18/08/2026
২০২৪ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে সরকারি চাকরিতে অনুমোদিত পদ আছে ১৯ লাখ ১৯ হাজার ১১১টি।
এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন। অর্থাৎ বিশাল এই জনসংখ্যার রাষ্ট্রে সরকারি চাকরিজীবী ১৫ লাখেরও কম। দেশে জনসংখ্যা আসলে কত সেই তথ্য একেক সংস্থার জরিপে একেক রকম।
তবে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের সময় জানা যায় দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ। অতএব এর বাইরে আরো তো ২৫-৩০% বা তারও বেশি আছে যাদের ভোটার হওয়ার বয়স হয়নি৷
মূল আলোচনায় আসি। দেশের ২০ কোটি বা তারও বেশি জনসংখ্যার মাত্র ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী। অথচ দেখেন দেশের সকল অনিয়ম, সকল অপরাধ, সকল দুর্নীতির দায় দেওয়া হচ্ছে এই ১৫ লাখের উপরে। এটা তো অবশ্যই সত্য যে সরকারি চাকরিজীবীরা সাধারণ মানুষকে ঠিকঠাক সেবা দেন না, হয়রানি করেন। কিন্তু দেশের সকল অনিয়ম, সকল দুর্নীতির দায়ই কী সরকারি চাকরিজীবীদের?
এই যে ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী আছেন এর মধ্যে মিনিমাম ৫০-৬০% এর কোনো দুর্নীতি করার সুযোগই নাই। যদি আর্থিক দুর্নীতির কথা চিন্তা করেন আর কী। একজন আর্মি, বিজিবির সাধারণ সদস্য কী দুর্নীতি করবে? এরকম অনেক সরকারি চাকরিজীবী আছে, যাদের দু্র্নীতি করার সুযোগই নাই। অর্থাৎ দুর্নীতিবাজ সরকারি চাকরিজীবী ২-৩ লাখের বেশি হবে না। তাদের কেউ নিজের লোভ থেকে দুর্নীতি করছেন, আর কেউ কেউ সিস্টেমের কারণে, কম বেতনের কারণে সৎ থাকতে পারছেন না।
বিপরীতে দেখেন বৃষ্টি নামলে ৯৯% রিক্সাওয়ালা, সিএনজিওয়ালা ভাড়া বেশি নেয়। আমার এলাকায় যেদিন কলেজে পরীক্ষা থাকে সেদিন সিএনজি ভাড়া ডাবল হয়ে যায়। অথচ সেদিন তারা নরমালিই বেশি আয় করতে পারে। আবার তারা সন্ধ্যা হলেই ভাড়া বেশি নেয়। অথচ তারা এটাকে দু্র্নীতি মনে করেন না। মনে করেন এটা তারা নিতেই পারেন।
আবার দেখেন বর্ষা আসলেই কাঁচা মরিচের দাম হয় ২০০-৩০০ টাকা কেজি। বলা হয় কাঁচা মরিচ পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ভারত থেকে আমদানি করা হবে এই ঘোষণা দিলেই দাম অর্ধেক হয়ে যায়।
এইমাত্র কয়েকটা উদাহরণ এরকম আরো হাজারো উদাহরণ আছে ভাড়া বৃদ্ধি, মূল্য বৃদ্ধি সিন্ডিকেট ইত্যাদি ইত্যাদি
এই যে ছোট ছোট অপরাধ, ছোট ছোট দুর্নীতি অনিয়ম এসব নিয়ে তেমন কথা হয় না। অথচ কালেক্টিভভাবে রিক্সাওয়ালারা এক বৃষ্টিতে কত টাকা পকেটে ভরলো এটা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নাই। কারণ তারা গরিব। এই যে ছোট ছোট দুর্নীতিকে অগ্রাহ্য করা হয়, এসবই সমাজে ধীরে ধীরে দুর্নীতিকে সহনশীল করে তোলে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে আমাদের সমাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে যতই কথা বলুক, সে নিজে দুর্নীতিকে ঔন করে, দুর্নীতিকে উৎসাহ দেয়। সমাজের সবচেয়ে টাকাওয়ালা লোকটা সমাজে সবচেয়ে গুরুত্ব পায়, এখন তার টাকা বৈধ না অবৈধ, সেটা কোনো বিষয় না। আবার ধরেন যে সে সরকারি চাকরিজীবীদের ঘৃণা করে কিন্তু আবার ঘুষ দিয়ে নিজের সন্তানকে চাকরি দেওয়ার জন্য জমি বিক্রি করতেও রাজি। আপনি আগে এসবকে রিজেক্ট করেন। তাহলে না দুর্নীতি কমবে।
