31/07/2016
আমাদের রামপাল প্রকল্প কেন দরকার? অথবা কেন আমরা রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প চাই না? ৫ মিনিট সময় নিয়ে এই লেখাটি পড়ুন, তারপরই না হয় নিজেকে প্রশ্ন করুন আমাদের এটা হতে দেয়া উচিত অথবা না। ?
১ - অর্থনৈতিক ইস্যু।
২ - পরিবেশগত ইস্যু।
অর্থনৈতিক ক্ষতিঃ
# রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি ডলার। এর ৭০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ নেয়া হবে,(৭০ ভাগ ঋণের সুদ টানা এবং ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশের)। ১৫ শতাংশ অর্থ দেবে পিডিবি এবং বাকি ১৫ শতাংশ দেবে ভারতের এনটিপিসি। ওই প্রকল্পের জন্য পুরো জমি, অবকাঠামোগত বিভিন্ন কিছু, সব সরবরাহ করবে বাংলাদেশ। অথচ শেষ বিচারে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মালিকানা চলে যাবে ভারতের হাতে! মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে তারা হয়ে যাবে হর্তাকর্তা! তাছাড়া এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনতে হবে পিডিবিকে! আর যে নীট লাভ হবে, তার অর্ধেক নিয়ে নেবে ভারত অর্থাৎ লাভ ফিফটি ফিফটি! চুক্তি অনুযায়ী কয়লা আমদানির দায়িত্ব বাংলাদেশের এবং ক্ষয়ক্ষতির দায় বহন করতে হবে বাংলাদেশেরই!!
# আমাদের দেশীয় কোম্পানি ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে গত ২০ ডিসেম্বর ২০১১ পিডিবির যে ক্রয় চুক্তি হয়েছে,সে অনুযায়ী,কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৫২২ মেগাওয়াটের একটি হবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায়। এছাড়া খুলনার লবনচরা ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ২৮৩ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে। সেখানে বলা আছে মাওয়া থেকে কিনবে ৪ টাকা প্রতি ইউনিট। আর লবনচরা ও আনোয়ারার কেন্দ্র থেকে কিনবে ৩ টাকা ৮০ পয়সা করে। কিন্তু রামপালের কেন্দ্র থেকে কিনতে হবে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা করে!! এছাড়াও দেখা গেছে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য প্রয়োজন ৫৫৫ একর জমি। এর সঙ্গে এমজিআর ও কুলিং টাওয়ারের জায়গা হিসাব করলে জমি প্রয়োজন সর্বোচ্চ ৭০০ একর। অথচ ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে!(এর বেশির ভাগই কৃষি জমি)।
এই প্রকল্পের উপর আমরা জোর দিচ্ছি পরিবেশগত ক্ষতির ওপর, কারন আমাদের সুন্দরবন একটিই, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো বিকল্প আছে। আমরা দাবি করেছি এই একই প্রকল্প অন্য কোন জায়গায় করা হোক। যেখানে এমন একটি দেশের 'ফুসফুস' এর মত কিছু ধ্বংস হবে না।
পরিবেশগত ক্ষতিঃ
# ভারতে না,বাংলাদেশে হা - এনটিপিসি তার নিজ দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল (NTPC's coal-based project in MP turned down অর্থাৎ "মধ্যপ্রদেশে এনটিপিসি'র কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প বাতিল " দ্য হিন্দু, ৮ অক্টোবর ২০১০)। কৃষি ও পরিবেশগত সমস্যা হবে, সে কারণেই ভারত সরকার এনটিপিসির প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। ২০০৭ সালে রাজীব গান্ধী ন্যশনাল পার্ক থেকে ২০ কিমি দূরে ১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পরিকল্পনা করে, কিন্তু জনগনের বিরোধিতার কারনে ২০০৮ সালে এই প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয় ভারত সরকার। ঐ বনাঞ্চলটি ছিল সুন্দরবন বাংলাদেশ অংশের ১০ ভাগের ১ ভাগ।
# বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ কার্বন নিঃসরণ। একটি ৫০০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বার্ষিক ৩৭ লক্ষ টন কার্বন নির্গত হয় যা ১৬ কোটি গাছ কেটে ফেলার সমান। সুতরাং আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না আমরা কি করতে যাচ্ছি বাংলাদেশের একমাত্র এবং বিশ্বের বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ন বন সুন্দরবনের পাশেই তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে।
# জোয়ার ভাটা খেলার বৈশিষ্ট্যযুক্ত ছোট-বড় বহু শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট নদী-খাল দিয়ে বিভক্ত দ্বীপমণ্ডলীর সমষ্টি এই বন। মোট এলাকা ৬০০০ বর্গ কিলোমিটার। যার মধ্যে ম্যানগ্রোভ এলাকা ৩৯৫৬ বর্গ কিলোমিটার। নদী খালে নিমজ্জিত ১৮০০ বর্গ কিলোমিটার । এই জোয়ার প্লাবিত বনাঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদে ও বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এই বনে আছে ৬৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২০০ প্রজাতির মৎস্য, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী জন্তু, ২৩৪ প্রজাতির পাখি, ৫১ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর প্রানী এবং অসংখ্য অমেরুদণ্ডী জীব। এছাড়াও জীবিকার জন্য সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল প্রায় কয়েক লাখ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন সুন্দরবনের পাশে এমন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার ফলে এসব প্রজাতির জীবন জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।
এর প্রমান হিসাবে দেয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হতো তার ফলাফল হলো যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হাইওয়ে ২১ এর ৪৮ কিমি এলাকা জুড়ে গাছ ধ্বংস হয়েছে।
# রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড (বছরে ৫১ হাজার ৮৩০ টন) এবং ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (বছরে ৩১ হাজার ২৫ টন) নির্গত হবে। এই বিশাল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব তখনকার চেয়ে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে সুন্দরবনের প্রাণ ও পরিবেশ। ইআইএ রিপোর্টে এই জায়গাটাতে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে! নিয়মানুযায়ী সুন্দরবনের জন্য ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর’ মানদণ্ড উল্লেখ করার কথা। অথচ ইআইএ রিপোর্টে সুন্দরবনের জন্য ‘আবাসিক ও গ্রাম’ এলাকার মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে! সুন্দরবন কবে থেকে ‘আবাসিক ও গ্রাম এলাকা’ হলো?
এখন বলেন, কি মনে হয়? রামপাল তথা দেশকে জাস্ট একটা রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে সুইসাইড করতে দিবেন কি দিবেন না...।
Let's save our country for our child and next generation; so that they can atleast breath.
- অন্ধকারের যাত্রী, ইশটিশন ব্লগ।