19/01/2026
মওদুদীবাদের ব্যবচ্ছেদ!
ভারত উপমহাদেশে ইসলামকে ভালোর খোলসে যতভাবে বিকৃতি করা হয়েছে তারমাঝে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠতা মাওলানা মওদুদী। আজ আমরা এই মওদুদীবাদেরই ব্যবচ্ছেদ করতে চলেছি।
মওদুদি সাহেব আওরংগাবাদে পড়াশোনা করা অবস্থায় তার পিতা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৭ বছর বয়সে তিনি জীবিকা অর্জনের জন্য লেখনি শক্তিকেই অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করে নেন। তবে ব্যক্তি জীবনে তিনি ইসলামকে লালন করতেন না। এবিষয়ে মাওলানা মানযূর নোমানী বলেন, ১৯৩৬/১৯৩৭ সাল পর্যন্ত মওদুদি সাহেব ইংরেজি স্টাইলে চুল কাটতেন এবং দাড়ি সেভ করতেন। নামকা ওয়াস্তে দাড়ি অবস্থায় ছিলেন দীর্ঘদিন।
১৯৩২ সালে মওদুদি সাহেব একটি মাসিক পত্রিকা বের করতে শুরু করেন। পত্রিকাটিতে আধুনিক যুগের আলোকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন ও পাশ্চাত্য সভ্যতার সৃষ্ট বিভিন্ন সংশয় নিরসনে লেখা দিতে শুরু করেন। লেখা পড়ে মাওলানা মানযূর নোমানী ও মাওলানা আবুল হাসান আলী নদবী সহ অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম মওদুদী সাহেবের প্রতি মুগ্ধ হন। পরবর্তীতে তারা মওদুদি সাহেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন।
তবে এ যোগদান পরবর্তী সময়ে ওলামায়ে কেরাম উপলব্ধি করলেন, মওদুদি সাহেবের মূল লক্ষ্য হল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন করা এবং এ লক্ষ্যে ধর্মহীন রাজনৈতিক দলের ন্যায় যখন যে নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজনীয় মনে করতেন তখন তা গ্রহণ করতেন। এমনকি ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও তিনি অবলীলায় এবং ইসলামের নামে তা গ্রহণ করতেন। প্রয়োজনে ইসলামী শিক্ষা ও মৌলিক নীতিমালার স্বকল্পিত ব্যাখ্যাও দিতেন। এভাবে তিনি ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা শুরু করেন এবং ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোর মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন।
মাওলানা মানযূর নোমানী সাহেব জামায়াত ত্যাগ করার পূর্বে ‘মাওলানা মওদুদীর সাথে আমার সাহচর্যের ইতিবৃত্ত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ নামক কিতাব লেখেন। যেখানে তিনি মওদুদীর ভ্রান্ত বিষয়গুলো সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মওদুদী ইসলামকে রাজনৈতিক ধারায় পরিচালিত করার মধ্য দিয়েই এর বিকৃতি শুরু করেছিলো। যা ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তিনি কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষাকে রাজনৈতিক ভাবে স্টাবলিশ করতে মনগড়া ব্যাখা দিয়েছিলেন।
১. তিনি ‘ইলাহ’ এর অর্থ শাসক বলে ব্যাখা দেন। অথচ ওলামায়ে কেরাম ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ মাবুদ বা প্রভু বলে ব্যাখা করেছেন। মওদুদীর এই ব্যাখাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছিলো—শাসক তো সর্বদা ন্যায়পরায়ন হতে পারেন না। জালেমও হয়। অথচ আল্লাহ তো তা নন। সেক্ষেত্রে ইলাহ এর অর্থ শাসক হয় কিভাবে?
