23/10/2024
বদমেজাজি ভালোবাসা
পর্ব ৭
মাঝরাতে হুট করে স্নিগ্ধর ঘুম ভেঙে গেল, অন্ধকারে সে তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছিল না তার খুব পিপাসা পাচ্ছিল, সাইট টেবিলে পানি খুঁজতে গিয়ে সে দেখলো যে তার ডান হাত ধরে পাশে কেউ একজন ঘুমিয়ে আছে প্রথমে সে ভাবলো হয়তো মামি , বাম পাশের সাইট টেবিলে ছোট ল্যাম্ব জ্বালাতে দেখতে অনেক অবাক হয়ে গেলো সে দেখলো মাটি তার হাত ধরে তার পাশে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে ।
রাতে মাটিকে জড়িয়ে ধরে বলা প্রত্যেকটা কথাই স্নিগ্ধ স্পষ্ট মনে ছিল সে কখনো ভাবতেও পারিনি যে সে তার দুর্বলতা কখনো কোন মেয়েকে দেখাবে , সে একটি আতঙ্কিত হল আর ভাবতে লাগলো মাটি যদি তার এই দুর্বলতার কথা কাউকে বলে দেয় সে যদি তাকে নিয়ে মজা করে কারণ কোন মেয়েকে সে পছন্দ করতে পারে না বা কোন মেয়ের প্রতি সে বিশ্বাস আনতে পারে না, সেটা ডান হাতটা মাটির হাত থেকে ছাড়াতে গেলে মাটি জেগে যায় আর দিকে তাকিয়ে বলে
: উঠে গেছেন আপনি কিছু লাগবে আপনার
হালকা কন্ঠে বলে কথা যেন দেখতে হৃদয় ছুঁয়ে গেল , কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকায় থাকলো সে , কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে স্নিগ্ধ বাস্তবতাতে ফিরে এলো আর মাটিকে জিজ্ঞাসা করল
: তুমি এখানে কি করছ
উত্তরে মাটি বলল
: কালকে রাতে আপনার ভাই আপনার সাথে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে পরে অনেক বৃষ্টি থাকার কারণে আপনার মামী আমাকে আর বাসায় ফিরতে দেয়নি রাতে আপনার মামীর আমকে কিছুক্ষণ এখানে আপনার দেখাশোনা করতে বলে তো আমি হয়তো তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
: এগুলো করার কোনো দরকার ছিল না আমি তোমাকে কালকে রাতেই বলেছিলাম যে আমাকে একা ছেড়ে দাও।
মাটি চোখ নামিয়ে ফেললো , সে কোনো কথাই বললো না , তাই আবার স্নিগ্ধ বলল
: অনেক মজা পেয়েছো তাই না কালকে আমি তোমাকে আমার দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়েছি তুমি হয়তো এখন ওগুলোই মানুষের কাছে বলবে আমার মজা নিবে।
তারই কথা শুনে মাটি চোখ কপালে তুলে আর বিছড়ি একটা নজরে স্নিগ্ধ দিকে তাকালো আর বলল
: ছি! আপনি কি সব মেয়েদের একই মনে করেন নাকি আপনি এটা কিভাবে ভাবতে পারলেন যে আমি আপনার দুর্বলতা নিয়ে আপনার সাথে মজা করবো, আসলে আপনি কিছুই বুঝেন না তাই না আপনি আমাকে আপনার কষ্টের কথা বলেছেন আর এখন আপনি এটা ভাবছেন যে আমি ওগুলো মানুষকে বলে বা ওগুলো নিয়ে আপনার মজা নেব।
মাটি এক দৃষ্টিতে স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে থাকবে আর বলে
: আমার ভাবতেও ঘেন্না লাগতেছে যে আপনার মত একটা মানুষের সাহায্য করেছি আমার তো উচিত ছিল আপনাকে ওভাবে ফেলে রেখে চলে আসা।
স্নিগ্ধ তখন বলে
: দেখ মাটি
মাটি সাথে সাথে তার হাত তুলে স্নিগ্ধকে চুপ করিয়ে বলে ,
: আমার কথা এখনো শেষ হয় নি , আগে আমার কথা শুনেন, আমি জানি কিছু মেয়েদের কারণে আপনার অতীত ভালো যায়নি , কিন্তু আমার মা-বাবা কখনো আমাকে মানুষের সাথে অমানবিক হতে শিখায়নি সেজন্য আমি আপনাকে বৃষ্টির মাঝে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে আসেনি। কালকে আপনি যে কষ্ট পেয়েছেন আমার জন্য পেয়েছিলেন আমি না জেনে আপনার উপর প্রশ্ন করেছিলাম , সেটার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছিলাম আর সেই সময় আপনি হয়তো আবেগের বসে আমাকে না বলতে চওয়া অনেক কথাই বলে ফেলেছিলেন। আর সেই কথা গুলো আমার মাঝেই থাকবে। আপনাকে নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, আপনার সাথে আমার কোন রকমের সম্পর্ক নেই না বন্ধুত্বের না অন্য কিছু সেজন্য আপনাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করার প্রশ্ন ওঠেনা। আমি এমনি চলে যেতাম আপনার মামী আমাকে থাকতে বলেছে আর বৃষ্টি অনেক ছিল দেখি আমি যেতে পারিনি। কাল সকালেই চলে যাব। আপনি আমার মুখ দেখবেন না বলেছিলেন এখন থেকে আমিই আপনাকে আর নিজের মুখ কখনো দেখবো আর এমনকি আপনার মুখ ও কোনোদিনও দেখবো না।
