27/07/2025
ধানমন্ডি সেন্ট্রাল হাসপাতালে যাব। এক বৃদ্ধ আত্বীয় অসুস্থ। বয়স ৯০ এর কাছাকাছি হবে৷ সিরিয়াস অবস্থা। দম নাকের ডগায় চলে এসেছে। যে কোনো সময় আজরাইল এসে "বিসমিল্লাহ" বলে নিয়ে যাবে। শেষ বিদায় জানাতে উনার ছেলেমেয়ে, নাতি, নাতকর, আত্বীয় স্বজন সবাই এসে হাসপাতালে ভীড় করছে। আমাকেও কল দিলো। এখন না গেলে খারাপ দেখা যায়। এর আগেও উনি আরও তিনবার এইরকম সিরিয়াস অবস্থায় ছিলেন। প্রতিবারই সবাই শেষ দেখা দেখতে ছুটে আসে। এসে কেঁদেকুটে, বিভিন্ন স্মৃতিচারন করে যায় সবাই। পরে দেখা যায় দুই তিন পরেই উনি আবার সুস্থ হয়ে উঠেন। এরপর সবাই পড়ে যায় দোটানায়। যাবে কি যাবে না, দেখতে। না গেলে যদি এইটাই শেষ বার হয়ে যায়? আবার গেলেও পরে দেখা যায় ভালো হয়ে গেছে। প্রকৃতি মাঝেমধ্যে অযথাই মানুষকে নিয়ে এভাবে খেলে। বলা যায় একটা মানুষের মৃত্যুর জন্যই এখন সবার অপেক্ষা। তবে এইবার নাকি বেশি খারাপ অবস্থা। আজকের দিনটাও টিকবে বলে মনে হয় না।
রাস্তায় বাইক খোঁজাখুঁজি করছি। এখন আর এপে চলাফেরা করি না। এত সময় নেই। বাইকওয়ালাদের রাস্তা চেনানোও বিরক্তিকর লাগে। কেউ কেউ ঠিক সময়ে আসে না। পারলে ভাত টাত খেয়ে একদম পান সিগারেট শেষ করে তারপর আসে। একদিন এক বাইকওয়ালাকে বললাম, ভাই ইমার্জেন্সি তাড়াতাড়ি আসেন। সে আর আসে না। ২০ মিনিট পর আমি ফোন দেয়ার পর সে বলে, তার বাইকে তেল নাই। এখন আসতে পারবে না। আরেকদিন একজনকে বললাম, আমি মহাখালী, আমতলী। সে ম্যাপ বুঝে না। চলে গেছে গাবতলী। গাবতলী গিয়ে কল দিয়ে বলে, আপনি কই?
তিনজন বাইকওয়ালা বসে আছে বাইকের উপরে রাস্তার পাশে। একজন বসতে গিয়ে প্রায় শুয়ে গেছে। শুয়ে মোবাইল টিপছে। একটা বালিশ এনে দিলে ভালো হতো। দুইজনের চেহারা আর বেশভূষা দেখে ভালো লাগে লাগলো না। ইদানীং বাইকেও ছিনতাই হয়। তবে পাশের জনকে দেখলাম ফরমাল কাপড় চোপর পড়া। ইন করা। পায়ে সু। ভদ্রলোক ই মনে হলো। আমি তার বাইকে উঠলাম।
সংসদ ভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে দেখলাম, আমার টিমের এক ছেলে এক মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে ভেলপুরি খাচ্ছে। আমি কল টল কিছুই দিলাম না। সেলসে বাইরে কাজ করলে ফাঁকে ঝাকে পোলাপান একটু আধটু ব্যাক্তিগত কাজও সেরে ফেলে। এটা সবাই করে। তবে এগুলোকে আমি ফাঁকি হিসেবে দেখি না। এগুলো বরং তার মধ্যে সতেজতা তৈরী করে। প্রেশার রিলিজ হয়। সেলসের প্রেশার কখনো কখনো মানুষকে আধা পাগল বানিয়ে দেয়। তাই একটু নিস্তার দরকার আছে। এই ঘন্টাখানের জন্য তাকে কল দিয়ে ঝাড়ি দেয়ার কিছু নেই। তার কাজ সে ঠিক ঠাক করলেই হলো৷ আমার দরকার সেলস। এটা পুরন করে দিয়ে তুই গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে শুয়ে থাকলেও আমার কিছু আসে যায় না। আমি টিমের পোলাপানদের এই স্বাধীনতা দিয়েই কাজ করাই৷ এবং তারা যথেষ্ট সেলস আনে।
আসাদ গেটের জ্যামে বসে কল দিলাম টিমের আরেকজনকে। সে নাকি মোহাম্মদপুর আছে। অথচ ট্রাকিং এ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আবাসিক হলে আছে। সে প্রতিদিন ই দুপুর সময়ে সেদিকে থাকে। হলের ডাইনিং এ কম টাকায় দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য যায়। নতুন ছেলে বেতন ১৫/১৬ হাজার হয়তো পায়। গরীব পরিবারের একমাত্র ছেলে। বাড়ীতেও টাকা দেয়। দুপুরে ২০০/৩০০ টাকা খরচ করে লাঞ্চ করা তার জন্য বিলাসিতা। আমি এদের সব খবর ই জানি৷ সবার ভেতর বাহিরের খবরই রাখি। কিন্তু কিছুই বলি না। আমার দরকার সেলস। সেটা বুঝিয়ে দিলেই হলো। মাস শেষে শুধু একবার ধরব। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় কল দিয়ে দিয়ে, প্রেশার দিয়ে আসলে কোন কাজ হয় না। এরকম ভাবে মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে কেউ ভালো করে কাজ করতে চায় না।
