22/02/2021
#অন্ধকারের_আড়ালে (পর্ব ০১)
#রবিউল_হাসান_সাইমুন
বাতি নিভিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজেরই প্রতিবিম্বের দিকে। দেহের উপরিভাগ পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং পেটের ঠিক মাঝখানে বড় একটা কাটা দাগ। রক্ত চুইয়ে পড়ছে দাগটা থেকে। গত কয়েক দিন থেকেই দেখা দিয়েছে সমস্যাটি। রাত হলেই পেটে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয় ঈশিতার। আর আয়নার সামনে এলে দেখতে পায় পেটের উপর বিরাট একটা কাটা দাগ। কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো দিনের বেলায় দাগটাকে দেখা যায় না আর।
বাড়ির অন্য কাউকে জানাবে জানাবে করেও জানায় নি এই ভেবে যে অন্যেরা তাকে পাগল ভেবে বসবে। তবে একটা জিনিস আজ খেয়াল করেছে ঈশিতা। তা হলো গতকালের তুলনায় আজ যেনো দাগটা তুলনামূলক একটু বেশিই বড় হয়ে গেছে। গতকালও দাগটা এতোটা বড় ছিল না বোধহয়। বাতি জ্বালিয়ে দেখলে বোঝা যেতো। কিন্তু বাতি জ্বালালে বাসার অন্যেরা জেগে যাবে, তখন কী হুলুস্থুল কান্ড বেঁধে বসবে তা ভাবতেই গা রি রি করে উঠলো তার।
আলতো করে কাটা দাগটায় হাত বোলালো সে। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে এগিয়ে ধরলো আয়নার দিকে। ফ্ল্যাশলাইটের মৃদু আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ক্ষতটা বিকট আকার ধারণ করেছে, সম্ভবত আজ রাতেই। এক কিডনি হতে আরেক কিডনি পর্যন্ত বেড়ে গেছে ওটা। আচমকা কী মনে হতেই ফোনে ক্ষতচিহ্নের ছবি তুলে নিলো সে। সিদ্ধান্ত নিলো আগামীকালই সবাইকে এ ব্যাপারে জানিয়ে দেবে। আর প্রমাণ হিসেবে তো ছবিটা আছেই।
কয়েক মিনিট পার হবার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের মাত্রাটাও বেড়ে গেলো তার। কেন জানি দাগটার এভাবে বেড়ে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না সে। আয়নার সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়ে একগ্লাস পানি পান করে বসলো বিছানায় গিয়ে। তরতর করে ঘাম বইছে কপালের দুই পাশ বেয়ে। মাথা নিচু করে পেটের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো আরেকটু চওড়া হয়ে গেছে দাগটা। এবার আর উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি পেলো না গায়ে। যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠে শুয়ে পড়লো বিছানায়। ইতিমধ্যে ঠকঠক করে কাঁপতে আরম্ভ করেছে সে।
যন্ত্রণা খানিকটা কমানোর আশায় জোর করে চোখ বুজে রাখলো। পিনপতন নিরবতার মাঝে নিজের হৃদপিন্ডের ধুকধুকানিই ভয়াবহ শোনাচ্ছে তার কাছে। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে কান চেপে ধরলো ঈশিতা। হাটু ভাজ করে একপাশে ঘাড় কাত করতেই টের পেলো কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে বিছানার ঠিক পাশেই। অবাক হয়ে চোখ খুললেও হাতদুটো কান থেকে সরালো না। সে বিছানার এক সাইডের দিকে মুখ দিয়ে শুয়ে থাকায় সহজেই দেখতে পেলো আগন্তুককে। একটা লম্বা কালো জামা পরে আছে আগন্তুক। ধীরে ধীরে উপরের দিকে মাথা তুলে আগন্তুকের মুখ দেখার চেষ্টা করলো ঈশিতা। শিউরে উঠে গড়িয়ে এসে বিছানার উল্টোদিকে ফ্লোরে পড়লো সে।
মেঝেতে পড়েই দুইহাত কান থেকে সরিয়ে চোখের উপর এনে রাখলো। একটু আগে দেখা দৃশ্যটা পুনরায় দেখতে রাজি নয় সে। এখনো চোখের পাতায় ভাসছে দৃশ্যটা। ফ্যাকাশে একটা মেয়ে তাকিয়েছিলো তার দিকে। মেয়েটার কপালের উপর থেকে চিবুকে পর্যন্ত লম্বা একটা সেলাই দাগ। চোখদুটো এতোটাই বড়ো যে দেখে মনে হয়েছিলো দুটো বড়োসড়ো মারবেল।
বিড়বিড় করে কিছু একটা কানে আসায় আঙুলের ফাঁক দিয়ে উপরের দিকে তাকালো ঈশিতা। ঘরের উপরের দিকে ঘুরতে থাকার ফ্যান ছাড়া কিছুই দেখতে পেলো না আর। এদিকে শব্দটা বেড়েই চলেছে ক্রমাগত। উপরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বুঝতে পারলো শব্দটা আসলে আসছে তার বামদিকে খাটের নিচ থেকে। আবারও খপ করে চোখদুটো বন্ধ করে ফেললো সে। আর যাই হয়ে যাক না কেনো কোনোভাবেই অন্ধকারাচ্ছন্ন খাটের তলদেশে তাকাবে না সে।
থপথপ... থপথপ... থপথপ...
