01/07/2026
#নীলাদ্রি_পাহাড়
#উর্মিলা
#পর্বঃ০৬
(❌গল্পটি কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ❌)
সকালের প্রথম আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে আয়ানের ঘরে ঢুকতেই তার ঘুম ভাঙল।গত রাতের কথাগুলো এখনও মাথার ভেতর ঘুরছে।আরাফ রহমানের ভাঙা কণ্ঠ...রোশনির আঁকা সেই ছোট্ট ছবিটা...আর "নীলাদ্রি পাহাড়"—এই দুটি শব্দ।বিছানা ছেড়ে উঠে সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।শীতের সকালের নরম রোদ ধীরে ধীরে শহরের উঁচু ভবন গুলোকে আলোকিত করছে।অনেক দিন পর তার মনে হলো, আজকের সকালটা অন্যরকম।সে টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নিল।আদনানের নম্বরে কল দিল।ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো গলায় উত্তর এল—
— "হ্যালো... এত সকালে?"
আয়ান হালকা হেসে বলল,
— "আমি যাচ্ছি।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর আদনানের চিৎকার,
— "কী বললি! সত্যি?"
— "হ্যাঁ। আজ ফর্ম জমা দেব।"
— "দোস্ত, তুই জানিস না, এই খবরটা শুনে আমি কতটা খুশি হয়েছি!"
আয়ান শুধু হাসল।অনেক দিন পর সেই হাসিটা সত্যিকারের ছিল।
---বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতেই ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ।সবাই ট্যুর নিয়েই ব্যস্ত।কারও হাতে ট্রেকিং ব্যাগের তালিকা।কেউ পাহাড়ে কী কী লাগবে সেটা লিখছে।কেউ আবার ইউটিউবে ক্যাম্পিং ভিডিও দেখছে।আদনান দূর থেকেই আয়ানকে দেখে দৌড়ে এল।
— "এই যে, অবশেষে পাহাড় জয় করতে চলেছিস!"
সিয়াম হেসে বলল,
— "আমি বাজি ধরেছিলাম, শেষ পর্যন্ত তুই রাজি হবি।"
মিম ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
— "এখানে সই কর।"
আয়ান কোনো কথা না বলে ফর্মে সই করে কলমের কালিটা শুকানোর আগেই মনে হলো—এই একটা সই হয়তো তার জীবনটাই বদলে দিতে চলেছে।---ঠিক তখনই বিভাগের সমন্বয়কারী অধ্যাপক সবাইকে অডিটোরিয়ামে ডাকলেন।সবাই ভেতরে ঢুকে বসল।অধ্যাপক মঞ্চে উঠে বললেন—
— "তোমরা সবাই জানো, এটা সাধারণ শিক্ষা সফর নয়।"
হলরুম নিস্তব্ধ।মিম পাশে ফিসফিস করে বলল
স্যার এই এক কথা কয় বার বলে রে....
— "তোমরা প্রায় এক মাস নীলাদ্রি পাহাড় অঞ্চলে থাকবে। সেখানে স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, পরিবেশ—সবকিছু নিয়ে গবেষণা করবে।"
স্ক্রিনে পাহাড়ের কিছু ছবি ভেসে উঠল।সবুজ পাহাড়।
সাদা কুয়াশা,ঝরনা,বাঁশের সাঁকো,ছোট ছোট পাহাড়ি ঘর।ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।সে অজান্তেই নিজের স্কেচবুক বের করে ফেলল।একটা ছবির কোণ দেখে দ্রুত কয়েকটা রেখা টেনে দিল।মিম পাশে বসে সেটা দেখে মুচকি হেসে বলল,
— "পাহাড়ে পৌঁছানোর আগেই আঁকা শুরু?"
