10/03/2026
পৃথিবীর কেন্দ্রে ভ্রমণ: কল্পবিজ্ঞান থেকে বিজ্ঞানীদের অজানা রহস্য 🌍🔍
প্রায় ১৬০ বছর আগে জার্মান ভূতত্ত্ববিদ অট্টো লিডেনব্রক এবং তার ভাইপো অ্যাক্সেল ফরাসি লেখক জুল ভার্নের কাল্পনিক "জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ" বা 'পৃথিবীর কেন্দ্রে যাত্রা' বইয়ে এক রোমাঞ্চকর অভিযানের সূচনা করেছিলেন। সেই গল্পে, তারা আইসল্যান্ডের একটি গুহা মুখ থেকে যাত্রা করে পৃথিবীর কেন্দ্রে একটি বিলুপ্ত আগ্নেয়গিরি, সূর্যহীন সমুদ্র, আলোকিত শিলা, প্রাগৈতিহাসিক বন ও সামুদ্রিক জীবনের সন্ধান পেয়েছিলেন। কিন্তু আজকের বিজ্ঞানের জ্ঞান অনুযায়ী, আমাদের পায়ের নিচে প্রায় ৬,৩৭১ কিলোমিটার নিচে আসলে কী আছে? চলুন, পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে এক বৈজ্ঞানিক যাত্রায় বেরিয়ে পড়ি।
গুপ্ত গুহাশ্রয়: পৃথিবীর ভূ-ত্বক (Crust)
আমাদের পৃথিবী পেঁয়াজের মতো অনেকগুলো স্তর দিয়ে গঠিত, এবং আমরা যতদূর জানি, শুধুমাত্র প্রথম স্তরেই প্রাণের অস্তিত্ব আছে, যাকে বলা হয় ক্রাস্ট বা ভূ-ত্বক। এই স্তরে ছুঁচা বা গন্ধমূষিক এবং ব্যাজার বা গর্তবাসী ভোঁদড়ের মতো ছোট আকারের নিশাচর প্রাণীরা গুহা বা গর্তে বাস করে। এর চেয়ে গভীরে গেলে নাইল ক্রোকোডাইল নামে এক ধরণের কুমির পাওয়া যায়, যারা মাটির নিচে ১২ মিটার পর্যন্ত গভীর গর্ত বা গুহায় থাকতে পারে। এই প্রথম স্তরে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন ভূগর্ভস্থ শহর, যেমন তুরস্কের এলেনগুবু, যা বর্তমানে ডেরিনকুয়ু নামে পরিচিত। এটি ভূ-ত্বক থেকে ৮৫ মিটারের বেশি গভীরে অবস্থিত এবং ১৮ স্তরের টানেল দিয়ে নির্মিত গোলকধাঁধাঁর মতো বিস্তৃত এই শহরটিতে ২০ হাজারের বেশি মানুষ ধারণের ক্ষমতা ছিল বলে ধারণা করা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম খনি প্রায় চার কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বর্ণখনির শ্রমিকরা মাটির দুই কিলোমিটার গভীরে জীবন্ত কীট খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু তিন কিলোমিটার গভীরতার পর আর কোনো প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এছাড়াও রয়েছে রাশিয়ার খনন করা বিশ্বের গভীরতম কূপ, কোলা সুপারডিপ বোরহোল, যাকে অনেকে নরকের দ্বার বলে মনে করে এবং স্থানীয়রা দাবি করে যে তারা নির্যাতিত আত্মার চিৎকার শুনতে পায়।
ক্যালিডোস্কোপ: ম্যান্টল বা বিচ্ছুরিত স্তর (Mantle)
৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গভীরতায় গিয়ে আমরা পৃথিবীর দ্বিতীয় স্তরের দেখা পাই, যাকে বলা হয় ম্যান্টল বা বিচ্ছুরিত স্তর। এটি আমাদের গ্রহের সবচেয়ে বড় অঞ্চল, যা পৃথিবীর আয়তনের ৮২ শতাংশ এবং ভরের ৬৫ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত। এটি উত্তপ্ত শিলা দিয়ে গঠিত, যা আমাদের কাছে কঠিন মনে হলেও এটি আসলে খুব ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়, বছরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার