Urmila Akter-উর্মিলা আক্তার

Urmila Akter-উর্মিলা আক্তার কল্পনার রাজ্য💗
📜 প্রতিটা গল্পের শেষে লুকিয়ে থাকে একটা না বলা অনুভূতি।

28/08/2026

আজ অনেকটা দিন পর একটিভ হলাম,
আজ থেকে শুরু করব পরবর্তী পর্বগুলো
#নীলাদ্রি_পাহাড়
#লেখনিতে_উর্মিলা_আক্তার

 #নীলাদ্রি_পাহাড়  #উর্মিলা_আক্তার  #পর্ব১৫ (কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ) ক্যাম্পে আজ খুব সকাল থেকেই ব্যস্ততা,ক্যাম্পের র...
07/08/2026

#নীলাদ্রি_পাহাড়
#উর্মিলা_আক্তার
#পর্ব১৫

(কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ)

ক্যাম্পে আজ খুব সকাল থেকেই ব্যস্ততা,ক্যাম্পের রান্নাঘরের পাশ থেকে ধোঁয়া উঠছে। কয়েকজন ছাত্র সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করছে। কেউ আবার তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে স্ট্রেচিং করছে।আদনান হাই তুলতে তুলতে বলল,

"আমি জীবনে এত সকালে কোনোদিন উঠিনি।আজ এত তাড়াতাড়ি উঠলাম কিভাবে?এই পাহাড় এসে বুঝলাম,সূর্যও আমাদের আগে উঠে পড়ে!"

মিম হাসতে হাসতে উত্তর দিল,

"শহরে থাকলে তো দুপুর পর্যন্ত ঘুমাতি।বরং এখানে এসে মানুষ হয়ে গেছিস।"

সিয়াম ক্যামেরা হাতে কুয়াশার ছবি তুলছিল।সে বলল,

"এই দৃশ্যটা দেখ! ছবিতে যত সুন্দর আসবে, বাস্তবে তার থেকেও বেশি।"

আয়শা গরম চায়ের কাপ হাতে আয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল।

"কী ব্যাপার? আজ এত চুপচাপ কেন?"

আয়ান কুয়াশার দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল,

"চুপচাপ নই। শুধু এই জায়গাটা ভালো লাগছে।"

আদনান সঙ্গে সঙ্গে কথাটা ধরে ফেলল।

"জায়গাটা নাকি জায়গার কেউ?"

কথাটা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল।আয়ানও হাসল, তবে কোনো উত্তর দিল না।তার চোখের সামনে ভেসে উঠল গতকালের সেই বিকেল।একটি নীল ডায়েরি,একটি শান্ত হাসি।আর একটি নাম মাধবীলতা।
সে নিজেই অবাক হলো।একজন মানুষের সঙ্গে মাত্র একবার দেখা হয়েছে,তবুও কেন জানি নামটা বারবার মনে পড়ছে।

এদিকে মাধবীলতার সকাল শুরু হয়েছে নানির ডাকে।

"লতা, ওঠ মা। আজ তো বাজারে যেতে হবে।"

মাধবীলতা চোখ মুছতে মুছতে উঠল।জানালার বাইরে তাকাতেই তার মনে পড়ে গেল গতকালের কথা।অজান্তেই তার ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।নানি সেটা লক্ষ্য করে বললেন,

"কী রে? সকাল সকাল এত হাসছিস কেন?"

মাধবীলতা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

"কিছু না নানি। একটা গল্পের কথা মনে পড়েছে।"

নানি মুচকি হেসে বললেন,

"গল্পের কথা মনে পড়েছে,?কি ব্যাপার আজ একটু অন্যরকম লাগছে মনে হচ্ছে"

মাধবীলতা দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে বলল,

— "আরে নানি!"

নানি আর কিছু বললেন না।তবে তার অভিজ্ঞ চোখ এড়াল না, আজ নাতনির হাসিটা অন্য দিনের মতো নয়।সকালের নাস্তা শেষ করে মাধবীলতা কলেজের উদ্দেশ্যে বের হলো।পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে বারবার অকারণে পেছনে তাকাচ্ছিল।নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে বলল,

"আমি আবার কী খুঁজছি?"

কোনো উত্তর পেল না।শুধু হালকা বাতাস এসে তার ওড়নাটা উড়িয়ে দিল।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আজকের কাজ ছিল গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো।অধ্যাপক মাহবুব হাসান সবাইকে বললেন,

"আজ তোমরা শুধু পর্যবেক্ষণ করবে না। মানুষের সঙ্গে বসে কথা বলবে। তাদের জীবন, স্বপ্ন, কষ্ট—সব শুনবে। ভালো গবেষক হতে হলে আগে ভালো শ্রোতা হতে হয়।"
সবাই দল ভাগ করে বেরিয়ে পড়ল।সিয়াম পড়লো অন্য দলে আর আয়ান, আদনান, মিম দলটিকে পাঠানো হলো পাহাড়ের পূর্ব দিকের ছোট্ট গ্রামটায়।জাহিদ চাচা পথ দেখাতে দেখাতে বললেন,

"এই দিকটায় খুব ভালো মানুষজন থাকে। তবে দুপুরের পর বেশি দূরে যেও না। পাহাড়ে আবহাওয়া কখন বদলে যায়, বোঝা যায় না।"

আদনান হেসে বলল,

"চাচা, আমরা তো আয়ানকে নিয়েই বেশি চিন্তায় থাকি। ও কখন যে একা একা কোথায় চলে যায়!"

জাহিদ চাচাও হেসে উঠলেন।

"পাহাড় মানুষকে ডাকে বাবা। যার মন একটু চুপচাপ, সে এই ডাক এড়াতে পারে না।"

কথাটা শুনে আয়ান চুপ করে রইল।সে জানে না পাহাড় তাকে ডাকছে নাকি পাহাড়ের কোথাও থাকা একটি নাম।মাধবীলতা।সেদিনের সেই বিকেলের পর থেকে নামটা যেন তার মনের ভেতর অদ্ভুতভাবে জায়গা করে নিয়েছে।সে জানেও না কেন।কিন্তু এটুকু বুঝতে পারছে আজ যদি হঠাৎ আবার সেই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তাহলে তার একটুও খারাপ লাগবে না।

দূরে...একই সময়ে অন্য একটি পাহাড়ি পথ ধরে কলেজের দিকে হাঁটছিল মাধবীলতা।তার ডায়েরিটা আজ শক্ত করে ব্যাগের ভেতরে রাখা।হেঁটে যেতে যেতে সে আস্তে করে নিজেকেই বলল—

"আজ আর কিছু ভুলে যাব না..."

কথাটা শেষ করেই সে নিজেই হেসে ফেলল।কিন্তু সে জানত না আজ সে কোনো জিনিস ভুলবে না ঠিকই,
কিন্তু একজন মানুষকে ভুলতে পারবে না।
★★★
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে সময়।নীলাদ্রি পাহাড়ের আকাশ আজ একদম পরিষ্কার। নীল আকাশে সাদা মেঘগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে নিশ্চিন্তে। দূরের পাহাড়গুলো যেন আরও সবুজ হয়ে উঠেছে।
ক্যাম্পে সকালের কাজ শেষ করে সবাই দুপুরের খাবার খাচ্ছে।আদনান প্লেট হাতে বসেই বলল,

"আজ বিকেলে কোথাও বের হবি?"

