19/07/2026
#ত্রিলোকপূজিতা শ্রীশ্রীবড়মা—এক অপার্থিব প্রেমের কাব্য
 ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄
শ্রাবণের আকাশ যখন মেঘে ভারী হয়ে আসে, বৃষ্টির ধারা যখন নামে অবিরাম হয়ে, তখনই যেন ফিরে ফিরে আসে সেই স্মৃতি — কারণ শ্রাবণ-ধারাতেই একদিন এই ধরাধামে পা রেখেছিলেন এক নারী, যাঁকে যুগে যুগে জগজ্জননী নামে ডাকা হবে। তিনি জননী ষোড়শীবালা দেবী। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সহধর্মিণী। ভক্তের কাছে চিরপরিচিত এক নামে— শ্রীশ্রীবড়মা।
পরমপুরুষ যখন এই ধরায় অবতীর্ণ হন, তিনি সেই যুগের যুগশ্রেষ্ঠ পুরুষ। আর যে নারী তাঁর সহধর্মিণীরূপে আবির্ভূতা হন, তিনিও স্বভাবতই হয়ে ওঠেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠা নারী। এ কোনো আকস্মিক মিলন নয় — এ বিধিনির্দিষ্ট, বিহিত সাধনার ফসল। যে মহাতপস্বিনী দীর্ঘ সাধনায় যুগগুরুর সহধর্মিণী হবার যোগ্যতা অর্জন করেন, একমাত্র তিনিই সেই আসনে অধিষ্ঠিত হন। শ্রীশ্রীঠাকুর নিজেই একদিন বলেছিলেন — "আপনাদের ঠাকুর যদি নারীদেহ নিয়ে জন্মাতো, তাহলে তাঁর যে রূপ হতো, তা ওই বড়বৌ।"
◉ যেদিন বধূ থেকে হলেন #জগজ্জননী
১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ৬ই চৈত্র, মাতা মনোমোহিনী দেবী — স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুরের জননী — ইহলোকের বাঁধন কাটিয়ে চলে গেলেন চিরদিনের মতো। আশ্রমজুড়ে নেমে এলো শোকের অন্ধকার, প্রতিটি মানুষ যেন হারিয়ে ফেলল মায়ের আশ্রয়, মায়ের আঁচল।
ঠিক সেই বিহ্বল মুহূর্তে হঠাৎ ধ্বনিত হলো ঠাকুরের কণ্ঠস্বর — মেঘগর্জনের মতো ভারী, দৃঢ়, প্রতিটি প্রাণের গভীরে গিয়ে আঘাত করল সেই স্বর। কান্নার স্রোত থমকে গেল মুহূর্তে, শোকের কল্লোল স্তব্ধ হয়ে রইল সেই ধ্বনির সামনে। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনল। ঠাকুর বললেন — "বড়বৌ, আমাদের মা আজ চলে গেলেন। আশ্রমবাসী মাতৃহারা হলো আজ, আশ্রয়চ্যুত হলো তারা। তুমি তাদের মা হও আজ থেকে, আশ্রয় হয়ে দাঁড়াও তাদের। তোমার স্নেহের কোলে বিশ্রাম লভুক আজ থেকে সকলে। আজ আর তুমি বধূ নও। আজ তুমি মা। সকলের জননী হলে আজ থেকেই তুমি।"
সেই মুহূর্তে যেন খসে পড়ল আবরণ। লজ্জাবনতা বধূর ঘোমটার আড়াল থেকে ফুটে উঠল সিঁদুরচিহ্নিত ললাট — যেমন মেঘের বুক চিরে বেরিয়ে আসে জ্যোৎস্নাস্নাত চাঁদ। শোকাচ্ছন্ন গৃহের প্রতিটি কোণে যেন ছড়িয়ে পড়ল এক নতুন আলো। যেখানে মৃত্যুর ছায়া নেমেছিল, সেখানেই যেন জেগে উঠল প্রাণের নতুন স্পন্দন। করুণায় আর্দ্র দৃষ্টি মেলে বড়মা তাকালেন উপস্থিত সকলের দিকে — সেই এক দৃষ্টিতেই যেন মুছে গেল সব হাহাকার, শান্ত হলো সব ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়। সেই মুহূর্ত থেকেই বড়বৌ হয়ে উঠলেন শ্রীশ্রীবড়মা — বিধির অমোঘ বিধানে বধূ রূপান্তরিত হলেন জননীতে।