আয়ান মাথা নিচু করেই বলল,
— "সব ছবি ক্যামেরায় ধরা যায় না। কিছু ছবি শুধু চোখে থাকে।"
মিম উত্তর দিল না।তবে মনে মনে ভাবল—এই ছেলেটা অন্যদের মতো নয়।
---ক্লাস শেষে পাঁচ বন্ধু ক্যাম্পাসের পুরোনো লেকের ধারে বসে রইল।আয়শা একটা নোটবুক খুলে বলল,
— "চলো, কাজ ভাগ করে নিই।"
আদনান বলল,
— "আমি লোকাল মানুষের সাক্ষাৎকার নেব।"
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— "আমি ভিডিও করব।"
মিম বলল,
— "আমি রিপোর্ট লিখব।"
আয়শা হাসল।
— "তাহলে আয়ান?"
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।সে একটু ভেবে বলল—
— "আমি পাহাড় আঁকব।"
সিয়াম হেসে উঠল।
— "শুধু পাহাড়?"
আয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল—
— "হয়তো... পাহাড়ের মানুষও।"
এই কথাটা বলার সময় সে নিজেও জানত না—কয়েক দিন পর তার স্কেচবুকের সবচেয়ে সুন্দর ছবিটা কোনো পাহাড়ের হবে না।হবে খোলা চুলে পাহাড়ের ঢালে বসে থাকা এক অচেনা মেয়ের।
---সেদিন বিকেলে বাসায় ফিরে আয়ান প্রথমবার নিজের আলমারি খুলে ট্রাভেল ব্যাগ বের করল।
অনেক দিন ব্যবহার হয়নি।ধুলো ঝেড়ে বিছানায় রাখতেই দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল রোশনি।
— "ভাইয়া..."
— "আয়।"
সে দৌড়ে এসে ব্যাগের ওপর বসে পড়ল।
— "তুমি কি সত্যিই অনেক দিনের জন্য চলে যাবে?"
আয়ান হেসে বলল,
— "আবার ফিরে আসব তো।"
রোশনি মুখ ফুলিয়ে বলল,
— "কিন্তু আমি তোমাকে প্রতিদিন দেখব কীভাবে?"
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর আলমারি থেকে একটা ছোট্ট স্কেচবুক বের করে রোশনির হাতে দিল।
— "আমি না থাকা পর্যন্ত তুই প্রতিদিন একটা করে ছবি আঁকবি।"
রোশনির চোখ চকচক করে উঠল।
— "আর তুমি?"
— "আমিও প্রতিদিন একটা করে ছবি আঁকব,আর অনেক গুলো ছবি তুলব।"
— "ফিরে এসে আমাকে দেখাবে?"
— "সবগুলো।"
রোশনি খুশিতে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরল।ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাফিয়া বেগম।
তিনি ভেতরে এলেন না।শুধু নিঃশব্দে হাসলেন।তার মনে হলো—আয়ান রাফিয়া বেগমের দিকে না তাকিয়ে হঠাৎ করেই বলে উঠলো
--ধন্যবাদ আপনাকে বাবাকে রাজি করানোর জন্য।
হয়তো এই সফর শুধু আয়ানের জীবনই বদলাবে না।
তাদের পরিবারের জমে থাকা বরফও একদিন গলতে শুরু করবে।
---রাত গভীর হলো।ঘুমানোর আগে আয়ান টেবিলে রাখা স্কেচবুক খুলল।আজ সে কোনো পাহাড় আঁকল না।শুধু একটা খালি বেঞ্চ।তার সামনে অস্পষ্ট কুয়াশা।
আর ওপরে লিখল—
"কখনও কখনও মানুষ কোনো জায়গায় যাওয়ার আগেই সেই জায়গা তাকে ডাকতে শুরু করে।"
সে জানত না—ঠিক সেই সময়, নীলাদ্রি পাহাড়ে বসে মাধবীলতাও তার গল্প প্রতিযোগিতার শেষ লাইনটা লিখছে।দুইজনের কলমের কালি তখন দুই ভিন্ন জায়গায় একই ভাগ্যের গল্প লিখতে শুরু করেছে...