আয়ান একটু ভেবে বলল,

— "ক্যাম্পে বসে থাকতে ভালো লাগছে না।"

মিম মুখ তুলে বলল,

"তুই না থাকলেই বিপদ। কালও একা বেরিয়ে গিয়েছিলি।"

সিয়াম হেসে বলল,

"ওকে ছাড়। ওর মনে হয় পাহাড়ের সঙ্গে গোপন বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।"

ঠিক তখনই আয়ানের মোবাইলটা কেঁপে উঠল।সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু থেমে গেল।No Service
নেটওয়ার্ক নেই।কিন্তু তার নিচেই ভেসে আছে—
৪টি Miss call বাবা আর বাকি ১২টি Missed Call, Homeআয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল।এতগুলো মিসড কল?বাড়ি থেকে সাধারণত কেউ এভাবে ফোন দেয় না।তার মনে প্রথমেই ভেসে উঠল রোশনির মুখ।মেয়েটা প্রায়ই বাবার ফোন না পেলে বাড়ির ল্যান্ডলাইনের নম্বর থেকেই তাকে কল করে।আদনান আয়ানের মুখের পরিবর্তন দেখে জিজ্ঞেস করল,

"কী হয়েছে?"

আয়ান স্ক্রিনটা দেখিয়ে বলল,

"বাড়ি থেকে অনেকগুলো মিসড কল এসেছে। কিন্তু এখানে নেটওয়ার্ক নেই।"

আয়শা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

"সব ঠিক আছে তো?"

"জানি না। একটু উঁচু কোথাও গেলে হয়তো সিগন্যাল পাব। ফোনটা করে দেখি।"

মাহবুব স্যারও তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।তিনি বললেন,

"ক্যাম্পের উত্তর দিকের পাহাড়ের চূড়ায় গেলে মাঝে মাঝে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তবে বেশি দেরি করো না।"

আয়ান মাথা নেড়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল।পাহাড়ি সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে।কোথাও এক দাগ নেটওয়ার্কও উঠছে না।
একবার থামে,আবার হাঁটে,একটু উঁচুতে ওঠে,আবারও একই অবস্থা।নিজের অজান্তেই সে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল সেই পাহাড়ের চূড়ায় যেখানে গতকাল তার হাতে ফিরে এসেছিল একটি নীল ডায়েরি।চূড়ায় পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়াল।বড় পুরোনো গাছটার নিচে বসে আছে মাধবীলতা।আজও তার কোলে খোলা ডায়েরি।হাতে একটি কালো কলম।মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, আবার কিছু লিখছে।চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আর কেউ নেই।আয়ান অজান্তেই দাঁড়িয়ে রইল।গতকালের দেখা সেই মেয়েটাকে আজ আবারও একই জায়গায় দেখে তার ঠোঁটের কোণে অকারণে একটা হাসি ফুটে উঠল।হয়তো সত্যিই...

ঠিক তখনই মাধবীলতা যেন কারও উপস্থিতি টের পেল।সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল।দুই জোড়া চোখ আবারও একে অপরের সঙ্গে মিলিত হলো।এবার আর আগের মতো বিস্ময় নেই।বরং দুজনের মুখেই অচেনা অথচ স্বস্তির একটি ছোট্ট হাসি।মাধবীলতা সবার আগে নীরবতা ভাঙল।

"আজও কি কারও হারানো জিনিস খুঁজে পেলেন?"

আয়ান স্বাভাবিক হল, হেসে মাথা নাড়ল।

"না। আজ আমি নিজেই নেটওয়ার্ক খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এসেছি।"

মাধবীলতা অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে বলল,

"নেটওয়ার্ক?"

"হ্যাঁ। বাড়ি থেকে অনেকগুলো ফোন এসেছে। এখানে নাকি একটু সিগন্যাল পাওয়া যায়।"

মাধবীলতা মৃদু হেসে গাছটার ডান পাশের উঁচু পাথরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,

"ওই পাথরটার ওপর দাঁড়ান। আমাদের গ্রামের সবাই ওখানেই ফোনে কথা বলে। পুরো পাহাড়ে এটাকেই সবাই 'নেটওয়ার্কের পাথর' বলে ডাকে।"

আয়ান হেসে ফেলল।

"'নেটওয়ার্কের পাথর'?"

"হুম। নামটা শুনে হাসছেন কেন?"

"না,শহরে এমন নাম কখনো শুনিনি।"

মাধবীলতা চোখ টিপে মৃদু দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলল,

"শহরে অনেক কিছু আছে, যা আমাদের নেই। আবার আমাদের কাছেও এমন কিছু আছে, যা শহরে পাবেন না।"

আয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।তার মনে হলো মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গিটাও ঠিক এই পাহাড়ের মতো।খুব সহজ কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেক গভীর।ঠিক তখনই আয়ানের ফোনে হঠাৎ এক দাগ নেটওয়ার্ক উঠে এল।সে দ্রুত রোশনির নম্বরে কল করতে গেল।আর মাধবীলতা চুপচাপ বসে ডায়েরির খোলা পাতায় নতুন একটি লাইন লিখল—

"কিছু মানুষের সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হওয়াটা কাকতালীয়,নাকি প্রকৃতির নিয়ম..
★★★
আয়ান ধীরে ধীরে পাথরটার ওপর উঠে দাঁড়াল।মাধবীলতা যেটাকে একটু আগে মজা করে "নেটওয়ার্কের পাথর" বলেছিল।

সত্যিই ফোনের ওপরে এক দাগ, তারপর দুই দাগ সিগন্যাল ভেসে উঠল।আয়ান দ্রুত রোশনির নম্বরে কল দিল।দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—

"ভাইয়া!"

কণ্ঠে এমন স্বস্তি, যেন সে অনেকক্ষণ ধরেই এই ফোনটার অপেক্ষায় ছিল।আয়ানের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

"আরে পাগলি, এতগুলো ফোন দিয়েছিলি কেন?"

রোশনি অভিমানী গলায় বলল,

"আমি কি শুধু শুধু ফোন দিই নাকি?তুমি ফোনই ধরো না। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"

"ভয় কেন?"

"কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছি তুমি পাহাড়ে পথ হারিয়ে ফেলেছ!"

আয়ান হেসে ফেলল।

"তোর কল্পনাশক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে।"

"হাসছ কেন? আমি সত্যিই কেঁদে ফেলেছিলাম।"

আয়ানের চোখ নরম হয়ে এল।সে একটু শান্ত গলায় বলল,

"আমি ভালো আছি, রোশনি। এখানে নেটওয়ার্ক থাকে না বলেই ফোন ধরতে পারিনি।"

রোশনি যেন এবার একটু শান্ত হলো।

"আচ্ছা শোনো, তুমি কি আজও ছবি এঁকেছ?"