এই একটিমাত্র আদেশ যেন পাল্টে দিল একটি নারীর সমগ্র অস্তিত্ব। বড়মা সেই আদেশ মাথা পেতে নিলেন, আর শুধু নিলেনই না — নিজের চরিত্রের অন্তরে সেই আদেশকে এমনভাবে ধারণ করলেন যে, তিনি সত্যিই হয়ে উঠলেন আশ্রমের দীন সন্তানদের স্নেহের আলো, প্রেরণার উৎস। শ্রীশ্রীঠাকুর নিজে একদিন বলেছিলেন — "বড়বৌ-এর মতো মানুষ দেখি না, আমার খুব শ্রদ্ধা হয়। রামকৃষ্ণদেবের স্ত্রী মা'ঠাকরুন যেমন ছিলেন, কতকটা সেই ধাঁচের। কংস রাজার খেয়ালের মতো কত হুকুম চালিয়েছি, হাসিমুখে সুখে করেছে, সন্তপ্ত হয়ে নয়।"
◉ #মনোজ্ঞ চলন—এক প্রেমের ব্যাকরণ
একদিন আলোচনা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেন, "ইষ্টের মনোজ্ঞ চলনে চলতে হয়।" আর তারপর নিজেই সেই কথার তাৎপর্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এক ছোট্ট ঘটনা দিয়ে। পাবনায় একদিন সবাই খেতে বসেছেন, বড়বৌ পরিবেশন করছেন। বারবার আসা-যাওয়ার মধ্যে রান্নাঘরের চৌকাঠের কাছে একবার পড়ে গিয়েছিলেন তিনি, তারপর নিজেকে সামলে আবার পরিবেশন চালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই রাতে ঠাকুর বলেছিলেন — "তুমি যে অত লোকের সামনে পড়ে গেলে, আমার ভারি লজ্জা করল।" এই একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল। তারপর থেকে জীবনে আর কোনোদিন শোনা যায়নি যে বড়মা পড়ে গেছেন। যে চলনে, যে আচরণে প্রভুর মুখ মলিন হয়, সেই আচরণ থেকে চিরকালের জন্য নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি — এই-ই মনোজ্ঞ চলন, এই-ই প্রকৃত ভালোবাসার ভাষা।
◉ #যন্ত্রণার মাঝে যে হাসি লুকিয়ে থাকে
একবার হাঁটুর উপরে দুটি বিষাক্ত কার্বাঙ্কল দেখা দিল — দুঃসহ যন্ত্রণা, একটার উপর আরেকটা। সেই অবস্থাতেও সংসারের সমস্ত কাজ তাঁকে করে যেতে হচ্ছিল নীরবে। যখন ঘা ভয়ংকর আকার নিল, অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় রইল না। সেকালের গ্রামে না ছিল অজ্ঞান করার ওষুধ, না ছিল অবশ করার কোনো ব্যবস্থা। দাঁতে দাঁত চেপে, একটি শব্দও না করে, স্থির-নিশ্চল হয়ে সেই ভয়ংকর অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণা সহ্য করলেন তিনি।
অস্ত্রোপচার শেষ হলো কোনোরকমে। উঠে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নড়াচড়া করারও শক্তি নেই শরীরে। ঠিক তখনই শোনা গেল স্বামীর আবদার — "ডাক্তারবাবুরা এত যত্ন করে, এত কষ্ট করে তোমার অপারেশন করলো, তুমি আজ তাদের নিজের হাতে চারটি ঘি-ভাত রান্না করে খাওয়াবে না?" কী অদ্ভুত আবদার! অথচ সেই আবদার মেটানোই যেন হয়ে উঠল তাঁর পরম সুখ, পরম তৃপ্তি। প্রভু রামচন্দ্রের আদেশে মা সীতা যেমন ক্লিষ্ট দেহেও আদেশ পালনে তৃপ্তি খুঁজে পেতেন, এ যেন তারই আরেক রূপ — নিজ করণীয় নিষ্পন্ন করে নিজেকে গৌরবান্বিত বোধ করা।
◉ #জীবনের থেকে, জীবনস্বামী যখন বড়
মানিকতলার এক দোতলা বাড়িতে তখন বাস করছেন শ্রীশ্রীঠাকুর ও বড়মা। হঠাৎ একদিন ভূমিকম্প হলো, বাড়ি কাঁপতে লাগল, চারপাশে বাড়ি ভেঙে পড়ার খবর আসতে থাকল। সবাই বাইরে বেরিয়ে এলেন, কিন্তু বড়মাকে দেখা গেল না কোথাও। ডাকাডাকি শুরু হলো। বড়মা তখন দোতলার বারান্দা থেকে দৃঢ়স্বরে বললেন — "আমি বেরিয়ে যাব না!"