আবার ধরেন কথায় কথায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়ে খোটা দিয়ে বলা হয় আমাদের ট্যাক্সের টাকায় আপনাদের বেতন হয়। অথচ দেশের সিংহভাগ লোক ইনকাম ট্যাক্স দেয় না। রাস্তার ফুটপাতে যে পণ্য বিক্রি করে তার ইনকাম ট্যাক্সের আওতায় আসার পরও যুগ যুগ ধরে তারা ট্যাক্স দেন না। সরকারি চাকরিজীবীদের কিন্তু ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নাই। অথচ যে লোকটা ট্যাক্স দিচ্ছে না বছরের পর বছর ধরে সেই লোকটা ট্যাক্স দেওয়া সরকারি চাকরিজীবীকে গালি দেয়।
সরকার পে-স্কেল দিতে যাচ্ছে। এ নিয়ে সমালোচনার অভাব নাই। ১০ বছর আগে ৪০০ টাকায় দিনমজুরের কাজ করা লোকটা আজ ৭০০-৮০০ টাকা পাচ্ছে। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী নামক গোলামদের ১০ বছর আগের বেতনেই চাকরি করতে হবে। এবং শুনতে হবে না পোষালে চাকরি ছেড়ে দেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতি বিদ্বেষ মূলত দুই কারণে। প্রথমত, ঠিকঠাক সেবা না দেওয়ার কারণে। এবং এটা যৌক্তিক।
দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে নিজে সরকারি চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে। এর বাইরে আর কোনো কারণ নাই। দেশের সিস্টেম খারাপ শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের না। তারা সংখ্যায় মাত্র ১৫ লাখ। বাকিদের নিয়ে যে সমাজ সেই সমাজও চরম দুর্নীতিগ্রস্থ বলেই দেশে কোনো পরিবর্তন নাই।
এজন্য আমি একটা কথা ঔন করি এবং ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার লেখালেখি করেছি আমরা কয়েক কোটি সাধারণ মানুষ যদি নিয়ম মেনে সরকারের সেবা গ্রহণ করি করতে চাই তাহলে দু-র্নীতি ও দু-র্নীতিবাজেরা ঘুষখোররা ঘুষ খাওয়া সুযোগ পাবে না, থাকবে না। আমরাই তো তাদেরকে ঘুষ খাওয়ার দু-র্নীতি করার সুযোগ করে দি, কিভাবে সেটা বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে অল্প সময়ে সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে, অসুদপায় অবলম্বন করে কাজ করতে গিয়ে আমরা অনিয়ম দু-র্নী-তির সাথে জড়িয়ে পড়ি। এ সুযোগটা কাজে লাগিয়ে চেয়ার চেয়ারে বসে থাকা মানুষগুলো ঘুষ খাওয়ার সুযোগ পায়।
এজন্য বলি আমাদেরকে আগে নিয়ম মেনে সঠিক উপায়ে, নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেবা গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে তাহলে পারেই পর্যায়ক্রমে অনিয়ম, দু-র্নী-তি, ঘু-ষ এ বিষয়গুলো হ্রাস পাবে।
লেখা সংগৃহীত ও সংযোজিত।