Urmila Akter

Urmila Akter বাস্তবতার থেকে কল্পনায় সুখী
অনুভূতির রাজ্য রহস্যময়ী

গাড়ির চাকাগুলো ভেজা পিচ রাস্তার ওপর দিয়ে চলার সময় এক ধরণের গোঙানির মতো শব্দ তুলছিল। রাতের ঢাকা শহরের বুক চিরে আয়ানের গাড়...
13/08/2026

গাড়ির চাকাগুলো ভেজা পিচ রাস্তার ওপর দিয়ে চলার সময় এক ধরণের গোঙানির মতো শব্দ তুলছিল। রাতের ঢাকা শহরের বুক চিরে আয়ানের গাড়ি ছুটছিল চৌধুরী এস্টেটের দিকে। ড্যাশবোর্ডের ওপর রাখা ফোনটার স্ক্রিনটা এখনো থেকে থেকে জ্বলে উঠছিল, আর তাতে জ্বলজ্বল করছিল সেই মেসেজটা।

​হাতলটা এত শক্ত করে আয়ান ধরে ছিল যে তার হাতের রগগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠছিল। ডাক্তারের বলা '৪৮ ঘণ্টা' শব্দ দুটো আয়ানের কানের কাছে কোনো বিষাক্ত পোকার মতো একটানা শব্দ করে চলেছে।

​বিশাল চৌধুরী এস্টেটের লোহার রাজকীয় গেটটা আজ রাতে যেন কোনো হিংস্র দানবের হা-করা মুখের মতো দেখাচ্ছিল। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে গাড়িটা পোর্চ এলাকায় এনে ব্রেক কষল সে। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

শুধু ছাদের টিনের চালে বৃষ্টির সোঁদা শব্দ আর আয়ানের নিজের হাঁপানোর শব্দ।

​জ্যাকেটের ভেতর হাত দিয়ে পিস্তলটার স্পর্শ অনুভব করল সে। আয়ানের মনের ভেতর এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, শুধু জমে আছে এক হিমশীতল ঘৃণা।

​এস্টেটের বিশালাকার কাঠের দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল আয়ান।

ভেতরে আবছা আলো। ঝাড়বাতিটার নিচে সোফায় বসে ছিলেন চৌধুরী পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য, আয়ানের কাকা—জয়নুল চৌধুরী।

চাদরটা গায়ে জড়িয়ে তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন।

​আয়ানকে রক্তভেজা জামা আর মুখে কাটা দাগ নিয়ে ঢুকতে দেখে জয়নুল চৌধুরী অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

​“আয়ান! তুই? এই অবস্থায়? আর ইনায়া কই? কী হয়েছে তোদের?”— জয়নুল চৌধুরীর গলায় উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কার ছাপ স্পষ্ট।

​আয়ান একপা একপা করে এগোতে লাগল। তার বুটের শব্দটা নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনি তুলছিল।

​“ইনায়া হাসপাতালে, মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, কাকা।”— আয়ানের গলার স্বর একেবারে সমতল, কোনো আবেগ নেই।

​জয়নুল চৌধুরী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন, “ কিন্তু কী করে হলো এসব? রশীদ লোকটা কি শেষমেশ...”

​“না কাকা, রশীদ ইনায়াকে গুলি করেছে ঠিকই, কিন্তু ও ইনায়াকে মারতে পারেনি। ইনায়াকে ধীর গতিতে শেষ করার কাজটা চৌধুরী এস্টেটের ভেতরে বসেই কেউ করছিল। গত কয়েক মাস ধরে ওর খাবারে স্লো-পয়জন মেশানো হচ্ছিল।”

​কথাটা শোনার সাথে সাথেই ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। সেলিম চাচার হাত থেকে চায়ের ট্রে-টা হঠাৎ মেঝেতে পড়ে গিয়ে বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

​আয়ান ঝড়ের গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে পিস্তলটা সরাসরি সেলিমের কপালে তাক করল।

​“আ-আয়ান বাবা! এসব কী করছিস? সেলিম তো পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এই পরিবারের সেবা করছে!”— চিৎকার করে উঠলেন জয়নুল চৌধুরী।

​“চুপ থাকুন কাকা!”— গর্জে উঠল আয়ান, “সেলিমের, গত তিন মাস ধরে ইনায়ার ঘরে রাতের দুধের গ্লাসটা কে নিয়ে যেত? তুই ছাড়া ইনায়ার রান্নাঘরে আর কার অবাধ যাতায়াত ছিল? সত্যি বল, নয়তো আজ এই ঘরেই তোর মাথাটা উড়িয়ে দেব!”

​সেলিমের শরীর কাঁপছিল। সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল, “ছোট বাবু... আমাকে মেরে ফেলবেন না! আমি কিচ্ছু জানি না! আমাকে... আমাকে শুধু এই গুঁড়ো ওষুধটা দুধে মিশিয়ে দিতে বলা হয়েছিল। না করলে আমার নাতিকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল!”

​“কে দিয়েছিল হুমকি? কার কথায় তুই এই কাজ করেছিস?”— আয়ানের আঙুল পিস্তলের ট্রিগারে চেপে বসল।

​“বড় বাবু... আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বড় কর্তাবাবু... বরুণ চৌধুরী!”

​কথাটা যেন পুরো ঘরে একটা বৈদ্যুতিক শক পাঠাল।

​বরুণ চৌধুরী—আয়ানের বাবার নিজের দাদা, বংশের সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব, যিনি গত পাঁচ বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ওপরের তলার অন্ধকার ঘরে শয্যাশায়ী!

​পিস্তলটা নামিয়ে না এনে আয়ান সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। পিছন থেকে কাকা জয়নুল চৌধুরী তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন, “আয়ান, দাঁড়াও! বরুণ ভাই তো হাঁটতেই পারেন না! ওনার পক্ষে এসব কী করে সম্ভব? ও নির্দোষ!”

​কিন্তু আয়ান থামল না। প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে সে এস্টেটের দোতলার শেষ প্রান্তের সেই অন্ধকার ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরটা থেকে একটা স্যাঁতসেঁতে কালচে গন্ধ আসছিল।

​আয়ান এক লাথিতে ঘরের ভারী দরজাটা খুলে ফেলল।

​ঘরের মাঝে বিশাল রাজকীয় বেডে শুয়ে আছেন বৃদ্ধ বরুণ চৌধুরী।

মনিটরের ধুকপুক শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো শব্দ নেই। ঘরে ঢুকতেই আয়ানের নজর গেল বিছানার পাশের টি-টেবিলের ওপর। সেখানে রাখা একটা স্যাটেলাইট ফোন, যা থেকে এখনো নীল আলো জ্বলছে-নিভছে। আর তার পাশেই রাখা চৌধুরী এস্টেটের লোগো দেওয়া সেই গোপন খাম, যার ভেতরের অংশ ডায়েরির ছিঁড়ে নেওয়া পাতার সাথে হুবহু মিলে যায়!

​বিছানায় শুয়ে থাকা বৃদ্ধ লোকটা ধীরেসুভে চোখ খুললেন। কিন্তু সেই চোখে কোনো অসুস্থতা বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর ভীতি ছিল না। সেখানে ছিল এক হিংস্র, পৈশাচিক উজ্জ্বলতা।

​তিনি সোজা হয়ে বসে উঠলেন—কোনো অসুবিধা ছাড়াই!

​“দেরি করে ফেললি, আয়ান।”— বরুণ চৌধুরীর গলার স্বর কোনো অসুস্থ মানুষের মতো শোনালো না, বরঞ্চ তা ছিল বেশ গভীর আর কর্কশ।

“ডায়েরির বারো নম্বর পৃষ্ঠাটা বুঝতে তোর বেশ কয়েক বছর সময় লেগে গেল। তোর বাবাও ঠিক এই ভুলটাই করেছিল... আমাকে ভাই ভেবে বিশ্বাস করেছিল।”

​আয়ানের ভেতরের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতে লাগল। সে পিস্তলটা বরুণ চৌধুরীর দিকে উঁচিয়ে ধরল, “ইনায়ার অ্যান্টিডোট কোথায়? মুখ ফোটার আগে অ্যান্টিডোটের নাম বল, নয়তো তোর এই ভণ্ড জীবনের শেষ এখানেই হবে!”