পরে সব শান্ত হলে কেউ জিজ্ঞেস করলেন, ঘর ভেঙে পড়লে কী হতো, ভয় করেনি? বড়মা হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন — "আমার ঘরে ঠাকুরের ব্যবহারের জিনিসপত্র রয়েছে। ঘর ভেঙে পড়লে সব নষ্ট হয়ে যেত। আমি এটাই জানি, আমি ঘরে থাকলে ঠাকুর কিছুতেই ঘর ভাঙতে দেবেন না। আমি নেমে গেলে ঘর ভেঙেও পড়তে পারত।" এমন বিশ্বাস, এমন নিঃসংশয় আস্থা — যা মৃত্যুভয়কেও তুচ্ছ করে দেয়।
◉ দেওঘরের দারিদ্র্যে যে #ঐশ্বর্য ছিল
হিমাইতপুর থেকে ঠাকুর যেদিন দেওঘরে গেলেন, বড়মা যা কিছু সঙ্গে নিয়েছিলেন, তার সবটাই ছিল ঠাকুরের ব্যবহারের জিনিস। সেদিনের চরম অর্থকষ্টে, সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও শ্রীশ্রীঠাকুরের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল অবিচল। " #নারীর_নীতি" গ্রন্থে ঠাকুরের একটি বাণী আছে — "নিজের প্রয়োজনকে না বাড়িয়ে, মান-যশের আকাঙ্ক্ষা না করে, সেবাতৎপর থেকে সর্বদা সন্তুষ্ট থাকাকে চরিত্রগত করে নিলে সুখ কখনো ত্যাগ করে না।" এই আদর্শকে বড়মা জীবনভর বহন করে চলেছিলেন। কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো অসন্তোষ নেই — শুধু ছিল প্রিয় পরমের জন্য উৎসর্গকৃত সমস্ত সত্তা। সেদিনের অর্থকষ্টেও বড়মার ঘরে অভাব বলে কিছু ছিল না। ঈশ্বর যেন অভাবের বোধটাই কেড়ে নিয়েছিলেন তাঁর কাছ থেকে।
একটা পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের ঘটিতে জল খেতেন বড়মা — এতটাই পুরনো যে তার আসল চেহারাই হারিয়ে গিয়েছিল। একদিন সুশীলাবালা মা বললেন, এই ঘটিতে জল খাওয়া দেখতে তাঁর ভালো লাগে না। বড়মা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন — "ওলো, জল খাওয়ার জন্যেই তো ঘটি, ঘটির জন্য তো জল খাওয়া নয়। নারকেলের মালাতেও তো জল খাওয়া যায়। আসল কথা হলো জল খাওয়া, জল খাচ্ছি, ঘটি তো খাচ্ছি না।" জামা হোক, ব্রাশ হোক, জুতো হোক, বা ক্ষুদ্রতম একটি সূচ — প্রতিটি বস্তুর প্রতি তাঁর একই রকম যত্ন, একই রকম দরদ।
◉ তাঁর #সুখে, নিজের যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখা
পা পিছলে পড়ে গিয়ে একবার কলারবোন ভেঙে গেল বড়মার। তীব্র যন্ত্রণায় কাতর তিনি। ডাক্তার ধীরেন্দ্রকিশোর ভট্টাচার্য এসেছেন দেখতে। পাশের ঘর থেকে ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, কে এসেছে? বড়মা বললেন, "ধীরেন এসেছে!" ডাক্তার বেরিয়ে যাওয়ার সময় বড়মা তাঁকে সাবধান করে দিলেন — "শোন ধীরেন, তুই যখন ঠাকুরকে প্রণাম করতে যাবি, আর যদি জিজ্ঞেস করেন কেন এসেছিলি, বলবি বড়মাকে প্রণাম করতে এসেছিলাম। আমার হাড় ভাঙার কথা বলবি না। তিনি শুনলে বড় কষ্ট পাবেন, ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠবেন।"
আরেকবার রান্না করতে গিয়ে কড়াই নামাতে গিয়ে পায়ে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল। সে কথাও ঠাকুরকে জানাননি তিনি। ঠাকুর নিজেই একদিন এই ঘটনা বলেছিলেন — "এই যে বড়বৌয়ের কথা দেখো না। বড়বৌ পা-ছড়িয়ে বসে রান্না করে, ওইরকম করতে করতে কড়াই নামাতে গিয়ে পায়ে লেগে পুড়ে গেছে। সে-কথা আমার কাছে কয়ও না, কিছুই না। ভেবে বললে ঠাকুর অস্থির হয়ে পড়ে নাকি! কিন্তু ওই নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে।" নিজের কষ্ট গোপন রেখে অন্যের শান্তি রক্ষা করা — এই ছিল বড়মার নিত্যদিনের সাধনা।
