15/06/2026
আয়ানের মুখের ওপর "হ্যাঁ-না-হতেও পারে"
টাইপ রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রেখে ইনায়া ঝটপট নিজের ফোনটা হাতে নিল।
আয়ান যেভাবে হুট করে বাঘ হয়ে উঠল, সেটা দেখে ইনায়ার নিজের বুকের ভেতর এখন ড্রাম বাজছে।
সে মায়রাকে দ্রুত টেক্সট টাইপ করতে লাগল: "মায়রা, ইমার্জেন্সি! ভোর ৫টার মধ্যে একজন রিয়েল কাজী আর জেনুইন রেজিস্ট্রি খাতা নিয়ে আমাদের বাড়ির পেছনের গেটে রেডি থাকবি। নো ফেক ড্রামা, দিস ইজ রিয়েল!"
মায়রা ওপাশ থেকে রিপ্লাই দিল: "কীহ্?!
তুই তো বলেছিলি জাস্ট অ্যাক্টিং! এখন রিয়েল কাজী কেন? তোদের বাসর ঘরে কি অন্য কোনো কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন হয়ে গেছে নাকি?!"
ইনায়া মেসেজ দেখে আড়চোখে একবার আয়ানের দিকে তাকাল। আয়ান তখন বেশ গম্ভীর মুখে ঘরের জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরের গার্ডদের পজিশন দেখছে। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নেওয়ায় তাকে সত্যিই কোনো অ্যাকশন হিরোর চেয়ে কম লাগছে না।
ইনায়া মায়রাকে টেক্সট করল: "অ্যাজাইনমেন্টে টুইস্ট এসেছে রে বোন। পরে বুঝিয়ে বলব, এখন যা বললাম তা কর। নয়তো কাল সকালে তোর বান্ধবী বিধবা হবে, আর আয়ান ভাইয়া ডিরেক্ট পরপারে চলে যাবে!"
ফোনটা লক করে ইনায়া বিছানা থেকে নামতে যাবে, ঠিক তখনই আয়ান তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় আয়ানের চোখ দুটো যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
"কোথায় যাচ্ছো চৌধুরী বাড়ির হবু মালকিন?" আয়ান গলার স্বর নামিয়ে একদম ফিসফিস করে বলল।
ইনায়া একটু আমতা আমতা করে বলল, "না... মানে, একটু ওদিকে... সোফায়..."
"একদম না!" আয়ান হালকা টানে ইনায়াকে আবার খাটে বসিয়ে দিল।
"বাইরে বুটের আওয়াজ পাচ্ছো? গার্ডরা এখনো দরজার বাইরে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এখন সাইলেন্ট হয়ে গেলে ওরা ভাববে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। নাটক এখনো বাকি আছে, জানু !"
'জানু' শব্দটা আয়ানের মুখে শুনে ইনায়ার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। সে বলল, "তো... এখন আর কী নাটক করব?"
আয়ান একটা হাসি দিয়ে বলল, "কেন?
বাঙালি বাসর ঘরের ট্র্যাডিশনাল নাটক! বউ রাগ করবে, আর জামাই বউয়ের মান ভাঙাবে।"
বলার সাথেই সাথেই আয়ান একটু গলা চড়িয়ে বলল, "আহা ইনায়া! এভাবে রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে থেকো না তো! বিয়ের প্রথম রাতেই যদি তুমি আমার ওপর এভাবে অভিমান করো, তাহলে আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই এই জানালার কাচ ভেঙে নিচে লাফ দেব!"
ইনায়া প্রথমে হতভম্ব হলেও পরক্ষণেই মুচকি হেসে নিজের খিলখিলানি চেপে ধরল। সেও গলা উঁচিয়ে কান্নার মতো সুর করে বলল, "যাও! তোমার সাথে আমি কথাই বলব না! তুমি বিয়ের আগেই বলেছিলে আমাকে সুইজারল্যান্ড নিয়ে যাবে, আর এখন বলছো হানিমুন হবে কুয়াকাটায়? আমি তোমার এই কিপটেমি সহ্য করতে পারব না!"
আয়ান মনে মনে ভাবল, 'বাহ্! মেয়ে তো স্ক্রিপ্ট ছাড়াই হেব্বি অ্যাক্টিং করছে!'
সে আরও এক কাঠি বাড়িয়ে বলল, "আরে জানু , কুয়াকাটায় তো সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুটোই একসাথে দেখা যায়! আমাদের ভালোবাসার সূর্যও ওখানেই উদয় হবে। প্লিজ, রাগ করো না, এই নাও তোমার পায়ে ধরছি।""
বাইরে দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বডিগার্ড রফিক আর কুদ্দুস একে অপরের দিকে তাকাল।
রফিক ফিসফিস করে বলল, "কুদ্দুস ভাই, ছোট আপামণির চয়েস আছে। জামাই দেখতে যেমন মাখন, ডায়ালগও মারে একদম সিনেমার হিরোর মতো!"