"না। আজ সময় পাইনি।"

"মিথ্যে। তোমার গলাটা শুনেই বুঝছি তুমি কোথাও ঘুরছ।"

আয়ান হেসে মাথা নাড়ল।

"এত বড় গোয়েন্দা কবে হলি?"

"আমি তো তোমার বোন। তোমাকে না বুঝলে কাকে বুঝব?"

ঠিক তখনই ওপাশ থেকে রাফিয়া বেগমের কণ্ঠ শোনা গেল—

"রোশনি, ফোনটা আমাকে দাও।"

কয়েক সেকেন্ড পর শান্ত, পরিণত একটি কণ্ঠ ভেসে এলো।

"আয়ান?"

"জি।"

"আমরা সবাই ভালো আছি। শুধু এতগুলো ফোন করেছিলাম, কারণ যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।"

"পাহাড়ে সাবধানে থেকো। ঠান্ডা বেড়েছে শুনেছি।গরম কাপড় ব্যবহার করবে।"

আয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর ধীরে বলল—

"ঠিক আছে। খেয়াল রাখব।"

রাফিয়া বেগম মৃদু স্বরে বললেন—

"নিজের খেয়াল রাখাটাও একটা দায়িত্ব। সেটা ভুলে যেও না।"

ফোনটা কেটে গেল।আয়ান কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।নেটওয়ার্ক... নেটওয়ার্ক আবার চলে গেছে।তারপর ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল।মাধবীলতা তখনও গাছের নিচে বসে আছে।তবে এবার আর লিখছে না।দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে।আয়ান কাছে এসে হালকা হেসে বলল-

"আপনার 'নেটওয়ার্কের পাথর' সত্যিই কাজ করে।"

মাধবীলতা মুখ তুলে হেসে বলল—

"আমি তো বলেছিলাম। এই পাহাড় আমাদের কখনো পুরোপুরি নিরাশ করে না।"

আয়ান গাছের পাশে দাঁড়িয়ে বলল—

"আপনি কি প্রতিদিন এই সময় এখানে আসেন?"

মাধবীলতা একটু ভেবে উত্তর দিল—

"প্রতিদিন না।"যেদিন মনে হয় নিজের সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার, সেদিন চলে আসি।"

"তাহলে আজ নিজের সঙ্গে কী কথা বলছিলেন?"

মাধবীলতা হেসে ফেলল।

"সব কথা কি এত সহজে বলে দেওয়া যায়?"

আয়ানও মৃদু হাসল।

"ঠিক বলেছেন।আমারও কিছু কথা আছে, যেগুলো আমি কাউকে বলি না।"

"তাহলে কোথায় রাখেন?"

আয়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল—

"ছবির ভেতর।"

"আমি যখন আঁকি, তখন মনে হয় রঙগুলো আমার হয়ে কথা বলে।"

মাধবীলতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"একদিন দেখাবেন?"আপনার আঁকা ছবিগুলো?"**

প্রশ্নটা শুনে আয়ান অবাক হয়ে তাকাল।তারপর হাসল।

"দেখাতে আপত্তি নেই।তবে একটা শর্ত আছে।"

মাধবীলতা ভুরু তুলল।

"শর্ত?"

"তার আগে আমাকে আপনার লেখা একটা গল্প পড়তে হবে।যে ডায়েরির জন্য আপনি এত চিন্তা করেন... সেখানে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর গল্প লেখা থাকে।"

মাধবীলতা লজ্জা পেয়ে ডায়েরিটা বুকের কাছে টেনে নিল।

"না না এত সহজে কাউকে পড়তে দিই না।"

"গল্পগুলো এখনও অসম্পূর্ণ।"

আয়ান মুচকি হেসে বলল—

"অসম্পূর্ণ গল্পের আলাদা একটা সৌন্দর্য আছে।শেষটা জানা না থাকলে মানুষ অপেক্ষা করতে শেখে।"

কথাটা শুনে মাধবীলতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তার মনে হলোএই ছেলেটা যেন কথাগুলো বলে না—অনুভব করায়।ঠিক তখনই নিচ থেকে ভেসে এল আদনানের জোরে ডাক—

"আয়ান..! কোথায় তুই?"

দুজনেই একসঙ্গে নিচের দিকে তাকাল।মাধবীলতা হেসে বলল—

"মনে হচ্ছে, আপনার খোঁজ শুরু হয়ে গেছে।"

আয়ান হালকা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।

"হ্যাঁ... আমার বন্ধুরা আমাকে বেশিক্ষণ একা থাকতে দেয় না।"

দুজনেই আবার একবার একে অপরের দিকে তাকাল।
এবার বিদায় বলার আগে আর আগের মতো অস্বস্তি লাগল না।বরং মনে হলো আজকের এই বিকেলটা তাদের দুজনের মাঝের অচেনা দূরত্বটাকে একটু কমিয়ে দিল।দূরে দাঁড়িয়ে আদনান আবার চিৎকার করে উঠল—

"আয়ান! তাড়াতাড়ি আয়! নইলে স্যার তোকে খুঁজতে এখনই বের হবে!"

আয়ান হেসে মাথা নাড়ল।তারপর মাধবীলতার দিকে তাকিয়ে বলল—

"আবার দেখা....."

মাধবীলতা স্বচ্ছ একটি হাসি দিয়ে উত্তর দিল—

"নীলাদ্রি পাহাড়ে 'হয়তো' কথাটা খুব বেশি দিন টেকে না।এখানে পথগুলো মানুষকে আবারও এক জায়গায় নিয়ে আসে।"

আয়ান কিছু না বলে শুধু হেসে ফেলল।আর সেই হাসিটুকুই তাদের দ্বিতীয় বিকেলের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে রইল।

(চলবে..)

 #নীলাদ্রি_পাহাড় #লেখনীতে_উর্মিলা_আক্তার  #পর্ব_১৪(কপি করা নিষেধ) এদিকে ক্যাম্পে সবাই তখন নিজেদের কাজে ব্যস্তকেউ নোট লি...
02/08/2026

#নীলাদ্রি_পাহাড়
#লেখনীতে_উর্মিলা_আক্তার
#পর্ব_১৪

(কপি করা নিষেধ)

এদিকে ক্যাম্পে সবাই তখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত
কেউ নোট লিখছে,কেউ ছবি গুছিয়ে রাখছে।কিন্তু আয়ানের মন আজ কোনো কাজেই বসছিল না।
আদনান খেয়াল করে বলল,

"কী রে? আজ তোকে কেমন অস্থির লাগছে।"

আয়ান হালকা হেসে উত্তর দিল,

"অস্থির না শুধু একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে,পাহাড় টা একটু নিজের মত ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করছে।"

মিম সঙ্গে সঙ্গে বলল,

"তাহলে যা। তবে হারিয়ে যাস না যেন। পরে তোকে খুঁজতে গিয়ে আমরাই হারিয়ে যাব!"