​বরুণ চৌধুরী হা-হা করে এক পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়লেন।

“অ্যান্টিডোট? ইনায়ার শরীরের রক্তে যে বিষ মিশছে, তা কোনো সাধারণ বিষ নয় আয়ান। ওটা চৌধুরী পরিবারের তৈরি সেই গোপন রসায়ন, যা কেবল এস্টেটের গোপন তলার ল্যাবরেটরিতেই আছে। আর তার কোডটা শুধু আমিই জানি।”

​তিনি নিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট রিমোট বের করলেন।

​“তুই যদি আমাকে গুলি করিস, অ্যান্টিডোট চিরদিনের মতো নষ্ট হয়ে যাবে।

আর ইনায়ার শরীরের সাথে সাথে তোর বাবার এই চৌধুরী এস্টেটের ইতিহাসও শেষ হয়ে যাবে।

তোর কাছে সময় আছে আর মাত্র ৪৭ ঘণ্টা। সিদ্ধান্ত তোর—প্রতিশোধ নিবি, না নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাবি?”

​ঘরের বাইরে আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। আয়ান রাগান্বিত গলায় বলে উঠল, আমি সব করব! সব, তোমাদের সব বানচাল করতেই এসেছি। Mind it. See you soon. M.r বুড়ো।

​ #আমার_বউ
#লেখনীতে_Urmila_Akter
পর্ব:২৭

বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে দরগাহর বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। প্রখর ফ্লাডলাইটের আলোয় ভিজে যাওয়া ধোঁয়া আর ...
03/08/2026

বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে দরগাহর বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। প্রখর ফ্লাডলাইটের আলোয় ভিজে যাওয়া ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধ চাদরের মতো পুরো ঘরটাকে ঢেকে ফেলেছে। একঝাঁক সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তা অস্ত্র উঁচিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তেই পরিবেশের উত্তেজনা চড়মে পৌঁছাল।

​অফিসার-ইন-চার্জ দ্রুত এগিয়ে এলেন আয়ানের দিকে। মাটিতে পড়ে থাকা রক্তভেজা ইনায়া আর তার বুক জড়িয়ে ধরে রাখা আয়ানকে দেখে অফিসার নিজের টিমকে সংকেত দিলেন, “কুইক! অ্যাম্বুলেন্সকে ডেকে পাঠাও! মেয়েটার পালস খুব দুর্বল!”

​পুলিশের কর্ডন পার করে ইনায়াকে যখন স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছিল, আয়ান এক মুহূর্তের জন্যও তার হাত ছাড়েনি। ইনায়ার শাড়ির আঁচলের ভেতরের পকেটে শক্ত হয়ে আটকে থাকা সেই পুরোনো, রসে-রক্তে ভিজে যাওয়া ডায়েরিটা আয়ান নিজের জ্যাকেটের ভেতর লুকিয়ে ফেলল।

​হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের বাইরে রেড লাইটটা জ্বলছিল। সাদা ধবধবে দেওয়ালগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আয়ানের নিজের রক্তমাখা হাত দুটো কাঁপছিল। গালের কাটা দাগটা থেকে এখনো হালকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু শরীরের সব যন্ত্রণা ঢাকা পড়ে গেছে মনের ভেতর চলতে থাকা তোলপাড়ের নিচে।

​পকেটের ভেতর থেকে সাবধানে ডায়েরিটা বের করল সে। পুরোনো চামড়ার বাঁধানো কভার, তাতে শতাব্দীর পুরোনো চৌধুরী এস্টেটের পারিবারিক ছাপ আঁকা। ডায়েরির পাতাগুলো রক্তে ভিজে আঠালো হয়ে গেছে।

​আয়ান সাবধানে একটার পর একটা পাতা উল্টাতে লাগল। এক... পাঁচ... নয়... অবশেষে বারো নম্বর পৃষ্ঠা।

​পাতাটা রক্তে অর্ধেকটা ঝাপসা হয়ে গেলেও লাল রঙের গাঢ় কালিতে লেখা অক্ষরগুলো স্পষ্ট পড়া যাচ্ছিল। আয়ানের বাবার নিজের হাতের লেখা—

​> “আজ ১৬ই নভেম্বর। আমি নিশ্চিত, ওরা আমাকে শেষ করে দেবে। কিন্তু চৌধুরী এস্টেটের রক্ত চোষা অভিশাপের পেছনের মূল নকশা আমার ভাই নয়... ও শুধু একটা ঘুঁটি।

এই খেলায় আসল চালটা চালছে চৌধুরী পরিবারের সম্মান রক্ষাকারী হিসেবে পরিচিত আমার পরম শ্রদ্ধেয়...”

​লেখাটার এই অংশটুকু এসে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে! কিন্তু ঠিক তার নিচে একটা ছোট নোট লেখা ছিল—

> “আয়ান যদি কোনোদিন এই লেখা পড়ো, মনে রেখো—যে শত্রুকে তুমি বাইরে খুঁজছ, সে লুকিয়ে আছে তোমার খুব কাছের ছায়ায়।

​আয়ানের মাথার ভেতরে যেন হাজারটা বাজ একসাথে ডেকে উঠল। সে এতদিন যাকে নিজের বাবার হত্যকারী ভেবে অন্ধের মতো তাড়া করে ফিরেছে, যার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নিজের পুরো জীবনটা বাজি রেখেছে—সেই কেবল এক ভাড়াটে ঘাতক? তবে মূল চক্রান্তকারী কে? কে সেই ‘পরম শ্রদ্ধেয়’?

​ঠিক তখনই ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের দরজা খুলে ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে এলেন। মুখে গভীর চিন্তার ছাপ।

​“ডাক্তারবাবু! ইনায়া? ইনায়া কেমন আছে?” আয়ান প্রায় ছুটে গেল।

​ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বুলেটের আঘাতটা সরাসরি হৃৎপিণ্ডে লাগেনি, তবে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা অবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু জটিলতা অন্য জায়গায়...”

​“কী জটিলতা?”

​“প্যাশেন্টের শরীরে স্লো-পয়জনিংয়ের লক্ষণ পাওয়া গেছে। গত কয়েক মাস ধরে ওকে অল্প অল্প করে কোনো দুর্লভ বিষ দেওয়া হচ্ছিল। আজকের ট্রমার পর সেই বিষ ওর স্নায়ুতন্ত্রকে অচল করে দিচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এর অ্যান্টিডোট না পেলে ওকে বাঁচানো অসম্ভব।”

​কথাটা শুনে আয়ানের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। রশীদ বা মুখোশধারী লোকটা নয়—ইনায়া তো চৌধুরী এস্টেটের বাইরেই যেত না! তবে তাকে বিষ দিচ্ছে কে?

​আয়ানের মাথায় হঠাৎ চমক দিয়ে উঠল ডায়েরির বারো নম্বর পৃষ্ঠার শেষ বাক্যটা—‘সে লুকিয়ে আছে তোমার খুব কাছের ছায়ায়...’

​হাসপাতালের করিডোরের অন্ধকার কোণ থেকে আয়ানের ফোনের স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। কোনো অজানা নম্বর থেকে একটা সংক্ষিপ্ত বার্তা এসেছে—

​“ডায়েরির বারো নম্বর পৃষ্ঠাটা পড়ার জন্য অভিনন্দন, ছোট চৌধুরী। তবে সময় খুব কম। ইনায়ার আয়ু ৪৮ ঘণ্টা।

​আয়ান মেঝের দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করল। চোখের কোণে জমে থাকা সব সংশয় আর ভয় যেন এক নিমিষে জমাট বাঁধা রাগে পরিণত হলো।

পকেট থেকে পিস্তলের অতিরিক্ত ম্যাগাজিনটা বের করে লোড করার ধাতব শব্দ হলো এক লহমায়।

​লড়াইটা কেবল বেঁচে থাকার নয়, এবার লড়াই সত্যকে টেনে বের করার।

​(চলবে...)