★★★
নীলাদ্রি পাহাড়ের সকালগুলো যেন প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেয়।ভোরের প্রথম আলো পাহাড়ের চূড়ায় পড়তেই ধীরে ধীরে কুয়াশার সাদা চাদর পাতলা হতে শুরু করল।দূরের সবুজ পাহাড়গুলো একে একে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।ঝরনার কলকল শব্দ,নাম না-জানা পাখিদের ডাক,আর ঠান্ডা বাতাসে দুলতে থাকা বাঁশঝাড় সব মিলিয়ে পুরো পাহাড় যেন কোনো শিল্পীর নিখুঁত আঁকা ছবির মতো লাগছিল।এমন সকাল মাধবীলতার খুব প্রিয়।আজও সে বাড়ির পেছনের ছোট্ট ঢালটায় গিয়ে দাঁড়াল। হাতে তার নীল রঙের ডায়েরি।আর একটু সকাল হতেই সে দৌড়ে চলে গেল বাড়ির পেছনের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়।এটা তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।সে ঘাসের ওপর বসে ডায়েরিটা খুলল।কিছুক্ষণ কলম হাতে নিয়ে চুপচাপ রইল।
লিখবে কী?নিজের জীবনের গল্প?নাকি এমন একটা গল্প, যেখানে নিজের কথাগুলো অন্য কারও জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে?ঠিক তখনই পেছন থেকে নানির কণ্ঠ ভেসে এলো—
— "এত সকালে আবার লিখতে বসেছিস?"
মাধবীলতা ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসল।তুমি এখানে এসেছো কেন।
— "আজ গল্পটা শেষ করব, নানি।"
নানি ধীরে ধীরে পাশে এসে বসলেন।পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "যা মন বলে, তাই লিখিস। মানুষের মন ছুঁয়ে যায় এমন লেখা কখনো হারে না।"
মাধবীলতা নানির হাতটা আলতো করে ধরল।তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাহস এই মানুষটিই।আজ যেন দিনটা অন্যরকম। নানীর সাথে কাটানো এক অন্যরকম মুহূর্ত।
---সকালের নাস্তা শেষ করে কলেজের উদ্দেশ্যে বের হলো সে।আজ আকাশ একেবারে পরিষ্কার।সূর্যের আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে সোনালি রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে।পথে দেখা হলো কাশেম চাচার সঙ্গে।তিনি হাসিমুখে বললেন—
— "মা, শুনলাম তুই নাকি গল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিস?"
— "জি, চাচা।"
— "আজ কি প্রথম পুরস্কার নিয়েই ফিরবি কিন্তু!"
মাধবীলতা হেসে মাথা নাড়ল।
— "দোয়া করবেন।"
আরও কিছুটা এগোতেই তৃষা দৌড়ে এসে পাশে দাঁড়াল।আজও তার মুখে আগের মতোই হাসি।
---কলেজে পৌঁছেই বোঝা গেল, আজকের দিনটা অন্য রকম।অডিটোরিয়ামের সামনে রঙিন ব্যানার ঝুলছে।
ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছে।কারও হাতে খাতা।কারও হাতে প্রিন্ট করা কাগজ।কেউ আবার শেষ মুহূর্তে লেখায় কাটাকাটি করছে।মাধবীলতা এসবের মাঝেও অদ্ভুত শান্ত।.......
দারুণ। এবার পর্ব–৭ এর দ্বিতীয় অংশ থেকে গল্পে নতুন মোড় শুরু হবে। এখানে আগের অংশের কোনো ঘটনা পুনরাবৃত্তি না করে নতুন দৃশ্য, নতুন সংলাপ এবং নতুন আবহ রাখা হয়েছে।
---কলেজের অডিটোরিয়ামটা তখন প্রায় পূর্ণ।
মঞ্চের সামনে সারি সারি চেয়ারে বসে আছে ছাত্রছাত্রীরা। কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে।মাধবীলতা একেবারে পেছনের সারিতে বসে ছিল।ঠিক তখনই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে উঠলেন।
— "এবার আমরা গল্প প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করব।"
পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।একটার পর একটা পুরস্কারের নাম ঘোষণা হতে লাগল।
তৃতীয়...
দ্বিতীয়...
তারপর—
— "প্রথম স্থান অর্জন করেছে..."