সিয়াম হেসে বলল,

"আর যদি খুব সুন্দর কোনো জায়গা খুঁজে পাশ, ছবি তুলে আনিস। একা একা উপভোগ করা নিষেধ।"

আয়শা মৃদু হেসে যোগ করল,

"সূর্য ডোবার আগেই ফিরে আসবি,পাহাড়ে সন্ধ্যা খুব দ্রুত নামে,আর জানিস তো সন্ধ্যার পর ক্যাম্পের বাহিরে একা থাকা নিষেধ।"

আয়ান মাথা নেড়ে বেরিয়ে পড়ল,আজ তার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই।শুধু হাঁটতে ইচ্ছে করছে।পাহাড়ি সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে গেল সেই উঁচু চূড়ায়।
জায়গাটা দেখে সে থমকে দাঁড়াল।চারদিকে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীর সব শব্দ অনেক দূরে রয়ে গেছে।
উপরে তাকালে মনে হয় আর কয়েক কদম এগোলেই হয়তো আকাশটাকে ছুঁয়ে ফেলা যাবে।আয়ানের হঠাৎ খেয়াল হল, সে মোবাইল বা ক্যামেরা সাথে আনেনি।পাশেই একটা বড় বট গাছ।সে ধীরে ধীরে বড় গাছটার দিকে এগিয়ে গেল।ঠিক তখনই গাছের গোড়ায় চোখে পড়ল একটি নীল রঙের ডায়েরি।আয়ান অবাক হয়ে নিচু হয়ে সেটি তুলে নিল।ডায়েরির মলাটে হাত বুলিয়ে ধুলো ঝাড়ল,কেউ হয়তো ভুলে রেখে গেছে মনে মনে ভাবলো আইয়ান, সে ভেতরটা খুলতে চাইনি তবুও অজান্তেই,ভেতরের প্রথম পাতাটা খুলতেই সুন্দর হাতের লেখায় একটি নাম চোখে পড়ল—

"মাধবীলতা।"

নামটা পড়ে সে অদ্ভুতভাবে থেমে গেল।খুব সাধারণ একটি নাম।তবুও কেন জানি নামটার মধ্যে পাহাড়ি বাতাসের মতো এক ধরনের কোমলতা আছে।সে আস্তে করে নামটা আবার পড়ল—

"মাধবীলতা..."

অজান্তেই তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।
আয়ান ডায়েরিতে লেখা নামটার দিকে আরেকবার তাকাল।

"মাধবীলতা।"

নামটা কেন জানি তার মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি জাগিয়ে তুলল।সে আস্তে করে নামটা উচ্চারণ করল—

"মাধবীলতা..."

এইদিকে, ঘরে পৌঁছাতেই বারান্দায় এসে মাধবীলতার খেয়াল হল তার হাতে ডায়েরি টা নেই, সে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল, আর বলতে লাগলো

"ধ্যাত, তাড়াহুড়া করে ডাইরিটায় ফিরে এলাম।"

ডাইরিটা এখনই নিয়ে আসা উচিত, তাই সে তার নানীর উদ্দেশ্যে ডাক ছেড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে -

"নানী..ডায়রিটা ফেলে এসেছি, আমি এক্ষুনি গিয়ে নিয়ে আসছি।"

মাধবীলতা কথাটা বলেছে ঠিকই কিন্তু তার নানি শুনতে পায়নি।

আয়ান ডায়েরির পরের পৃষ্টা উল্টাতে যাবে,ঠিক সেই মুহূর্তেই পিছন থেকে ভেসে এলো এক মেয়ের কণ্ঠ।

"এই যে... শুনছেন...!"

কণ্ঠটা ছিল নরম, তবু তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট।আয়ান ধীরে ধীরে ফিরে দাঁড়াল।আর সেই মুহূর্তেই পাহাড়ের বুক চিরে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল।ডুবন্ত সূর্যের শেষ সোনালি আলো এসে পড়ল মেয়েটির মুখে।
বাতাসে তার লম্বা কালো চুলগুলো উড়ে এসে মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।সে এক হাতে চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে নিল।আয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।তার মনে হলো এই পাহাড়ের এত সৌন্দর্যের মাঝেও, এই মুহূর্তটাই যেন সবচেয়ে সুন্দর।
মেয়েটি একটু কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

"মাফ করবেন আপনার হাতে যে ডায়েরিটা রয়েছে ওটা..."

কথাটা শেষ করতে পারল না।কারণ সে ইতিমধ্যেই নিজের ডায়েরিটাকে চিনে ফেলেছে।চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।আয়ান ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— "তাহলে এটা সত্যিই আপনার?"

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

"জি,আমি... আমি একটু আগে এখানে বসে লিখছিলাম। নানির ডাকে তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছিলাম। বাড়ি গিয়ে মনে পড়তেই আবার দৌড়ে এলাম।"

কথাগুলো বলতে বলতে সে হালকা লজ্জা পেয়ে নিজেই হেসে ফেলল।

"আমি খুব ভুলোমনা। প্রায়ই এমন করি।"

আয়ানের ঠোঁটেও মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

"ভাগ্য ভালো আজ ডায়েরিটা ভুলে গিয়েছিলেন, অন্য কিছু না।"

মাধবীলতা একটু অবাক হয়ে তাকাল।ল,তারপর অজান্তেই হেসে ফেলল।হাসিটা ছিল একদম নির্মল।যেন পাহাড়ি ঝরনার পানির মতো স্বচ্ছ।কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজনেই চুপ।চারপাশে শুধু বাতাসের শব্দ দূরে নামতে থাকা সূর্য আর অদ্ভুত এক শান্ত নীরবতা।
আয়ান ডায়েরিটা দুই হাতে এগিয়ে দিল।

"নিন। আমি ভেবেছিলাম, যার এটা, সে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। তাই অপেক্ষা করছিলাম।"

মাধবীলতা ডায়েরিটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে নিঃশ্বাস ফেলল, যেন নিজের খুব প্রিয় কোনো জিনিস ফিরে পেয়েছে।তার চোখে কৃতজ্ঞতার আলো।

"ধন্যবাদ।"

আয়ান শান্ত স্বরে বলল,

"আমার মনে হয়, কিছু জিনিস হারানোর জন্য নয়। শুধু একটু সময়ের জন্য আমাদের কাছ থেকে দূরে যায়।"

কথাটা শুনে মাধবীলতা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।এই ছেলেটা কে?অচেনা একজন মানুষ. তবু তার কথাগুলো কেমন যেন গল্পের কোনো লাইনের মতো লাগছে।ঠিক তখনই আয়ানের চোখ আবার ডায়েরির মলাটে গিয়ে থামল।সে আস্তে করে বলল,

"আপনার নামটা খুব সুন্দর।"

মাধবীলতা একটু লজ্জা পেল,মাথা নিচু করে হেসে বলল,

"ধন্যবাদ। এই নামের প্রশংসা খুব কম মানুষই করেছে।"

"হয়তো সবাই নামটা শুধু পড়েছে। অনুভব করার চেষ্টা করেনি।"

কথাটা শুনে মাধবীলতার চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময় ফুটে উঠল।তার মনে হলো এই ছেলেটা অন্যদের মতো নয়।আর আয়ানের মনে হলো এই মেয়েটার চোখে এমন এক শান্তি আছে, যা সে আগে কখনও দেখেনি,।
দূরে সূর্য তখন পাহাড়ের আড়ালে ডুবে যাচ্ছে।আকাশ জুড়ে কমলা আর গোলাপি রঙের মায়া।হালকা বাতাসে আয়ানের গলায় জড়ানো লাল মাফলার দুলে উঠল।
মাধবীলতার চোখ একবার সেই মাফলারের দিকে গিয়ে থেমে গেল।কেন জানি না দৃশ্যটা তার মনে থেকে গেল।
আর তাদের দুজনের অজান্তেই নীলাদ্রি পাহাড় নীরবে তাদের গল্পের প্রথম অধ্যায় লিখে ফেলল।
★★★
পাহাড়ের চূড়ায় তখন বিকেলের শেষ আলো।
পশ্চিম আকাশটা ধীরে ধীরে কমলা থেকে লাল, লাল থেকে বেগুনি রঙে রূপ নিচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢেকে যেতে শুরু করেছে। বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া।হঠাৎ আয়ানের চোখ পড়ল ডায়েরির পাতার ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়া ফুলের ওপর।সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

"ওটা?"

