27/03/2026
চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ও স্বাধীনতার ঘোষনা প্রচার ঘিরে ঐতিহাসিক বিতর্ক ও বিকৃতি আমাদের স্কুল জীবন থেকে দেখে আসছি। ৪ দশক পার করেও দেখছি একই বৃত্তে সেটি ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্যাপারটি হতাশাজনক।
আমি নিজের কাছে পরিস্কার থাকার জন্য নির্দিষ্ট এই ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান করে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেছি। যে সোর্সগুলোর ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে এসেছি সেগুলো হচ্ছে- স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, নবম খন্ড। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র, প্রফেসর ডাঃ এম সুলতান উল আলম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বেলাল মোহাম্মদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ, ডাঃ মাহফুজুর রহমান।
এবার আসা যাক আমি কী কী জেনেছি।
২৬ মার্চ ভোরবেলা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনার টেলিগ্রাম পাওয়ার পর চট্টগ্রাম সংগ্রাম কমিটির নেতাদের উদ্যোগে হাজার হাজার কপি সাইক্লোস্টাইল করে বিতরনের পাশাপাশি শহরে মাইক দিয়ে ঘোষনা চলতে থাকে। এর আগের রাত সন্ধ্যা ৭টায় নেতৃবৃন্দের কাছে বঙ্গবন্ধুর টেলিফোন নির্দেশনার প্রেক্ষিতে রাত ৮.৪৫ মিনিটে পাকিস্তানী সেনা অবস্থানের উপর আক্রমনের মাধ্যমে সশস্ত্র যুদ্ধের সুচনা করেন ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিক। রফিকের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধটি শহরের ভেতর ২৬ মার্চ তারিখেও চলমান থাকে৷
৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহ অধিনায়ক জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বিদ্রোহ করে, শহরের ভেতরের যুদ্ধে যোগ না দিয়ে ট্রুপ সহ ভোরবেলা যাত্রা শুরু করে কালুরঘাট পার হয়ে পটিয়ায় গিয়ে অবস্থান গ্রহন করেন।
২৬ মার্চ সকাল বেলা সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেন, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনাটি বেতারে সম্প্রচারের। ক্যাপ্টেন রফিকও সম্মতি দেন তবে একমাত্র অফিসার হিসেবে তিনি সামরিক কন্ট্রোলরুম ছেড়ে বেতারে যেতে পারবেন না বলে জানান। পরে নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়- শহরের কেন্দ্র আগ্রাবাদে অবস্থিত চট্টগ্রাম বেতারের বদলে কালুরঘাট সম্প্রচার কেন্দ্রটি ব্যবহার করা হবে।
প্রথম অধিবেশনঃ ২৬ মার্চ দুপুর ১.১০ মিনিট
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যান আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী, এম এ হান্নান, মোশাররফ হসেন, ডাঃ এম এ মান্নান, আতাউর রহমান খান কায়সার, আখতারুজ্জামান বাবু, ডাঃ আবু জাফর, মীর্জা মনসুর, ছাত্রলীগ নেতা রাখাল চন্দ্র বণিক ও শাহ-ই-জাহান চৌধুরী। কারিগরী ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় বেতারের আঞ্চলিক প্রকৌশলী মীর্জা নাসিরউদ্দিন, প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান ও দেলওয়ার হোসেনকে। প্রকৌশলীরা সম্প্রচারের জন্য বেতার চালু করেন।নেতারা মিলে ঘোষনার খসড়া রচনা করেন। রাখাল বণিকের কন্ঠ প্রথম ভেসে আসে- ‘ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র, একটি বিশেষ ঘোষনা। একটু পরেই জাতির উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা দেবেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের বিপ্লবী সাধারন সম্পাদক এম এ হান্নান। আপনারা যারা রেডিও খুলে বসে আছেন তাঁরা রেডিও বন্ধ করবেন না’। এরপর এম এ হান্নান ঘোষনাটি পাঠ করেন। প্রথমে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র বললেও পরে রাখাল বণিক স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র বলতে থাকেন। এম এ হান্নানের ঘোষনা পাঠও প্রচারিত হতে থাকে।
এরপর নেতারা শহরে ফিরে আসেন। বেতার কেন্দ্রে রয়ে যান ছাত্রনেতা শাহ-ই-জাহান চৌধুরী।
দ্বিতীয় অধিবেশনঃ ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭.৪০ মিনিট