এই কথা বলে স্নিগ্ধকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মাটি ঘর থেকে বের হয়ে যায়,
কিছুক্ষণ পর ঘরের মধ্যে আকাশ আসে আর স্নিগ্ধকে দেখে বলে
: তুই কি আসলেই মানুষ? এইভাবে একটা মেয়ের সাথে কথা বলবি তুই।
স্নিগ্ধ চোখ তুলে বলে
: তুই দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিলি।
: না আমি তোকে দেখতে এসেছিলাম কারণ মা তো কখনোই ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে আর মাটির ঘরের দরজা খোলা তিনি তার ঘরে ছিল না তাই ভাবলাম হয়তো তিনি তোর দেখাশোনা করতেছে তাই আমি দেখতে এসেছিলাম।
: আকাশ আমার এখন কোনো কথা বলার ইচ্ছা নাই
:কিন্তু তোকে আমাকে কথা শুনতে হবে , তোর ঘরে এসে যেটা দেখলাম , এইভাবে উপকারের প্রতিফল দিলো তুই, আমি মানছি ওই মেয়েটাও তোকে আপমান করছে কষ্ট দিছে কিন্তু তুইও তো ঠিক ঐটাই করছিস তুই ওর হাতে গরম কফি ফেলে দিছিলি
: তুই কিভাবে জানলি একটা
: তুই কখন কি করিস সব খবরই আমার কাছে চলে আসে বড় ভাই আমি তোর।
: ওই একটা মেয়ের পক্ষ নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করতেছিস আকাশ।
: আমি ঝগড়া করতেছি না তোর সাথে, তোকে বাস্তবতা বলতেছি, ওই মেয়ে টা পারলে তোকে ওই ভাবে রাস্তায় ফেলে আসতে পারতো। ছিল তুই জানিস তুই ওকে জড়িয়ে ধরেছিলি ছাড়িস নাই আমি এত চেষ্টা করছি তারপরও তোকে ওর থেকে আলাদা করতে পারেনি,
তুই কি জানিস কিসের জন্য তোর পাশে তোর হাত ধরে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল কারন তুই তার ধরেছিল, আর সেটা এত শক্ত করে ধরেছিল সে ছড়াতে পারেনি বেশি জোর দিলে যদি তোর ঘুম ভেঙ্গে যায় সেজন্য সে তোর পাশেই বসে ছিল , ও তোর সাথে সব ঝগড়া ভুলে গিয়ে তোর দেখাশোনা করতে ছিল রাস্তায় তোকে ফেলে রেখে যায়নি এমনকি তোকে নিয়ে বাড়ি পর্যন্ত আসছে আর সেই মেয়েটার সাথে এরকম করলি তাকে এরকম একটা কথা বলেছিলি যে সে তোকে নিয়ে মজা নেবে আসলে স্নিগ্ধ! আমার আসলে আজকে অনেক আশ্চর্য লাগছে তোকে দেখে।
: আকাশ শোন
আকাশও স্নিগ্ধকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল,
স্নিগ্ধ কিছুটা গিলটি ফিল করতেছিল , তার মাটিকে এভাবে বলা একদমই ঠিক হয়নি সে তো আমার সাহায্য করছিল আর স্নিগ্ধ তার সাথে কি করলো, বিছানা থেকে নেমে স্নিগ্ধ মাটির খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়ল সে দেখল মাটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে , সে মাটির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো আর তাকে বলল
: আমার ভুল হয়ে গেছে আমার উচিত হয়নি তোমার সাথে এভাবে কথা বলার আমাকে মাফ করে দিও, তুমি আমার সাহায্য করছিলা আর আমি কিছু না জেনে তোমাকে অনেক কথা বলে ফেলেছি সরি। আমি কখনো কোন মেয়েকে সরি বলিনি তোমাকে বলছি
তার কথা শুনে মাটি বলল
: কখনো কাউকে প্রশ্ন করার আগে এটা ঠিক করে নিবেন যে প্রশ্নটা আপনি করছেন সেটা করাঠিক হবে কিনা, আমি কিছু মনে করিনি আর করবও না কারণ আপনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই আমাদের পরিচয় শুধু এতটুকুই যে আমার ছোট্ট ফুলে দোকানের সামনে যে বড় কোম্পানিটা ওইটার মালিক আপনি এটুকুই আর ওইটার খাতিরে আমি আপনাকে ফেলে রেখে যেতে পারিনি, আপনাকে ঠিকমত আপনার বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি, আমারও ভুল ছিল যে আমি শুধুমাত্র চোখে দেখে কোন কিছু বিবেচনা না করে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম ওই জন্যই তখন আপনার কাছে মাফ চেতে গিয়েছিলাম
