18/10/2024
বৃদ্ধ লোকটি বারান্দার চেয়ারে বসে আছেন। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, চুলগুলোও প্রায় পুরো সাদা। দুচোখে চশমা, যেটা নাকে বারবার পিছলে পড়ছে। একসময় ছিলেন তিনি গ্রামের সেরা মানুষ। সবাই সম্মান করত, ডাকত ‘বাহাদুর মিয়া’ বলে। শক্তি, সাহস, কথা বলার ধরণ—সবকিছুতেই ছিলেন একজন প্রভাবশালী। কিন্তু আজ সময় বদলেছে, বয়সের ভারে সবকিছু যেন ভেঙে পড়েছে।
সেদিনও সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হয়েছিলেন, কিন্তু পা টেনে টেনে চলতে হচ্ছিল। আগে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাঠে দাপিয়ে বেড়াতেন, সেখানে এখন দশ পা হাঁটতেই ক্লান্ত হয়ে যান। হাঁটার সময় ছেলেরা হাসি মুখে বলল, "কিরে মিয়া, এখন তো আর আগের মতো বাহাদুরী নেই!" তিনি মৃদু হাসলেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা বেদনা অনুভব করলেন।
রাতের খাবারে আজও তেমন খেতে পারেননি। পেটের সমস্যা যেন প্রতিদিনের সঙ্গী। আগে তিনি গ্রামের যেকোনো উৎসবে যতই খাওয়া হোক, কিছুই হতো না। এখন সামান্য বেশি খেলেই হজমের কষ্ট। স্ত্রী তাকে বলল, "তুমি আগের মতো খেতে পারবে না। বয়স হয়েছে তো।" তিনি মাথা নেড়ে বললেন, "হ্যাঁ, ঠিক বলেছো।"
তাঁর ঘরে একটা পুরোনো আয়না রয়েছে। আজ রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখলেন। দাঁতগুলো নড়ে গেছে, মুখে বলিরেখা পড়েছে, চোখের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। মনে পড়ে গেল, আগে কত মানুষ তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াতো। এখন সবাই তাকে ‘মুরব্বি’ বলে ডাকে, কিন্তু সেই পুরোনো সম্মান আর নেই।
কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখানে সবাই হেসে-খেলে আনন্দ করছে, কিন্তু তাঁর আর মন চাইলো না। মনে হলো, এই সব কিছু তার জন্য নয়। আগে এসব রঙতামাশায় কত আনন্দ পেতেন, এখন সেগুলো তাকে ক্লান্ত করে দেয়। কথাও বলতে ভুল হয়ে যায়, মাঝে মাঝে থেমে যান—মনে হয়, সবকিছুতেই তিনি পিছিয়ে যাচ্ছেন।
ছেলে-মেয়েরা এখন নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু সেই আগের মতো পাশে থাকে না। রাতের বেলায় শুয়ে শুয়ে তিনি ভাবেন, এই জীবন কি সত্যিই ব্যর্থ হলো? এত কিছু করলেন, কিন্তু এখন যেন কিছুই করতে পারেন না। এই বয়সের ক্লান্তি, অবশ শরীর, ম্লান চোখ—সবকিছু মিলে তিনি এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেন।
বারান্দার ঠাণ্ডা হাওয়া এসে মুখে লাগে। তিনি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করেন। পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো একে একে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একসময় যে মানুষটা ছিলেন সবার কাছে ‘বাহাদুর মিয়া’, আজ তিনিই যেন সময়ের সামনে হার মানছেন। তবু ভেতরে ভেতরে একটা শান্তি অনুভব করেন—জীবনের এই ধীরগতিরও একটা আলাদা মাধুর্য আছে, একটা আলাদা শিক্ষা।
তিনি ধীরে ধীরে শুয়ে পড়েন। মন থেকে সব অস্থিরতা দূর হয়। সময় বদলেছে, জীবনও বদলেছে, কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে। সেগুলোর সাথে তিনি শেষের দিনগুলো কাটিয়ে দেবেন, এই ভাবনাতেই তিনি শান্তিতে চোখ বন্ধ করেন।