24/10/2026
#অশুদ্ধ_দরিয়া(০৪)
রাতের আঁধারে আব্বার শেষ গোসল সম্পন্ন করা হলো।
তার ছোট ছেলে মৃত্যুর সংবাদটুকুও পেলোনা। আর বড় ছেলের বউ আব্বা অসুস্থ হওয়ার পর পরই বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলো, আর বউয়ের লেজ ধরে সেও শ্বশুর বাড়িতে ছিলো। মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কোনো রকম এসে জানাজাটা ধরেছে।
আমার বয়স্ক মা একাই বাবার সবকিছু করেছে। ঘোর অসুস্থটাতেও ঔষধ কেনার জন্য তার কাছে দুটো পয়সাও ছিলোনা, যখন মৃত্যু সন্নিকটে তখন কাকা ডাক্তার ডাকতে গেছে, কিন্তু সেই ডাক্তারের কোনো কাজ আব্বা লাগায়নি, এর আগেই বিদায় নিয়ে নিয়েছেন।
এশারের নামাজের পর আব্বার জানাজা আর দাপন সম্পন্ন করা হয়। এতক্ষণ অনেক মানুষ বলাবলি করছিলো আমার ছোট ভাই আসলোনা কেন? আবার আমার শ্বশুর বাড়ি তো কাছে সেখান থেকে কেউ আসলো না কীভাবে? অন্তত মেয়ের জামাইটারতো উচিত ছিলো শ্বশুরের কবরে এক মুষ্টি মাটি দেওয়া! কীভাবে পারলো না এসে?
শেষ পর্যন্ত আমার আম্মাও বিষয়টা খেয়াল করলো, কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে গেছে তার, লাল টকটকে গোলার মতো চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
' সোহানা তোর জামাই খবর পায় নাই? তোর বাপের জানাজায় আইলোনা কি কইরা?
আমি অসহায় গলায় বললাম,
' আম্মা কেডা খবর দিবো তারে?
' তাইলে তুই আইলি কেমন কইরা?
' আমি এমনি আইছি আম্মা।
' এমনি এমনি তো তুই আওনের বেডি না, হাছা কইরা ক কি হয়ছে?
আম্মাকে থামাতে জোর গলায় বললাম,
' এতো জেরা কইরোনা তো। অইবো আবার কি? উডো কাকী ডাকতাছে খাইতে।
' তুই খা গিয়া। আমি খামুনা। কার লাইগা খামু আমি? কি নিয়া বাঁচমু আর? যার লাইগা বাঁইচা আছিলাম হে তো আমারে রাইখা চইলাই গেলো।
বলে আবারও কান্না জুড়ে দিলো। আম্মার কাঁধে জড়িয়ে ধরে জোরপূর্বক টানতে টানতে বললাম,
' আমরার কেউ নাই আম্মা, নিজেরাই নিজেরার জানডা বাঁচাইয়া রাখন লাগবো। আইয়ো কডা খাইবা।
আম্মা আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালো,বুঝলো আমি মন শক্ত করে শোক কাটিয়ে উঠতেছি। কিন্তু সে তো জানেনা আমি কতো ঝড় বুকে নিয়ে এই বাড়ি এসেছিলাম, তার সাথে যুক্ত হয়েছে বাবা মরার শোক। মানুষ বলেনা অতি শোকে মানুষ পাথর হয়ে যায়? আমি হয়তো তা-ই। চোখে আর পানি আসছেনা, আর না আসছে বুক ফাটানো আর্তনাদ! আমারও গলায় আর জোর নেই।
আমাদের সাথে বড় ভাই আর তার বউ বাচ্চারাও কাকীদের ঘরে গেলো খেতে। কাকী পাতে খাবার বাড়তে বাড়তে ভাইকে বললো,
' রুস্তম তোর আব্বায় তোরে বড় আউস কইরা পালছে, তুই যখন হইলি তখন সংসারে খুব অভাব তাও মসজিদে ৫ কেজি জিলাপি বিলাইছে। তুই হওনের আগে তোর মা'র দুইটা বাচ্চা হইয়া মরছে। তাই তোরে যে কি আদরডা করতো! তুই কেমনে তোর বাপটার অসুখের সময় এমন পলাইয়া গেলি বাপ?
