02/11/2025
পর্ব: 2 — অভিশপ্ত চিঠি (লেখক: সাকিব আরেফিন)
বিকেল ৬টায় বাসায় ফিরলাম।
৬:৩০ থেকে ১০টা — আমার পড়ার সময়। রুটিন ঠিক করা। কেউ Disturb করে না। দরজার সামনে নাস্তা রাখা থাকে। যেকোনো সময় খাওয়া যায়।
চিঠিটা ব্যাগ থেকে বের করে টেবিলে রাখলাম। একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।
কালো খাম।
মনে হচ্ছিল চিঠিটা আমাকে কিছু বলতে চায়। কিন্তু আমার সাহস হচ্ছে না।
ভাবছিলাম— কে পাঠিয়েছে? কেন? এই রঙ, এই ফুল কেন?
প্রথম কাজটা করলাম। ফুলটার ছবি গুগলে দিয়ে সার্চ করলাম।
ফুলটির নাম “Red Spider Lily”। বাংলায় বলে — লাল সুখদর্শন।
জাপান, কোরিয়া, চায়নায় পাওয়া যায়। আমাদের দেশে হয় না। বিশেষ তাপমাত্রা ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দরকার।
এই ফুলের অর্থ কী?
মৃত্যু। বিদায়। আর কখনো দেখা না হওয়ার প্রতীক।
হঠাৎ বুকের ভিতর ধক করে উঠল।
কালো চিঠি...
লাল মৃত্যুর ফুল...
কেউ কি আমাকে কিছু বোঝাতে চাইছে?
ভয় দেখাচ্ছে?
নাকি এটা কোনো অদ্ভুত প্রেমপত্র?
চোখ চেপে ধরলাম।
চিঠিটা খোলার সাহস হচ্ছে না।
বাহিরে হালকা হাওয়া বইছে।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেছে।
টেবিলের ওপর চিঠিটা নীরবে পড়ে আছে।
আমার দিকে তাকিয়ে যেন বলছে —
"খুলে ফেলো আমাকে। এখনই।"
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে চলেছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সময় থেমে আছে। বাইরে দুলে দুলে আসছে সন্ধ্যার বাতাস। জানালা দিয়ে একটানা তাকিয়ে থাকলে, মনে হয়— বাতাস নয়, কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
চিঠিটা এখনো খোলা হয়নি।
হাত বাড়ালাম। আবার ফিরিয়ে নিলাম। বুকের ভেতর ব্যাকুল একটা ঢেউ উঠছে — ঠিক যেন শরীর চায় খুলতে, কিন্তু মন মানতে চাইছে না।
“দরজা বন্ধ করো। এই সময় কাউকে ভেতরে আসতে দিও না।”
হঠাৎ মাথার ভেতর একটা আওয়াজ হলো। কার কণ্ঠ? চেনা নয়। অচেনা কিন্তু ভারী চেনা।
আমি চিঠিটা খুললাম।
অদ্ভুত গন্ধ।
পাতলা একটা কাগজ। কালি দিয়ে লেখা, কিন্তু যেন কালি না — ছায়া।
“সাকিব আরেফিন (SK),
তুমি এখনো বেঁচে আছো। সেটা কিছুটা আশ্চর্যজনক।
বেঁচে থাকার মতো খুব বেশি কারণ তোমার হাতে নেই।
কিছু মানুষ আছে, যাদের ভুলে গেলে চলে না। তুমি ভুলে গেছো।
কিছু কাজ আছে, যেগুলো করেই ফেলা উচিত ছিল না। তুমি করেছো।
এই চিঠিটা তোমার জন্য নয়।
এটা তোমার ভেতরের সেই ছেলেটার জন্য,
যে মাঝেমাঝে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলে— “আমি ঠিক আছি।”
অথচ সে জানে, সে ঠিক নেই।
কাল বিকেল চারটা চল্লিশে একটা শব্দ হবে।
হয়তো ঘড়ির কাঁটা।
হয়তো কারো নিঃশ্বাস।
বা হয়তো… কিছুই না।
কিন্তু তুমি বুঝে যাবে, ওটাই ছিল শেষবার।
এখন চাইলে তুমি ঘুমিয়ে পড়তে পারো।
না চাইলে— প্রস্তুতি নিতে পারো।
আমি কে, জেনে কোনো লাভ নেই।
বরং ভাবো— তুমি কে?