কয়েক সেকেন্ড থেমে তিনি হাসলেন।
— "বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী—মাধবীলতা।"
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ হাততালিতে ভরে উঠল।তৃষা সবচেয়ে আগে উঠে দাঁড়াল।।সে ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।তার হাত দুটো ঠান্ডা হয়ে গেছে।মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা খুব জোরে ধুকপুক করছে।
---মঞ্চে উঠে পুরস্কার নেওয়ার পর বিচারকদের একজন মাইক্রোফোন হাতে বললেন—
— "আমি একটু কিছু বলতে চাই।"
তিনি বাংলা বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক, অধ্যাপক মাহবুব স্যার।শান্ত স্বভাবের মানুষ।কলেজে সবাই তাকে খুব সম্মান করে।তিনি মাধবীলতার গল্পের কাগজটা হাতে তুলে বললেন—
— "এই গল্পে কোনো বড় বড় শব্দ নেই।"
— "কোনো কৃত্রিম নাটকীয়তাও নেই।"
— "কিন্তু এমন কিছু অনুভূতি আছে, যেটা পড়ে মনে হয়েছে—এই লেখাটা কেউ বানিয়ে লেখেনি, বেঁচে লিখেছে।"
পুরো হলরুম আবার চুপ হয়ে গেল।স্যার আবার বললেন—
— "মাধবীলতা, তুমি কি নিয়মিত লেখো?"
মাধবীলতা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল—
— "জি... ডায়েরিতে লিখি।"
— "শুধু ডায়েরিতে আটকে থেকো না।"
— "তোমার লেখার মধ্যে মানুষকে স্পর্শ করার ক্ষমতা আছে।"
— "এই ক্ষমতা সবাই নিয়ে জন্মায় না।"
কথাগুলো শুনে মাধবীলতার চোখ ভিজে উঠল।কারণ জীবনে এই প্রথম কেউ তার লেখাকে এত গুরুত্ব দিয়ে দেখল।
---অনুষ্ঠান শেষে অনেকেই তার কাছে এসে অভিনন্দন জানাল।কেউ বলল—
— "তুই সত্যিই দারুণ লিখিস।"
কেউ বলল—
— "আমরা জানতামই না তুই এত ভালো লেখক!"
মাধবীলতা শুধু হাসছিল।
তার ভেতরে তখনও স্যারের কথাগুলো ঘুরছিল।
"ডায়েরিতে আটকে থেকো না..."
---কলেজ ছুটি হওয়ার পর তৃষা তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল—
— "শোন..."
— "আজকে কিন্তু মিষ্টি খাওয়াতেই হবে।"
মাধবীলতা হেসে বলল—
— "আমার কাছে টাকা কোথায়?"
— "টাকা লাগবে না।"
— "কাশেম চাচার দোকান থেকে দুইটা নারকেলের নাড়ু কিনে দিলেই হবে।"
দুজনেই হেসে উঠল।পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল।
---রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট ছেলে কাঁদছিল।তার হাতে থাকা কাগজের ঘুড়িটা ছিঁড়ে গেছে।মাধবীলতা হাঁটা থামাল।ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা আঠার টিউব বের করল।সে প্রায়ই ব্যাগে এমন ছোটখাটো জিনিস রাখে।
ঘুড়িটা খুব যত্ন করে জোড়া লাগিয়ে ছেলেটার হাতে ফিরিয়ে দিল।ছেলেটা হাসতে হাসতে দৌড়ে চলে গেল।
তৃষা তাকিয়ে বলল—
— "তুই না, সবার সমস্যাকে নিজের সমস্যা বানিয়ে ফেলিস।"
মাধবীলতা মৃদু হেসে উত্তর দিল—
— "কাউকে হাসাতে পারলে নিজের মনটাও ভালো হয়ে যায়।"
---বাড়ি ফিরে নানি দরজায় দাঁড়িয়েই বুঝে গেলেন—
আজ কিছু একটা হয়েছে।
— "কী রে?"
— "এত হাসছিস কেন?"
