04/09/2026
নামজারি কার্যক্রমে রেকর্ডীয় শ্রেণি হালনাগাদ:
ভূমি ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
ভূমি ব্যবস্থাপনায় সঠিক ও হালনাগাদ রেকর্ড একটি অপরিহার্য বিষয়।
জমির মালিকানা, ব্যবহার, শ্রেণি, ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ এবং ভূমি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনগত কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য ভূমির রেকর্ড বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিকভাবে কিংবা মানুষের ব্যবহারের পরিবর্তনের কারণে ভূমির প্রকৃত শ্রেণির পরিবর্তন ঘটলেও তা নিয়মিতভাবে রেকর্ডে প্রতিফলিত না হওয়ায় ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হয়ে আসছে।
এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট ও পারফরমেন্স (ডিকেএমপি) অনুবিভাগ ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্মারক নং ৩১.০০.০০০০.০৫৭.৯৯.০০৩.২৬-৭০৮-এর মাধ্যমে নামজারি কার্যক্রমের সঙ্গে রেকর্ডীয় শ্রেণি হালনাগাদের ব্যবস্থা ই-মিউটেশন সিস্টেমে চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের উক্ত স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি বড় সমস্যা হচ্ছে রেকর্ডীয় শ্রেণি যথাসময়ে হালনাগাদ না হওয়া। কোনো জমির শ্রেণি প্রাকৃতিক কারণে অথবা মানুষের ব্যবহারজনিত কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু পরিবর্তিত শ্রেণি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত না হলে পরবর্তীতে ভূমি রেজিস্ট্রেশন, ভূমির মূল্য নির্ধারণ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়সহ বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রকৃত অবস্থা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এর ফলে একদিকে ভূমি ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, অন্যদিকে সরকার প্রাপ্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
সাধারণত ভূমি হস্তান্তর বা ওয়ারিশসূত্রে কোনো ব্যক্তি ভূমির মালিকানা অর্জন করার পর সংশ্লিষ্ট ভূমির নামজারি করা হয়। নামজারির মাধ্যমে ভূমির রেকর্ড হালনাগাদ করা হয়। ফলে নামজারি কার্যক্রমকে কাজে লাগিয়ে একই সঙ্গে ভূমির প্রকৃত বা বাস্তব শ্রেণিও রেকর্ডে প্রতিফলিত করার একটি কার্যকর সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এতদিন নামজারি কার্যক্রমের সময় জমির মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়টি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও জমির বাস্তব ব্যবহার বা শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়মিতভাবে রেকর্ডীয় শ্রেণিতে প্রতিফলিত করার ব্যবস্থা ছিল না। ফলে একই জমি বাস্তবে এক শ্রেণিতে ব্যবহৃত হলেও রেকর্ডে অন্য শ্রেণিতে থেকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ভূমির প্রকৃত ব্যবহার এবং সরকারি রেকর্ডের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান উদ্যোগের মাধ্যমে নামজারি প্রক্রিয়ায় জমির বাস্তব শ্রেণি বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি নামজারির আবেদন করলে আবেদন নিষ্পত্তির সময় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে জমির বাস্তব ব্যবহার ও শ্রেণি নিরূপণ করে তা নামজারি খতিয়ানে রেকর্ডীয় শ্রেণি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা ই-মিউটেশন সিস্টেমে চালু করা হচ্ছে। এর ফলে ভূমির মালিকানা হালনাগাদের পাশাপাশি ভূমির শ্রেণিও বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে হালনাগাদ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ ও আদায় আরও বাস্তবভিত্তিক হবে, ভূমির মূল্য নির্ধারণে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে এবং ভূমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সরকারি রাজস্ব সঠিকভাবে নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে। সর্বোপরি, ভূমির ডিজিটাল রেকর্ড ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—রেকর্ডীয় শ্রেণি হালনাগাদ এবং ভূমির মালিকানা নির্ধারণ বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এক বিষয় নয়। নামজারি মূলত রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কোনো জমির মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি আদালতে বিরোধ, স্বত্বের প্রশ্ন বা আদালতের রায়-ডিগ্রি থাকলে তা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে। শুধুমাত্র শ্রেণি হালনাগাদের নির্দেশনাকে ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তির স্বত্ব বা মালিকানা সৃষ্টি, বিলোপ বা বাতিল করা সমীচীন নয়।
অতএব, নামজারি তদন্ত ও নিষ্পত্তির সময় সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জমির খতিয়ান, দলিল, দখল, মাঠপর্যায়ের বাস্তব ব্যবহার এবং প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জমির বাস্তব শ্রেণি রেকর্ডীয় শ্রেণির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রেকর্ডীয় শ্রেণি হালনাগাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে তাই শুধু একটি সফটওয়্যার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মূলত “মালিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভূমির বাস্তব তথ্যও হালনাগাদ করার” একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উদ্যোগ। এর যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভূমির ডিজিটাল রেকর্ড আরও নির্ভুল, বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর হবে এবং একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও আরও শক্তিশালী হবে।
সর্বোপরি, নামজারি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ভূমির মালিকানা, ব্যবহার ও শ্রেণির তথ্য একই সঙ্গে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের এই নির্দেশনা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।