◉ সবার জন্য যাঁর ছিল #প্রার্থনা
একদিন ঠাকুর একটু অসুস্থ। বড়মা তাঁর কাছে এসে বললেন — "মানুষের অসুখ হলে তোমার কাছে আসে, বলে ঠাকুর আমার মেয়ের অসুখ সেরে দাও, আমার ছেলে বেয়াড়া, আমার মনে শান্তি নেই। এরকম সব কয়। কিন্তু আমরা আর কার কাছে যাব? ভগবান বলে যদি কিছু থাকে, তার কাছে জানাই — তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো।" তিনি জানতেন তিনি কার ঘরনী। জগতে তাঁর আপন বলতে একমাত্র ঠাকুর, আর তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার। অসীমকে ভালোবেসেছিলেন বলেই জগতের প্রতিটি প্রান্তে ভালোবাসা ছড়াতে পেরেছিলেন তিনি।
◉ যিনি এক এবং #অদ্বিতীয়
আদিনাথ মজুমদার একদিন বলেছিলেন, তিনি ঠাকুর আর ঠাকুর পরিবারের অন্য সবাইকে সমান মনে করেন। শুনে ভীষণ ব্যথিত হয়েছিলেন বড়মা। তিরস্কার করে বলেছিলেন — "ঠাকুর তো ঠাকুর! তাঁর সঙ্গে কার তুলনা? ঠাকুরের ছেলে, বউ, ভাই, বোন যেই হোক না কেন, ঠাকুরের কেউ হলেই ঠাকুরের সমান হয়ে যায় না। আজ আমার প্রায় ষাট বছর বয়স, বারো বছর বয়সে এই সংসারে এসেছি, প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তাঁর সঙ্গ করছি— এতগুলো বছরেও আমি তাঁর কড়ে আঙুলের যোগ্য হতে পারিনি, তাঁর গুণের কণামাত্রও পাইনি। তাঁর সঙ্গে কাউকে সমান করতে দেখলে আমার বড় লাগে।" আদিনাথ দা লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর তখন ক্ষুব্ধ বড়মাকে শান্ত করে বলেছিলেন — "যাই বলো, ও বেকুব। বেকুব না হলে ঐ সব কাজ করে?"
ইষ্ট-আচার্য্য-পুরুষোত্তমের কোনো শরিক হয় না — এই সত্যকে বড়মা রক্ষা করেছিলেন নিজের সমগ্র সত্তা দিয়ে। ভক্ত হনুমান যেমন শ্রীনাথের মধ্যে জানকীনাথকে অনুভব করেও নিজের জীবন সর্বস্ব সমর্পণ করেছিলেন একমাত্র জানকীনাথকেই, বড়মার ভালোবাসাও ছিল ঠিক তেমনই অবিভাজ্য, অদ্বিতীয়।
◉ রাতের সেই #বাণী
একদিন রাত্রি পৌনে এগারোটায় ঠাকুর ভোগে বসেছেন, বড়মা পাশে বসে যত্ন সহকারে পরিবেশন করছেন। হঠাৎ ঠাকুর ডাকলেন অনুলেখক প্রফুল্লদাকে, বললেন খাতা-কলম নিয়ে আসতে। তারপর বলে গেলেন এক অমূল্য বাণী — "যে তোমার হতে চায় না, কিন্তু তোমাকে তার করতে চায়, তার অন্তরে ওত পেতে আছে ক্রূরবুদ্ধি, তোমার সাথে তার খাদ্য-খাদক সম্বন্ধ, সাবধান, হিসাব করে চলো।" বাণী দেওয়ার পর ঠাকুর বড়মাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কি বলো, ঠিক আছে?" বড়মা উত্তর দিলেন, "আমি তো খুব স্পষ্ট বুঝতে পারছি।" ঠাকুর হেসে বললেন, "তাহলেই হলো।"