: যেহেতু এখন তুমি সব কিছুই জানো তো তোমার কাছে আর কোন কিছু লুকানোর কোন দরকার আমার নেই আমি অনেক ছোট থেকে একা ওভাবে বড় হয়েছে, আমি একটু বদমেজাজিও,
: একটু
: ঠিক আছে ঠিক আছে অনেক বদমেজাজি রুডি যাই বলো তুমি আমাকে
: ঠিক আছে আপনি বুজতে পেরেছে এটাই অনেক।
: আমি এটাই আশা করব যে তুমি কখন আমার দুর্বলতা নিয়ে আমাকে আঘাত করবা না
: কখনোই না , আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন
: শুয়ে পড়ো কালকে সকালে আমি তোমাকে তোমার বাসায় রেখে আসবো
: আমি কালকে সকালে আগে ফুলের দোকানেই যাব তাই ওখান থেকে পরে বাসায় ফিরব
: ঠিক আছে তাহলে আমি তোমাকে ফুলের দোকানেই নিয়ে যাব আমি যখন সকালে অফিসে যাব
তাদের মাঝখানে কথা বার্তা শেষ হয়ে স্নিগ্ধ তার ঘরে চলে যায় এই মাটি গেস্টরুমে।
পরের দিন সকালে মাটি ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বাহিরে গিয়ে দেখে সবাই ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে , স্নিগ্ধর মামী মাটিকে দে দেখে তাকে ডাক দেয় , টেবিলে আকাশ স্নিগ্ধ আর তার মামা বসে আছে।
মাটি গিয়ে স্নিগ্ধর পাশে বসলো, আকাশ মাটিকে জিজ্ঞাসা করলো
: রাতে ঘুমাতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো
উত্তরে মাটি
: না সব ঠিক ছিল
স্নিগ্ধর মামী এসে সবাইকে খবর বেড়ে দেয়। খাওয়া শেষ হলে মাটি আকাশ, মামা আর মামীর কাছ থেকে বিদায় নেয়
: আসি তাহলে আন্টি , ভালো থাকবেন
উত্তরে মামী
: আবার এসো মা, আমি অপেক্ষায় থাকবো
: কখনও সুযোগ হলে অবশ্যই আসবো
এই বলে মাটি গিয়ে স্নিগ্ধর গাড়িতে বসে কিছুক্ষণ পর স্নিগ্ধ চলে আসে , মাটি চোখ ভেজা ছিল, তার আসা পানি মুছতে দেখে স্নিগ্ধ বলে ,
: কাদছো কেনো, কিছু হয়েছে ??
উত্তরে মাটি বলে
: না কিছু হয়নি , আপনার বাসায় আমার খুব ভালো লেগেছে , আপনার মামী অনেক ভালো আমার মার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল, মাকে নিয়ে বেশি স্মৃতি নেই আমার কারণ সে আর বাবা সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকত কিন্তু যতটুকু সময় আমাকে দিতো খুব আদর করত , মা আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিত বাবা গল্পঃ শুনাতো, কিন্তু একদিন সব বন্ধ হয়ে গেলো , আর তুলে খাইতে দেয় নাই না গল্পঃ শুনাতো হুট করে সব শেষ হয়ে গেলো , কালকে দিনটা আমার থেকে আমার সব কিছু কেড়ে নিছিলো , আমাকে কেউ আপন করে নেয়নি না আমার দাদা বাড়ি না আমার নানা বাড়ি। অসহায় এতিম হয়ে গেছিলাম।
স্নিগ্ধর চোখে পানি চলে আসে আর সে বলে
: আমারও
মাটি কান্না চোখে স্নিগ্ধর দিকে তাকায় , স্নিগ্ধ বলতে থাকে
: আমাদের ভাগ্য কিছুটা একরকম তাইনা বলো , তোমারও কেউ নেই আমারও কেউ নেই
মাটি বলে
: আপনার আছে , মায়ের মত মামী আছে যে আপনাকে তার চোখের মণি করে রেখেছে , বাবার মতো মামা আছে আর আকাশের মতো ভাই আর বন্ধু আছে যাকে আপনি আপনার মনের সব কথা
বলতে পারেন ,আপনি এতিম না আপনি অনেক ভাগ্যবান একজন।
: তাই !
: জি ! আচ্ছা তুমি বললা তো মেনে নিলাম
: আমি না বললে মানতেন না
: না মানতাম তো অবশ্যই আর মানিও
: আমার অতীত কতটাই খারাপ হোক না কেন এদের জন্য আপনার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ অনেক সুন্দর
: ঠিক বলেছো তুমি , চলো এইবার যাওয়া যাক , আমাদের দুজনেরই কাজ আছে।
: জি জি অবশ্যই চলেন
তার দুজন রওনা দিলো
অফিসের সামনে (পর্ব ৮)
Thank You For Reading 🩵