আমার ভাবী পাশ থেকে বললো,
' দুইডা খাওয়াইবেন বইলা কি কথা শুনাইয়া উসুল তুলতাছেন?
কাকী জিব্বায় কামড় দিয়ে বললো,
' সুজনের মা কথাডা কইলা কি? কিসের উসুল তুলমু? অসুখে-বিসুখে পোলাপান বাপ-মার কাছে না থাকলে কেডা থাকবো? আর আমি কথাগুলা কইতাছি রুস্তমরে, তুমি ফাঁকেত্তে কি কও এইগুলা? ভাবী দেখছেন আপনার পোলার বউ কথাডা কি কইলো?
আম্মা চুপ করে রইলো।
আমার ভাই বললো,
' হাছাই তো কইছে। আমি কি জানতাম আব্বা মইরা যাইবো? আব্বার তো আরেক পোলাও আছে, হেরে তো কেউ কিছু কন না। টাকাপয়সা বেশি কামায় দেইক্কা?
কাকী কিছু বলতেই যাচ্ছিলো।
আম্মা কাকীর হাতটা চেপে ধরে বললো,
' থামো জামিলার মা। আর কিছু কইয়োনা।
কাকী থেমে গেলো। আমার ভাবীর খাওয়া বন্ধ হয়নি, সে খাচ্ছে, বাচ্চাকেও খাওয়াচ্ছে। আমিও অল্প খেলাম। কাকী আম্মাকে জোরাজোরি মরে কয়েক লোকমা খাওয়ালো।
রাতে আম্মার সাথে ঘুমালাম। আম্মা সারারাত ঘুমায়নি, আমার মাথায় হাত বুলাইছে আর একটু পর পর নাক ঝাড়ছে, আম্মার কান্না বন্ধ হয়নি। কাঁদবেইনা কেন? আম্মার সুখে দুঃখের একমাত্র সঙ্গীই ছিলো আব্বা, কোনোদিন তারা দুজন দুজনকে ছেড়ে একা থাকেনি।
আর আমি আব্বার সবচেয়ে ভালোবাসার ছিলাম, বিয়ে হওয়ার আগে আব্বার কাপড়চোপড় ধোয়া,খাবার দেওয়া,শরীরে তেল দিয়ে দেওয়া,নখ কেটে দেওয়া সবই করতাম। কিন্তু বিয়ের তিন বছরে আব্বার সাথে তিনটা দিনও থাকতে পারিনি।
আমার ছোট ভাইয়ের জন্মের প্রায় ৭ বছর পর আমার জন্ম হয়েছে। দুই ছেলের পর একটা মেয়ের খুব আকাঙ্খা ছিলো তাদের। বড্ড আদরের ছিলাম আমি। যতদিন আব্বা কামাই করতো ততদিন আমি রাজকন্যার মতোই ছিলাম। আব্বা স্ট্রোক করে ঘরে পড়ে যাওয়ার পরই সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো। আব্বার তিলে তিলে গড়া সারের দোকানটা বড় ভাই দখলে নিলো।
যখন জামানের সাথে আমার বিয়ের আলাপ আলোচনা চলে, তখন তারা অনেককিছু দিয়ে দেওয়ার আবদার করে আর অনেক লোক খাওয়ানোর কথা বলে। আব্বার দুই ছেলেই এর ঘোর বিরোধী ছিলো, তারা বললো এতকিছু তারা করতে পারবেনা।
অন্যদিকে আব্বাও এতো ভালো সমন্ধ হাতছাড়া করতে চাইলোনা। পাত্র বাড়ির একমাত্র ছেলে, বাড়িতে আবার বিল্ডিং থাকে আবার বিদেশ!
