21/07/2026
আজকের গল্প
বন্ধ ঘরের তৃতীয় জানালা -প্রথম পর্ব
————————————————
কলকাতার উত্তর শহরতলির এক পুরনো বাড়ি।
বাড়িটির নাম—নীলকুঠি।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, বহু বছর ধরে সেখানে কেউ থাকে না। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, লোহার গেট মরচে ধরেছে, আর বাগানের আগাছা কোমর ছাড়িয়ে গেছে।
কিন্তু প্রতি বছর ঠিক একই দিনে বাড়িটির দোতলার একটি জানালায় আলো জ্বলে।
তারিখটা—
১৭ জুলাই।
কেউ জানে না কেন।
⸻
অর্ক সেন একজন সাংবাদিক।
পুরনো রহস্য ও অমীমাংসিত অপরাধ নিয়ে লেখাই তার কাজ।
একদিন সন্ধ্যায় তার অফিসে একটি খাম এসে পৌঁছল।
খামের ভিতরে ছিল মাত্র একটি ছবি।
পুরনো একটি বাড়ি।
নীলকুঠি।
ছবির পিছনে লেখা—
“এই বাড়িতে আজ রাত বারোটার পর তৃতীয় জানালাটি খুলবে।
যদি সত্য জানতে চান, ভিতরে আসুন।”
নিচে কোনও নাম নেই।
অর্ক প্রথমে বিষয়টিকে মজা ভেবেছিল।
কিন্তু ছবির নিচে লেখা একটি তারিখ দেখে সে থমকে গেল।
১৭ জুলাই, ২০০৬।
ঠিক কুড়ি বছর আগে।
সেই রাতেই নীলকুঠি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল এক কিশোরী—
মীরা।
মীরার দেহ কখনও পাওয়া যায়নি।
কেসটি আজও অমীমাংসিত।
⸻
রাত ১১টা ৪০।
অর্ক নীলকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে।
বৃষ্টি পড়ছে।
গেটটা আশ্চর্যজনকভাবে খোলা।
সে ভিতরে ঢুকে পড়ল।
বাড়ির দরজা ঠেলে খুলতেই একটা ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগল।
ঘরের ভিতর অন্ধকার।
হঠাৎ—
টিক…
একটি ঘড়ির শব্দ।
অর্ক টর্চ জ্বালিয়ে তাকাল।
দেওয়ালে একটি পুরনো ঘড়ি।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে—
১১টা ৪৭ মিনিটে।
অর্কের ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে কোনও উত্তর নেই।
শুধু একজন মেয়ের কণ্ঠস্বর—
—“তুমি দেরি করে ফেলেছ।”
অর্ক চমকে উঠল।
—“আপনি কে?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
—“তৃতীয় জানালাটা খুঁজে বের করো।”
কল কেটে গেল।
⸻
অর্ক দোতলায় উঠল।
করিডোরের একেবারে শেষে তিনটি জানালা।
প্রথমটি বন্ধ।
দ্বিতীয়টি বন্ধ।
তৃতীয়টি—
খোলা।
অর্ক ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
জানালার পাশে একটি কাঠের টেবিল।
তার উপর একটি পুরনো ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“মীরা—১৭ জুলাই ২০০৬।”
অর্কের হাত কেঁপে উঠল।
সে ডায়েরি খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“আজ বাবা আবার মিথ্যা বলল।
আমি সব জানি।
কিন্তু কেউ আমাকে বিশ্বাস করবে না।”
পরের পাতায়—
“যদি আমার কিছু হয়, তৃতীয় জানালার নিচে খুঁজবে।”
অর্ক সঙ্গে সঙ্গে জানালার নিচে মেঝে পরীক্ষা করল।
কাঠের একটি তক্তা অন্যগুলোর তুলনায় আলগা।
সে তক্তাটি তুলতেই একটি ছোট লোহার বাক্স পেল।
বাক্সের ভিতরে—
একটি পুরনো ক্যাসেট।
আর একটি ছবি।
ছবিতে চারজন মানুষ।
মীরা।
তার বাবা।
একজন অচেনা যুবক।
আর—
অর্ক নিজে।
অর্কের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।
—“এটা কীভাবে সম্ভব?”
ঠিক তখনই পিছন থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল।
ধাম!