মাধবীলতা ব্যাগ থেকে ছোট্ট ট্রফিটা বের করে নানির হাতে দিল।নানি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
— "এটা?"
— "আমি গল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছি।"
কথাটা শেষ হতেই নানির চোখ ভিজে উঠল।তিনি ট্রফিটা বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন—
— "আলহামদুলিল্লাহ..."
— "আমি জানতাম তুই একদিন পারবি।"
তারপর তিনি আলতো করে মাধবীলতার মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।
— "আল্লাহ তোকে এমন জায়গায় নিয়ে যাক, যেখানে তোর লেখা হাজার হাজার মানুষ পড়বে।"
মাধবীলতা কিছু বলতে পারল না।শুধু নানিকে জড়িয়ে ধরল।
---সন্ধ্যার পর নিজের ঘরে এসে সে ট্রফিটা টেবিলের ওপর রাখল।তার পাশে নীল রঙের ডায়েরি।আজ ডায়েরি খুলতেই কলম যেন নিজে থেকেই চলতে শুরু করল।সে লিখল—
"আজ প্রথমবার মনে হলো, হয়তো আমার স্বপ্নগুলো শুধুই কল্পনা নয়।হয়তো সত্যিই একদিন আমার লেখা কোনো অচেনা মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে।আর যদি সেই দিন আসে, আমি কখনো ভুলব না—আমার প্রথম পাঠক ছিলেন আমার নানি।"
লেখা শেষ করে সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।আজকের দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দূরে পাহাড়ের মাথায় সন্ধ্যার কুয়াশা নেমে এসেছে।পূর্ণিমার আলোয় পাহাড়গুলোকে আজ আরও রহস্যময় লাগছে।মাধবীলতা জানত না—এই লেখাগুলোই একদিন তাকে এমন একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে, যে নিজেও শব্দের চেয়ে অনুভূতিকে বেশি বিশ্বাস করে।
আর সেই মানুষটি—এই মুহূর্তে ঢাকায় বসে নীলাদ্রি পাহাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।দুই জীবনের গল্প...
এখনও আলাদা।কিন্তু সময় ধীরে ধীরে তাদের একই অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
★★★
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকতেই বোঝা যাচ্ছে, সবাই যেন এক অদৃশ্য উত্তেজনায় ভাসছে।কেউ বড় বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছে, কেউ ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করছে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে কেনাকাটার তালিকা মিলিয়ে দেখছে।কারণ আর মাত্র তিন দিন পর শুরু হবে বহু প্রতীক্ষিত গবেষণা ও ক্যাম্পিং প্রোগ্রাম।প্রায় এক মাসের এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা শুধু ভ্রমণ করবে না; পাহাড়ি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করবে। ক্যাম্প স্থাপন করে সেখানেই থাকবে।ক্লাসে ঢুকতেই আদনান চেয়ার টেনে আয়ানের পাশে বসল।
— "ভাই, ব্যাগ গুছানো শেষ?"
আয়ান বই বন্ধ করে হালকা হাসল।
— "এখনও না।"
— "তুই তো সব শেষ দিনে করিস!"
ঠিক তখনই সিয়াম এসে বলল—
— "আমি কিন্তু ক্যামেরার জন্য আলাদা ব্যাগ নিচ্ছি।"
মিম সঙ্গে সঙ্গে বলল—
— "আর আমি পুরো জার্নাল লিখব। প্রতিদিন কী হলো, সব লিখে রাখব।"
আয়শা মুচকি হেসে যোগ করল—
— "এক মাস পরে ফিরে এসে দেখি, কেউ গবেষণা করেছে, আর কেউ শুধু ছবি তুলেছে!"