#আমার_বউ

#লেখনীতে_Urmila_Akter

পর্ব:২৬

দরগাহর ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো আর ধোঁয়ার কুয়াশায় চৌধুরী এস্টেটের অন্ধকার ঘরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে এক জীবন্ত ...
01/08/2026

দরগাহর ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো আর ধোঁয়ার কুয়াশায় চৌধুরী এস্টেটের অন্ধকার ঘরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে এক জীবন্ত কসাইখানায় পরিণত হলো। সাব-মেশিন গানের লেজার সাইটের লাল বিন্দুগুলো আয়ানের বুক আর কপাল জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

​এক সেকেন্ড। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আয়ানের হাতে সময় ছিল মাত্র এক সেকেন্ড।

​রক্তাক্ত কাঁধ চেপে ধরে পৈশাচিক ভঙ্গিতে হেসে উঠল মুখোশধারী, “বন্দুক নামা আয়ান! নাহলে তোর আর ইনায়ার শরীর ঝাঝরা হতে তিন সেকেন্ডও লাগবে না।”

​আয়ানের চোখের কোণ দিয়ে দেখা যাচ্ছিল মেঝের ওপর অচৈতন্য হয়ে পঁড়ে থাকা ইনায়াকে।

র*ক্তে ভিজে সিক্ত তার পরনের জামা। অন্যদিকে রশীদ মেঝেকোণে বসে হাপাচ্ছে, তার চোখ জুড়ে এখনও এক অন্ধ হিংস্রতা।

​“আমার হিসেব বাকি থেকে গেল রশীদ ভাই,” আয়ান ফিসফিস করে বলল।

​পরমুহূর্তেই আয়ান কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই মেঝের দিকে নিচু হয়ে বাঁ পায়ের সজোর লাথিতে তুলে দিল সেখানে পড়ে থাকা কাঠের ভারী টেবিলটা।

​কালো পোশাকধারীদের সাব-মেশিন গান থেকে একঝাঁক গুলি সশব্দে গর্জে উঠল।

কাঠের টেবিল আর ঘরের পলেস্তারা ঝরে পড়ে চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। কাঠের স্প্লিন্টার আয়ানের ডান গাল চিরে রক্তাক্ত করে দিয়ে গেল, কিন্তু আয়ান থামেনি।

​সে ধোঁয়ার সুযোগ নিয়ে গড়িয়ে সোজা চলে এল ইনায়ার একদম কাছে। বাঁ হাত দিয়ে ইনায়ার শরীরটা জড়িয়ে ধরে এক টানে ঘরের কোণে থাকা ভারী পিলারের আড়ালে নিয়ে এল সে।

​“ইনায়া... ইনায়া শোনো!” আয়ান ওর গাল ধরে ঝাঁকাল।

​ইনায়া খুব কষ্ট করে চোখের পাতা দুটো একটুখানি খুলল। তার ঠোঁটের কোণে ফোটা র*ক্ত জমে কালো হয়ে এসেছে। অস্পষ্ট গলায় সে শুধু উচ্চারণ করল, “ডায়েরি... ডায়েরির বারো নম্বর পৃষ্ঠা... আয়ান, তোমার বাবা... ওটা সত্যি নয়...”

​কথাটা শেষ করার আগেই ইনায়ার মাথাটা নেতিয়ে পড়ল আয়ানের বুকে।

​আয়ানের বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো বরফ দিয়ে চিরে দিল। বারো নম্বর পৃষ্ঠা? তার বাবার মৃত্যুর পেছনের সত্য কি তবে অন্য কিছু? চৌধুরী পরিবারের যে অভিশাপ আর বিশ্বাসঘাতকতার গল্প সে জেনে এসেছে, তার পুরোটাই কি কোনো সাজানো নাটক?

​“আয়ানকে জ্যান্ত চাই! চৌধুরী সাহেবের কড়া নির্দেশ, ওকে ধুঁকে ধুঁকে মারতে হবে!” দরজার কাছ থেকে গমগম করে উঠল কালো পোশাকধারী দলের প্রধানের গলা।

​কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আবার কেঁপে উঠল দরগাহর বাতাস।


​এবার গুলি এল বাইরে থেকে। তবে এবার কোনো পুলিশের সাইরেন নয়, আসল পুলিশ দল প্রখর আলোর ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে এস্টেট ঘিরে ফেলেছে।

লাউডস্পিকারে বিকট আওয়াজ ভেসে এল, “ভেতরে যারা আছেন, অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করুন! পুরো এলাকা পুলিশ ঘিরে ফেলেছে!”

​আকস্মিক এই আক্রমণে ব্যাকআপ টিমের ভেতরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো।

বাইরে থেকে পুলিশের অনবরত গুলিবর্ষণে তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল।

​রশীদ এই অরাজকতার সুযোগ নিল। র*ক্তা*ক্ত কবজি চেপে ধরে সে আয়ানের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হেসে বলল, “খেলা মাত্র শুরু হলো ছোট চৌধুরী! তোর বাবার রক্তে যে অভিশাপ আছে, তা তোকে গ্রাস করবেই!”

​বলতে বলতেই রশীদ ঘরের গোপন সুরঙ্গের দরজার দিকে ধেয়ে গেল এবং এক নিমেষে অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। মুখোশধারী লোকটাও তার দলের লোকজনের আড়ালে পেছনে হটতে হটতে হারিয়ে গেল দরগাহর ধ্বংসাবশেষের ভেতরে।

​ঘরের ধোঁয়া কিছুটা কাটতেই পুলিশ এস্টেটের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল।
​“হ্যান্ডস আপ!”

​আয়ান পিস্তলটা মাটিতে ফেলে দিয়ে ইনায়ার নিথর শরীরটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখল। বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে।

চৌধুরী এস্টেটের এই পুরনো দেওয়ালগুলো যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমানো কোনো বীভৎস রহস্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

​আয়ান জানে, সে বেঁচে গেছে। কিন্তু রক্তে ভেজা ডায়েরিটা তার বুকে ভার হয়ে চেপে বসছে। ইনায়ার শেষ কথাগুলো তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাড়ি মারছে—‘ডায়েরির বারো নম্বর পৃষ্ঠা... তোমার বাবা... ওটা সত্যি নয়...’

​সত্যি যদি ওটা না হয়, তবে গত তেরো বছর ধরে সে যার প্রতিশোধ নিতে জীবন বাজি রেখেছে, সেই শত্রু কে?

​(চলবে...)

লাইক কমেন্ট করতে কিপটামো করবেন না 🤭। ভালো লাগলে
Urmila Akter পেজটাই ফলো দিয়েন।

#আমার_বউ
#লেখনীতে_Urnila_Akter
#পর্ব:২৫

আয়ানের ঘাড়ের চামড়ায় চেপে বসা রিভলভারের শীতল ধাতব স্পর্শ যেন তার রক্তপ্রবাহ স্তব্ধ করে দিল। কণ্ঠস্বরটি অচেনা নয়। বিগত পাঁ...
31/07/2026

আয়ানের ঘাড়ের চামড়ায় চেপে বসা রিভলভারের শীতল ধাতব স্পর্শ যেন তার রক্তপ্রবাহ স্তব্ধ করে দিল। কণ্ঠস্বরটি অচেনা নয়। বিগত পাঁচটা বছর ধরে যে লোকটার সঙ্গে সে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অন্ধকার জগতের অপরাধীদের ওপর নজর রেখে এসেছে, যে লোকটাকে সে নিজের সবচেয়ে আস্থাভাজন সহযোগী—এমনকি বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করে এসেছে, সেই আজ তার পেছনে বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে।
আয়ানের ঘাড়ের চামড়ায় চেপে বসা রিভলভারের শীতল ধাতব স্পর্শ যেন তার রক্ত*প্রবাহ স্তব্ধ করে দিল। কণ্ঠস্বরটি অচেনা নয়।

বিগত পাঁচটা বছর ধরে যে লোকটার সঙ্গে সে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অন্ধকার জগতের অপরাধীদের ওপর নজর রেখে এসেছে, যে লোকটাকে সে নিজের সবচেয়ে আস্থাভাজন সহযোগী—এমনকি বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করে এসেছে, সেই আজ তার পেছনে বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে।

​“রশীদ ভাই...?” আয়ানের কণ্ঠস্বর ধরে এল। শব্দটা বুক চিরে যেন এক চিলতে অবিশ্বাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয়ে এল।

​পেছন থেকে এক চিলতে শীতল হাসির শব্দ ভেসে এল। রশীদ কিছুটা এগিয়ে এসে আয়ানের পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। তার হাতে কালান্তক অবয়বে ধরা একটা রিভলভার। রশীদের মুখে নেই কোনো দ্বিধা, নেই কোনো অনুশোচনা—বরং ফুটে উঠেছে এক হিংস্র, কুটিল তৃপ্তি।