কুদ্দুস খৈনি চিবোতে চিবোতে বলল, "হুম, তবে বড় স্যারের কানে গেলে এই হিরোর হিরোগিরি ছুটে যাবে। তুই চুপচাপ পাহারা দে।"
ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ৪টা ছুঁইছুঁই, ঘরের মোমবাতিগুলো ততক্ষণে গলে শেষ। এসি-র ঠান্ডা বাতাসে ঘরের পরিবেশটা এখন একদম শান্ত।
এতক্ষণের নাটক আর টেনশনের পর ইনায়া কখন যে খাটের এক কোণে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও জানে না। তার লেহেঙ্গার ভারী ওড়নাটা মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে।
আয়ান কিন্তু ঘুমায়নি। সে সোফায় বসে সারারাত ধরে শুধু একটা জিনিসই ভেবেছে—যে জীবনটা সে এতকাল একদম সাদামাটাভাবে কাটিয়ে এসেছে, আজ এক রাতের মধ্যে সেটা কতটা বদলে গেল।
সে কি সত্যিই ইনায়াকে ভালোবাসে? নাকি এই বিপদের থ্রিলটাই তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? কিন্তু ইনায়ার ওই মায়াবী মুখের দিকে তাকালে তার মনে হয়, এই মেয়ের জন্য চৌধুরী আসাফউদ্দৌলার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোও সম্ভব।
হঠাৎ ইনায়ার ফোনে ভাইব্রেশন হলো। মায়রার মেসেজ: "আই অ্যাম হিয়ার। পেছনের গেটে কাজী রেডি। তোরা বের হবি কীভাবে?"
আয়ান জলদি ইনায়াকে হালকা ধাক্কা দিয়ে ডেকে তুলল, "ইনায়া, ওঠো! আওয়ার টাইম স্টার্টস নাও।"
ইনায়া চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসল। আয়ান ততক্ষণে জানালার পাশে গিয়ে একটা মোটা চাদর আর খাটের চাদর একসাথে গিঁট দিয়ে জানালার গ্রিলের সাথে বাঁধতে শুরু করেছে।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল, "আয়ান ভাইয়া, এটা কী করছো?"
"কেন? তোমার আব্বুর খাঁচা থেকে পালানোর অফিশিয়াল ব্যবস্থা!" আয়ান জানালার একটা স্লাইডিং কাচ আস্তে করে সরিয়ে নিচে তাকাল। নিচ তলার গার্ডরা এই ভোরে একটু ঝিমোচ্ছে।
"কিন্তু এই ভারী লেহেঙ্গা পরে আমি পাইপ বা চাদর বেয়ে নামব কী করে?!" ইনায়া নিজের ড্রেসের দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিল।
আয়ান ইনায়ার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, আছে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। সে ইনায়ার কোমরে হাত দিয়ে তাকে এক ঝটকায় নিজের কোলে তুলে নিল।
ইনায়া চমকে উঠে আয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল।
"চৌধুরী বাড়ির মেয়েদের মনে হয় সাহস একটু কম," আয়ান মুচকি হেসে বলল, "চোখ বন্ধ করো ইনায়া। আমরা ডিরেক্টলি আমাদের ফিউচারে ল্যান্ড করছি।"
জানালার চাদর ধরে আয়ান যখন ইনায়াকে কোলে নিয়ে নিচে নামার জন্য প্রস্তুত, ঠিক তখনই দরজার বাইরে একটা ভারী শব্দ হলো। কেউ একজন এসেছে।
চৌধুরী আসাফউদ্দৌলার গম্ভীর গলা শোনা গেল, "আয়ান, ইনায়া... ভোর হয়ে গেছে। দরজা খোলো।"
তার একটু পিছনে থেকে হেঁটে আসছে মিনা বেগম, ইনায়ার মা।
বলি, তোমার কি আক্কেল জ্ঞান শুনি ভোর হতে না হতেই ছেলে- মেয়ে দুটোকে ডাকাডাকি শুরু করে দিছো! চলো আসো আমার সাথে ঘরে চলো। ওরা ঠিক সময় মতো উঠে পড়বে। আসাফউদ্দৌলা মিনা বেগমের সঙ্গে চলে গেলেন।
আয়ান, ইনায়া চোখাচোখি করে মুচকি হাসলো.....।
চলবে....
(কেমন লাগলো অবশ্যই রেসপন্স করবেন। আপনাদের ভালোবাসা আমাদের লেখার উৎসাহ। Happy Reading......)
#আমার_বউ
#লেখনীতে_Urmila_Akter
পর্ব:৫