স্থান পরিবর্তন করে। মাটির নিচের এই খুব ছোট পরিবর্তনও পৃথিবীর উপরিভাগ বা ভূত্বকে ভূমিকম্পের সৃষ্টি করতে পারে। এই স্তরে একটি বিশাল সাগরও রয়েছে, যা পুরো পৃথিবীর সব সাগরের পানি ধারণ করার সক্ষমতা রাখে। তবে এতে এক ফোঁটাও তরল নেই; বরং এটি খনিজ অলিভাইনে জমে থাকা পানির সমন্বয়ে গঠিত, যা ম্যান্টল বা বিচ্ছুরিত স্তরের উপরিভাগের ৫০ শতাংশই তৈরি করে। আরও গভীরে গেলে এটি আকাশী নীল রঙের রিংউডাইট ক্রিস্টাল বা আকাশী নীল রঙের ম্যাগনেসিয়াম সিলিকেটের স্ফটিকে পরিণত হয়। আরও নীচে নামলে চাপ আরও বাড়তে থাকার মানে হচ্ছে, অ্যাটম বা পরমাণুর গঠনে পরিবর্তন হয়, যার কারণে সবচেয়ে পরিচিত পদার্থও খুবই অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে। এটি একটি ঘূর্ণায়মান জায়গা যেখানে ক্যালিডোস্কোপের স্ফটিকের মতো বস্তু রয়েছে। এটি এমন এক জায়গা যেখানে শিলা প্লাস্টিকের মতো নমনীয় এবং খনিজগুলো এতোটাই বিরল যে সেগুলো পৃথিবীর উপরিভাগে সেগুলোর অস্তিত্বই নেই। বাস্তবিক পক্ষে সেখানে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় থাকা ব্রিজম্যানাইট এবং ডেভমাওইট নামে খনিজগুলো গঠিত হওয়ার জন্য ভূ-অভ্যন্তরের অতি উচ্চ চাপের দরকার হয় এবং এগুলো পৃথিবীর উপরিভাগে উঠিয়ে নিয়ে আসা হলে সেগুলো ভেঙ্গে পড়বে। ২৯০০ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছানোর পর আমরা ম্যান্টল বা বিচ্ছুরিত স্তরের শেষ প্রান্তে উপনীত হব।
রহস্যময় কাঠামো: লার্জ লো শিয়ার ভেলোসিটি প্রভিন্স (LLSVP)
ম্যান্টলের গভীরে দুটি বিশালাকার কাঠামো রয়েছে, যা হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং পৃথিবীর আয়তনের ছয় শতাংশ এগুলো দিয়ে গঠিত। এদের বলা হয় “লার্জ লো শিয়ার ভেলোসিটি প্রভিন্স” বা সংক্ষেপে এলএলএসভিপি (Large Low Shear Velocity Provinces)। এগুলোর অবশ্য আরও নাম রয়েছে: 'টুজো' (Tuzo)—এটি আফ্রিকা অঞ্চলের নিচে অবস্থিত এবং 'জেসন' (Jason)—এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিচে অবস্থিত। এগুলোর উচ্চতা নিয়ে আলাদা ধারণা প্রচলিত থাকলেও, টুজো ৮০০ কিলোমিটার উঁচু বলে মনে করা হয়, যা ৯০টি হিমালয় পর্বতকে পরস্পরের উপরে বসালে যে উচ্চতা হবে তার সমান। জেসনের উচ্চতা ১৮০০ কিলোমিটার, যা প্রায় ২০৩টি এভারেস্ট পর্বতের মিলিত উচ্চতার সমান। তবে এগুলোর আয়তন কত বড় সে সম্পর্কিত তথ্য ছাড়া এগুলো নিয়ে আর তেমন কোনো নিশ্চিত তথ্য জানা যায় না; যেমন সেগুলো কীভাবে গঠিত হয়েছে, এগুলো কী দিয়ে তৈরি বা কীভাবে আমাদের গ্রহকে প্রভাবিত করে ইত্যাদি।
স্ফটিকাকার হৃদয়: আউটার কোর ও ইনার কোর (Outer Core & Inner Core)