প্রতিউত্তরে মওদুদী লিখেছিলেন, আল্লাহ তা'আলাও জালেম। কেননা যে ক্ষেত্রে পৃথিবীতে নর ও নারীর অবাধ মেলামেশা রয়েছে, সেক্ষেত্রে ব্যভিচারের কারণে আল্লাহর নির্দেশ রজম প্রয়োগ করা নিঃসন্দেহে জুলুম।
(তাফহীমাত : ২/২৮১)
২. তিনি ‘রব’ এর অর্থও লিখেছেন, শাসক। যার ব্যাখায় তিনি লিখেছেন, রব ও ইলাহ আসলে একই শব্দের প্রতিশব্দ। অথচ ‘রব’ এর অর্থ প্রতিপালক।
৩. তিনি ‘দ্বীন’ এর অর্থে লিখেছেন, রাষ্ট্রীয় সরকার বা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো এবং ‘শরীয়ত’ এর অর্থ, রাষ্ট্রের আইন-কানুন। অথচ ঈমান আমল তথা নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত সহ আল্লাহর মৌলিক হুকুম মানার সমন্বিত নাম হল দ্বীন তথা ধর্ম এবং শরীয়ত হলো তার মানদণ্ড।
যখন মওদুদী দ্বীনকে রাষ্ট্র ও শরীয়তকে তার আইনকানুন হিসাবে ব্যাখা দিলেন তখন বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এলো। যেমন—যদি এমনই হয় তবে নবীরা কে ছিলো? তাদের দায়িত্ব কি ছিলো? উত্তরে বলা হয়, নবীরা ছিলেন আইনকানুনের সাধারণ প্রচারক ও রাষ্ট্রের প্রধান। যেহেতু আইনকানুনের প্রচারক ও রাষ্ট্রের প্রধানরা ভুলের উর্ধ্বে নন তাই নবীরাও ভুলের উর্ধ্বে ছিলেন না।
এ বিষয়ে তিনি তার কিতাবে লিখেন, অন্যদের কথা তো স্বতন্ত্র, প্রায়শঃই পয়গাম্বরগণও তাদের কুপ্রবৃত্তির মারাত্মক আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
(তাফহীমাত : ২/১৯৫)
নবী কারিম সাঃ এর ব্যাপারে তিনি লিখেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের উর্ধ্বে নন এবং মানবীয় দুর্বলতা থেকেও মুক্ত নন।
(তরজমানুল কুরআন : এপ্রিল-১৯৭৬)
প্রশ্ন রাখা হয়, শরীয়ত যদি আইনকানুনই হয় তবে কুরআন, হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের কি হবে? আইনকানুন তো যুগের সাথে পরিবর্তনশীল। এক্ষেত্রে তিনি তার কিতাবে উল্লেখ করেন, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার শব্দগুলোর (ইলাহ, রব, দ্বীন, ইবাদত) যে মৌলিক অর্থ প্রচলিত ছিল, পরবর্তী শতকে তা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এক একটি শব্দ ব্যাপকতা হারিয়ে একান্ত সীমিত ও অস্পষ্ট অর্থের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে।
এর এক পৃষ্ঠা পরই তিনি লিখেন, এটা সত্য যে, কেবল এ চারটি মৌলিক পরিভাষার তাৎপর্য পুরোনো হয়ে যাওয়ায় কুরআনের তিন চতুর্থাংশের চেয়েও বেশি শিক্ষা এবং তার সত্যিকার স্পিরিট দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গেছে।
(কুরআন কী চার বুনিয়াদী ইসতিলাহে : ৮-১০)
হাদীস সম্বন্ধে মওদূদী লিখেছেন, বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত সারা আ.-এর ঘটনা সম্বন্ধে বলেন, “এট একটি মিথ্যা নাটক।"
(রাসায়েল মাসায়েল: ৩/৩৬)
তিনি আরো লিখেছেন, "হাদীস তো কতিপয় মানুষ সূত্রে বর্ণিত হয়ে কতিপয় মানষের নিকট পৌছেছে।কাজেই এসবের সত্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্ম নিতে পারে না বড়জোর ধারণা জন্ম নিতে পারে।
(তাফহীমাত : ১/৩৫৬)
সাহাবায়ে কেরামের সত্যের মাপকাঠি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি লিখেন, সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি বলে জানবে না এবং তাদের অনুসরণ করবে না।
(দস্তুরে জামা'আতে ইসলামী : ৭)