মাধবীলতা ডায়েরিটা খুলে ফুলটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

"আমি যেসব দিন মনে রাখতে চাই, সেদিন একটা ফুল রেখে দিই। অনেক দিন পরে ডায়েরি খুললে সেই দিনের কথাও মনে পড়ে যায়।"

আয়ান অবাক হয়ে বলল,

"স্মৃতি ধরে রাখার এভাবে ভাবা সুন্দর।"

"আপনি...মাধবীলতা এবার প্রশ্ন করল।আপনি কি লেখালেখি করেন?"

আয়ান মাথা নেড়ে বলল,

"না। আমি লিখতে পারি না,তবে আমি আঁকি,আঁকতে পছন্দ করি যা বলতে পারি না,ক্যানভাসে এঁকে ফেলি।"

মাধবীলতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"সত্যি?"

"তাহলে আপনিও তো গল্প বলেন। শুধু শব্দ দিয়ে নয়... রঙ দিয়ে।"

আয়ান প্রথমবার একটু হেসে মাথা নিচু করল।

"এভাবে কেউ কোনোদিন বলেনি।"

মাধবীলতা হালকা মজা করে বলল,

"তাহলে আজ থেকে মনে রাখবেন।"

দুজনেই হেসে উঠল,হাসিটা খুব ছোট্ট।কিন্তু অদ্ভুতভাবে স্বস্তির।ঠিক তখনই দূরে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো।পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে সেই সুর যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।মাধবীলতা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

"আমার যাওয়া উচিত,নানি অপেক্ষা করছেন।"

আয়ান মাথা নাড়ল।

"আমারও ক্যাম্পে ফিরতে হবে। বন্ধুরা নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজছে,আমাদের আবার সন্ধ্যের পর বাহিরে থাকা নিষেধ। "

"আচ্ছা বুঝেছি, এখানে ক্যাম্প করতে এসেছেন যে ওইখানের একজন, তাই না।মাধবীলতা প্রশ্ন করল ?"

"হ্যাঁ, ক্যাম্পেরি একজন আমি,আইয়ান উত্তর দিল।"

মাধবীলতা কয়েক কদম এগিয়ে আবার থেমে গেল।
পেছন ফিরে মৃদু হেসে কিছু একটা বলতে গিয়েও আবার থেমে গেল।দুজনেই একবার একে অপরের দিকে তাকাল।কেউ হাত নাড়ল না,কেউ বিদায়ও বলল না।শুধু দুটি নীরব হাসি আর একটি সূর্যাস্ত সেই দিনের স্মৃতি হয়ে রইল।আয়ান পাহাড় থেকে নামতে নামতে একবার পেছনে তাকাল।দূরে মাধবীলতা ধীরে ধীরে অন্য পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে।অস্তগামী সূর্যের আলোয় তার ছায়াটা লম্বা হয়ে পাহাড়ি পথের ওপর পড়েছে।
★★★
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে আয়ান।
বিকেলের শেষ আলো প্রায় নিভে এসেছে। আকাশের পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের লাল আভাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাসে গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দে দুলছে।কিন্তু আজ প্রকৃতির সেই সৌন্দর্যেও আয়ানের মন পুরোপুরি নেই।বারবার তার মনে ভেসে উঠছে একটি মুখ,এক জোড়া শান্ত চোখ।আর একটি নাম

মাধবীলতা।

সে নিজেই হালকা হেসে মাথা নাড়ল।

— "অদ্ভুত মেয়ে..."

মাত্র কয়েক মিনিট কথা হয়েছে।তবু মনে হচ্ছে, যেন কথাগুলোর চেয়ে নীরবতাই বেশি মনে রয়ে গেছে।আইয়ান এখন ক্যাম্পে অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে চিৎকার ভেসে এলো।

"জনাব আয়ান সাহেব! আপনি কি পাহাড় কিনে ফেলেছেন? নাকি সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?"

আয়ান হেসে ফেলল।

"আসছি। এত নাটক করার কী আছে?"

আদনান থামল না।

"নাটক? আমরা আধা ঘণ্টা ধরে তোকে খুঁজছি! মিম তো বলছিল, তুই নাকি পাহাড়ের চূড়ায় বসে কবি হয়ে গেছিস!"

দূর থেকে মিমের গলাও শোনা গেল—

"ওকে বল! চা ঠান্ডা হয়ে গেছে!"

সিয়াম হাসতে হাসতে বলল—

"আমার তো মনে হচ্ছে, ও নিশ্চয়ই কোনো গোপন গুপ্তধন পেয়ে গেছে!"

আয়ান মৃদু হেসে উত্তর দিল,

"গুপ্তধন পাইনি। তবে একটা সুন্দর বিকেল পেয়েছি,তার উপর আমি গেলাম বেশিক্ষণ হলোও না এতেই তোরা আমাকে এত মিস করছিস...।"

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর আদনান সন্দেহের সুরে বলল

— "এই কথার মানে কী?"

"কোনো মানে টানে নেই, আমাকে আগে আসতে তো দে,গিয়ে বলছি।"

আয়ান নিজেই বুঝতে পারল আজ সে এমনভাবে হাসছে, যেভাবে অনেক দিন হাসেনি।আয়ান অনুভব করলো, পাহাড়ে আসার কিছুদিন না হতেই তার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে, আয়ানের এখন আর আগের মত একাকীত্ব ভাব নেই। যেন জীবন একদম স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তার ওপর আজকের দিনটা অন্যরকম ছিল, আয়াম আগে কখনোই এভাবে একটা মেয়ের সাথে মন খুলে কথা বলেনি।আসলেই আজকে যেন একটা অদ্ভুত রকমের দিন কেটে গেল।

অন্যদিকে মাধবীলতা দ্রুত পায়ে বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই নানি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন—

"এই তো এলি! কতবার বলেছি, সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরবি। পাহাড়ে কুয়াশা নামতে কতক্ষণ লাগে বল তো?"

মাধবীলতা নানির কাছে গিয়ে আদুরে গলায় বলল—

"আচ্ছা নানি, আর দেরি করব না। আজ সত্যিই একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল।"

নানি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন—

"আবার কী ভুল করলি?"

