26/08/2026
বর্বরতার মুখোমুখি এক জাতি:
কন্যাসন্তান, জারজ কলঙ্ক আর পরিত্যক্ত নবজাতকের কাহিনি
পৃথিবীর আলো দেখার পরপরই এক নবজাতককে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নির্জন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে। নাড়ি কাটা হয়নি। শরীরজুড়ে অসংখ্য পিঁপড়া। কান্নার শব্দ শুনে স্থানীয়রা তাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন। সোমবার (২৪ আগস্ট ২০২৬) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বরগুনার বামনা উপজেলার সোনাখালী গ্রামের ফায়ার সার্ভিস ইউনিটের সামনে ফজলুর দোকানের পেছনে নারিকেলগাছের পাশ থেকে এই শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। দোকানদার বাবুল কান্নার শব্দ শুনে তারিফ হাওলাদারকে জানান। তারিফ ফায়ার সার্ভিসের কামরুজ্জামানকে খবর দেন। ব্যাগ খুলে শিশুটিকে কোলে তুলে নেওয়া হয়। চিকিৎসক নাড়ি কেটে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। শিশুটি মোটামুটি সুস্থ। এখন তারিফ হাওলাদারের হেফাজতে। তিনি বলেছেন, “বোনের মতো স্নেহ-মমতায় মানুষ করতে চান।” এই একটি বাক্যই যেন পুরো সমাজের নিষ্ঠুরতার মুখোশ উন্মোচন করে। কারণ যে শিশু পৃথিবীতে এসে মায়ের বুকের উষ্ণতা পাওয়ার কথা, তাকে ব্যাগে ভরে ফেলে রাখা হয়েছে।
এই ঘটনা একা নয়। এর সঙ্গে জুড়ে যায় আরেকটি আরও ভয়াবহ বাস্তবতা। এগারো বছরের এক মাদ্রাসা ছাত্রীর সন্তান জন্ম হয়। যে হুজুরের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে এটি ঘটে, তিনি অস্বীকার করেন। ডিএনএ পরীক্ষায় দোষী সাব্যস্ত হন। তবু একটি ধর্মভিত্তিক দলের সমর্থনে তিনি সমাজ ও আইনকে নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করতে থাকেন। একদিকে এগারো বছরের শিশুকে যৌন নিপীড়নের শিকার করে সন্তান জন্মদানে বাধ্য করা, অন্যদিকে সেই সন্তানকে বা তার মাকে সামাজিক কলঙ্কের বোঝা বানিয়ে ফেলে দেওয়া—এই দুই ঘটনা একই সুতোয় গাঁথা। সুতোটার নাম লোকলজ্জা, ধর্মের অপব্যবহার এবং কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করার পুরনো কুসংস্কার।
সমাজ যখন কন্যাসন্তানকে অভিশাপ বলে, তখন তার জন্মকেই অপরাধ বানিয়ে ফেলে। যখন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানকে “জারজ” বলে কলঙ্কিত করে, তখন সেই সন্তানের কোনো অপরাধ নেই—অপরাধ বাবা-মায়ের এবং সমাজের। এগারো বছরের মেয়েটি নিজেই শিশু। তার শরীর ও মন এখনো পরিণত হয়নি। তাকে যৌন সম্পর্কে টেনে নেওয়া মানে শিশু যৌন নিপীড়ন। ডিএনএ প্রমাণের পরও ধর্মের নামে সমর্থন জোগানো মানে অপরাধীকে রক্ষা করা। এটি ধর্মের শিক্ষা নয়; এটি ক্ষমতা ও লজ্জা ঢাকার কৌশল। একইভাবে বরগুনায় নবজাতককে ব্যাগে ভরে ফেলে রাখা মানে সমাজের সেই লজ্জা, যে লজ্জা কন্যাসন্তান বা অবৈধ সন্তানকে বহন করতে চায় না। শরীরে পিঁপড়া জড়ানো সেই শিশু যেন সমাজের বিবেকের ওপর চিৎকার করে বলছে—তোমরা কতটা বর্বর!