অথচ মহান আল্লাহ অসংখ্য আয়াতে কুরআনকে অবিকৃত অবস্থায় কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নেওয়ার, নবীদের নিষ্পাপ হওয়া এবং সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি হিসাবে ঘোষণা করেছেন।
৪. তিনি ‘ইবাদত’ এর ব্যাখায় লিখেন, ইবাদত শব্দের অর্থ আইন মান্য করা।
অথচ হকপন্থী ওলামাদের মতে, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি বিধি-বিধান পালন করার নামই হলো ইবাদাত। কিন্তু মওদূদী সাহেবের মতে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত এগুলো মূলত ইবাদত নয়, বরং এগুলো হল ট্রেনিং কোর্স। তার মতে এসমস্ত ইবাদতই ইসলামের মূল উদ্দেশ্য নয় বরং ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হল, ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি "ইবাদত একটি টেনিং কোর্স” এই শিরোনামে বলেন, বস্তুত ইসলামের নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতসমূহ এই উদ্দেশ্যে (জিহাদ ও ইসলামী হুকুমত কায়েম) প্রস্তুতির জন্যই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। দুনিয়ার সমস্ত রাষ্ট্রশক্তি নিজ নিজ সৈন্যবাহিনী, পুলিশ ও সিভিল সার্ভিসের কর্মচারীদেরকে সর্বপ্রথম এক বিশেষ ধরনের ট্রেনিং দিয়ে থাকে। সেই ট্রেনিংয়ে উপযুক্ত প্রমাণিত হলে পরে তাকে নির্দিষ্ট কাজে নিযুক্ত করা হয়। ইসলামও তার কর্মচারীদেরকে সর্বপ্রথম এক বিশেষ পদ্ধতির ট্রেনিং দিতে চায়। তারপরই তাদেরকে জিহাদ ও ইসলামী হুকুমত কায়েম করার দায়িত্ব দেয়া হয়।
তিনি অন্যত্র বলেন, মূলত মানুষের রোযা, নামায, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তাসবীহকে ঐ বড় ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করার ট্রেনিং কোর্স (Training Courses)।
এভাবেই তিনি বহুসংখ্যক মৌলিক পরিভাষার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যা সুস্পষ্টত গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার লক্ষণ। তার প্রতিটা কথাই ইসলাম ও কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক। যা ঈমান ও আকীদাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সারকথা—মওদূদী সাহেব ও তার অনুসারী জামায়াত শিবিরের মতবাদ ও চিন্তাধারা ঈমান-আকীদা, ইবাদত-বন্দেগী থেকে শুরু করে প্রায় সমস্ত মৌলিক বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চিন্তা-চেতনা থেকে বিচ্যুত। তারা সমগ্র উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব মস্তিস্ক ও স্বতন্ত্র দৃষ্টিভংগী থেকে ইসলামের নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা ইসলাম ও মুসলমানের পরিচয়ও পাল্টে দিয়েছেন। মওদুদীবাদ ইবাদত-বন্দেগীর পরিচয়, দ্বীন ধর্ম এবং শরীআতের পরিচয়ও পাল্টে দিয়েছেন। এমনকি পাল্টে দিয়েছেন ইলাহ বা মা'বুদের পরিচয়ও।
ইসলামের এসব প্রধান মৌলিক বিষয়গুলোর পরিচয় ও স্বরূপ পাল্টে দেয়ার ফলে মওদূদী সাহেব ও তার অনুসারীদের পেশকৃত ইসলাম আর সেই ইসলাম থাকেনি যে ইসলামকে নবী কারিম সাঃ প্রচার করেছিলেন। অতএব বলা যায়, মওদূদী সাহেব এক নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটিয়েছেন আর তার অনুসারীগণ সেই নতুন ধর্মই অনুসরণ করে চলেছেন।
বিঃদ্রঃ এখানে উল্লেখিত প্রতিটি কথার প্রমাণ ও যুক্তি, দলীল রয়েছে। কারোর সন্দেহ হলে কমেন্ট করুন। আমরা সত্যের পথে চলি, কারোর পক্ষপাতিত্ব নয়।