​“দুঃখিত আয়ান,” রশীদ ঠাণ্ডা গলায় বলল, “তুমি সত্যিই একজন দুর্দান্ত ট্র্যাক আর্ট; কোনো কেস তোমার হাত থেকে রেহাই পায় না। কিন্তু নিজের অতীতের রহস্য ভাঙতে গিয়ে যে তুমি নিজের চারপাশে বিছানো জালের ভেতরেই হেঁটে ঢুকে পড়বে, তা ভাবিনি।”

​আয়ানের চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে শক্ত করে ধরে থাকা অস্ট্রিয়ান গ্লক-১৭ পিস্তলের গ্রিপে তার আঙুলের চাপ বাড়ল। কিন্তু তার চোখের সামনে এখন দুটো চরম ঝুঁকি—একদিকে ঘাড়ে রশীদের লোডেড রিভলভার, অন্যদিকে কয়েক গজ দূরে লিভারে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কাঠের মুখোশধারী সাইকোপ্যাথ। সামান্যতম ভুল পদক্ষেপে মুহূর্তের মধ্যে ঝুলে পড়তে পারে ইনায়ার অচেতন দেহ।

​“তেরো বছর ধরে রশীদ... তেরো বছর ধরে আমি চৌধুরী বাড়ির খুনিদের খুঁজেছি,” আয়ানের চোখ দুটো হিংস্র বাঘের মতো জ্বলে উঠল, “আর তুই এতদিন ধরে আমার পাশেই ছিলি? আমার প্রতিটা পদক্ষেপের খবর ওদের হাতে তুলে দিয়েছিস?”

​“টাকা আর বংশের ঋণ বড় অদ্ভুত জিনিস, আয়ান,” রশীদ ধীরপায়ে আয়ানের ডান পাশে গিয়ে দাঁড়াল, চোখ তার আয়ানের ডান হাতের দিকে।

“তোমাকে এতদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল চৌধুরী বংশের শেষ গোপন সম্পদের সন্ধান পাওয়ার জন্য । আমরা জানতাম, তোমার বাবা মৃত্যুর আগে ওটা চৌধুরী বাড়ি থেকে সরিয়ে কোনো এক গোপন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিলেন। আর সেই খবর শুধু তোমার বাবার সেই দিনকার রক্তে লেখা ডায়েরিতে ছিল, যা তেরো বছর ধরে তুমি আগলে রেখেছ।”

​ঠিক সেই মুহূর্তে চৌধুরী এস্টেটের স্যাঁতসেঁতে মেঝের ধুলো উড়িয়ে এক পশলা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেল। দরগাহর বারান্দায় ঝুলে থাকা শ্যাওলা ধরা পুরনো লণ্ঠনটা দুলতে শুরু করল, আর তার হলুদ আলো-ছায়ায় মুখোশধারীর রক্তচক্ষু দানবের প্রতিকৃতিটা যেন আরও বীভৎস রূপ নিল।

​মুখোশধারী লোকটা বাঁকা ছুরিটার চকচকে ফলা দিয়ে ইনায়ার থুতনিটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। ইনায়ার কপাল থেকে চুইয়ে পড়া র*ক্তের এক ফোঁটা র*ক্ত তার নীল জামা ভিজিয়ে মেঝের লাল মাটিতে এসে পড়ল।

​“সব সত্য এত সহজে শেষ হয় না, আয়ান,” মুখোশধারী কর্কশ গলায় হেসে উঠল। “তুই ভেবেছিলি তেরো বছর আগে কেবল তোর বাবা শফিক চৌধুরীকেই বলি দেওয়া হয়েছিল? না! চৌধুরী বংশের রক্তকূপ এত ছোট নয়। তোর বাবা আর চৌধুরী বাড়ির তৎকালীন কর্তা—দুজনেই এই অভিশপ্ত শক্তির গোপন চাবিকাঠির পেছনে ছিলে। কিন্তু তোর বাবা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তিনি নীলকান্তমণির সিলমোহরটা চুরি করে তোকে নিয়ে পালিয়েছিলেন।”

​কথাগুলো আয়ানের কানে যেন ফুটন্ত সিসার মতো বিঁধল। মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল। সে অস্ফুটে বলে উঠল, “আমার বাবা... এই চৌধুরী বংশের লোক ছিলেন?”

​“হা হা হা!” মুখোশধারীর অট্টহাসিতে দরগাহর দেওয়ালে আটকে থাকা পুরনো বাদুড়গুলো আবার ডানা ঝাপটে উঠল। “তোর ধমনীতে যে রক্ত বইছে, সেই একই রক্ত বইছে এই অর্ধমৃত মেয়েটার শরীরেও!

ইনায়া চৌধুরী তোর সৎ বোন, আয়ান! যে রক্তের বদলা নিতে তুই তেরো বছর ধরে রক্তচক্ষু শিকারী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, তুই নিজেই সেই অভিশপ্ত রক্তের অন্যতম শেষ রক্তবীজ!”

​আয়ানের ভেতরের পৃথিবীটা যেন নিমেষেই চুরমার হয়ে গেল। বুকের ভেতর এক অবর্ণনীয় শূন্যতা সৃষ্টি হলো। যার ওপর সে নিজের জীবন সঁপে দিয়েছিল, যাকে সে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছে—সে ইনায়া... তার রক্তের সম্পর্ক? নাকি এটা পুরোটাই তাকে মানসিকভাকে ভেঙে ফেলার একটা কুটিল মনস্তাত্ত্বিক খেলা?

​ইনায়া ধুঁকতে ধুঁকতে চোখের পাতা সামান্য মেলল। তার নীল পোশাক র*ক্তে ভেজা, শরীর থেকে জীবনের শেষ শক্তিটুকু নিভে আসছে।

সে একদৃষ্টিতে আয়ানের দিকে তাকিয়ে কাঁপা ঠোঁটে ফিসফিস করে বলল, “আ... আয়ান... ওদের বিশ্বাস কোরো না... ডায়েরিটা... ডায়েরিটা ওদের হাতে পড়তে দিও না...”

​“চুপ কর!” মুখোশধারী গর্জে উঠে এক ঝটকায় ইনায়ার চুল ধরে টানে।
​আর ঠিক তখনই, শতাব্দীর সেই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের সুযোগটা নিল আয়ান!

​মানসিক ধাক্কাকে পাশ কাটিয়ে তার বহু বছরের প্রশিক্ষিত চোখ আর শার্পশুটার রিফ্লেক্স মুহূর্তের মধ্যে জেগে উঠল। মুখোশধারী যখন ইনায়ার ওপর ক্ষণিকের জন্য মনোযোগ হারাল, আর রশীদ যখন বিজয়ের আনন্দে সামান্য অসাবধান হয়ে পড়ল—আয়ান বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করল না।

​আয়ান নিজের দেহটা এক অবিশ্বাস্য গতিতে বাঁ দিকে ঘুরিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। একই সাথে তার জ্যাকেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো গ্লক-১৭ পিস্তল। অন্ধকারের বুক চিরে প্রথম গুলিটা রশীদের রিভলভার ধরা ডান হাতের কবজি ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল।

​“আহহহ!” রশীদের আর্তচিৎকারে কেঁপে উঠল দরগাহ। হাত থেকে ছিটকে গেল তার রিভলভার।

​কিন্তু লড়াই কেবল শুরু হয়েছিল।

চলবে....

