19/12/2025
আপনার হাতের ফোনটা একটু নামিয়ে রাখুন।
হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি।
আজ সারাদিন
আপনার স্ক্রিনে কত কিছুই না ভেসে গেছে!
নাচের রিলস,
হাসির মিম,
বন্ধুদের আড্ডা,
কারও বিয়ের ছবি।
আপনি লাইক দিয়েছেন,
হয়তো একটা “haha” রিয়েক্ট,
তারপর নিঃশব্দে স্ক্রল।
কিন্তু,
একটু দাঁড়ান।
গতকাল রাতে,
ঠিক যখন আপনি কম্বল জড়িয়ে
ঘুমের দিকে ঢলে পড়ছিলেন,
তখন সীমান্তের ওপারে,
ময়মনসিংহে,
একটা উৎসব চলছিল।
হ্যাঁ, উৎসবই।
শত শত মানুষ,
স্লোগানের গর্জন,
উত্তেজনার ঢেউ,
আর হাজার হাজার মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশ।
সবাই ভিডিও করছে।
সবাই লাইভ যাচ্ছে।
কারো হাত কাঁপছে না।
কারো বিবেক কাঁপছে না।
ক্যামেরার ফ্রেমে কী ছিল জানেন?
কোনো স্টেজ শো নয়।
কোনো কনসার্ট নয়।
ফ্রেমে ছিল,
দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা
একটা শরীর।
একটা জ্যান্ত মানুষ।
নাম?
দীপু চন্দ্র দাস।
আগুনের তাপ টা বুঝতে পাচ্ছেন?
না।
আপনি পাচ্ছেন না।
কারণ আপনার কানে
এখন তথাকথিত
‘সেক্যুলারিজম’-এর তুলো গোঁজা।
ঘটনাটা খুব পরিচিত।
চিত্রনাট্যটা মুখস্থ।
অভিযোগ উঠল,
ধর্ম অবমাননা।
ব্যাস।
এটুকুই যথেষ্ট।
কোনো পুলিশ এল না।
কোনো আদালত বসল না।
কোনো প্রমাণ চাওয়া হলো না।
রাস্তাতেই বিচার বসে গেল।
প্রথমে পি*টি*য়ে
হাড়গোড় গুঁড়ো করা হলো।
তারপর,
তারপর সেই নিথর শরীরটা
ঝুলিয়ে
আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো।
আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো?
তারা আগুনের উত্তাপ পোহাল।
তারা উল্লাস করল।
এখন আপনি বলবেন,
“ওটা তো বাংলাদেশ।
ওটা তো আলাদা দেশ।
আমাদের এখানে এসব হবে না।”
সত্যিই?
আপনি নিশ্চিত?
আগুন যখন পাশের বাড়িতে লাগে,
তখন নিজের দেওয়াল ভিজিয়ে রাখতে হয় দাদা।
আগুনের কোনো পাসপোর্ট লাগে না।
কাঁটাতার লাগে না।
ওটা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে।
দীপু চন্দ্র দাসের
পোড়া শরীরটা
আসলে একটা বার্তা।
আপনাকে।
আমাকে।
আমাদের সবাইকে।
বার্তাটা খুব সোজা!
“তুমি দুর্বল,
তাই তুমি শিকার।”
এবার ধর্মের কথা বাদ দিন।
রাজনীতির কথাও বাদ দিন।
আসুন,
মনুষ্যত্ব নিয়ে কথা বলি।
যারা কাল রাতে
ওই আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে
উল্লাস করছিল,
তাদেরও হাত-পা ছিল।
চোখ-মুখ ছিল।
তারা দেখতে মানুষের মতোই ছিল।
কিন্তু বিশ্বাস করুন!
ওগুলো মানুষ নয়।
কারণ যে মানুষ
একটা মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার পর
বাড়ি ফিরে
শান্তিতে ভাত খেতে পারে,
যে মানুষ
তারপর নিজের সন্তানের মুখের দিকে
চোখ তুলে তাকাতে পারে,
তাকে আর যাই হোক
“মানুষ” বলা যায় না।
আগুনটা আসলে
দীপুর শরীরে লাগেনি।
আগুনটা লেগেছে
সভ্যতার বুকে।
আগুনটা লেগেছে
একটা শব্দে,
মনুষ্যত্ব।
যেদিন ধর্ম রক্ষার নামে
মানুষ পোড়ানো
‘গর্বের’ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়,
সেদিন আর ধর্ম জেতে না।
সেদিন মনুষ্যত্ব মরে যায়।
দীপু তো চলে গিয়ে
বেঁচে গেছে।
কিন্তু আমরা?
আমরা যারা বেঁচে আছি,
অথচ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে
প্রতিবাদ করার
মেরুদণ্ড হারিয়ে ফেলেছি,
আমরা কি সত্যিই বেঁচে আছি?
নাকি ভেতর থেকে
আমরাও পুড়ে ছাই?
এখনো সময় আছে।
শুধু ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে
দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন না।
চিৎকার করুন।
প্রশ্ন তুলুন।
কারণ,
মনুষ্যত্ব যদি একবার পুড়ে ছাই হয়ে যায়,
তবে আর কোনো ধর্মই
আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।