মাধবীলতা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরে হেসে বলল—

"ডায়েরিটা পাহাড়ে ফেলে চলে এসেছিলাম।"

নানি অবাক হয়ে বললেন—

— "তারপর?"

"একজন, দেখলাম একজন আমার ডাইরিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিনি অপেক্ষা করছিলেন, যদি কেউ ফিরে আসে।আমার ডায়েরিটা তিনি ফিরিয়ে দিলেন।"

নানি মৃদু হাসল,মাধবীলতা কিছু বলল না।সে শুধু মনে মনে সেই ছেলেটার শান্ত হাসিটা মনে করার চেষ্টা করল।রাতের খাবার শেষ করে নিজের ছোট্ট ঘরে ঢুকল মাধবীলতা।জানালার বাইরে পাহাড় অন্ধকারে ঢেকে গেছে।দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।টেবিলের ওপর রাখা কেরোসিন বাতিটা জ্বালিয়ে সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা খুলল।আজকের তারিখ লিখল।কিছুক্ষণ কলম হাতে নিয়েও কিছু লিখতে পারল না।তারপর ধীরে ধীরে লিখল—

"হয়তো ডায়েরিটা আজ কিছুক্ষণের জন্য হারায়নি হারায়নি বরং আমাকে নতুন একটি গল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে একটু দূরে গিয়েছিল।আজ একজন অচেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হলো।মাধবীলতার হঠাৎ মনে হল,তার নামটা জিজ্ঞাসা করা হয়নি।অদ্ভুত ব্যাপার হলো বিদায়ের পরও তার কণ্ঠস্বরটা বারবার মনে পড়ছে।হয়তো এটা শুধু কাকতালীয় একটি বিকেল।অথবা কোনো গল্পের একেবারে প্রথম লাইন।"

শেষ লাইনটা লিখে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।তারপর ডায়েরিটা আস্তে করে বন্ধ করে দিল।

এদিকে ক্যাম্পে ফিরে আয়ান দেখল সবাই আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে।মিম তাকে দেখেই বলল—

"এই যে! অবশেষে মহাশয় ফিরে এসেছেন!"

আদনান নাটকীয় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল।

"জনাব, আপনার বিচার হবে!"

আয়ান হেসে বলল—

"আচ্ছা, আমার অপরাধটা কী?"

সিয়াম মুখ গম্ভীর করে বলল—

"প্রথম অপরাধ কাউকে না বলে একা চলে যাওয়া।"

"কাউকে না বলে কই গেলাম,বলেই তো গেলাম সবাইকে,ভুলে গেলি নাকি সবাই?"

মিম যোগ করল—

"দ্বিতীয় অপরাধ ফিরে এসে এমন হাসি হাসা, যেটা আমরা আগে কখনো দেখিনি!"

আয়শা দুষ্টুমি করে বলল—

"সত্যি করে বলো তো পাহাড়ে কি শুধু দৃশ্য দেখেছ, নাকি কারও সঙ্গেও দেখা হয়েছে?"

প্রশ্নটা শুনে আয়ান এক মুহূর্ত থেমে গেল।তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে বলল—

"কখনও কখনও কিছু প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া যায় না।"

"কারণ উত্তরটা নিজেই তখনও পুরোটা জানে না।"

সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।আদনান ধীরে ধীরে মুচকি হেসে বলল—

"আচ্ছা তাহলে আমরা অপেক্ষা করব।"

আগুনের শিখা ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠতে লাগল।আর নীলাদ্রি পাহাড়ের নীরব রাত দুটি অচেনা মানুষের মনে এক নতুন অনুভূতির প্রথম আলো জ্বেলে দিল।
★★★

(চলবে..)

 #নীলাদ্রি_পাহাড় #লেখনীতে_উর্মিলা_আক্তার #পর্ব_১৩ (কপি করা নিষেধ) ___________________দুপুরের সূর্য তখন ধীরে ধীরে মাথার ...
28/07/2026

#নীলাদ্রি_পাহাড়
#লেখনীতে_উর্মিলা_আক্তার
#পর্ব_১৩

(কপি করা নিষেধ)
___________________

দুপুরের সূর্য তখন ধীরে ধীরে মাথার ওপর উঠে এসেছে।শীতের দিন হওয়ায় রোদটা খুব একটা তীব্র নয়। বরং পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত আরামদায়ক উষ্ণতা তৈরি করেছে। গ্রামের সরু পথ পেরিয়ে আয়ানদের দল এবার পৌঁছাল পাহাড়ের একটু উঁচু ঢালে অবস্থিত একটি পুরোনো বাড়ির সামনে।
বাড়িটা অন্য বাড়িগুলোর মতো নয়।চারপাশে কাঠের বেড়া, উঠোনজুড়ে নানান রঙের ফুল। এক কোণে শুকাতে দেওয়া ভুট্টার ছড়া ঝুলছে। আর বারান্দার সামনে বসে একজন বৃদ্ধ বাঁশ দিয়ে ছোট ছোট ঝুড়ি বুনছেন।জাহিদ চাচা হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে বললেন,

"আসসালামু আলাইকুম, করিম কাকা। কেমন আছেন?"

বৃদ্ধ চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,

"ওয়ালাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। এরা বুঝি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা?"

"হ্যাঁ। এক মাস আমাদের পাহাড়েই থাকবে। ভাবলাম, প্রথমে আপনাদের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিই।"

করিম কাকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।তার মুখভরা সাদা দাড়ি, কপালে গভীর ভাঁজ। কিন্তু চোখ দুটো এখনো আশ্চর্য রকম উজ্জ্বল।তিনি বললেন,

"এসো বাবারা,বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? অতিথি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলে বাড়ির বরকত কমে যায়।"

মিম হেসে বলল,

"কাকা, আপনার কথাগুলো শুনেই মনে হচ্ছে অনেক গল্প জানেন।"

করিম কাকা হেসে উত্তর দিলেন,

"গল্প জানি কি না জানি না, তবে এই পাহাড়ে আশি বছর ধরে যা দেখেছি, তা বললে তোমাদের দিন শেষ হয়ে যাবে।"

উঠোনে মাদুর পেতে সবাই বসল,কিছুক্ষণের মধ্যেই করিম কাকার স্ত্রী গরম চা, ভাজা মুড়ি আর পাহাড়ি মধু নিয়ে এলেন।আদনান কাপ হাতে নিয়ে বলল,

"খালা, এত কষ্ট করলেন কেন? আমরা তো শুধু একটু কথা বলতে এসেছিলাম।"

মহিলা মমতা ভরা গলায় বললেন,

"তোমরা এত দূর থেকে এসেছ। তোমাদের আপ্যায়ন করতে পারলে আমাদেরই ভালো লাগে।"

আয়শা মুগ্ধ হয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলল,

"আপনাদের বাড়িটা যেন ছবির মতো সুন্দর। প্রতিটা গাছে এত যত্নের ছাপ!"

করিম কাকা হেসে বললেন,

"গাছও মানুষ চিনে মা। যত ভালোবাসবে, ততই ফল-ফুল দিয়ে উত্তর দেবে।"

আয়ান এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল।সে সামনে রাখা একটি ছোট কাঠের বাঁশি হাতে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

"এটা কি আপনি বানিয়েছেন?"