--------- ------------
অন্ধকারের বুক চিরে ফিনকি দিয়ে র*ক্ত ছুটে এল রশীদের কবজি থেকে। কিন্তু আয়ান এক সেকেন্ডের জন্যও থামল না। রিফ্লেক্স অ্যাকশন তাকে চালিত করছে এক যান্ত্রিক নিখুঁততায়—বুকের ভেতর জমা হওয়া শত শত অনুভূতির ঝড়কে সে এক নিমেষে ঠেলে দিল মনের গহীনে। এখন কান্নাকাটি বা ভাবার সময় নয়, এখন বাঁচার আর বাঁচানোর সময়।

অন্ধকারের বুক চিরে ফিনকি দিয়ে র*ক্ত ছুটে এল রশীদের কবজি থেকে। কিন্তু আয়ান এক সেকেন্ডের জন্যও থামল না। রিফ্লেক্স অ্যাকশন তাকে চালিত করছে এক যান্ত্রিক নিখুঁততায়—বুকের ভেতর জমা হওয়া শত শত অনুভূতির ঝড়কে সে এক নিমেষে ঠেলে দিল মনের গহীনে। এখন কান্নাকাটি বা ভাবার সময় নয়, এখন বাঁচার আর বাঁচানোর সময়।

​রশীদের আর্তচিৎকারের সাথেই আয়ান মেঝের স্যাঁতসেঁতে ধুলোয় শরীর গড়িয়ে দিল ডান দিকে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই মুখোশধারীর হাতের বাঁকা ছুরিটা ফাঁকা বাতাসে সোঁ সোঁ শব্দ তুলে আয়ানের জ্যাকেটের কাঁধের অংশ চিরে দিল। কয়েক মিলিমিটারের জন্য রক্ষা পেল তার ঘাড়!

​“শয়*তানের দল!” আয়ান চিৎকার করে উঠে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার গ্লক-১৭ পিস্তলের নল এখন সরাসরি মুখোশধারীর বুক বরাবর।

​কিন্তু চতুর মুখোশধারী এক মুহূর্তে ইনায়ার র*ক্তা*ক্ত শরীরটাকে ঢাল হিসেবে টেনে নিল নিজের সামনে। তার হাতের ধারালো ছুরিটা ইনায়ার গলায় চেপে ধরে পৈশাচিক গলায় হেসে উঠল, “এক চুল এদিক-ওদিক হলে এই মেয়ের শ্বাসনালী দু’ফাঁক হয়ে যাবে, আয়ান!

গুলি কর, সাহস থাকলে গুলি কর!”

​আয়ানের পিস্তল ধরা হাতটা থরথর করে কেঁপে উঠল।

ইনায়া… কি তার সত্যি বোন? নাকি তার ভালোবাসার মানুষ? এই মুহূর্তে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ নেই, কিন্তু ইনায়াকে সে চোখের সামনে শেষ হতে দিতে পারে না। ইনায়ার ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো আয়ানের দিকেই স্থির। রক্তে ভেজা ঠোঁট দুটো নিঃশব্দে যেন বলছে—‘আমাকে নিয়ে ভেবো না...’

​মেঝের ওপর লুটিয়ে থাকা রশীদ ততক্ষণে তার বাম হাত দিয়ে ছিটকে যাওয়া রিভলভারটার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত ডান হাত থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে, কিন্তু তার চোখে প্রতিশোধের আগুন।

​“আয়ান... তুই আজ এখান থেকে জ্যান্ত ফিরবি না!” রশীদ র*ক্তাঙ্কিত কণ্ঠে গর্জে উঠল।

​হঠাৎ দরগাহর বাইর থেকে কয়েকটা বুটের ভারী আওয়াজ আর গাড়ির হেডলাইটের প্রখর আলো এসে পড়ল ভাঙা জানালায়। সাথে সাথে বেজে উঠল পুলিশের সাইরেনের বিকট শব্দ!

​আচমকা এই পরিবর্তন দেখে মুখোশধারী চমকে উঠল। তার বাঁধন আলগা হওয়ার সেই এক মুহূর্তের অসাবধানতাকে কাজে লাগাল ইনায়া! সমস্ত শক্তি দিয়ে সে তার কনুই দিয়ে মুখোশধারীর পেটে এক সজোর গুঁতো মারল।

​“আহহ!” মুখোশধারী সাময়িকভাবে ভারসাম্য হারাতেই আয়ান আর কোনো চিন্তা করল না।


​আয়ানের গ্লক থেকে ছিটকে যাওয়া গুলিটা নিখুঁতভাবে গিয়ে বিঁধল মুখোশধারীর ডান কাঁধে। ছুরিটা হাত থেকে খসে পড়ল মেঝের ওপর। ইনায়া ঢলে পড়ল স্যাঁতসেঁতে মাটিতে।

​“ইনায়া!” আয়ান দ্রুত এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই ছায়ামূর্তির মতো পিছন থেকে রশীদ তার বাম হাতে কুড়িয়ে নেওয়া রিভলভার দিয়ে গুলি চালিয়ে দিল!


​আয়ানের বাঁ পাশ ঘেঁষে গুলিটা দেওয়ালের পলেস্তারা উড়িয়ে দিল। আয়ান এক মূহুর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে রশীদের বুকের দিকে পিস্তল তাক করল।

​“খেল শেষ, রশীদ ভাই,” আয়ানের গলা হিংস্র শোনালো, “তেরো বছরের বিশ্বাসঘাতকতার জবাব এবার পাবি।”

​কিন্তু গুলি করার আগেই চৌধুরী এস্টেটের বিশাল কাঠের দরজাটা সজোরে ভেঙে পড়ল। ধোঁয়া আর ধুলোর আড়ালে বেশ কিছু সশস্ত্র লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু তারা পুলিশ নয়! তাদের পরনে কালো পোশাক, হাতে অত্যাধুনিক সাব-মেশিন গান।

​মুখোশধারী লোকটা রক্তা*ক্ত কাঁধ চেপে ধরে পৈশাচিক হেসে বলল, “বলেছিলাম না আয়ান, চৌধুরী বংশের খেলা এত সহজে শেষ হয় না! ব্যাকআপ টিম পৌঁছে গেছে।”

​কালো পোশাকধারী লোকগুলো একযোগে আয়ানের দিকে বন্দুক তাক করল। একদিকে রক্তা*ক্ত ইনায়া, অন্যদিকে রশীদ আর এই নতুন আততায়ীর দল। আয়ান বুঝল, র*ক্তে লেখা ডায়েরির আসল খেলাটা এখন কেবল দ্বিতীয় অঙ্কে প্রবেশ করল!

​(চলবে...)

(গল্প একটু দেরি করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত। কিন্তু আপনাদের রেসপন্স তেমন পাচ্ছি না। Urmila Akter পেজটা ফলো দিয়ে পাশে থাকবেন। হ্যাপি রিডিং)

#আমার_বউ

#লেখনীতে_Urmila_Akter
পর্:২৩+২৪

গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা তখন ১৫০ ছুঁইছুঁই। উইন্ডশিল্ডে আঁধার চিরে আছড়ে পড়ছে গাড়ির হেডলাইটের প্রখর আলো। ব্ল্যাক এসইউভি-র...
26/07/2026

গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা তখন ১৫০ ছুঁইছুঁই। উইন্ডশিল্ডে আঁধার চিরে আছড়ে পড়ছে গাড়ির হেডলাইটের প্রখর আলো। ব্ল্যাক এসইউভি-র গর্জন যেন পুরো হাইওয়ের স্তব্ধতাকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছিল। কিন্তু আয়ানের মাথার ভেতর ঝড়ের গতিতে ঘুরছিল কেবল একটা কথা—“হাতে মাত্র দুই ঘণ্টা সময়।”

গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা তখন ১৫০ ছুঁইছুঁই। উইন্ডশিল্ডে আঁধার চিরে আছড়ে পড়ছে গাড়ির হেডলাইটের প্রখর আলো।

ব্ল্যাক এসইউভি-র গর্জন যেন পুরো হাইওয়ের স্তব্ধতাকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছিল। কিন্তু আয়ানের মাথার ভেতর ঝড়ের গতিতে ঘুরছিল কেবল একটা কথা—“হাতে মাত্র দুই ঘণ্টা সময়।”

​ড্যাশবোর্ডের ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই আয়ানের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে এল। রাত বারোটা বেজে পঁয়তাল্লিশ। বাতাসে এক বিষাক্ত আর্দ্রতা, যেন কালবৈশাখীর আগের স্তব্ধতা।

গাড়িটা যখন জাতীয় মহাসড়ক ছেড়ে ধুলোবালি ভরা, এবড়োখেবড়ো কাঁচা রাস্তায় মোড় নিল, চারপাশের পরিচিত শহরের দৃশ্যপট নিমেষেই বদলে গেল।