২৬ মার্চ সকালে ডাঃ শফি ও বেগম মুশতারী শফির বাসায় বসে বেতার চালু করার আলোচনা করেন চট্টগ্রামে বেতারে কর্মরত কয়েকজন- বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, আব্দুল্লাহ আল ফারুক প্রমুখ। তারা প্রথমে যান রাজনৈতিক নেতাদের কাছে, তারা সবাই যখন ব্যস্ত ছিলেন যুদ্ধরত ইপিআরদের সাহায্য করতে। এখান থেকে প্রখ্যাত নাট্যকার মমতাজউদ্দিন যোগ দেন। সবাই মিলে যান আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্রে। একই উদ্দেশ্যে এসময় আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্রে হাজির হন ঐ এলাকার ডাঃ আনোয়ার আলী সহ কয়েকজন। ডাঃ আলীর কাছে ছিল বঙ্গবন্ধুর ঘোষনার কপি।
আগ্রাবাদ কেন্দ্রের আঞ্চলিক প্রকৌশলী কাহহার পরামর্শ দেন কালুরঘাট যেতে। পরামর্শ অনুযায়ী সবাই মিলে কালুরঘাট পৌঁছান। এখানে প্রথম ঘোষনা দেন আবুল কাসেম সন্দ্বীপ। সংবাদ পাঠ করেন সুলতান উল আলম। সন্ধ্যার পর ডাঃ জাফর ও এম এ হান্নান আবার আসলে বেলাল মোহাম্মদের অনুরোধে এম এ হান্নান আবার স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন।
তৃতীয় অধিবেশন: ২৬ মার্চ রাত ১০টা
মাহমুদ হোসেন, ফারুক চৌধুরী (আগ্রাবাদ হোটেলের সহকারী ম্যানেজার), বেতার শিল্পী রঙ্গলাল দেব চৌধুরী রাত ১০টায় বেতার চালু করেন।
চতুর্থ অধিবেশন : ২৭ মার্চ সকাল ১০.৩০ মিনিট
এই অধিবেশনটি পরিচালনা করেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতারা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনা পাঠের সাথে বাংলা ও ইংরেজী সংবাদ এবং কথিকা পাঠ করা হয়।
পঞ্চম অধিবেশনঃ ২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়ার ঘোষনা পাঠ
এদিন সকাল বেলা বেলাল মোহাম্মদ পটিয়ায় গিয়ে মেজর জিয়াকে অনুরোধ করেন, বেতার ভবনের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। মেজর জিয়া তৎক্ষনাৎ কয়েকজন সৈন্য পাঠিয়ে দেন। তিনি নিজে বেতার কেন্দ্রে আসেন বিকেল ৫টায়। বেলাল মোহাম্মদের সাথে অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমদও ছিলেন। তাঁরা মেজর জিয়াকে অনুরোধ করেন স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করতে। মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন।
যষ্ঠ অধিবেশন: ২৭ মার্চ রাত ৯.৩০ মিনিট- মেজর জিয়ার নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা
মেজর জিয়া হঠাৎ করেই আবার বেতারে আসেন রাত ৯.৩০ মিনিটে তার সামরিক অফিসারদের নিয়ে। আবার বেতার চালু হয়। আমিনুর রহমান ও আবদুস শুকুর নামে দুজন বেতার কর্মী ছাড়া উল্লেখযোগ্য কেউ ছিলেন না তখন। এবারের ভাষনে মেজর জিয়া নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন।
সপ্তম অধিবেশনঃ ২৮ মার্চ সকাল ৯টার পর
এই অধিবেশনে বেলাল মোহাম্মদ, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, সেকান্দর হায়াত খান, ল্যাফটেনেন্ট শমসের মবিন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুঁইয়া উপস্থিত ছিলেন। মেজর জিয়ার নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষনাটি পুনঃ প্রচার হয়। দিনের বেলা সম্প্রচারে এই ঘোষনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। এম এ হান্নানের নির্দেশে চট্টগ্রাম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারন সম্পাদক সাবের আহমদ আসগরী এসে মেজর জিয়াকে জানান- অবিলম্বে ঘোষনা বদলাতে হবে, না হলে সংগ্রাম পরিষদ অন্য কোন সেনা অফিসার দিয়ে নতুন করে ঘোষনা দেয়াবে। কিছুক্ষন চিন্তা করে জিয়া বেতার কেন্দ্রে যান।
অষ্টম অধিবেশনঃ ২৮ মার্চ দুপুর ২টার পর
এই অধিবেশনে মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবারো স্বাধীনতা ঘোষনা পাঠ করে বিভ্রান্তির অবসান ঘটান। এরপর থেকে এই ঘোষনাটি বারবার প্রচার হতে থাকে।
কালুরঘাট থেকে মোট ১৪টি অধিবেশনে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। ৩০ মার্চ বেতার কেন্দ্র লক্ষ্য করে পাকিস্তানীরা বিমান আক্রমন করলে সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। ৩১ মার্চ ট্রান্সমিটারটি খুলে পটিয়া, বান্দরবন, রামগড় ঘুরে বিএসএফ এর সহযোগীতায় ৮ এপ্রিল বিলোনিয়ার এক পাহাড়ে আবার চালু হয়।
ছবি ও লেখা সংগৃহীত
Hasan Murshed