করিম কাকা মাথা নাড়লেন।

"হ্যাঁ। ছোটবেলায় আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন। এখন আর আগের মতো চোখে দেখি না, তবু মাঝে মাঝে বানাই।"

আয়ান বাঁশিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখল।তারপর বলল,

"যে জিনিসে মানুষের সময় আর ভালোবাসা মিশে থাকে, তার দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।"

কথাটা শুনে করিম কাকা কিছুক্ষণ আয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর মৃদু হেসে বললেন,

"তোমার চোখে কৌতূহল আছে বাবা। আর যার কৌতূহল থাকে, সে একদিন অনেক কিছু শিখে ফেলে।"

এদিকে সিয়াম ক্যামেরা নিয়ে উঠোনের এক পাশে চলে গেল।সেখানে কয়েকজন ছোট্ট বাচ্চা গোল হয়ে কাঁচের গুলি খেলছিল।সে ছবি তুলতেই একটি মেয়ে দৌড়ে এসে বলল,

"ভাইয়া, আমাকে সুন্দর করে তুলবেন কিন্তু!"

সিয়াম হেসে বলল,

"সুন্দর মানুষকে আলাদা করে সুন্দর বানাতে হয় না। শুধু হাসলেই ছবি সুন্দর হয়ে যায়।"

বাচ্চারা হেসে উঠল।একজন ছেলে বলল,

"আমাদেরও ঢাকা নিয়ে যাবেন?"

আদনান মজা করে বলল,

"ঢাকায় গেলে কিন্তু এই পাহাড়কে খুব মিস করবে।"

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,

"তাহলে থাক, আমি এখানেই ভালো আছি!"

কথার ফাঁকে করিম কাকা হঠাৎ বললেন,

"তোমরা কি শুধু পাহাড় দেখতে এসেছ, নাকি মানুষের গল্পও লিখবে?"

মিম সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,

"মানুষের গল্পই বেশি জানতে চাই। কারণ বইয়ে পাহাড়ের ছবি পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের জীবন পাওয়া যায় না।"

করিম কাকার চোখে সন্তুষ্টির ঝিলিক দেখা গেল।তিনি ধীরে ধীরে বললেন,

"তাহলে একটা নাম মনে রেখো—মাধবীলতা।"

আয়ান প্রথমবার নামটা শুনে তাকাল।করিম কাকা বলতে লাগলেন,

"ও আমাদের গ্রামের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করে। গ্রামের অনেক অনুষ্ঠানের বক্তৃতা, কবিতা সব লিখে দেয়। কলেজের শিক্ষকরাও ওকে খুব ভালোবাসেন।"

মিম আগ্রহ নিয়ে বলল,

"তাহলে তো ওর সঙ্গে আমাদের দেখা করতেই হবে!"

করিম কাকা হেসে বললেন,

"হবে। তবে ওকে খুঁজতে হবে না। এই পাহাড়ে যারা মন দিয়ে আসে, একদিন না একদিন ওদের সঙ্গে মাধবীলতার দেখা হয়েই যায়।"

আয়ান কিছু বলল না।কিন্তু অদ্ভুতভাবে নামটা তার মনে গেঁথে গেল।মাধবীলতা নামটার মধ্যে যেন পাহাড়ি বাতাসের মতোই এক ধরনের কোমলতা আছে।
ঠিক সেই সময় গ্রামের অন্য প্রান্তে কলেজের লাইব্রেরিতে বসে ছিল মাধবীলতা।বাংলা বিভাগের শিক্ষক শারমিন ম্যাডাম ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলেন।মুখে উজ্জ্বল হাসি।

"মাধবীলতা, তোমার জন্য একটা সুখবর আছে।"

মাধবীলতা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

"জি ম্যাডাম?"

ম্যাডাম ফাইলটা খুলে বললেন,

"তোমার গল্পটা শুধু প্রথমই হয়নি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটা জেলা সাহিত্য পরিষদে পাঠানো হবে। সেখানে নির্বাচিত হলে তুমি তরুণ লেখক কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।"

মাধবীলতা যেন কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে ভুলে গেল।
সে আস্তে করে বলল,

"সত্যি... আমি?"

শারমিন ম্যাডাম মমতা ভরা গলায় বললেন,

"হ্যাঁ, তুমি। কারণ তোমার লেখায় শুধু শব্দ নেই, অনুভূতিও আছে। আর একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি সেটাই।"

মাধবীলতা মাথা নিচু করে হাসল।সেই মুহূর্তে তার খুব ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে নানিকে খবরটা জানাতে।
সে জানত—এই খবর শুনে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন একজনই।তার নানি।
★★★
পরের দিন সকাল।সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে নীলাদ্রি পাহাড়ের বুকজুড়ে।গত কয়েক দিনের মতো আজও বাতাসে শীতের কোমল স্পর্শ। পাহাড়ের চূড়াগুলোতে ভাসছে হালকা সাদা মেঘ। দূরের ঝরনার শব্দ যেন সকালটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
ক্যাম্পে আজ একটু ভিন্ন রকম ব্যস্ততা।গতকাল সারাদিন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে পরিচয় আর পর্যবেক্ষণের কাজ করার পর আজ শিক্ষকেরা সবাইকে নতুন একটি দায়িত্ব দিয়েছেন।প্রতিটি দলকে গ্রামের জীবন নিয়ে একটি ছোট্ট পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।সেই জন্য শুধু ছবি তুললেই হবে না, মানুষের কথা শুনতে হবে, তাদের কাজ দেখতে হবে, তাদের অনুভূতিও বুঝতে হবে।সকালের নাস্তা শেষ করে সবাই খোলা মাঠে জড়ো হলো।অধ্যাপক মাহবুব হাসান হাতে একটি নোটবুক নিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,

"শুধু তথ্য লিখে কোনো প্রতিবেদন ভালো হয় না। মানুষের গল্প বুঝতে শিখতে হবে। এই পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের আলাদা একটা জীবন আছে। তোমরা চেষ্টা করবে, তাদের চোখ দিয়ে এই জায়গাটাকে দেখতে।"

মিম নোট নিতে নিতে বলল,

"স্যার, যদি কেউ কথা বলতে না চায়?"

স্যার মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,

"তাহলে জোর করবে না। বিশ্বাস অর্জন করতে হয়, আদায় করা যায় না।"

আদনান পাশ থেকে আস্তে করে আয়ানের কানে বলল,

"শুনলি? এক মাসে শুধু রিপোর্ট না, মানুষের বিশ্বাসও জিততে হবে!"

