15/05/2025
ময়নামতি গ্রাম
পর্ব ৪
সকালের রোদ যখন সরিষার ফুলে ঝিকিমিকি খেলছিল, তখন পুরো ময়নামতি গ্রামে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এসেছিল। তবে জসিমের জন্য এ দিনটা ছিল নতুন কিছু শেখার দিন। কারণ সে প্রথমবারের মতো তার বাবার সঙ্গে মাঠে যাবে হাল চাষে।
জসিমের বাবা, রুহুল আমিন, একজন সৎ ও পরিশ্রমী কৃষক। তাঁর মুখে সবসময় শান্ত এক হাসি, যেন জীবন যতই কঠিন হোক, তিনি হার মানবেন না।
ভোরে বাবা ঘুম থেকে ডেকে দিলেন,
—“জসিম, আজ আমার সঙ্গে মাঠে যাবি তো? একটু হাত লাগা লাগবে।”
—“আচ্ছা বাবা, যাব।”
জসিম মন থেকে রাজি হয়েছিল। আগের দিনের গোলার আগুন তার ভাবনাকে বদলে দিয়েছিল।
---
মাঠের দিন
সকাল সাতটার মধ্যেই তারা দু’জন পৌঁছাল মাঠে। জোড়া বলদ হাল টানছে, আর জমি এখনো ভিজে, কাদাময়। জসিম এক পা রেখেই পিছলে পড়ল। বাবার হাসি পেল।
—“এই হচ্ছে মাটির আসল শিক্ষা—যে টিকে থাকতে জানে, সেই গড়তে জানে।”
জসিম বলদ সামলানোর চেষ্টা করল। হাত দিয়ে হাল ঠেলল, কাদায় পা ডুবিয়ে চলল। ঘামে ভিজে গেল পুরো শরীর। মাঝে মাঝে সে পেছনে তাকিয়ে দেখছিল বাবাকে—যিনি দিনের পর দিন এমন কষ্ট করছেন, কিন্তু একটিবারও অভিযোগ করেননি।
জসিমের মুখে তখন শুধুই নীরবতা।
ঘণ্টা দুয়েক পর বাবা থামলেন। পাটির ওপরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। পকেট থেকে একটা খেজুর বের করে ছেলের হাতে দিলেন।
—“কেমন লাগছে, হে হাল চাষি?”
—“বাবা... আমি জানতাম না, এত কষ্ট হয়। আমি ভাবতাম, শুধু মাটি চষা মানেই কৃষিকাজ। কিন্তু এটা তো জীবন গড়ার মতো কিছু।”
রুহুল আমিন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“এই মাটি আমাদের শিখিয়েছে ধৈর্য, কষ্ট সহ্য করা, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজের ঘাম দিয়ে নিজের খাবার জোগাড় করা। এটা শুধু কাজ নয়, এটা ইবাদত।”
জসিম নীরবে মাথা ঝুকিয়ে ফেলল। তার হৃদয়ে যেন কেউ একটা নতুন জানালা খুলে দিল।
---
বিকেলের শিক্ষা
সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে ফিরতে জসিম বলল,
—“বাবা, আমি এখন বুঝি, শহরের চাকরি ভালো হতে পারে, কিন্তু নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে কিছু গড়ার যে আত্মমর্যাদা, সেটা শহরের চাকচিক্যেও পাওয়া যায় না।”
বাবা হাসলেন,
—“তুই যদি মন থেকে বিশ্বাস করিস, তোর গ্রাম একদিন তোর গর্ব হবে।”
জসিম সিদ্ধান্ত নিল, শহর যেতে হবে ঠিকই, কিন্তু গ্রামের সম্মান নিয়ে। সে এবার স্কুলে আরও মন দিয়ে পড়বে, হাশেম চাচার কথা মনে রাখবে, আর কৃষকের ঘামের মূল্য বুঝে চলবে।
চলবে.......