লাল মাটির মেঠো পথ। চাকার নিচে শুষ্ক মাটি গুঁড়ো হয়ে বাতাসে উড়ছে, আর হেডলাইটের আলোয় ভেসে উঠছে রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জংলি কৃষ্ণচূড়া আর বিশাল বিশাল অশ্বত্থ গাছ—যেন একদল কালো পোশাকের প্রহরী নিশব্দে পথ ছেড়ে দিচ্ছে আয়ানকে।

​স্মৃতিগুলো বিষাক্ত সাপের মতো কামড় বসাচ্ছিল আয়ানের মগজে। এই সেই পথ। তেরো বছর আগে ঠিক এই মেঠো পথেই ভেসে এসেছিল তাজা রক্তের গন্ধ আর শ্মশানের পোড়া কাঠ। ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে।

তফাৎ শুধু একটাই—তেরো বছর আগে সে ছিল এক অসহায় বালক, আর আজ সে রক্তের বদলা নিতে আসা এক হিংস্র শিকারী।

​হঠাৎ করেই ড্যাশবোর্ডে রাখা আয়ানের ফোনটা আবার জ্বলে উঠল। কিন্তু এবার কোনো রিংটোন বাজল না, কেবল স্পিকারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেসে এল সেই কর্কশ, খসখসে কণ্ঠস্বর—

"গতি আরেকটু বাড়াও, আয়ান। তোমার ভালোবাসার মেয়েটার শরীর থেকে কিন্তু ফোঁটা ফোঁটা লাল রং ঝরে পড়ছে। সময় বড্ড কম!"

​"তোর পরিচয় যা-ই হোক, আজ তোকে বাঁচানোর মতো কেউ পৃথিবীতে নেই!" দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল আয়ান। সে এক্সিলারেটরে চাপ পুরোপুরি বাড়িয়ে দিল।

​পনেরো মিনিট পর।

​গাড়িটা এসে থামল এক বিশাল, জরাজীর্ণ গেটের সামনে। ভাঙা পাথরের খিলানের ওপর অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা—'চৌধুরী এস্টেট'।

বহু বছরের পুরনো জমিদার বাড়ি। শ্যাওলা ধরা বিশালাকার থাম আর ধসে পড়া দরগাহর অবয়বটা ঘন অন্ধকারের বুকেও এক গা ছমছমে রাজত্ব তৈরি করে রেখেছে। চারপাশ এতটাই নিঝুম যে আয়ানের নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দও যেন তার কানে ড্রামের মতো বাজছিল।

​আয়ান গাড়ি থেকে নামল। তার ডান হাত সোজা চলে গেল জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে—অস্ট্রিয়ান গ্লক-১৭ পিস্তলটার গ্রিপে আঙুল পেঁচিয়ে ধরে সে পা বাড়াল।

​ভেজা ঘাস আর ঝরা পাতার ওপর আয়ানের বুটের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে উঠল এক বিদঘুটে, মিষ্ট গন্ধ আর সেই বিষাদময় চেনা সুরেরটানে। সুরটা যেন কোনো বাঁশির নয়, কোনো অতিলৌকিক অস্তিত্বের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসছে।

​দরগাহর ভাঙা বারান্দায় পা রাখতেই আয়ানের চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল।

​ঘরের মাঝখানে কাঠের একটা পুরনো চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ঝুলে আছে ইনায়া।

তার পরনের নীল পোশাকটা রক্তে ছোপ ছোপ হয়ে গেছে, মাথাটা বুকের ওপর হেলে পড়ে আছে—অচেতন।

ইনায়ার মাথার ওপর সিলিং থেকে ঝুলছে একটা দড়ি, যার অন্য প্রান্ত বাঁধা রয়েছে ঘরের কোণে রাখা এক বিশালাকার, মরচে ধরা লোহার লিভারের সাথে।

​আর ঠিক ইনায়ার পেছনের আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে সেই অবয়ব।

গায়ে কালো আলখাল্লা, মুখে কাঠের তৈরি এক অদ্ভুত মুখোশ—যাতে আঁকা রয়েছে এক হিংস্র রক্তচক্ষু দানবের মুখ। তার ডান হাতে একটা চকচকে বাঁকা শিকারী ছুরি, যার ডগা দিয়ে তখনও টপ টপ করে রক্ত ঝরছে।

​"ইনায়া!" আয়ান চিৎকার করে এক পা এগোতেই মুখোশধারী লোকটা খিকখিক করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো মানবীয় অনুভূতি ছিল না, ছিল নিখাদ উন্মাদনা।

​"এক পা-ও এগোবি না, শিকারী!" মুখোশধারীর কণ্ঠ দরগাহর স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে এল। "তুই তোর পিস্তলে হাত দিলেই এই লিভারটা পড়ে যাবে। আর তার এক সেকেন্ডের মধ্যে এই দড়ি ইনায়ার গলার হাড় গুঁড়ো করে দেবে। পরীক্ষা করে দেখবি নাকি?"

​আয়ান থেমে গেল। তার পিস্তল ধরা হাতটা জমে বরফ হয়ে গেছে। সে চোখের কোণ দিয়ে চারপাশটা মেপে নেওয়ার চেষ্টা করল। লোকটার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, পায়ের ছাপ, আর কথা বলার ধরন—সবকিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর প্রশিক্ষণ। এটি কেবল কোনো সাইকোপ্যাথের কাজ নয়, এটি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ।

​"কী চাস তুই?" আয়ানের কণ্ঠ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছিল। "আমার সাথে তোর শত্রুতা! ইনায়াকে কেন টেনে আনছিস মাঝখানে?"

​"ইনায়া?" মুখোশধারী এবার হা-হা করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে দরগাহর ছাদ থেকে দুটো বাদুড় ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। "তুই এখনও অন্ধ হয়ে আছিস, তাই না আয়ান? তুই ভাবছিস ইনায়া নিছকই এক নির্দোষ মেয়ে, যাকে তুই ভালোবেসে উদ্ধার করতে এসেছিস? জিজ্ঞেস কর তোর রক্তকে! জিজ্ঞেস কর এই চৌধুরী বাড়ির মাটিকে!"

​মুখোশধারী এক পদক্ষেপে ইনায়ার চুলগুলো চেপে ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। ইনায়ার কপাল থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে, কিন্তু তার চোখ দুটো আধবোজা—সে হালকা জ্ঞান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।

​"ইনায়ার জন্মসূত্র কী, তা তুই জানিস না আয়ান," মুখোশধারী ফিসফিস করে উঠল, "যে রক্তের খোঁজে তোর বাবা তেরো বছর আগে এই দরগাহতে খুন হয়েছিলেন... ইনায়ার ধমনীতে বইছে ঠিক সেই অভিশপ্ত চৌধুরী বংশের রক্ত! তুই যাকে বাঁচাতে নিজের জীবন দিচ্ছিস, সে তোর পিতার খুনি বংশের শেষ উত্তরাধিকারী!"

​কথাটা শোনামাত্র আয়ানের মাথার ভেতরে যেন হাজারটা বাজ একসাথে ভেঙে পড়ল। তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। ইনায়া... চৌধুরী বংশের মেয়ে? যে রক্ত চেনার জন্য সে তেরো বছর ধরে অন্ধকার জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেই রক্তই তার এত কাছাকাছি ছিল?

​"মিথ্যা... সব মিথ্যে!" আয়ান চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তার নিজের কণ্ঠেই এক অতল সংশয় ফুটে উঠল।

​"বিশ্বাস হচ্ছে না?" মুখোশধারী বাঁকা চোখে হাসল। "তাহলে ওড়নাটার নিচে ইনায়ার ঘাড়ে থাকা ওই উল্কিটা দ্যাখ! যে চিহ্ন কেবল চৌধুরী বাড়ির রক্তে জন্মানো মেয়েদের শরীরে আঁকা থাকে!"

​আয়ান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ইনায়ার দিকে। ইনায়া ধুঁকতে ধুঁকতে কোনোমতে চোখ মেলে তাকাল। তার রক্তাক্ত ঠোঁট দুটো সামান্য কেঁপে উঠল—"আ-আয়ান... পালিয়ে যাও... এটা একটা... ট্র্যাপ..."