একটানা পানিতে থাপড়ানোর আওয়াজ শুনে চমকে উঠে চোখ খুললো সে। আড়চোখে খাটের তলায় তাকাতেই দেখতে পেলো ঠিক নাক বরাবর সামনেই একটা অবয়ব শুয়ে থেকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখদুটো গোল গোল করে খাটের নিচে শুয়ে থাকা অবয়বের দিকে তাকিয়ে রইলো সে।
ঈশিতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা রক্তাক্ত হাত বেরিয়ে এলো খাটের নিচ থেকে। সরাসরি তার ঘাড়ের উপর পড়লো হাতটা। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটানে ঈশিতাকে খাটের নিচে নিয়ে গেলো অবয়বটা। কয়েক সেকেন্ড যাবত সব চুপ...
অতঃপর ঘরের নিরবতা ভেঙ্গে খানখান করে চেঁচিয়ে উঠলো একটা নারীকন্ঠ। একটানা মিনিট কয়েক চিৎকারের পর থেমে গেলো আওয়াজটা। তারপর আবার শোনা গেলো চিৎকার, তবে আগেরবারের চেয়ে কম জোরে। ধীরে ধীরে রোধ হয়ে এলো কন্ঠটা। যেমন করে আচমকা শুরু হয়েছিল, তেমনই আচমকা থেমে গেছে সেই কানফাটা আর্তনাদ। ততক্ষণে বাইরের দরজায় লোক জড়ো হওয়া শুরু হয়েছে। দুয়েকজন ধাক্কা দিতে শুরু করেছে দরজায়। দুয়েকজন হাক পাড়ছে বাইরে থেকে, “ঈশিতা! কী হয়েছে? দরজা খোল।”
একদৃষ্টিতে হাতের শাদা-কালো ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে শান। ছবিটা খুব একটা পুরনো না হলেও ১০/১২ বছর আগের তো হবেই। একটা মেয়ের ছবি ওটা। বয়স ত্রিশের আশেপাশে হবে হয়তো। তবে সবচেয়ে বেশি যেই জিনিসটা তার নজর কেড়েছে তা হলো মেয়েটার উজ্জ্বল চোখ।
ছবিটা কয়েক দিন আগে বিকেলেবেলা পেয়েছিলো সে। স্কুল ট্যুরে বান্দরবানের একটা বনে গিয়েছিলো তারা। এমনিতেই শানের স্বভাব একা একা থাকা। ফলে বাকি বন্ধুগুলো যখন স্যারদের সঙ্গে হইহল্লা করছিলো তখন প্রায় নিঃশব্দে সরে আসে। স্যারদের পূর্ব-নিষেধ থাকা স্বত্বেও এগিয়ে যায় বনের ভেতরের দিকে। দুই হাত দিয়ে গাছপালা ঠেলেঠুলে এগোচ্ছিলো সে। নিজের অজান্তেই আনমনে বনের গভীর হতে গভীরতর অংশ প্রবেশ করে সে। একটাসময় রাস্তা হারিয়ে ফেলে। যেদিকেই তাকায় সবদিক থেকে ঘন গাছপালা ঝেকে ধরেছিলো। এমনকি সেই দিনের বেলায়ও গভীর রাতের মতো অন্ধকার ছিলো সেখানে। অগত্যা ভয়ে ভয়ে ভুল পথেই পা বাড়ায় সে। বনের ভেতরের ছোটোখাটো রাস্তাটাও নিঃশেষ হয়ে যায় ধীরে ধীরে। গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে সামনের দিকে এগোতে এগোতে নিজেকে গালি দিতে থাকে এখানে একা ঢুকে পড়ার জন্য।
একটা সময় শান নিজের পেছনে কারো অস্তিত্ব টের পায়। থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরেও কাউকে দেখতে পায় না সে। অবাক হয়ে পুনরায় হাঁটতে শুরু করে আগের দিকে। এবারও সে হাঁটা শুরু করার পর পরই শুনতে পায় আওয়াজটা। কেউ একজন তার পেছন পেছন আসছে। আবারও দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়েছিলো সে। এবারও কাউকে দেখতে পেলো না।
মনের ভেতরে অজানা এক ভয় দানা বাঁধতে আরম্ভ করেছে ইতিমধ্যে। কপালে হাত দিয়ে চ্যাটচ্যাটে ঘাম টের পেলো সে। ক্ষিপ্র গতিতে হাতের পিঠ দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছে নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো। দেখতে পেলো তার কাছ থেকে কয়েক হাত দূরে হাঁটছে কেউ একজন। ভালো করে তাকিয়ে দেখতে পেলো কালো রংয়ের একটা ড্রেস পরে আছে মেয়েটি যা তার হাঁটু অবধি ঝুলছে।
“কে আপনি?” চেঁচিয়ে উঠে মুহূর্তে চুপ হয়ে গেলো শান। দেখতে পেলো মেয়েটার পায়ের পাতায় লেগে থাকা রক্ত।