এই বর্বরতা শুধু ব্যক্তিগত নয়। এটি কাঠামোগত। পরিবার যখন কন্যাসন্তানকে যৌতুকের বোঝা মনে করে, তখন তার জন্মকেই অবাঞ্ছিত করে তোলে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যখন অপরাধীকে রক্ষা করে, তখন ন্যায়বিচারকে দুর্বল করে। আইন যখন দেরি করে বা প্রভাবিত হয়, তখন শিকার আরও একা হয়ে পড়ে। এগারো বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রমাণ এসেছে। কিন্তু তার মানসিক আঘাত, শারীরিক ক্ষতি এবং সামাজিক কলঙ্ক মুছে যায়নি। নবজাতকটি বেঁচে গেছে স্থানীয়দের মানবিকতায়। কিন্তু কত নবজাতক বেঁচে যায় না? কত মাকে বাধ্য করা হয় সন্তান ফেলে দিতে? এই প্রশ্নগুলো সমাজ এড়িয়ে যেতে পারে না।
মানবিক প্রতিবেদনের দাবি হলো সত্যকে মুখোমুখি দাঁড়ানো। সন্তান কোনো অপরাধ করে জন্মায় না। লিঙ্গ কোনো অভিশাপ নয়। বিবাহের বাইরে জন্ম নেওয়া সন্তানও মানুষ। তার অধিকার আছে বেঁচে থাকার, পরিচর্যা পাওয়ার, পরিচয় পাওয়ার। বাংলাদেশের আইনে শিশু অধিকার স্বীকৃত। জন্ম নিবন্ধন, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক সুরক্ষা বিবাহের অবস্থা নির্বিশেষে প্রযোজ্য। তবু বাস্তবে সামাজিক চাপ আইনকে পরাজিত করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে অপরাধ ঢাকা হয়। “কন্যা বোঝা” বলে পরিত্যাগ করা হয়। লোকলজ্জার ভয়ে পরিবার নিজেই নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।
তারিফ হাওলাদারের মতো মানুষ আছেন যারা শিশুকে বোনের মতো মানুষ করতে চান। এটি আশার আলো। কিন্তু ব্যক্তিগত মানবিকতা দিয়ে কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন দ্রুত তদন্ত। নবজাতকের মা-বাবার সন্ধান। এগারো বছরের শিকারের জন্য ন্যায়বিচার এবং পুনর্বাসন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। শিক্ষা ব্যবস্থায় লিঙ্গসমতা ও শিশু সুরক্ষার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা। আইনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
সমাজ যদি কন্যাসন্তানকে অভিশাপ বলে চালিয়ে যায়, যদি জারজ কলঙ্ক দিয়ে শিশুকে শাস্তি দেয়, যদি ধর্মের নামে অপরাধীকে রক্ষা করে, তাহলে এটি বর্বর জাতিই থেকে যাবে। পরিবর্তন সম্ভব। শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আইনের শাসন যখন বাড়ে, তখন এই কুসংস্কার দুর্বল হয়। ইতিমধ্যে শহুরে ও শিক্ষিত পরিবারে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গ্রামীণ ও ধর্মীয় প্রভাবিত এলাকায় এখনও অন্ধকার ঘন। বরগুনার সেই নবজাতক এবং এগারো বছরের সেই মেয়েটি যেন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে—আর কতকাল? আর কত শিশুকে ব্যাগে ভরে ফেলতে হবে? আর কত হুজুরকে ধর্মের ছদ্মবেশে রক্ষা করতে হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সমাজকেই দিতে হবে। মানবিকতা মানে শুধু উদ্ধার নয়; মানে প্রতিরোধ, জবাবদিহি এবং পরিবর্তন। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকে হত্যা করা। ধর্ম যদি মানবতাকে রক্ষা না করে, তাহলে সেই ধর্মের অপব্যবহার। সমাজ যদি লজ্জাকে শিশুর জীবনের ওপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে সেই সমাজ বর্বর। এখন সময় এসেছে এই বর্বরতাকে থামানোর। নবজাতকের কান্না এবং এগারো বছরের মেয়েটির নীরবতা যেন বৃথা না যায়। তাদের জন্য ন্যায়বিচার, সুরক্ষা এবং সম্মান নিশ্চিত করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
(প্রতিবেদনটি প্রদত্ত ঘটনাবলি ও পূর্ববর্তী আলোচনার প্রেক্ষাপটে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপ্রমাণিত অভিযোগ নয়; বরং সামাজিক কাঠামোর সমালোচনা। শিশু সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে।)
