13/08/2026
গাড়ির চাকাগুলো ভেজা পিচ রাস্তার ওপর দিয়ে চলার সময় এক ধরণের গোঙানির মতো শব্দ তুলছিল। রাতের ঢাকা শহরের বুক চিরে আয়ানের গাড়ি ছুটছিল চৌধুরী এস্টেটের দিকে। ড্যাশবোর্ডের ওপর রাখা ফোনটার স্ক্রিনটা এখনো থেকে থেকে জ্বলে উঠছিল, আর তাতে জ্বলজ্বল করছিল সেই মেসেজটা।
হাতলটা এত শক্ত করে আয়ান ধরে ছিল যে তার হাতের রগগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠছিল। ডাক্তারের বলা '৪৮ ঘণ্টা' শব্দ দুটো আয়ানের কানের কাছে কোনো বিষাক্ত পোকার মতো একটানা শব্দ করে চলেছে।
বিশাল চৌধুরী এস্টেটের লোহার রাজকীয় গেটটা আজ রাতে যেন কোনো হিংস্র দানবের হা-করা মুখের মতো দেখাচ্ছিল। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে গাড়িটা পোর্চ এলাকায় এনে ব্রেক কষল সে। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শুধু ছাদের টিনের চালে বৃষ্টির সোঁদা শব্দ আর আয়ানের নিজের হাঁপানোর শব্দ।
জ্যাকেটের ভেতর হাত দিয়ে পিস্তলটার স্পর্শ অনুভব করল সে। আয়ানের মনের ভেতর এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, শুধু জমে আছে এক হিমশীতল ঘৃণা।
এস্টেটের বিশালাকার কাঠের দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল আয়ান।
ভেতরে আবছা আলো। ঝাড়বাতিটার নিচে সোফায় বসে ছিলেন চৌধুরী পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য, আয়ানের কাকা—জয়নুল চৌধুরী।
চাদরটা গায়ে জড়িয়ে তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন।
আয়ানকে রক্তভেজা জামা আর মুখে কাটা দাগ নিয়ে ঢুকতে দেখে জয়নুল চৌধুরী অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“আয়ান! তুই? এই অবস্থায়? আর ইনায়া কই? কী হয়েছে তোদের?”— জয়নুল চৌধুরীর গলায় উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কার ছাপ স্পষ্ট।
আয়ান একপা একপা করে এগোতে লাগল। তার বুটের শব্দটা নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনি তুলছিল।
“ইনায়া হাসপাতালে, মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, কাকা।”— আয়ানের গলার স্বর একেবারে সমতল, কোনো আবেগ নেই।
জয়নুল চৌধুরী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন, “ কিন্তু কী করে হলো এসব? রশীদ লোকটা কি শেষমেশ...”
“না কাকা, রশীদ ইনায়াকে গুলি করেছে ঠিকই, কিন্তু ও ইনায়াকে মারতে পারেনি। ইনায়াকে ধীর গতিতে শেষ করার কাজটা চৌধুরী এস্টেটের ভেতরে বসেই কেউ করছিল। গত কয়েক মাস ধরে ওর খাবারে স্লো-পয়জন মেশানো হচ্ছিল।”
কথাটা শোনার সাথে সাথেই ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। সেলিম চাচার হাত থেকে চায়ের ট্রে-টা হঠাৎ মেঝেতে পড়ে গিয়ে বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
আয়ান ঝড়ের গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে পিস্তলটা সরাসরি সেলিমের কপালে তাক করল।
“আ-আয়ান বাবা! এসব কী করছিস? সেলিম তো পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এই পরিবারের সেবা করছে!”— চিৎকার করে উঠলেন জয়নুল চৌধুরী।
“চুপ থাকুন কাকা!”— গর্জে উঠল আয়ান, “সেলিমের, গত তিন মাস ধরে ইনায়ার ঘরে রাতের দুধের গ্লাসটা কে নিয়ে যেত? তুই ছাড়া ইনায়ার রান্নাঘরে আর কার অবাধ যাতায়াত ছিল? সত্যি বল, নয়তো আজ এই ঘরেই তোর মাথাটা উড়িয়ে দেব!”
সেলিমের শরীর কাঁপছিল। সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল, “ছোট বাবু... আমাকে মেরে ফেলবেন না! আমি কিচ্ছু জানি না! আমাকে... আমাকে শুধু এই গুঁড়ো ওষুধটা দুধে মিশিয়ে দিতে বলা হয়েছিল। না করলে আমার নাতিকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল!”