অর্ক ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার সামনে একজন বৃদ্ধ।
বৃদ্ধ বললেন,
—“তুমি শেষ পর্যন্ত ফিরে এলে।”
অর্ক চিনতে পারল না।
—“আপনি কে?”
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।
—“যে মানুষটা তোমাকে বিশ বছর আগে বাঁচিয়েছিল।”
অর্কের বুক কেঁপে উঠল।
—“আমি এখানে আগে এসেছিলাম?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
—“হ্যাঁ।”
—“কখন?”
—“১৭ জুলাই ২০০৬।”
অর্ক পিছিয়ে গেল।
—“কিন্তু… আমি তখন কলকাতায় ছিলাম না। আমি তো—”
বৃদ্ধ তাকে থামিয়ে দিলেন।
—“তুমি মীরার সঙ্গে এই বাড়িতেই ছিলে।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
অর্কের মাথায় কিছু অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠতে লাগল।
একটি মেয়ে দৌড়াচ্ছে।
কারও চিৎকার।
একটি দরজা বন্ধ হচ্ছে।
আর—
একটি গুলির শব্দ।
অর্ক মাথা চেপে ধরল।
—“আমি কিছু মনে করতে পারছি না।”
বৃদ্ধ বললেন,
—“কারণ তোমাকে সব ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
—“কে?”
বৃদ্ধের চোখ এবার অন্ধকার হয়ে গেল।
—“তোমার বাবা।”
অর্ক স্তব্ধ।
তার বাবা মারা গেছেন দশ বছর আগে।
—“কেন?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে ক্যাসেটটির দিকে তাকালেন।
—“কারণ মীরা তোমার বাবার একটি অপরাধ দেখে ফেলেছিল।”
অর্ক ক্যাসেটটি হাতে নিল।
পুরনো টেপ রেকর্ডারে সেটি চালু করল।
কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর একটি মেয়ের কণ্ঠ—
“অর্ক, যদি তুমি এই কথাগুলো শোনো, তাহলে বুঝবে আমি আর নেই।”
অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
মীরার কণ্ঠ।
—“তোমার বাবা আমাকে মেরে ফেলেনি। কিন্তু সে জানে কে আমাকে মেরেছে।”
হঠাৎ ক্যাসেট বন্ধ হয়ে গেল।
অর্ক চিৎকার করল—
—“তারপর কী হয়েছিল?”
বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না।
অর্ক ঘুরে তাকাল।
বৃদ্ধ নেই।
ঘর ফাঁকা।
শুধু তৃতীয় জানালাটি খোলা।
আর জানালার বাইরে—
একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে।
সাদা পোশাক।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
অর্ক জানালার কাছে ছুটে গেল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
অর্ক জমে গেল।
মেয়েটির মুখ—
মীরার মতো নয়।
বরং—
অর্কের নিজের মায়ের মুখ।
⸻
পরদিন সকালে পুলিশ নীলকুঠিতে অর্ককে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করল।
তার পাশে পড়ে ছিল সেই পুরনো ডায়েরি।
কিন্তু ডায়েরির শেষ পাতায় আগের রাতে কোনও লেখা ছিল না।
এখন সেখানে একটি নতুন বাক্য।
“তুমি ভুল মানুষকে খুঁজছ।”
অর্কের পাশে পড়ে থাকা ছবিটিও বদলে গেছে।
ছবিতে এখন চারজন নয়—
পাঁচজন মানুষ।
মীরা।
অর্ক।
অর্কের বাবা।
সেই অচেনা যুবক।
আর—
অর্কের মা।
ছবির পিছনে একটি তারিখ।
১৭ জুলাই ২০০৬।
আর তার নিচে লেখা—
“খুনটি হয়েছিল রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে।
কিন্তু যে মারা গিয়েছিল, সে মীরা ছিল না।”
অর্ক ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর তার ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
সে ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে মীরার কণ্ঠস্বর—
—“এবার তুমি সত্যিই জানতে চাও?”
অর্ক কিছু বলল না।
মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—
“তাহলে আগামী ১৭ জুলাই তোমার মায়ের কাছে যেও না।”
কল কেটে গেল।
অর্ক ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকাল।
তৃতীয় জানালাটি আবার বন্ধ।
কিন্তু কাঁচের ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
একজন মেয়ে।
সে আঙুল তুলে কাঁচে লিখল—
“আমি এখনও বেঁচে আছি।”
—————————————