বাইকওয়ালার সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে যাচ্ছি। প্রসঙ্গক্রমে জানতে পারলাম রাইড শেয়ারিং তার পেশা না। সে একটা কোম্পানীতে সেলসে চাকুরী করে। প্রতিদিন অফিস থেকে বের হয়ে এখানে কিছুক্ষন দাঁড়ায়। সে যেদিকে যাবে সেদিকে কেউ গেলে সাথে নিয়ে নেয়। সে সিনিয়র মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। বিয়ে শাদি করলে এই বেতনে ঢাকা শহরে সংসার পাতা সম্ভব না। সাইট ইনকাম লাগবেই। সারাদিন ঢাকার এখানে সেখানে যাওয়া লাগে তার। পেছনে একজনকে বসিয়ে নিলে কোন ক্ষতি নেই। বরং বাড়তি আরও কিছু আয় হয়। আমি বললাম, "ভালোই তো ৷ চালিয়ে যান। বুদ্ধি খারাপ না।
হাসপাতালে গিয়ে দেখি আবারও এক পারিবারিক মিলন মেলা। অনেকে গল্প গুজব, হাসাহাসিও করছে। পারছে না অনলাইনে অর্ডার দিয়ে চা কফি পিজ্জা নিয়ে বসতে। বুড়ো মহিলা। ডেট শেষ। পুরো সংসার ছেলে মেয়ে সবাইকে গুছিয়ে দেয়ার পর এখন আর তার তেমন মুল্য নেই। তার বেঁচে থাকা না থাকা এখন একই সমান। বরং চলে যাওয়াই বেশি শান্তির।
সেখানে গিয়ে আরও পেলাম আমার সেই ধানমন্ডির আত্বীয়ের মেয়েটাকে। যে নর্থ সাউথে পড়ে। নামটা এখন মনে পড়ছে না। আমাকে আংকেল ভেবেছিল। খুব একটা পাত্তা দেয় নি। আজ তাকে দেখে আমি অন্যদিকে মুখ করে ছিলাম। সে কাছে এসে সালাম দিয়ে বললো "ভাইয়া কেমন আছেন? সেদিন আপনাকে চিনতে পারি নি। আপনার ফেসবুকের অনেক লিখা আমার ফ্রেন্ডরাও দেখি শেয়ার করে। তারপর চিনলাম আপনাকে, সেদিন এসেছিলেন।" আমি বললাম ঠিক আছে। সমস্যা নাই। রোগীর কি অবস্থা!" এই মেয়ের সাথে এখন ফরমাল আলাপ করতে হবে। কচি বয়স। আবেগ বেশী। তার চোখে মুখে প্রেম প্রেম ভাব দেখতে পাচ্ছি। আমার এসব প্রেমের সময় নেই। আমি কারো সাথেই প্রেম টেম করি না। এগুলো বিশ্বাসও করি না। আমার কেবল কামে বিশ্বাস। এ মেয়েও এক সময় কামে পড়বে তবে সেটা আরও অনেক পড়ে। প্রেমে বিশ্বাস হারিয়ে। এখন পরিছন্ন হৃদয়। সবই আবেগ দিয়ে দেখবে। এসব আবেগে পাত্তা দেয়ার কোন মানে নেই।
আমার দূর সম্পর্কের সেই মামাকেও পেলাম। উনি এসেই আমার সাথে উনার বাসা বিক্রি নিয়ে কথা বলছেন। অন্যান্য আত্বীয়রাও একে অন্যের সাথে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা নিয়ে ব্যাস্ত। বিছানায় পরে আছে রোগী। আমি উনার কাছে গেলাম। চোখ বন্ধ। শুধু দেহটা হালকা উঠা নামা করছে নি:শ্বাসের সাথে। এই মানুষটার চলে যাওয়ায় এখন খুব বেশি মানুষ ব্যাথিত হবে না। অথচ একদিন পুরো একটা সংসার, কত দায় দায়িত্ব, ছেলে মেয়ে কত কি আগলে রেখেছিলেন তিনি। কত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তিনি। উনাকে ছাড়া গোটা সংসার অচল। আজ সেই সংসারেই উনি অচল। উনার বিদায়ের জন্য সবার অপেক্ষা। উনি চলে গেলেই যেন সবার বেঁচে যাওয়া। জীবন সায়াহ্নে বৃদ্ধ মানুষদের এইসব করুণ বিদায় দেখলে খারাপ লাগে। বেশী বছর বেঁচে থাকা এক প্রকার যন্ত্রণা।
©Jayef khan Nadim