24/06/2025
১৩ তারিখ ইজরায়েল ইরান আক্রমণ করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সরকার পরিবর্তন - এমন সরকার যারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর মতো পশ্চিমের তাঁবেদারি করবে, সামরিক শক্তি বাড়ানো অপ্রয়োজনীয় মনে করবে, তলে তলে বা প্রকাশ্যে ইজরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব করবে, প্যালেস্টানিদের ঘৃণা করবে, নাইট ক্লাব হবে, মেয়েরা নাচবে, মদ জুয়া চলবে, আর ইজরায়েলকে বলবে বুকে আসো তোমরা আমাদের ইব্রাহামিক ভাই। এই লক্ষ্য পূরণে তারা কয়েকটা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলো।
১। ইরান যখন আক্রমণ আশা করছে না তখন আক্রমণ করা, মানে আমরা যাকে surprise attack করা বলি। মনে রাখতে হবে এই সময় ইরান আর আমেরিকার মধ্যে আলোচনা চলছিল, আলোচনায় ইরান অনেক নমনীয় হয়েছিল, একটা চুক্তি হয়ে যাবে এমন ধারণা করা হচ্ছিল, পরবর্তী বৈঠকের তারিখ ছিল দুদিন পর। ১৫ তারিখের আগে ইজরায়েল আক্রমণ করবে ইরান ভাবেনি, তাই তাদের সতর্কতা কম ছিল।
২। প্রথম রাতেই ইরানের টপ জেনারেলদের এবং টপ পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করা।
৩। প্রথম রাতেই ইরানের এয়ার ডিফেন্স ধ্বংস করে দেয়া যাতে করে আরও কয়েকদিন ধরে বিনা বাধায় বিমান দিয়ে আক্রমণ চালানো যায়।
৪। পরবর্তী কয়েকদিন গাড়ি-বোমা, হত্যা এবং অন্যান্য নাশকতা চালানো।
এভাবে ভয় ও অরাজকতার পরিবেশ সৃষ্টি করে সরকারকে অকেজো করে দেয়া এবং দেশের ভেতরে বা বাইরে আগে থেকে ঠিক করে রাখা কাউকে ক্ষমতায় বসানো।
ইজরায়েল কৌশলগত সফলতা লাভ করলেও মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। ইরানের সরকার টিকে যায়, এয়ার ডিফেন্সের একটা বড় অংশ ইরান আবার চালু করতে সক্ষম হয় এবং মোসাদের ভাড়া করা অধিকাংশ মানুষকে পাকড়াও করা হয়। এই সময় ইরানের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে বিভক্ত ইরান ইজরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়।
ইরান প্রতি-আক্রমণ শুরু করে। ইরান যেহেতু যুদ্ধ শুরু করেনি তাই তাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন।
১। আত্মরক্ষা – দেশ ও সরকার রক্ষা। এটাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
২। শক্তি প্রদর্শন।
৩। ইজরায়েলের এমন ক্ষতি করা যে তারা আবার আক্রমণ করতে ভয় পায় ( to establish deterrence)।
প্রতি-আক্রমণের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ইরান সবগুলো লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়। এরপর ইরানের আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
অন্যদিকে প্রথম ৪৮ ঘণ্টার পর ইজরায়েলের দিক থেকে যুদ্ধ থামানোর ইঙ্গিত আসতে থাকে। আমেরিকার সংবাদপত্রে এমন হিসাব দেয়া হয় যে ইজরায়েল আর ১০/১২ দিন মিসাইল আক্রমণ মোটামুটি ঠেকাতে পারবে।
তবে কি ইজরায়েল ইরানের শক্তিকে ছোট করে দেখেছিল? আমার মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর দুটো। ক) ইজরায়েল ভেবেছিল সরকার পতন হবে, ইরানের মিসাইলের সম্মুখীন তাদের হতে হবে না। খ) মিসাইল আসলেও তারা তা রুখতে পারবে।
ইরান যুদ্ধ আরও কিছুদিন না চালিয়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হল কেন? আমার মনে হয় উত্তর দুটো। ক) আরও কয়েকদিন যুদ্ধ চালিয়ে তাদের আর পাওয়ার কিছু ছিল না, তারা ইজরায়েলের প্রচুর ক্ষতি করেছে যা নজিরবিহীন। খ) যুদ্ধে নিজেদেরও ক্ষতি হচ্ছিল। তেমন কোন লাভ না পেয়ে ক্ষতি মেনে নেয়া দীর্ঘস্থায়ী কোন লক্ষ্য পূরণ করবে না।
সব মিলিয়ে এই কথা বলা ভুল হবে না যে ইরান তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ইজরায়েল কৌশলগত কিছু বিজয় অর্জন করলেও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধে তাই ইরানকেই বিজয়ী বলতে হবে।
এরপর কী হবে?
দুই পক্ষই নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। ইরানের জন্য এই কাজ তেমন কঠিন নয়। তারা তদের আসল ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে, তাই বোমা বানানোর সরঞ্জাম তাদের হাতে এখনো আছে। ইরানকে অবশ্য এয়ার ডিফেন্স উন্নত করতে হবে।
ইজরায়েলের কিছু ক্ষতি অবশ্য অপূরণীয়। যেমন তাদের একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার এবং জীবাণু গবেষণাগার পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তাদের আরও অনেক ক্ষতি হয়েছে যা এখনো জানা যায়নি। এছাড়াও তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি মনস্তাত্ত্বিক – তারা অপরাজেয় এই ইমেজ ধ্বংস হয়ে গেছে, শিশু এবং মেয়েদের সাথে যুদ্ধে বিজয় অর্জন করলেও আসল যুদ্ধে তারা ভয় পায় এই ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইজরায়েল অবশ্য চেষ্টা করে যাবে ইরানের ভেতরে হত্যাকাণ্ড এবং অন্যান্য নাশকতা চালিয়ে যাওয়ার।
এখন দেখার বিষয়, যুদ্ধবিরতি কয়দিন টেকে।
নেট থেকে নেয়া ছবি।