তাই আমার ভাইয়েরা আমার বিয়ের খরচ বহন করতে অস্বীকার করলে আব্বা তাদের উপর রাগ করে একমাত্র ফসলি জমিটাও বিক্রি করে দেয়। এরপর থেকে ভাইদের ক্ষোভ আমার উপর । আমি নাকি আমার পাওনার চাইতে বেশি নিয়ে গেছি, কেননা ওটা ছাড়া আমাদের কেবল ভিটাবাড়িটাই আছে। তাই আমাকে আর তেমন সহ্য করতে পারেনা। বিয়ের পর ভাইরা আমাকে এক নজর দেখতেও আমার শ্বশুর বাড়ি যায়নি। এই নিয়ে প্রথম প্রথম আমার শাশুড়ী বহু কথা শুনিয়েছে, ধীরে ধীরে বুঝেছে আমি দূর্বল, আমার পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। এরপর থেকে তার আচরণ ক্রমশই খারাপ হচ্ছিলো। কোনোদিন তার খারাপ আচরণের জন্য আমার বাবার বাড়ির লোকেরা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি,তাই তার কলিজা ছিলো প্রশস্ত।
'
পরেরদিন সন্ধ্যার আগ মূহুর্তে আমাদের বাড়িতে জামান এলো। এসেই আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করতে লাগলো। আমার ভাতিজা জামানকে দেখে বললো,
' ফুফু দাদির লগে ওই ঘরে।
আমাদের আধভাঙ্গা টিনের ঘরটা দেখিয়ে দিলো, যেটার একদিকে গরু থাকে, আরেকদিকে একটা বিছানা রাখা। আব্বা মারা যাওয়ায় আম্মা ৪০ দিন একাকী ওখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জামান দরজার বাইরে থেকে ডাকলো,
' সোহানা বাইর হও।
আমি মাথায় কাপড় দিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। আমাকে দেখে বললো,
' তোমার আব্বা মারা গেছে একবারও কইলা না ক্যান?
' ক্যান হাট বাজারে যান না?
' না যাই নাই।
' তাইলে শুনবেন কেমন কইরা? সারা বাজারের ব্যবসায়ীরাও তো জানাজায় আইছে, সবার মুখে মুখে খবর ছড়াইছে আপনেই শুনেন নাই খালি? আপনার আম্মা আমার আব্বার শইল খারাপের কথা শুইনাও আমারে জানায় নাই। আমারে দেখনের তৃষ্ণা নিয়া আব্বা দুনিয়া ছাইড়া গেছে। আর আপনাদের জানাইয়া কি হইবো? আমি তো নাইওর আসি নাই, আমি আমার সংসার ছাইড়া আইছি।
' সংসার ছাড়নের কথা কইবানা সোহানা।
আম্মা দরজার ফাঁক দিয়ে হাঁক ছেড়ে বললো,
' বাজান সংসার ছাড়নের কথা কইতাছো ক্যান তোমরা? কি হইছে?
আমার হুঁশ এলো, আম্মা সবকিছু শুনতে পাচ্ছে। আমি জামানকে থামানোর আগেই জামান বললো,
' আমি কিছু এমন কিছু কই নাই আম্মা,সোহানা রাগ কইরা চইলা আইছে।
আম্মা ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো,
' কি অলক্ষী কাজকারবার। সোহানা তুই ক্যান চইলা আইলি? আইছস আইছস এখন জামাই যা কইবো তাই করবি। বাজান, আমার মাইয়াডা অবুঝ, ওর বাপের বড় আদরের আছিলো তো তাই ধৈর্য্যশক্তি কম। একটু বুঝায়া বাজায়া রাইখো , এতিম হইয়া গেলো মাইয়াডা আমার!
মা'র কথা শুনে আমার চোখ ছলছল করে উঠলো, আমার নাকি ধৈর্য্যশক্তি কম!
জামান ইতস্তত হয়ে বললো,
' আসলে আম্মা আমার দ্বিতীয় বিয়াডা মনে হয় সোহানা মাইনা নিতে পারে নাই, তাই রাগ করছে। আমি কথা দিতাছি, দুজনরে এক রকম কইরা রাখনের চেষ্টা করুম।
আম্মা ভেতর থেকে কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর হঠাৎ টিনের উপর হাত দিয়ে জোরে আওয়াজ করে বললো,
' কই কইলা? তুমি আরেকটা বিয়া করছো?
জামান থতমত খেয়ে বললো,
' সোহানা বলে নাই?
