্ছেকে একীভূত করে রেখেছি, তবুও আবেগ বাঁধ মানছে না।
রাতুল হেসে বললো, "আমি তো বিদেশে একবারে যাচ্ছি না। মাস্টার্স করে ফিরে আসব।"
টলমল চোখে বাবার দিকে তাকালাম। হেঁটে ফিরে যাওয়ার আগে তাকিয়ে বাবা বুঝল কেন জানি আমার চোখের ভাষা, "তোমার মাকে বুঝাব।"
ছোটবেলা প্রচন্ড খুশির মুহুর্তে লাফঝাঁপ দিতাম। কতোকিছু বলার থাকে এসব মুহুর্তে। অথচ অনন্ত নক্ষত্রবিথীর নিচে মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে নক্ষত্র দেখা ছাড়া কোনোকিছুই বলার কথা মাথায় আসছে না, কতো আশ্চর্য তাই না? আমরা যে মুহুর্তের জন্য বহুসময় যাবত অপেক্ষা করি সে মুহুর্ত যখন ধরা দেয় তখনই আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলি।
মৃদু গলার আওয়াজ শুনলাম রাতুলের, "দেশে ফিরে পার্বত্য এলাকায় চাকরির পোস্টিং নেওয়ার চেষ্টা করব যেন স্বচ্ছ আকাশের নিচে ঝরণা দেখতে পারি দুজনে।"
অবশেষে সে রাতে দ্বিতীয়বারের মতো চমকালাম আমি।
-একপশলা ইচ্ছেবৃষ্টি
-মেহনাজ নওমী