01/11/2024
কেমন আছেন দেশের সবুজ সোনা তৈরির কারিগরেরা ?
উস্কো খুশকো চেহারা , হাসি মাখা মুখ , শরীর ভর্তি ক্লান্তির ছায়া !
অথচ এই মানুষ গুলোই তাদের ৩ বেলার আহার জোটাতে ব্যর্থ । তাদের যেন প্রতিদিনের যুধ্ব টা ১৭০ টাকার সাথে নিজেদের জীবনের । দেশের এই অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দৈনিক ১৫০-১৭০ টাকা দিয়ে আপনি কিভাবে সংসার চালাবেন , একবার ভেবে দেখেছেন কি ?
বাংলাদেশের চা বাগানগুলো দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, এই বাগানের শ্রমিকদের জীবন যুগ যুগ ধরে কষ্ট ও বঞ্চনায় ভরা। তাদের দুর্দশা সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি ?
দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরির জন্য লড়াই করে আসছেন। অথচ বাজারের দ্রব্যমূল্যের তুলনায় তাদের আয় এতই কম যে, একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোও তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অনিশ্চিত আবহাওয়া বা বাগানের সমস্যার কারণে কাজ না পেলে তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। চা শ্রমিক দের সাথে কথা বলে জানা যায় যেদিন বন্ধ থাকে চা বাগান সেদিন তারা কিভাবে চলে !
তারা সেদিন লুকিয়ে চা পাতা কুড়িয়ে সেটি বাসায় নিয়ে ভর্তা করে ভাত দিয়ে খায় । কখনো কি ভেবে দেখেছেন যেই চা পাতা আমরা পানি দিয়ে গরম করে ছিনি ছাড়া খেতে পারি না অনেকেই সেখানে তারা সেটি ভর্তা করে ভাত দিয়ে খাচ্ছে !
বাংলাদেশে চা শিল্পের সূচনা হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা আদিবাসীদের জোর করে চা বাগানে কাজ করানো হতো। তাদের জীবন ছিল অতিশয় কঠিন। খুব কম মজুরিতে দিনরাত এক করে কাজ করতে হতো। কোনো রকম স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না।
স্বাধীনতার পরেও চা শ্রমিকদের জীবনযাপনে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। মজুরি কম, কর্মপরিবেশ খারাপ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অভাব— এই সমস্যাগুলো আজও তাদের জীবনকে জর্জরিত করে চলেছে। চা শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য বারবার আন্দোলনে নেমেছে। তবে তাদের সংগ্রামের ফল এখনও সীমিত।
২০ মে ঐতিহাসিক ‘চা-শ্রমিক হত্যা দিবস’। ব্রিটিশদের মিথ্যা প্রলোভনে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা (১৮৩৪-৩৫) চা-শ্রমিকরা ব্রিটিশ চা-বাগান মালিক কর্তৃক অত্যাচার-নিপীড়ন, অবহেলা-নির্যাতন সইতে না-পেরে ১৯২১ সালের এই দিনে নিজ মুল্লুকে (আবাসভূমিতে) ফিরে যাওয়ার জন্য ‘মুল্লুকে চলো আন্দোলন’ সংঘটিত করেছিল। যেহেতু তাদের কাছে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না, তাই হেঁটেই সিলেট থেকে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাঁট পর্যন্ত আসে। এখানে ব্রিটিশরা তাদেরকে বাধা দেয়। বাধা অতিক্রম করে চা-শ্রমিকরা মেঘনা নদী পার হয়ে নিজের মুল্লুকে যেতে চাইলে ব্রিটিশ গুর্খা বাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং হাজার হাজার চা-শ্রমিককে পেট কেটে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। চা-শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত হয় মেঘনা নদীর পানি। চা-শ্রমিকদের রক্তেমাখা এই ইতিহাসকে স্মরণ করার জন্য প্রতিবছর ২০ মে পালিত হয় ‘চা-শ্রমিক হত্যা দিবস’।
ভেবে দেখেছেন কি , আপনি বৃষ্টি মুখর দিনে বারান্দায় বসে এক কাপ চা মুখে নিয়ে শান্তির চুমুক দিচ্ছেন কিংবা প্রেমিকার সাথে কোন এক টং এর পাশে চা তে চুমুক দিয়ে প্রেমে মজেছেন অথবা বন্ধুমহলের আড্ডায় চা নিয়ে বসেছেন ! সেই এক চুমুক চা এর পিছনে রয়েছে কত রক্তাক্ত ইতিহাস , ঘাম জরানো কত শত পরিবারের পরিশ্রম !
পারবেন তো এত কিছুর পরেও সেই চা তে তৃপ্তির চুমুক দিতে ?
- সাজ্জাদ শেখ