“কে দিয়েছিল হুমকি? কার কথায় তুই এই কাজ করেছিস?”— আয়ানের আঙুল পিস্তলের ট্রিগারে চেপে বসল।
“বড় বাবু... আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বড় কর্তাবাবু... বরুণ চৌধুরী!”
কথাটা যেন পুরো ঘরে একটা বৈদ্যুতিক শক পাঠাল।
বরুণ চৌধুরী—আয়ানের বাবার নিজের দাদা, বংশের সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব, যিনি গত পাঁচ বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ওপরের তলার অন্ধকার ঘরে শয্যাশায়ী!
পিস্তলটা নামিয়ে না এনে আয়ান সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। পিছন থেকে কাকা জয়নুল চৌধুরী তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন, “আয়ান, দাঁড়াও! বরুণ ভাই তো হাঁটতেই পারেন না! ওনার পক্ষে এসব কী করে সম্ভব? ও নির্দোষ!”
কিন্তু আয়ান থামল না। প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে সে এস্টেটের দোতলার শেষ প্রান্তের সেই অন্ধকার ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরটা থেকে একটা স্যাঁতসেঁতে কালচে গন্ধ আসছিল।
আয়ান এক লাথিতে ঘরের ভারী দরজাটা খুলে ফেলল।
ঘরের মাঝে বিশাল রাজকীয় বেডে শুয়ে আছেন বৃদ্ধ বরুণ চৌধুরী।
মনিটরের ধুকপুক শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো শব্দ নেই। ঘরে ঢুকতেই আয়ানের নজর গেল বিছানার পাশের টি-টেবিলের ওপর। সেখানে রাখা একটা স্যাটেলাইট ফোন, যা থেকে এখনো নীল আলো জ্বলছে-নিভছে। আর তার পাশেই রাখা চৌধুরী এস্টেটের লোগো দেওয়া সেই গোপন খাম, যার ভেতরের অংশ ডায়েরির ছিঁড়ে নেওয়া পাতার সাথে হুবহু মিলে যায়!
বিছানায় শুয়ে থাকা বৃদ্ধ লোকটা ধীরেসুভে চোখ খুললেন। কিন্তু সেই চোখে কোনো অসুস্থতা বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর ভীতি ছিল না। সেখানে ছিল এক হিংস্র, পৈশাচিক উজ্জ্বলতা।
তিনি সোজা হয়ে বসে উঠলেন—কোনো অসুবিধা ছাড়াই!
“দেরি করে ফেললি, আয়ান।”— বরুণ চৌধুরীর গলার স্বর কোনো অসুস্থ মানুষের মতো শোনালো না, বরঞ্চ তা ছিল বেশ গভীর আর কর্কশ।
“ডায়েরির বারো নম্বর পৃষ্ঠাটা বুঝতে তোর বেশ কয়েক বছর সময় লেগে গেল। তোর বাবাও ঠিক এই ভুলটাই করেছিল... আমাকে ভাই ভেবে বিশ্বাস করেছিল।”
আয়ানের ভেতরের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতে লাগল। সে পিস্তলটা বরুণ চৌধুরীর দিকে উঁচিয়ে ধরল, “ইনায়ার অ্যান্টিডোট কোথায়? মুখ ফোটার আগে অ্যান্টিডোটের নাম বল, নয়তো তোর এই ভণ্ড জীবনের শেষ এখানেই হবে!”
বরুণ চৌধুরী হা-হা করে এক পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়লেন।
“অ্যান্টিডোট? ইনায়ার শরীরের রক্তে যে বিষ মিশছে, তা কোনো সাধারণ বিষ নয় আয়ান। ওটা চৌধুরী পরিবারের তৈরি সেই গোপন রসায়ন, যা কেবল এস্টেটের গোপন তলার ল্যাবরেটরিতেই আছে। আর তার কোডটা শুধু আমিই জানি।”
তিনি নিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট রিমোট বের করলেন।
“তুই যদি আমাকে গুলি করিস, অ্যান্টিডোট চিরদিনের মতো নষ্ট হয়ে যাবে।
আর ইনায়ার শরীরের সাথে সাথে তোর বাবার এই চৌধুরী এস্টেটের ইতিহাসও শেষ হয়ে যাবে।
তোর কাছে সময় আছে আর মাত্র ৪৭ ঘণ্টা। সিদ্ধান্ত তোর—প্রতিশোধ নিবি, না নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাবি?”
ঘরের বাইরে আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। আয়ান রাগান্বিত গলায় বলে উঠল, আমি সব করব! সব, তোমাদের সব বানচাল করতেই এসেছি। Mind it. See you soon. M.r বুড়ো।
#আমার_বউ
#লেখনীতে_Urmila_Akter
পর্ব:২৭