এমনই ছিল তাঁদের সেই নিত্যদিনের কথোপকথন — গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আর সাংসারিক স্নেহের মিশ্রণে গড়া এক অননুকরণীয় সম্পর্ক। ঠাকুর প্রতিটি চিঠির শেষে লিখতেন — "তোমারই আমি।" এই-ই ছিল অপার্থিব প্রেম, ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসা, তুমি আমার হও বা না হও— 'আমি তোমার' হয়ে থাকব। আমরা অধিকাংশ মানুষ নিজেদের অভাব, দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তির পথ খুঁজেই ঠাকুরকে ধরি — কিন্তু বড়মা ছিলেন সেই বিরল ভালোবাসার জীবন্ত প্রতিমূর্তি, যিনি ঠাকুরের জন্যই ঠাকুরকে ভালোবেসে গেছেন আজীবন, নিঃস্বার্থভাবে, শর্তহীনভাবে। তিনি প্রায়ই বলতেন — "ঈশ্বরের কাছে এটুকুই আমার চাওয়া, ঠাকুরের আগে আমি যেন না যাই। আমি আগে চলে গেলে ওনার যে বড় কষ্ট হবে।"
◉ #যেভাবে এলেন, সেভাবেই ফিরে গেলেন
১৯৬৯ সালের ২৭শে জানুয়ারি শ্রীশ্রীঠাকুর দয়ালদেশে চলে যাওয়ার পর বড়মা এক প্রকার বাকরহিত হয়ে গেলেন। যেন নীরবে প্রস্তুতি নিতে লাগলেন সেই চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য — যখন তিনি তাঁর প্রিয়পরমের সত্তার সঙ্গে চিরকালের জন্য একাত্ম হবেন। অবশেষে এলো সেই দিন — ২৬শে বৈশাখ, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ, বুদ্ধপূর্ণিমার তিথি। সেদিন আকাশ থেকে ঝরে পড়ছিল অবিরাম বৃষ্টিধারা।
জগতে তিনি এসেছিলেন শ্রাবণের ধারায় ভিজিয়ে, ছেড়ে যাওয়ার দিনেও যেন সেই বর্ষারই ধারাকে সঙ্গী করে নিলেন। জন্মে বর্ষা, মৃত্যুতেও বর্ষা — যেন প্রকৃতি নিজেই তাঁর আগমন আর প্রস্থানকে একই সুরে বেঁধে রেখেছিল। তিনি ফিরে গেলেন সেই পরমেশ্বরের পরমাত্মার সঙ্গে অখণ্ড মিলনে, পার্থিব শরীরের বাঁধন ছেড়ে।
◉ যে #প্রেম মুছে যায় না
গর্ভধারিণী জননীর মতো অসংখ্য সন্তানের সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধা, শান্তি-অশান্তি সর্বান্তঃকরণে অনুভব করা এক নারী — বিনয়, মর্যাদা, সেবা, প্রীতি, মমতা, ধৈর্য, দৃঢ়তা, সাহস, সংযম, সহিষ্ণুতার জীবন্ত জাগ্রত মূর্তি। আজ তাই স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ত্রিলোক জুড়ে পূজিত হন তিনি — পুরুষোত্তমের যোগ্য লীলাসঙ্গিনীরূপে।
্রাবণের_এই_সূচনালগ্নে, যখন আকাশ থেকে নেমে আসে সেই চিরচেনা বৃষ্টিধারা, মনে পড়ে যায় সেই জগজ্জননীর কথা — যিনি নিজের সমস্ত যন্ত্রণা লুকিয়ে রেখে অন্যকে সুখ দিয়েছেন, যিনি অভাবের মধ্যেও ঐশ্বর্য খুঁজে পেয়েছেন, যিনি ভালোবেসেছেন শর্তহীনভাবে, প্রতিদানের কোনো আশা না রেখে। তাঁর এই অপার্থিব প্রেমের কাহিনি আজও আমাদের শেখায় — প্রকৃত ভালোবাসা কাকে বলে, প্রকৃত সেবা কাকে বলে, আর কীভাবে একটি সাধারণ মানবজীবনও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ, শুধু নিঃস্বার্থ প্রেম আর সমর্পণের মধ্য দিয়ে।
শ্রাবণের এই পুণ্য সূচনালগ্নে, জগজ্জননী শ্রীশ্রীবড়মার শ্রীচরণে এই ক্ষুদ্র শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হোক।
◕ লেখক— মলয় কুমার ঘোষ
----------------------------------------------------------------
◕ গ্রাফিক্স ও উপস্থাপনা— সাত্বত কথা
◕ তথ্যসূত্র: এই স্মৃতিচারণ রচিত হয়েছে—'জয়তু জননী মে', পূজনীয়া বনলতা দেবী; 'ঠাকুর স্মৃতি', পূজনীয়া সুপ্রভা দেবী; 'শ্রীশ্রীবড়মার সংসার', পূজনীয়া সৰ্ব্বমঙ্গলা দেবী; 'লক্ষ্মীমা', শ্রীপ্রফুল্ল কুমার দাস; 'আলোচনা প্রসঙ্গে', শ্রীদেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়; 'দীপরক্ষী'।