​ঠিক সেই মুহূর্তে, আয়ানের মাথার পেছনে একটা ঠাণ্ডা ধাতব স্পর্শ অনুভূত হলো।

​কেউ একজন এতক্ষণ নিশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর তার ঘাড়ের কাছে চেপে বসেছে একটা লোডেড রিভলভারের নোল।

​"খেল শেষ, আয়ান," পেছন থেকে ভেসে এল আরও একটা চেনা কণ্ঠস্বর।

সেই কণ্ঠ শুনে আয়ানের মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
​কণ্ঠটা তার খুব পরিচিত। এতটাই পরিচিত যে আয়ানের হাতের পিস্তলটা সামান্য কেঁপে উঠল।

​(চলবে...)

গল্পটা যারা পড়বেন তারাই লাইক,কমেন্ট করে রেসপন্স করবেন। আপনারা বেশি বেশি রেসপন্স করলে লিখতেও ভালো লাগে। সব সময় সাথে থাকতে Urmila Akter পেজটি ফলো করে দিয়েন। হ্যাপি রিডিং.....

#আমার_বউ
#লেখনীতে_Urmila_Akter
পর্ব:২২

আয়ানের বুকের ভেতরটা মুহূর্তের জন্য যেন হিম হয়ে গেল। বাগানের ওই রহস্যময় অবয়বটার বিশ্রী, উন্মাদ হাসি অন্ধকারের ঘন ছায়ায় মি...
23/07/2026

আয়ানের বুকের ভেতরটা মুহূর্তের জন্য যেন হিম হয়ে গেল। বাগানের ওই রহস্যময় অবয়বটার বিশ্রী, উন্মাদ হাসি অন্ধকারের ঘন ছায়ায় মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আয়ান এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে পেছনে ঘুরে তীব্র গতিতে ভেতরে দিকে ছুটল।

​পেছনের ফ্রেঞ্চ উইন্ডো পার হয়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার চোখে পড়ল দোতলার ল্যান্ডিংয়ের দৃশ্যটা।

সিঁড়ির শেষ ধাপে বড় কাঁচের ঝুলন্ত ঝাড়বাতিটা ভেঙে ছাই হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে, আর চারপাশ ঘিরে ধরেছে এক গা ছমছমে অন্ধকার। করিম চাচা আর এক গার্ড সিঁড়ির নিচে মাথায় হাত দিয়ে অবচেতন হয়ে পড়ে আছে—কারো মাথার পেছন থেকে গলগল করে রক্ত গড়াচ্ছে।

​"ইনায়া!
" আয়ান এক লাফে সিঁড়ির তিন-চারটে ধাপ পেরিয়ে দোতলায় উঠে এল। তার হাতের পিস্তলের গ্রিপ শক্ত হয়ে জমে গেছে।

​দিদার ঘরের দরজাটা খোলানো, কিন্তু কাঠের শক্ত ফ্রেমটা যেন ভেতর থেকে কোনো দানবীয় শক্তিতে চুরমার করে ভেঙে ফেলা হয়েছে! দরজার ঠিক বাইরেই মায়রা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে, তার কপাল কেটে রক্তে লাল হয়ে গেছে ফর্সা গাল।

​ঘরের ভেতর ঢুকেই আয়ানের নিঃশ্বাস আটকে গেল।

​দিদা এক কোণে হাত-পা কাঁপাতে কাঁপাতে মেঝেতে বসে আছেন, মুখে কোনো শব্দ ফুটছে না—শুধু আঙুল উঁচিয়ে পেছনের ব্যালকোনির খোলা দরজার দিকে দেখাচ্ছেন। ব্যালকোনির ভারী পর্দাটা বাতাসে আছাড়িপিছাড় খাচ্ছে, আর ব্যালকোনির বাইরে ঝুলতে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের মোটা ডালটার পাতাগুলোর দুলুনি জানান দিচ্ছে—মুহূর্ত কয়েক আগেই সেখান দিয়ে কেউ নিচে নেমে গেছে।

​ইনায়া ঘরে নেই।

​মেঝেতে পড়ে আছে শুধু ইনায়ার হাতের নীল রঙের ওড়নাটা, আর তার ঠিক পাশেই তাজা রক্তের লাল ফোঁটা।

​"আ-আয়ান..." দিদা ধুঁকতে ধুঁকতে কোনোমতে ফুঁপিয়ে উঠলেন, "ওরা... ওরা ছাদের ওপর থেকে নেমে এসেছিল... ওরা ইনায়াকে চটের বস্তার মতো কাঁধে তুলে..."

​কথা শেষ করার আগেই আয়ানের মোবাইলটা পকেটে আবার ভাইব্রেট করে উঠল। আননোন নম্বর।

​আয়ান কাঁপতে থাকা আঙুলে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল। অপরপাশ থেকে কোনো কথা এলো না, কেবল ভেসে এলো সেই চেনা, বিষাদময় অতিলৌকিক সুরের একটা ছোট টান। তারপরই সেই খসখসে, ভুতুড়ে গলা—
​"তুই শিকারী হতে চেয়েছিলি না, আয়ান? এবার আয়... তোর অতীতের সেই লাল মাটির মেঠো পথে।

ইনায়ার রক্ত কিন্তু তার জন্মসূত্রে পাওয়া অতীতেই টানছে তাকে। হাতে মাত্র দুই ঘণ্টা সময়। যদি তোর ভালোবাসা সত্যি হয়, তবে একা আসবি। পুলিশ বা সিকিউরিটি ডাকলে... ইনায়ার লাশটা হয়তো পাবি, কিন্তু প্রাণটা পাবে না।"
​কলটা কেটে গেল।

​আয়ান নিচে নেমে এসে মায়রা আর করিম চাচাকে তুলল। বাড়ির অন্য সিকিউরিটি টিম ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আশিক ভয়ে ফ্যাকাশে মুখে ছুটে এসে বলল, "স্যার! পেছনের দেওয়াল টপকে একটা কালো গাড়ি তীব্র গতিতে হাইওয়ের দিকে গেছে। আমরা পিছু নিচ্ছি!"

​"না!" আয়ান হুঙ্কার দিয়ে উঠল, তার কন্ঠে এক দানবীয় হিংস্রতা। "কেউ আমার পিছু আসবে না। আশিক, তুই মায়রা আর দিদাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর। আর বাড়ির চারপাশে কড়া পাহারা রাখ।"

​"কিন্তু স্যার, আপনি একা?"

​আয়ান কোনো জবাব দিল না। সে গাড়ির চাবিটা তুলে নিয়ে গ্যারেজের দিকে হাঁটা দিল। তার ব্ল্যাক এসইউভি গাড়ির ইঞ্জিনটা গর্জে উঠল।

​গাড়ির স্ট্রিয়ারিং হুইলটা এত জোরে চেপে ধরল যে আয়ানের হাতের রগগুলো নীল হয়ে ফুটে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে বহু বছর আগের সেই স্মৃতি—লাল মাটির সোঁদা গন্ধ, পুরানো জমিদার বাড়ির ভাঙা দরগাহ, আর রক্তের ছোপ। ইনায়া যে অতীতের কথা কিছুই জানে না, সেই অন্ধকারই আজ তাকে গ্রাস করতে এসেছে।

​গাড়িটা ঝড়ের গতিতে মেন গেট পার হয়ে অন্ধকার রাতের বুক চিরে ছুটে চলল সেই মেঠো পথের দিকে।

​আয়ান মনে মনে কেবল একটা কথাই পুনরাবৃত্তি করছে—ইনায়া, তোমাকে বাঁচানোর জন্য যদি আমাকে আজ আবার সেই শয়তান হতে হয়, আমি তা-ই হব।

চলবে....

#আমার_বউ
#লেখনীতে_Urmila_Akter
পর্ব:২১

গাড়ির হর্নের বিকট শব্দে নিঝুম রাতের নীরবতাটা এক ছটফটে ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেল।ইনায়ার চোখের পাতা দুটো মৃদু কেঁপে উঠল। আয়ান...
22/07/2026

গাড়ির হর্নের বিকট শব্দে নিঝুম রাতের নীরবতাটা এক ছটফটে ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেল।
ইনায়ার চোখের পাতা দুটো মৃদু কেঁপে উঠল। আয়ানের বুকের গাঢ় উষ্ণতা আর তার চেনা সুবাসের মধ্যে এতক্ষণ যে পরম সুরক্ষার মোহ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তাকে, জানালার ওপাশের এক চিলতে হাওয়া যেন তা উধাও করে দিল।

​আয়ান কিন্তু ঘুমায়নি। ইনায়ার সামান্য নড়াচড়াতেই তার হাত দুটো আরও আঁটসাঁট হয়ে এল রাজকন্যার চারপাশে।

​"ঘুমাও, ইনায়া," আয়ানের গভীর কণ্ঠস্বর রাত বারোটার এই নিস্তব্ধতায় আরও থমথমে শোনালো। "বাইরের শব্দে কান দিয়ো না।"

​"আয়ান... নিচে কিছু একটা গাড়ি থামল না?"