আয়ান হালকা হেসে বলল,

"সেটাই তো আসল শেখা।"

সিয়াম ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করতে করতে বলে উঠল,

"আমি ঠিক করেছি, এবার শুধু পাহাড়ের ছবি তুলব না। মানুষের হাসির ছবিও তুলব। পরে দেখলে যেন মনে হয়, আমরা সত্যিই এখানে বেঁচে ছিলাম।"

আয়শা মুচকি হেসে বলল,

"কিন্তু আগে অনুমতি নিবি। না হলে গ্রামের সবাই তোকে দেখে পালাবে।"

সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।বন্ধুদের এই ছোট ছোট কথাবার্তা পুরো সকালটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলল।

এদিকেচন্দ্রঝর্ণা কলেজের বাংলা বিভাগের কক্ষে বসে আছে মাধবীলতা।গতকালের সুখবরের পর আজও তার মুখে লাজুক হাসি।শারমিন ম্যাডাম তাকে ডেকে বলেছিলেন, গল্পটা আরও একটু পরিমার্জন করতে হবে।কলেজের ছোট্ট লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে সে নিজের খাতায় কিছু লাইন কাটাকাটি করছে।ঠিক তখনই তৃষা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল,

"লতা! তুই এখানে বসে আছিস? আমি তোকে পুরো কলেজে খুঁজলাম!"

মাধবীলতা মুখ তুলে হেসে বলল,

"কী হয়েছে এমন?"

তৃষা নাটকীয় ভঙ্গিতে দুই হাত কোমরে রেখে বলল,

"কী হয়েছে মানে? তোর গল্প নিয়ে সবাই কথা বলছে আর তুই এখানে নিশ্চিন্তে বসে আছিস!"

মাধবীলতা হেসে মাথা নাড়ল।

"গল্পটা যদি মানুষের ভালো লাগে, সেটাই তো সবচেয়ে বড় ব্যাপার।"

"আরে, শুধু ভালো লাগার কথা না! বাংলা বিভাগের স্যার পর্যন্ত বলছেন, তোর লেখায় আলাদা একটা অনুভূতি আছে। তুই বুঝতেই পারছিস না, এটা কত বড় ব্যাপার!"

মাধবীলতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

"এত প্রশংসা শুনলে আমার বরং ভয় লাগে। যদি একদিন ভালো লিখতে না পারি?"

তৃষা তার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে বলল,

"যে মানুষ নিজের লেখাকে নিয়ে ভয় পায়, সে কখনো খারাপ লেখক হয় না। কারণ সে প্রতিদিন নিজেকে আরও ভালো করার চেষ্টা করে।"

মাধবীলতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর জানালার বাইরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

"আমি শুধু চাই, একদিন এমন কিছু লিখতে যেটা পড়ে মানুষ নিজের জীবনের কথা ভাববে।"

তৃষা মুগ্ধ চোখে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল।তার মনে হলো, এই মেয়েটা সত্যিই অন্যরকম।দুপুর গড়িয়ে বিকেল।শিক্ষার্থীরা আবার বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গ্রামের ভেতরে বেরিয়ে পড়েছে।জাহিদ চাচা আজ তাদের নিয়ে যাচ্ছেন পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে থাকা একটি পুরোনো ঝরনার দিকে।পথটা সরু, কিন্তু ভীষণ সুন্দর।
বুনো ফুলের গন্ধে বাতাস ভরে আছে।হাঁটতে হাঁটতে মিম হঠাৎ থেমে গেল।

"একটু দাঁড়াও! এই ফুলগুলো দেখো না! কী সুন্দর!"

আদনান হেসে বলল,

"মিম, তুই যদি এভাবে প্রতি পাঁচ মিনিটে দাঁড়াস, তাহলে ঝরনায় পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।"

মিম ভ্রু কুঁচকে বলল,

"সৌন্দর্য দেখার জন্য সময় দিতে হয়, মিস্টার তাড়াহুড়ো!"

অন্য দিকের পাহাড়ি পথ ধরে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল মাধবীলতা।তার হাতে কয়েকটি বই।ব্যাগের ভেতরে যত্ন করে রাখা গল্পের খাতা।সে দূর থেকে দেখতে পেল একদল সেই অচেনা তরুণ-তরুণী হাসতে হাসতে পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।তাদের একজনের গলায় জড়ানো লাল মাফলারটা বাতাসে হালকা উড়ছে।মাধবীলতা কয়েক সেকেন্ড থেমে তাকিয়ে রইল।তারপর আবার ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
অন্যদিকে আয়ানও অজান্তেই একবার মাথা তুলে সামনের পথের দিকে তাকাল।পিছন ফিরে সরুপথ ধরে নিচে নেমে যাচ্ছে একটা মেয়ে।মেয়েটি একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।আয়ানও কিছু বলল না।
দুই অচেনা মানুষ একই পাহাড়ের একই বিকেলে, একই আকাশের নিচে,মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য একে অপরকে দেখল।
★★★
বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে নীলাদ্রি পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে।সারাদিনের রোদ যেন এখন অনেক কোমল হয়ে এসেছে। পাহাড়ের গাছগুলো দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে ঢালু পথের ওপর। দূরে কোথাও অচেনা পাখির ডাক ভেসে আসছে। বাতাসে কাঁচা ঘাস আর বুনো ফুলের মিষ্টি গন্ধ।কলেজ থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতো আজও নিজের ছোট্ট নীল ডায়েরিটা হাতে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ার দিকে হাঁটছিল মাধবীলতা।এই জায়গাটা তার সবচেয়ে প্রিয়।যখন খুব আনন্দ হয়, সে এখানে আসে।মন খারাপ হলেও এখানে আসে।যখন কোনো গল্পের শেষ খুঁজে পায় না, তখনও এই পাহাড়ের নীরবতার কাছেই বসে থাকে।কারণ তার বিশ্বাস—

"মানুষের না বলা অনেক কথার উত্তর প্রকৃতি খুব নিঃশব্দে দিয়ে দেয়।"

পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে সে বড় পুরোনো গাছটার নিচে গিয়ে বসল।সামনে বিস্তীর্ণ আকাশ,নিচে সবুজ উপত্যকা।দূরে মেঘ পাহাড়ের গা ছুঁয়ে ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।সে ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করল।পাতাগুলো আলতো করে উল্টাতে উল্টাতে মৃদু হেসে বলল,

"আজ কী লিখব?"

কিছুক্ষণ কলমটা হাতে নিয়েই বসে রইল।তারপর লিখতে শুরু করল—

"কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় অনেক দেরিতে। অথচ মনে হয়, যেন তাদের জন্যই এতদিন অপেক্ষা করছিলাম..."

লিখতে লিখতে হঠাৎ থেমে গেল সে।নিজেই হেসে ফেলল।

"এ আবার কী লিখলাম আমি!"

ঠিক তখনই দূর থেকে নানির কণ্ঠ ভেসে এলো।

"লতা...! ও লতা...! মা, কোথায় তুই?"

মাধবীলতা চমকে উঠে দাঁড়াল।আবার ডাক শোনা গেল।এবার কণ্ঠে একটু উদ্বেগ।

"সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে মা! কুয়াশা নামার আগে বাড়ি আয়!"

মাধবীলতা তাড়াহুড়ো করে কলমটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দৌড়ে নিচের দিকে নেমে গেল।কিন্তু ব্যস্ততার মাঝেই...
গাছের শিকড়ের পাশে পড়ে রইল তার সবচেয়ে প্রিয় নীল ডায়েরিটা।

(চলবে..)

Address

Chittagong

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Urmila Akter-উর্মিলা আক্তার posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share