আম্মা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
' বললে কি তোমারে আমি বাপসোনা ডাকি? কেমনে আরেকটা বিয়া করলা? যাও আমার মাইয়া আমি দিমুনা।
' আম্মা এমন করবেন না। এখন থেইকা সব ভালাই হইবো।
' আমার বুঝা শেষ আমার মাইয়া কেমন ভালা আছে। আমার ফুলের মতো মাইয়াটা কতো কিছু লুকাইতে শিইখা গেলো হ্যাঁ? হের জামাই আরেক বেডি লইয়া আইছে আমারে একটাবার কইলোনা! আরো জানি কতো অশান্তি ভোগ করছে আল্লাহ জানে। তুমি চইলা যাও, সতীনের ঘর করতে দিমুনা আমি।
গরু নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমার ভাবী আম্মার কথা শুনে ফেললো, ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বললো,
' আরে কি কয় কয়, সোহানার জামাই আরেক বিয়া কইরা লাইছে?
আম্মা বললো,
' আস্তে চিল্লাও সুজনের মা, আমাদের মইধ্যে কথা কইবানা।
আরো বেশি চিল্লাতে চিল্লাতে এগিয়ে এসে বললো,
' কথা কমুনা ক্যান? মাইয়ারে সংসার ছাড়াইয়া আইনা বাড়িত তুলবেন, পালবো কেডা? এরপর আবার বিয়া দিবেন না? বাবাবাবাবা আমাদের নিঃস্ব কইরা আফসোস মিটে নাই? আপনার জামাই ফসলি জমি বেচছে আপনে কি ভিটাবাড়ি বেইচা দিবেন এইবার?
' সুজনের মা এইখান থেইকা যাও দোহাই লাগে। তোমরার এক টাকাও খরচা করমুনা, আমার মাইয়ারে লাগলে ভিক্ষা কইরা পালমু।
ভাবী মুখ ভেংচিয়ে চলে যেতে যেতে বললো,
' লাগলে তাই কইরেন, আর পারুম না। আপনারারে পালতে পালতে শইলের ছাল-বাকলা উইঠা গেছে।
আম্মা কাঁদতে কাঁদতে বললো,
' তুমি দাঁড়ায়া না থাইকা যাও জামান, বাড়িত গিয়া নতুন বউ লইয়া সুখে থাকো।
জামান গেলোনা। আমি ভেতরে চলে গেলাম। জামান কম্পিত গলায় বললো,
' সোহানা তোমারে ছাড়া একদিনেই বাড়িঘর আউলাঝাউলা হইয়া গেছে,বাড়িতে আজকা রান্ধাও হয় নাই। অনুরোধ লাগে আমার লগে আইয়ো।
আম্মার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
' দেখছো আম্মা? আমারে এমনে এমনে নিতে আইয়ে নাই, তার বাড়ির কাম করনের লাইগা আইছে। কাম ছাড়া ওই বাড়িত আমার কোনো দরকার নাই আম্মা। তুমি কও আমি কি দুইবেলা ভাতের লাইগা উষ্ঠালাত্তি খাইয়া সারাজীবন ওই বাড়িত কাম কইরা যামু?
আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
' কান্দিস না মা, এতদিন আমারে কস নাই ক্যান এতো অশান্তির কথা? কেমনে হজম করলি? আয় বস, আমারে সব ক, সব ক আমারে।
জামানের চলে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম, গটগট করে চলে যাচ্ছে।
পরক্ষণেই আমার ভাবীর গলার আওয়াজ ভেসে এলো, ডেকে বলতেছে,
' বউ যায়না? তারার দেমাক দেখলে শইল জ্বলে, সতীনের ঘর করলে সমস্যা কই? শুনেন ভাই, বউ থুইয়া যাইয়েন না, আপনার শাশুড়ী এমন ফুসলাইবো আর বউ ফিরা পাইবেন না।
আমি আম্মার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে জোরে বললাম,
' ভাবী সমস্যা না থাকলে আপনার জামাইরেও আরেকটা বিয়া করাইয়েন। আপনার আম্মা তো ভালা মানুষ, আপনারে ফুসলাইবোনা।
চলবে.......
লেখাঃ #তাজরীন_খন্দকার