02/02/2026
শয়তান আসলে খুবই কৌশলী। সে কোনো পাগল নয়, বিভ্রান্ত নয়, মানসিক রোগীও নয়। সে অত্যন্ত বুদ্ধিমান, খুবই বুদ্ধিমান। সে যেন সর্বকালের সেরা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট, সেরা প্রোপাগান্ডা এক্সপার্ট।
আল্লাহ যখন তাকে বললেন—“আমি তোমাকে সিজদা করতে বলেছিলাম, তুমি কেন করলে না?” খেয়াল করো, আল্লাহ বলেননি—“তুমি কেন অবাধ্য হলে?” বরং বলেছেন—“কোন জিনিসটা তোমাকে থামিয়ে দিল?” অর্থাৎ তার ভেতরে এমন কিছু ছিল, যা তাকে সিজদা করা থেকে আটকে দিয়েছিল।
সে কি বুদ্ধিমান ছিল? হ্যাঁ। তার কি স্বাধীন ইচ্ছা ছিল? হ্যাঁ। সে কি ভালো-মন্দ বোঝে? হ্যাঁ। তার কি নৈতিক দায়িত্ব ছিল? অবশ্যই। সে আল্লাহকে চিনত, সে জানত—সে আল্লাহর বান্দা। এটা কোনো নাস্তিকের অবাধ্যতা নয়; নাস্তিক বলে, “আমি আল্লাহকে মানি না।” কিন্তু সে আল্লাহকে চিনেও অবাধ্য হয়েছিল।
আর একটা বিষয় বুঝতে হবে—আমরা আল্লাহর হুকুম পাই কুরআনের মাধ্যমে, রাসূলের মাধ্যমে। আমরা আল্লাহকে সামনে দেখি না। কিন্তু শয়তান আল্লাহর কাছ থেকেই সরাসরি হুকুম শুনেছিল। ভাবো তো, আল্লাহ যদি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি আদেশ দিতেন, তাহলে সেই আদেশের গুরুত্ব কতটা হতো? কিয়ামতের দিন কেউ অবাধ্য হবে না কেন? কারণ আল্লাহ তখন সামনে থাকবেন। অথচ আল্লাহ সামনে থাকা সত্ত্বেও শয়তান “না” বলেছিল। এর মানে, আল্লাহর ভয় থেকেও বড় কিছু তার ভেতরে কাজ করছিল।
আর সেটা ছিল তার নিজের তৈরি করা আত্মপরিচয়। আমরা সবাই নিজের একটা ছবি বানাই—আমি কে, আমি কী, আমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি শিক্ষক, আমি নেতা, আমি সম্মানিত, আমি সেরা, আমি সবচেয়ে সুন্দর, আমার সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার। শয়তানও নিজের এমনই একটা ছবি বানিয়েছিল। সে ভাবত—আমি বিশেষ, আমি আলাদা, আমি সবার উপরে। সে ছিল একমাত্র জিন, যাকে ফেরেশতাদের মাঝে জায়গা দেওয়া হয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল—আমি ভিআইপি।
কিন্তু হঠাৎ করে আল্লাহ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং সবাইকে সিজদা করতে বললেন। তখন তার মনে প্রশ্ন জাগল—এই নতুন সৃষ্ট কেউ কেন বিশেষ হবে? তাহলে আমি আর নাম্বার ওয়ান থাকলাম না। তার কাছে দুই নম্বর হওয়া মানে শূন্য হয়ে যাওয়া।
এখন তার সামনে দুইটা পথ ছিল—এক, আল্লাহর হুকুম মানা। দুই, নিজের অহংকার ভাঙা। সে সিদ্ধান্ত নিল—আমি অহংকার ভাঙবো না, আমি আল্লাহকেই অমান্য করবো। এখান থেকেই তার পতন শুরু।
এরপর সে দোষ চাপাল দুইজনের উপর—আদম (আ.) আর আল্লাহর উপর। সে বলল—আদম না থাকলে আমি আজও সেরা থাকতাম। অথচ আদম কিছুই করেননি। তবুও শয়তান প্রতিশোধ নিতে লাগল। কিন্তু যত প্রতিশোধই নিক, তার ভাঙা আত্মপরিচয় আর ঠিক হয় না। তাই তার রাগ কখনো শেষ হয় না। সে আল্লাহকেও দোষ দেয়—তুমিই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছ।
এটাই শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র—মূল্যবোধের বিকৃতি। তার মতে, মানুষের মূল্য আসে না সে কী করে তার উপর; মানুষের মূল্য আসে মানুষ তাকে কীভাবে দেখে তার উপর। CEO হলে সম্মান, ট্যাক্সি ড্রাইভার হলে নয়। সে ভালো মানুষ কি না—তা গুরুত্বপূর্ণ না। পদ, র্যাঙ্ক, পরিচয়—এইটাই সব। এই চিন্তাই সে মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়।
ফলোয়ার কত, কোন ব্র্যান্ড, কোন গাড়ি, কোন বাড়ি—এটাই আজকের দুনিয়ার মূল্যবোধ। আর যখন কেউ ভাবে—আমি আর মূল্যবান নই—তখন সে বলে, আমি সমস্যা তৈরি করবো। আমি যদি গুরুত্বপূর্ণ না হই, তাহলে অন্তত আমি ভুলে যাওয়ার মতো হবো না।
এটাই শয়তানের শেষ অস্ত্র—ব্যথা দেওয়া, ধ্বংস করা। সে জানে সে ধ্বংস হবে, কিন্তু মরার আগে চায় তোমাকেও টেনে নামাতে।
সবশেষে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—শয়তান নিজের জন্য একটা গল্প বানিয়ে নিয়েছে। সে জানে সেটা ভুল, তবুও সেটাকেই সত্য মানে। সে বলে—আমার সত্যই আসল সত্য। আর সে চায় মানুষও তাই করুক—নিজের সত্য বানাও, আল্লাহর সত্য অস্বীকার করো।
আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন এই অহংকার থেকে, এই শয়তানি পথে পা দেওয়া থেকে। আমিন।