জুল ভার্নের ক্লাসিক উপন্যাসে অধ্যাপক লিডেনব্রক পুরো একটি আলাদা ভূগর্ভস্থ দুনিয়ার সন্ধান পেয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল প্রাগৈতিহাসিক সময়ের প্রাণী এবং ভূগর্ভস্থ মহাসাগর। যদিও ডাইনোসর থাকার বিষয়টি একটু অতিরঞ্জিতই ছিল, কিন্তু তারপরও সেখানে গলিত ধাতুর সাগর, যার গরম লাল স্রোত ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে, ছড় এবং গলিত ধাতুর সাইক্লোন—সবই ছিল। এই চলাচল একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে, যা ছাড়া পৃথিবীর উপরিভাগে জীবনের অস্তিত্ব সম্ভব নয়; এই চৌম্বকীয় স্তর সূর্যরশ্মির ক্ষতিকর বিকিরণ এবং অন্যান্য উপাদান থেকে রক্ষা করে। এটি না হলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ধ্বংস হয়ে যেতো। এরপর আমরা চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে যাব, যেটি ইনার কোর বা আন্তঃকেন্দ্র বলে পরিচিত। এটি এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যের বিষয়। এটি কঠিন লোহা ও নিকেলের তৈরি অতিঘন একটি উত্তপ্ত বল, যার উত্তাপ সূর্যের উপরিভাগের তাপের মতোই বলে ধরা হয় এবং এটি আকারে চাঁদের চেয়ে কিছুটা ছোট। এখানকার চাপ এতোই বেশি যে এর কারণে ধাতু স্ফটিকে পরিণত হয়ে পৃথিবীর কেন্দ্রে একটি নিরেট স্তর তৈরি করেছে। এটি এমন একটি স্তর যেখানে আমরা কখনোই পৌঁছাতে পারব না। এখানকার পরিবেশ এতো বেশি রুক্ষ (৬০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং চাপ ৩.৫ মিলিয়ন অ্যাটমোস্ফিয়ার) যে সেখানে কোনো কিছুই টিকতে পারবে না। ধাতব সাগরে আটকে থাকা সেই স্ফটিক জগত সব সময়ই রহস্যময় ছিল এবং সম্ভবত সব সময় রহস্যই থাকবে। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে গবেষণা করছেন এবং মাঝে মাঝেই মনে হয় যে আরও বেশি তথ্য আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এগুলো এখনো খুব একটা বোঝা সম্ভব হয়নি। অবশ্য বিজ্ঞান আর কল্পনার তো আসলে কোনো সীমা রেখা নেই।
শিক্ষণীয় বার্তা: পৃথিবীর কেন্দ্রের এই যাত্রা আমাদের দেখায় যে, আমাদের পায়ের নিচেও মহাবিশ্বের মতোই বিশাল এবং রহস্যময় এক জগৎ লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞান যতদূরই পৌঁছাক না কেন, অজানার রহস্য চিরকালই আমাদের কৌতূহলী করে রাখবে।
কমেন্ট প্রমোট: পৃথিবীর কেন্দ্রের এই বৈজ্ঞানিক যাত্রা সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়? মহাবিশ্বের কোন রহস্য আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে?
👉তথ্যসূত্র:
Jules Verne: Journey to the Center of the Earth (উপন্যাস)
National Geographic: Journey to the Earth's Core - https://www.nationalgeographic.com/science/article/earths-core
Live Science: What Is Earth's Core Made Of? - https://www.livescience.com/33368-what-is-earths-core-made-of.html
Smithsonian Magazine: What's at the Center of the Earth? - https://www.smithsonianmag.com/science-nature/whats-at-the-center-of-the-earth-180979407/
Wikipedia: Structure of the Earth - https://en.wikipedia.org/wiki/Structure_of_the_Earth
#পৃথিবীরকেন্দ্র #জুলভার্ন #ভূ-বিজ্ঞান #রহস্য #মহাবিশ্ব #বিজ্ঞান #গবেষণা #পৃথিবীরস্তর