যেনো শানের কথাটা শুনতেই পায়নি মেয়েটা। আনমনেই হেঁটে চলেছে সামনের দিকে। গাছগাছালির মাঝ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে শান। বিষাক্ত কোনো লতার সঙ্গে আঘাত পেয়ে গাল ছিড়ে রক্ত বেরিয়ে পড়ে। আউচচ বলে কুকিয়ে উঠে গালে হাত ছোঁয়ায় শান। চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পায় মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে। পুরনো যুগের ঢিলা জামা পরে আছে মেয়েটা। মন্ত্রমুগ্ধ রাজপুত্রের মতো মেয়েটাকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলে শান। আচমকা একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে তার পাশেই। আৎকে উঠে কয়েক কদম পিছিয়ে যায় সে। তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় একটু আগে দেখা মেয়েটা একটা বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ছে। লাফিয়ে গাছের ডালটা পার করে এগিয়ে যায় শান।
বাড়িটার সামনে এসে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে। ছোটো দালানটা এই গভীর বনে দেখতে পাবে তা স্বপ্নেও ভাবে নি শান। নিজের অজান্তেই ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। হৃদস্পন্দন ততক্ষণে আরো বেড়ে গিয়েছে। বারান্দা পেরিয়ে দরজায় আলতো করে ধাক্কা মারলো সে।
“কেউ কী আছেন?”
জবাব না পেয়ে আলতো করে ধাক্কা মারলো দরজায়। কোনোরকম শব্দ না করেই খুলে গেলো দরজাটি। ধুলো ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। ধুলোর চোটে কেশে উঠেছিলো সে। মিনিট কয়েক বাদে কাশি থামিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় পুরো ঘরটা জুড়ে ধুলোবালি ছড়িয়ে আছে। আসবাবপত্র বলতে কেবল একটা সোফা আর একটা টিভি আছে ডেস্কের উপর। সেগুলোও সম্পূর্ণ ছেয়ে গেছে ধূলোবালির আবরণে। কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে শান। এ ঘরটা পার করে একটা বেডরুমে এসে পৌঁছায় সে। দেখতে পায় একটা ধুলোয় মোড়া খাট আর একটা টেবিল-চেয়ার। মোটা মোটা বই রাখা আছে টেবিলে। তবে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা তার নজর কেড়েছিল তা হলো টেবিলের উপর রাখা একটা ছবি। শাদা-কালো ছবিটা একটা মেয়ের যে কিনা একদিকে তাকিয়ে হাসছে মৃদু।
এগিয়ে এসে ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো সে। একমনে তাকিয়ে থাকায় শান খেয়ালই করে নি যে চারিদিকে পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ধুলোয় আবৃত দেয়ালগুলো নেমে পড়ছে নিচের দিকে। ব্যাপারটা যতক্ষণে তার চোখে পড়েছে ততক্ষণে চারিদিকের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সে ঠিক সেখানটায় পৌঁছে গিয়েছে যেখানে তার বন্ধুরা দাঁড়িয়ে ছিলো শিক্ষকদের সাথে। প্রথমে শান ভেবেছিলো সবটাই তার হ্যালুসিনেশন ছিলো, কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে দেয় হাতে থাকা মেয়েটির ছবি।
“পাশের বাসার ঈশিতা নাকি আত্মহত্যা করেছে!”
পেছন থেকে মায়ের কন্ঠ ভেসে আসায় ছবিটা দ্রুত বালিশের তলায় গুজে দিলো শান। এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরলো মায়ের দিকে, “ঈশিতা আত্মহত্যা করেছে?”
“হ্যাঁ। একটু আগে ওদের চেঁচামেচি শুনে তোর বাবা গিয়েছে সেখানে। আশেপাশের বাসার মহিলাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি মেয়েটা নাকি আত্মহত্যা করেছে। তোর বাবা সে-ই যে গিয়েছে, তার কোনো খোঁজই নেই। তুই একটু গিয়ে দ্যাখ তো।”
“মা–” বিরক্তি সহকারে বললো শান, “আমি ওখানে গিয়ে কী করবো?”
মায়ের চোখ রাঙানো দেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা ছাড়লো সে। কোথাকার কোন মেয়ে আত্মহত্যা করেছে সেটার জন্য তাকে কেনো যেতে হবে ভেবে বিরক্ত হলো। তবে অবাক হলো এই ভেবে যে ঈশিতার মতো মেয়ে জীবনটা বাজে ভাবে উপভোগ করে, ওর তো আত্মহত্যা করার কথা নয়।
আর কিছু ভাববার অবকাশ পেলো না শান। ইতিমধ্যেই ঈশিতাদের বাসার সামনে চলে এসেছে সে। দেখতে পেয়েছে বাসা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পাড়া-প্রতিবেশীরা।
–চলবে.......