বরগুনা, বামনা উপজেলা, সোনাখালী (২৪ আগস্ট ২০২৬): প্লাস্টিক/বাজারের ব্যাগে নবজাতক (নাড়ি না কাটা, শরীরে পিঁপড়া)। স্থানীয়রা উদ্ধার, হাসপাতালে চিকিৎসা।
নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ উপজেলা, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা (৩০ জানুয়ারি ২০২৫/২০২৬ আশেপাশে): পরিত্যক্ত স্থান থেকে জীবিত নবজাতক (মেয়ে)। মুদি ব্যবসায়ী উদ্ধার।
চট্টগ্রাম, কোতোয়ালী, ব্রিজঘাট/এস আলম বাস কাউন্টার (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬): ফুটপাতে গামছা-তোয়ালে জড়ানো একদিন বয়সী ছেলে নবজাতক। পুলিশ উদ্ধার, চিকিৎসা শেষে দত্তক।
চট্টগ্রাম, পটিয়া উপজেলা (ফেব্রুয়ারি ২০২৬): ছাইয়ের স্তূপ থেকে নবজাতক উদ্ধার (পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু)।
খাগড়াছড়ি, পূর্ব শান্তিনগর, রাজু বোর্ডিংয়ের পেছন : নালা থেকে জীবিত নবজাতক (কাপড়ে পেঁচানো)। স্থানীয়রা উদ্ধার।
চট্টগ্রাম, বাঁশখালী উপজেলা, কোনাখালী (শেখেরখিল ইউনিয়ন) (১৫ জুলাই ২০২৬): পলিথিনে মোড়ানো নবজাতক। স্থানীয় পরিবার উদ্ধার, পরে আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের কাছে হস্তান্তর।
ঠাকুরগাঁও, সদর উপজেলা, জামালপুর ইউনিয়ন, মহেশালী/পূর্ব মহেশালী (মার্চ ২০২৫): ভুট্টা ক্ষেত থেকে জীবিত নবজাতক (কন্যা)।
চাঁদপুর, শহর, ষোলঘর এলাকা : গোয়ালঘরের পাশে বাজারের ব্যাগ থেকে জীবিত নবজাতক।
চট্টগ্রাম, বায়েজিদ বোস্তামী : ডাস্টবিন থেকে জীবিত নবজাতক (মেয়ে)।
সিরাজগঞ্জ, কামারখন্দ উপজেলা, আলোকদিয়ার : রেললাইনের পাশে ব্যাগ থেকে জীবিত ছেলে নবজাতক।
মাদারীপুর : ক্লিনিকের বাথরুম থেকে রক্তাক্ত নবজাতক উদ্ধার।
মুন্সিগঞ্জ, গজারিয়া উপজেলা : উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবর্জনার স্তূপ থেকে জীবিত নবজাতক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সরাইল উপজেলা, কুট্রাপাড়া (মার্চ ২০২৫): ঝোপ থেকে জীবিত কন্যা নবজাতক।
সিরাজগঞ্জ, উল্লাপাড়া পৌর এলাকা : ফুটপাত থেকে নবজাতক কন্যা উদ্ধার, সমাজসেবার তত্ত্বাবধানে।
ফরিদপুর, সদর, ধুলদি রেলগেট/সহিরউদ্দিন হাফিজিয়া মাদরাসা এলাকা (সেপ্টেম্বর ২০২৫): মহাসড়কের পাশে জঙ্গল থেকে নবজাতক, পরে দত্তক।
যশোর, শার্শা/বেনাপোল, হাকড় নদীর পাড় : নদীর পাড় থেকে নবজাতক উদ্ধার, প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে।
ময়মনসিংহ, নান্দাইল উপজেলা, মুশল্লি ইউনিয়ন, তারেরঘাট রসুলপুর (মার্চ ২০২৪): জঙ্গল/কবরস্থান এলাকা থেকে জীবিত নবজাতক কন্যা।
দিনাজপুর : হাসপাতালে ব্যাগে ফেলে যাওয়া নবজাতক, পরে নিঃসন্তান দম্পতির কাছে হস্তান্তর।
নারায়ণগঞ্জ (বিভিন্ন): ডাস্টবিন/রাস্তা থেকে উদ্ধারের একাধিক কেস (যেমন সোনারগাঁ)।
ঢাকা, উত্তরা (পুরোনো কেস, ২০২৩): পলিথিন ব্যাগে রাস্তার পাশে নবজাতক (সিসিটিভি ফুটেজ)।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য/পরিসংখ্যানভিত্তিক: ঢাকা মেডিকেল/শাহবাগ, সবুজবাগ, মোহাম্মদপুর ইত্যাদি এলাকায় ডাস্টবিন/রাস্তা থেকে বহু ঘটনা (অধিকাংশ মৃত)।
চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট বিভাগেও নিয়মিত রিপোর্ট।
মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে ২০২৪-এ প্রায় ৯৪টি; পাঁচ বছরে শত শত। অনেক জীবিত শিশু পরে শিশুমণি নিবাস বা দত্তক পরিবারে যায়।
নোট: এগুলো নিউজ মিডিয়া থেকে। তারিখ ও বিবরণ সামান্য ভিন্ন হতে পারে। সম্পূর্ণ সরকারি তালিকার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ বা শিশু অধিকার ফোরামের সাথে যোগাযোগ করুন। এই ঘটনাগুলো সামাজিক সমস্যা (কলঙ্ক, অর্থনৈতিক চাপ, অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ) নির্দেশ করে। শিশু সুরক্ষা আইন ও দ্রুত তদন্ত জরুরি।