15/11/2012
ফেসবুক ইয়াহু জিমেইলে ঢুকতে টাকা লাগবে!
প্রতি ই-মেইলে টাকা। জিমেইল, ইয়াহু বা হটমেইল_ খরচের বাইরে থাকবে না কিছুই। ইউটিউবে ভিডিও দেখাও টাকা ছাড়া সম্ভব হবে না। টুইটার-ফেসবুকে ঢুকতেও লাগবে টাকা। ছবি আপলোড করা, স্ট্যাটাস দেওয়া, কারও ছবি বা টেক্সটে মন্তব্য করা, লাইক দেওয়া এতদিন নিখরচায় করে আসা কাজগুলোর জন্য টাকা খরচের প্রস্তাব এসেছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে (আইটিইউ)।
সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোই শুধু নয়; যে কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকতে খরচের বিষয়টি যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। বিলিয়ন ডলার লাভ তুলে নিতেই এ প্রক্রিয়া।
একইভাবে ইন্টারনেট এখনকার মতো উন্মুক্ত (নিয়ন্ত্রণহীন) থাকবে, নাকি টেলিযোগাযোগ খাতের মতো এটিও সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে_ সে সিদ্ধান্তও হবে আইটিইউর ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অন ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স (ডবি্লউসিআইটি) সম্মেলনে। দুটি বিষয়েই ভোট হবে। ১৯৩টি সদস্য দেশের ভোট বলে দেবে_ ইন্টারনেটে সাধারণের অবাধ বিচরণ থাকবে, কী থাকবে না? ফল এদিক-ওদিক হলে সরকারই ঠিক করে দেবে_ তাদের দেশে কোন সাইট দেখা যাবে আর কোনটি দেখা যাবে না। এমন প্রস্তাবের ক্ষেত্রে নেতৃত্বে আছে চীন-রাশিয়া। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরব বিশ্বের অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো। ফেসবুক আন্দোলনের শিকার হয়ে দেশগুলো আরও ভীত-সন্ত্রস্ত। বাংলাদেশ কোন পক্ষে যাবে? ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় আসা এ সরকারের ভোট এসব নিয়ন্ত্রণ আর গ্রাহকের বাড়তি খরচের পক্ষে যাবে, নাকি উন্মুক্ত বিশ্বের পক্ষে থাকবে_ এখনও তা চূড়ান্ত হয়নি। অথচ আইটিইউর কাউন্সিল সদস্য বাংলাদেশ। সম্মেলনে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অংশ নেবে। টেলিযোগাযোগ সচিব আবু বকর সিদ্দিক বলেছেন, সম্মেলনে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে_ বাংলাদেশের ভোট কোন দিকে যাবে।
এদিকে বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের পজেশন পেপার তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। খুব তাড়াতাড়ি এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ এ খাতের প্রতিটি সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করা হবে। বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীলকান্তি বোস বলেন, পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিপক্ষে তারা। তবে মানহানি বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো বিষয় যাতে ইন্টারনেটে না ঘটে, তেমন নিয়ন্ত্রণ হতেই পারে। বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক করা হবে সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে।
আগামী ৩ থেকে ১৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে আইটিইউ তাদের ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেশন্সে (আইটিআর) পরিবর্তন আনবে। ইতিমধ্যে সেখানে বেশ কয়েকটি পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ সুপারিশের অন্যতম হলো ইন্টারনেট কি এখনকার মতো স্বাধীনভাবে চলবে, নাকি তার ওপর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে? বর্তমানে ইন্টারনেটের পুরো বিষয়টি এক হাতে তত্ত্বাবধান করে ইন্টারনেট করপোরেশন ফর অ্যাসাইন্ড নেমস অ্যান্ড নাম্বার্স (আইকান)। আইটিইউ চাইছে, নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সরকার তথা তাদের হাতে চলে আসুক। এর আগে ১৯৮৮ সালে আইটিআর প্রণয়ন করে টেলিযোগাযোগের পুরো বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ফলে যে দেশে যত কোম্পানিই থাক না কেন, শেষ পর্যন্ত ওই দেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় সরকার; কোম্পানি নয়।
এখন যেমন ইচ্ছেমতো বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি ইংল্যান্ডে গিয়েও ই-মেইল, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহার করতে পারেন। নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরোপিত হলে তখন এ সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ব্যক্তির যে দেশে অবস্থান সেখানকার সরকারের কাছ থেকে এ বিষয়ে অনুমতি নিতে হবে। টেলিফোনের মতো রোমিং করে নিলে কেবল তখন ই-মেইল বা অন্যান্য সেবা বিদেশে গিয়েও পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আবু সায়ীদ খান সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ কেন; কোনো সরকারেরই ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা নেই। ইন্টারনেটের বিকাশ এখন যে পর্যায়ে চলে গেছে, কেউ তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
বাংলাদেশে গুগলের প্রধান কাজী মনিরুল কবির বলেন, যতটা খোঁজখবর করেছি, তাতে কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রিত হওয়ার সুযোগ নেই। বরং নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যদি অবস্থান নেয়, তাহলে '৯২ সালে যেভাবে সাবমেরিন কেবল না নিয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে গিয়েছিল, এবার আরও একবার তেমন হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক করার জন্য ভারতের নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। সুনীলকান্তি বোস বলেন, কনসালটেশন বৈঠকের মাধ্যমে ভারতীয়রা তাদের অবস্থান ঠিক করছে। এখানেও সংশ্লিষ্ট যত সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা হবে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা বিভিন্ন ওয়েবসাইট দেখার জন্য বাড়তি টাকা খরচের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে আইটিইউ বিটিআরসির কাছে যে কাগজ পাঠিয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, ৫০ শতাংশ দেশ এখনও এ বিষয়ে অবস্থান ঠিক করেনি।