ইনায়া সোজা হয়ে বসল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। নীল নাইট ল্যাম্পের আবছা আলোয় তার চোখ দুটো আবার সেই পরিচিত আতঙ্কে চওড়া হয়ে উঠেছে।

​আয়ান কোনো কথা বলল না। ধীরস্থিরভাবে বিছানা থেকে উঠে
দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে কোনো অস্থিরতা নেই, কিন্তু চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। ট্রাউজারের পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দেখা গেল স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে আশিকের কল।

​ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে আশিকের উত্তেজিত গলা ভেসে এল, "স্যার! সিসিটিভি ফুটেজে এক আজব জিনিস ধরা পড়েছে। আপনার বাড়ির তিন নম্বর সিকিউরিটি ক্যামেরার ঠিক ডেড-জোনে আধঘণ্টা আগে একটা কালো হূডি পরা লোক এসে দাঁড়িয়েছিল। লোকটা সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়েছে... আর তার হাতে একটা জিনিস ছিল ঠিক তেমন বোঝা যাচ্ছে না।

​শুনতেই আয়ানের হাত দুটো মুহূর্তের জন্য জমে গেল। বহু বছর আগে ফেলে আসা সেই মেঠো পথ, লাল মাটির সোঁদা গন্ধ আর রক্তের দাগ মাখা সেই অন্ধকার অতীত—সব যেন এক নিমেষে ড্রয়িংরুমের কাঁচ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

​"আশিক, গেটের লোকজনকে অলার্ট করো। আর করিম চাচাকে বলো নিচের দরজার ডাবল লক যেন ফেলে দেয়," শান্ত অথচ হিমশীতল গলায় নির্দেশ দিল আয়ান। "আমি নিচে আসছি।"

​ইনায়া বিছানা থেকে নেমে এসে আয়ানের টি-শার্টের হাতা চেপে ধরল। "তুমি নিচে যাচ্ছ? আমাকে একা রেখে যেও না, প্লিজ! আমার... আমার খুব ভয় করছে আয়ান।"

​আয়ান ঘুরে দাঁড়াল। ইনায়ার আতঙ্কিত মুখের দিকে তাকিয়ে তার কঠোর চাহনি নিমেষে কোমল হয়ে এল। সে দুই হাতে ইনায়ার মুখটা তুলে ধরে কপালে এক দীর্ঘ স্পর্শ দিল।

​" এই আয়ান বেঁচে থাকতে কোনো ছায়া তোমার ছোঁয়া তো দূরের কথা, তোমার নাম উচ্চারণের সাহসও পাবে না। তুমি মায়রাকে ডেকে নাও, আমি এখনই ফিরে আসছি।"

​কিন্তু আয়ান নিচে নামার আগেই, দোতলার করিডোর ধরে একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝলক ধেয়ে এল। জানালার পর্দাগুলো অস্বাভাবিকভাবে দুলতে শুরু করেছে।

​আর ঠিক তখনই—বাড়ির পেছনের বাগান থেকে ভেসে এল সেই এক অদ্ভুত সুর।

​এক বিষাদময়, অতিলৌকিক শব্দ। যে সুর শুনলে রক্ত জল হয়ে যায়, যে সুর মনে করিয়ে দেয় অবদমিত কোনো ভয়ঙ্কর স্মৃতি।

​ইনায়া দুই হাতে কান চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল, "না! এই সুরটা আমি চিনি! ক্যাম্পাসে... ক্যাম্পাসের লেকের পাড়ে বসে এই সুরটাই বাজানো হচ্ছিল!"

​আয়ানের ভেতরের শান্ত সিংহটা এবার গর্জে উঠল। তার চোখের মণি দুটো হিংস্রতায় লাল হয়ে উঠল। সে এক মুহূর্তে কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে লক রিলিজ করল—যেটা সে সব সময় ঢিলেঢালা টি-শার্টের নিচে লুকিয়ে রাখে।

​"দিদা! মায়রা!" আয়ান হাঁক দিল।

​পরের মুহূর্তেই মায়রা আর দিদা নিজেদের ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল।

মায়রার চেহারা ভয়ে ফ্যাকাশে। "ভাইয়া! এমন সুর... . কে বাজাচ্ছে এই রাতে?"

​"ইনায়াকে দিদার ঘরে নিয়ে যাও। ভেতরের থেকে ছিটকিনি তুলে দাও। করিম চাচা আর দুজন গার্ড দরজার বাইরে থাকবে। খবরদার, আমি না ডাকা পর্যন্ত কেউ বাইরে বের হবে না!" আয়ানের আদেশ শেষ হতে না হতেই সে উল্টো ঘুরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।

​"আয়ান! যেও না! ওটা ফাঁদ হতে পারে!" ইনায়া পেছন থেকে কেঁদে উঠল।

​আয়ান সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একবার পেছনে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সেই ভয়ঙ্কর, নিশ্চিত জয়ের হাসিটা ফুটে উঠল।

​"ফাঁদ যদি হয়েও থাকে ইনায়া... শিকার কে আর শিকারী কে, সেটা আজ রাতেই ফয়সালা হবে।"

​আয়ান এক তলায় নেমে সোজা পেছনের বাগানের ফ্রেঞ্চ উইন্ডোটার দিকে এগোল। কাঁচের ওপারে ঘন অন্ধকার কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে আবছা একটা লম্বা মূর্তির অবয়ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লোকটার ঠোঁটে এখনও সেই বাঁশি।

​আয়ান কোনো ইতস্তত না করে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোটা এক ধাক্কায় খুলে দিয়ে অন্ধকারের বুকেই পা বাড়াল।

হাতে লোডেড পিস্তল, চোখে অন্যরকমের তেজ।

​"বহু বছর পর দেখা হলো, পুরাতন বন্ধু," আয়ানের শান্ত, হিমশীতল কণ্ঠস্বর রাতের অন্ধকার ভেদ করে গেল। "অবশেষে আলোর মুখোমুখি হতে এল তবে?"

​গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কালচে হূডি পরা অবয়বটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল। অন্ধকারেও তার সাদা বিষাক্ত দাঁতের হাসিটা স্পষ্ট বোঝা গেল।

​"খেলার বোর্ড সাজানো শেষ, আয়ান," এক ভুতুড়ে, খসখসে গলায় লোকটা বলে উঠল। "তুই ভেবেছিলি ইনায়াকে এই তোর কাছে রেখে তুই সব মুছে ফেলবি? কিন্তু ভুলে যাস না—আলো যতই উজ্জ্বল হোক, ছায়ার অস্তিত্ব মিটে যায় না। ইনায়ার রক্তে যা আছে, তা তুই কোনোদিন বদলাতে পারবি না।"

​"মুখের কথা অনেক হয়েছে," আয়ান হাত তুলে পিস্তলটা সোজা লোকটার বুক বরাবর তাক করল। "এখন তোর শেষ বার্তাটা বলে নে।"

​লোকটা একটুও ভয় পেল না। বরং এক অদ্ভুত উন্মত্ততায় হেসে উঠল।

​"আমাকে গুলি করবি? কিন্তু একবার উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলি না তো, আয়ান?"

​আয়ান মুহূর্তের জন্য সতর্ক হতেই ওপরের ঘর থেকে ইনায়ার এক বুক-ফাটা আর্তনাদ ভেসে এল!

​"আয়াননননননন!"

​সিঁড়ির ওপর থেকে কাঁচ ভাঙার শব্দ আর ভারী কিছু আছড়ে পড়ার আওয়াজ ড্রয়িংরুম জুড়ে প্রতিধ্বনি তুলে গেল।

​চলবে...

#আমার_বউ
#লেখনীতে_Urmila_Akter
পর্ব:২০

(যারা পড়নেন বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং.....)

Address

Chuadanga
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Urmila Akter posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category