17/07/2025
জগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথ যাত্রার গল্প
প্রথম পর্ব
(ভক্তের ভগবান)
প্রায় সাড়ে ছয়শো বছর আগের কথা বলছি। হিসেব করলে প্রায় ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ। বাংলায় তখন সুলতানী আমল শেষ হয়ে ইলিয়াস শাহী শাসনের শুরু হয়েছে। ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামের একজন সাধক গিয়েছিলেন পুরীতে জগন্নাথ দর্শন করতে। তাঁর ইচ্ছে ছিল নিজের হাতে ভোগ রেঁধে মহাপ্রভুকে খাওয়াবেন। সেই মতো তিনি প্রভুর জন্য ভোগ নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলেন। কিন্ত সেবায়ত এবং দ্বৈতাপতিরা সে ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেবেন কেন?কোথাকার কোন বামুন, নাম নেই ধাম নেই, তাঁর এমন আস্পর্ধা! শ্রীমন্দিরের ছাপ্পান্ন ভোগ ছেড়ে জগন্নাথ নাকি যে সে লোকের হাতে রাঁধা ভোগ খাবেন। মন্দিরের পান্ডারা ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীকে চরম অপমান করে মন্দির থেকে বের করেদিলেন ।
স্বয়ং ভগবানের স্থানে এসে ভক্ত এতো অপমান সইবে কেন? ধ্রুবানন্দ ভগবানের কাছে এসেছিলেন সামান্য ভোগ গ্রহণের আর্জি নিয়ে। কিন্ত বদলে জুটলো অহেতুক লাঞ্ছনা। জগতের নাথ যিনি সেই মহাপ্রভু জগন্নাথের দুয়ারে যদি এই অন্যায় সহ্য করতে হয়, তবেতো জীবন রাখাই বৃথা। দুঃখে অভিমানে ধ্রুবানন্দ অনাহারে প্রাণত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। দুই দিন পেরিয়ে গেল। অসুস্থ হয়ে পড়লেন ধ্রুবানন্দ গোঁসাই। তিন দিনের দিন রাতে ধ্রুবানন্দের এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হলো।
" ধ্রুবানন্দ, তুমি নাকি ভোগ খাওয়াবে বলে এসেছো। এদিকে নিজেই অনাহারে মরতে বসলে যে।"
ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর মাথার সামনে ও কে দাঁড়িয়ে? জগতের সমস্ত আলো যেন ধ্রুবানন্দকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে।
" ধ্রুবানন্দ, তোমার রান্না করা ভোগ খেতেই আমি এলাম। কিন্ত এযে দেখছি তুমি অভিমান করে বসে আছো। আমি তোমার সঙ্গে যাবো বলেই এসেছি।"
চোখ খুললেন না ধ্রুবানন্দ, তিনি জানেন প্রভু জগন্নাথ স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছেন ভক্তের মান ভাঙাতে। ধ্রুবানন্দের চোখ বেয়ে জল নামতে থাকলো।
"প্রভু, আপনি আপনার শ্রী মন্দির ,ছাপ্পান্ন ভোগ ছেড়ে এসেছেন আমার মতো একজন তুচ্ছ মানুষের সঙ্গে যাবেন বলে? আপনার ছলনার অন্ত নেই।"
"ভক্তের মনই আমার শ্রীমন্দির ধ্রুবানন্দ। লোক চক্ষুর সামনে যে মন্দির, সেখানে আমি দারুব্রহ্ম। কিন্ত লোক চক্ষুর অন্তরালে, মনের শ্রীমন্দিরে আমিই পূর্ণব্রহ্ম রূপে বাস করছি। সুতরাং শ্রীমন্দির ছেড়ে কোথাও যাওয়ার সাধ্যি নেই আমার।"
কিন্ত ঠাকুর, ব্রহ্মচারী মানুষ আমি, নিজেরই চালচুলো নেই। আপনাকে নিয়ে গিয়ে কোথায় ঠাই দেব? কোথায় পাবো এমন জায়গা যেখানে আপনাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।"
" ধ্রুবানন্দ, ভাগীরথীর তীরে এক পুণ্যভূমি আছে। সেখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করো। আমি দারু রূপেই তোমায় দর্শন দেব।"
"কিন্ত ঠাকুর, আমি সংসার ত্যাগী সন্যাসী। আমার পরে তোমার সেবা করার জন্যে কাউকে যে রেখে যাবো সে উপায় নেই। আমার অবর্তমানে তোমার ভার কে নেবে ঠাকুর?"
"আমি তোমার হাতে রাঁধা ভোগ খেতে এসেছি গো ধ্রুবানন্দ ঠাকুর। এই জীবনে তোমার দায়িত্ব ওইটুকুই। সময় এলে আমিই স্বয়ং তোমায় দায়িত্ব ভার থেকে মুক্তি দিতে আসবো। ততোদিন তুমি শুধু আমার নির্দেশ টুকু পালন করো।"
ঘুম ভেঙে গেল ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর। নাহ, সারা শরীরে কোনো রকম অসুস্থতার ছাপ নেই। বরং তারুণ্য ফিরে পেয়েছেন যেন। ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের বাস, এই কথাটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন। আর সময় নষ্ট করা যাবেনা এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। কি যেন নাম জায়গাটার? হ্যাঁ,
ভাগীরথী তীরে যেথা নব্য নীলাচল
মাহেশ নামেতে তাঁকে জানেন সকল।।
ফিরে চললেন ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী। এখন তাঁর কাঁধে স্বয়ং মহাপ্রভুর দায়িত্ব। মরার সময় নেই তাঁর।