সবাই হেসে উঠল।বন্ধুদের এই নির্ভার হাসিগুলো আয়ানের ভালো লাগে।তাদের সঙ্গে থাকলে সে কিছুক্ষণের জন্য নিজের ভেতরের ভার ভুলে যেতে পারে।
---ক্লাস শেষে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানের পাশে বসে ট্যুরের পরিকল্পনা করছিল।অধ্যাপক জানিয়ে দিয়েছেন, প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক নোট তৈরি করতে হবে।কেউ লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করবে।কেউ পাহাড়ি উদ্ভিদ নিয়ে।কেউ পরিবেশ নিয়ে।আদনান আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল—
— "তুই কী নিয়ে কাজ করবি?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আয়ান উত্তর দিল—
— "আমি মানুষকে নিয়ে কাজ করতে চাই।"
— "মানে?"
— "একটা জায়গাকে বুঝতে হলে আগে সেই জায়গার মানুষকে বুঝতে হয়।"
তার উত্তর শুনে সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর মিম হেসে বলল—
— "এই জন্যই তোর কথা শুনলে মনে হয় বই পড়ছি!"
আবারও হাসির রোল উঠল।
---বিকেলে ক্লাস শেষ হওয়ার পর আয়ান সরাসরি বাসায় না গিয়ে চলে গেল পুরোনো এক আর্ট স্টোরে।
দোকানদার তাকে দেখেই চিনে ফেললেন।
— "অনেক দিন পর এলে বাবা।"
— "জি, একটু রঙ আর ক্যানভাস লাগবে।"
একটার পর একটা স্কেচবুক, পেন্সিল, চারকোল, জলরঙ আর নতুন ক্যানভাস বেছে নিল সে দোকানদার অবাক হয়ে বললেন—
— "এত কিছু?"
আয়ান শান্ত গলায় বলল—
— "এবার অনেক দিন বাইরে থাকতে হবে।"
সব জিনিস গুছিয়ে ব্যাগে রাখতে রাখতে তার চোখে এক ধরনের আলো ফুটে উঠল।যে আলো কেবল একজন শিল্পীর চোখেই দেখা যায়।
---রাতে নিজের ঘরে ফিরে সব জিনিস বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখল সে।কাপড়, টর্চ, নোটবুক, ক্যামেরা...
সবকিছুর মাঝখানে সবচেয়ে যত্ন করে রাখল তার স্কেচবুক।সে জানে না কেন।কিন্তু তার মনে হচ্ছে—
এই সফরে এমন কিছু সে দেখবে, যা শুধু ক্যামেরায় নয়, নিজের হাতে আঁকতে হবে।
---জানালার পাশে বসে সে সাদা কাগজ খুলল।আজ অনেক দিন পর আঁকতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু কী আঁকবে?শহরের উঁচু দালান?ব্যস্ত রাস্তা?
না...
তার হাত যেন নিজে থেকেই চলতে শুরু করলকিছুক্ষণ পর কাগজে ফুটে উঠল—একটা পাহাড়ের অস্পষ্ট রেখা।তার শুধু পাহাড়ি আঁকতে মন চাইছে, কি আছে এই পাহাড়ে, আছে তো শুধু চারপাশে কুয়াশা।আয়ান থেমে গেল,সে নিজেই অবাক।এমন ছবি সে কেন আঁকল?এই মানুষটা কে?সে তো কাউকে দেখেনি!
নিজের অজান্তেই সে ছবিটার নিচে ছোট্ট করে লিখল—
"অপরিচিতা..."
---ঠিক তখনই ফোনে একটি বার্তা এলো।আদনান লিখেছে—
"সব প্রস্তুত রাখিস। এবার এমন একটা সফর হবে, যেটা সারাজীবন মনে থাকবে।"
আয়ান মৃদু হাসল।উত্তরে শুধু লিখল—
"ইনশাআল্লাহ।"
---রাত গভীর হলো।ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে।কিন্তু ঘুম এল না।তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেই অসমাপ্ত ছবিটা।কুয়াশা...
পাহাড়...আর খোলা চুলে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা মেয়ে।সে জানে না—কয়েক দিনের মধ্যেই বাস্তবের নীলাদ্রি পাহাড়ে সেই কল্পনার ছবির সঙ্গে তার অদ্ভুত মিল খুঁজে পাবে।আর তখন থেকেই বদলে যেতে শুরু করবে তার জীবনের প্রতিটি রং।
(চলবে..)