07/09/2026
যখন একটি রাজনৈতিক দলকে মব ও আক্রোশের মুখে রাষ্ট্রকতৃক হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে বিলোপ বা ক্লিনজিং এর মুখে ফেলা হয়েছে, তখন এই বক্তব্য সরাসরি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং রোম সনদ অনুযায়ী কোন জনগোষ্ঠীকে অপর একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া গণহত্যায় উসকানীর মত অপরাধ। এটা সরাসরি হত্যা বা নির্যাতনের নির্দেশের মাধ্যমে দাঙ্গা বা গণহত্যায় উসকানি। এই বক্তব্যই দেশে মব ও হত্যা নির্যাতনের জন্য দায়ী। এটাই জাকার্তা মেথড।
এই ভিডিওর পরের অংশে পরিষ্কার যে কি করা হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ায় ঠিক বর্তমানের বাংলাদেশের মতই অযুহাত দেখিয়ে ও ঘৃণা তৈরি করে সিআইএ এর জাকার্তা মেথড প্রয়োগ করে।
"জাকার্তা মেথড" হলো ১৯৬৫-৬৬ সালের ইন্দোনেশিয়ার গণহত্যা, যেখানে প্রায় ১০ লাখ বামপন্থী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মী সমর্থকদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই গণহত্যা মূলত সুকর্ণর শাসনের পতন এবং ইসলামপন্থী সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে সংঘটিত হয়, যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র (CIA) সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এই ঘটনাটি "জাকার্তা মেথড" নামে পরিচিত, কারণ ইন্দোনেশিয়ায় বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদীদের নির্মূল করার পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যেমন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে।
জাকার্তা মেথড আসলে কি? কি হয়েছিল ১৯৬৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায়? তিনি ইন্দোনেশিয়ার জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃত। সুকর্ণ ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং যিনি নেদারল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৪৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ঔপনিবেশিক শাসনামলে এক দশকেরও বেশি সময় রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন। তিনি ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তমনা, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপোক্ষ একজন আধুনিক নেতা।
বহুদিন ধরে ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় নেতা সুকর্ণকে লক্ষ্য করে কুৎসা রটায় মার্কিনপন্থীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায়। বলা হয় সুকর্ণ সোভিয়েতপন্থী, ইসলাম বিরোধী এবং তিনি একদিন সমাজবাদী হয়ে ইন্দোনেশিয়ায় মার্কসবাদ কায়েম করে দেশকে সোভিয়েতদের হাতে তুলে দেবেন।
দীর্ঘদিন ধরে কুৎসা রটানোর পর হঠাৎ এক রাতে যেখানে ছয় জন সামরিক জেনারেলকে নৃশংসভাবে মেরে ফেলে কিছু নিম্ন পদের সেনা কর্মকর্তা যাদের সেই হত্যাকান্ডের পেছনে তেমন কোন উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। এর পর আমেরিকা সরকার ও সিআই এর সহায়তায় সংঘটিত হয় একটি সামরিক ক্যু। জনপ্রিয় ও গণতান্ত্রিক নেতা সুকর্ণকে সরিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল সুহার্তো ক্ষমতা গ্রহণ করে ঘোষণা করে দেন যে উক্ত ছয় জেনারেলকে হত্যা করেছে ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টি। এর পর তিনি সেনা, সিভিল প্রশাসন ও মুসলিম গুন্ডাদের লেলিয়ে দেন মব সৃষ্টি করে কমিউনিষ্ট নেতৃত্ব, সমর্থক এমনকি ভোটারদের যেখানে পাওয়া যায় সেখানে হত্যা করতে।
এভাবে এক বছরে তারা ১০ লক্ষ ধর্মীয় ও জাতীগত সংখ্যালঘু, ভিন্ন মতাবলম্বী এবং যারা জাতীয়তাবাদী বা মুসলিম রাজনীতির পক্ষে নয় তাদের সমূলে বিনাশ করে। এটাই বাংলাদেশে করার চেষ্টা করা হয়েছিল বিডিআর বিদ্রোহের বিষয়টিকে উপলক্ষ্য করে। উদ্দেশ্য ছিল সেনা অভ্যুত্থ্যান করে কর্মকর্তাদের হত্যার দায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী নেতাদের কাঁধে চাপিয়ে গণহত্যা শরু করা এবং ধর্মীয় ও জাতীগত সংখ্যালঘু, ভিন্ন মতাবলম্বী এবং যারা সামরিক জাতীয়তাবাদ বা মুসলিম রাজনীতির পক্ষে নয় তাদের সমূলে বিনাশ করা।
২০২৪ সালে ৫ অগাস্টের পর এদেশে যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদীর পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বা ভুয়া হাদিসের ইসলামী রাজনীতির পক্ষে নয় তাদের সমূলে বিনাশ করাই লক্ষ্য সেই ইন্দোনেশিয়ার মতই। যে চেষ্টা প্রথম করা হয়েছিল ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের আড়ালে। সেই জন্যই ছিল এই দাঙ্গা বা গণহত্যায় উসকানী যাতে ইন্দোনেশিয়ার মত একটি গণহত্যা শুরু করা যায় জাকার্তা মেথড বাস্তবায়নের জন্য।