– একজন, যে তোমাকে ভুলেনি।”
চিঠিটা পড়ে চুপ করে বসে রইলাম।
ঘরে কোনো শব্দ নেই।
ঘড়ির কাঁটা থেমে গেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না —
নাকি আমি সময়ের বাইরে এসে পড়েছি, কে জানে।
চিঠির অক্ষরগুলো কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
আমার চোখে পানি নেই, তবু দেখার শক্তি হারিয়ে ফেলছি।
আমি জানি, এই চিঠি কেউ লিখেছে।
আবার এটাও মনে হচ্ছে— এই চিঠি আমি নিজেই লিখেছি।
কবে লিখেছি মনে নেই।
কেন লিখেছি জানি না।
ঘরের বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে।
হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এলো।
চিঠিতে বলা সময়— “কাল বিকেল চারটা চল্লিশ”।
ঠিক এই সময়টা কেন?
এই প্রশ্নটা খুব ছোট, কিন্তু মনে হচ্ছে এর উত্তরেই লুকিয়ে আছে সব রহস্য।
চিঠিটা আবার ভাঁজ করে ব্যাগে রাখলাম।
আয়নার দিকে তাকালাম।
নিজেকে দেখে মনে হলো — আমি আগের মানুষটা নেই।
মুখটা যেন আমার না।
চোখে একটা অপরিচিত ছায়া।
একবার মনে হলো —
সবকিছু ফেলে, বের হয়ে যাই।
দৌড়াতে দৌড়াতে যাই নদীর পাড়ে।
কিংবা ট্রেন ধরেই চলে যাই কোনো অজানা জায়গায়।
যেখানে সময় থেমে আছে।
চিঠি আসে না।
ফুল ফোটে না।
কিন্তু আমি জানি, আমি কোথাও যাচ্ছি না।
আমি এখানেই থাকব।
ঠিক কাল বিকেল চারটা চল্লিশ পর্যন্ত।
কারণ আমি জানতে চাই —
কে আমাকে ভুলতে পারেনি?
আর কেন?
রাত যত বাড়ছে, ভয়টা তত গাঢ় হয়ে উঠছে।
ঘুম আসছে না। বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছি।
আলো বন্ধ। শুধু জানালার পাশে টানা পর্দা— হালকা বাতাসে দুলছে।
মনে হচ্ছে, ঘরের ভেতরে কেউ একজন আছে।
ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে। কথা বলছে না। শুধু তাকিয়ে আছে।
আমি চোখ বন্ধ করে রাখি। শরীর কাঁপে না, কিন্তু ভেতরটা কাঁপে।
কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি।
ঘুম ভাঙল সকাল ১০টার দিকে।
ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা চিন্তা এসে পড়ল —
আর মাত্র ৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বাকি।
মনে হচ্ছে, সময়টাও যেন দৌড়াচ্ছে।
একটা লক্ষ্য ঠিক করে রেখেছে — ৪:৪০।
ভাবতে বসি— আমি কি এমন কিছু করেছি,
যার কারণে কেউ আমার মৃত্যু চায়?
একটা মুখ মনে পড়ার চেষ্টা করি।
কোনো কান্না, কোনো চোখ, কোনো অভিশাপ।
কিছুই ঠিকমতো মনে পড়ে না।
হঠাৎ মাথায় এল —
কাল ডায়েরি লেখা হয়নি।
#অভিশপ্তচিঠি #বাংলা_গল #সাকিবআরেফিন #বাংলা_থ্রিলার
#সাহিত্য
#গল্পপড়ি