18/12/2025
কিছুদিন আগে টোকিও জাপানের ডিজনী ল্যান্ডে গিয়েছিলাম। জাঁকজমকপূর্ণ সব রাইড আর উৎসবের আমেজ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম ভালোলাগা। কিন্তু তার মাঝে "It's a small world after all" নামের মাত্র ১০ মিনিটের একটা রাইড আমার ভেতরটা যেন ওলটপালট করে দিল।
রাইডটিতে নৌকায় করে ভেসে ভেসে দেখছিলাম পুরো পৃথিবীটাকে। কত বিচিত্র সব দেশের মানুষ, কত তাদের রঙ, কত ভিন্ন তাদের পোশাক আর সংস্কৃতি। কিন্তু আবহসংগীতে বারবার একটা কথাই বেজে উঠছিল—দিনশেষে পৃথিবীটা খুব ছোট, আর আমাদের সবার পরিচয় একটাই, আমরা মানুষ।
ওই ১০ মিনিটের যাত্রায় আমি যেন নিজের জীবনের যাত্রাপথটা দেখতে পেলাম। মনে পড়ে গেল ছোটবেলার কথা। দেশে থাকতে দেখতাম বাবা-মা কোথাও গেলে সবসময় ভিড়ের মাঝে নিজের এলাকা বা 'টাঙ্গাইল'-এর মানুষ খুঁজতেন। অপরিচিত কোনো জায়গায় গিয়ে নিজ জেলার কাউকে পেলে তাদের চোখেমুখে যে কী অকৃত্রিম আনন্দ আর স্বস্তি দেখতাম, তা বলে বোঝানো যাবে না। তখন ওটাই ছিল তাদের পৃথিবী, ওটুকুই ছিল তাদের আপন।
বড় হয়ে জীবিকার প্রয়োজনে যখন প্রথম দেশ ছাড়লাম, তখন আমার পৃথিবীটা একটু বড় হলো। বিদেশের মাটিতে তখন আর জেলা বা এলাকা নয়, আশেপাশে যেকোনো একজন 'বাংলাদেশি' পেলেই মনে হতো ভাই বা বন্ধু পেয়েছি, প্রাণভরে বাংলায় দুটো কথা বলতে চাইতাম। কিছুদিন পর গেলাম এমন এক দেশে যেখানে বাংলাদেশি খুব কম, সেখানে কলকাতার বাঙালি দেখলেও মনে হতো, "আহা, নিজের মানুষ!" মনে অদ্ভুত এক শান্তি লাগত।
এরপরের গন্তব্য যখন এমন হলো যেখানে কোনো বাঙালিই নেই, তখন দেখলাম এক অদ্ভুত পরিবর্তন। রাস্তায় কোনো সাউথ এশিয়ান—হয়তো ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কান কাউকে দেখলেও অচেনা আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিচ্ছি। কোনো কথা নেই, শুধু ওই হাসিটাই যেন বলে দিত, "আমরা এই অচেনা ভিড়ে একে অপরের আপন।" তখন বুঝতাম, সে-ও হয়তো তার কাছের কাউকে দেখতে পেয়ে খুশি হয়েছে।
ভাবতে অবাক লাগে, আজ যদি আমি ইউরোপ বা অন্য কোনো মহাদেশে যাই, তখন হয়তো যেকোনো এশিয়ানকে দেখলেই আমার বুকটা জুড়িয়ে যাবে। আর কল্পনায় যদি আরও দূর ভবিষ্যতে যাই, কখনও যদি পৃথিবীর বাইরে এলিয়েনদের জগতে গিয়ে পড়ি, তখন হয়তো আমরা হন্যে হয়ে খুঁজব কোথায় আরেকজন 'মানুষ' আছে? সে কালোর হোক, ফর্সার হোক, কিংবা আমার ঘোর শত্রুর দেশের হোক—সে তো অন্তত 'মানুষ'! তখন ওই মানুষ পরিচয়টাই হবে আমাদের একমাত্র আশ্রয়।
এই রাইডটা আমাকে এক বিশাল বার্তা দিয়ে গেল। আমরা আসলে অকারণে খুব ছোট পরিসরে নিজেদের আটকে রেখেছি। আমরা ধর্মের ধুজো তুলে একে অপরের রক্ত ঝরাই, কাঁটাতারের সীমানা দিয়ে একে অপরকে ঘৃণা করি, ভিনদেশী বলে অন্যের ভাষা বা সংস্কৃতিকে অপমান করি। অথচ মহাকালের হিসেবে আমাদের পরিচয় একটাই। রাশিয়ার সেই তুষারশুভ্র মেয়েটি কিংবা আফ্রিকার রোদে পোড়া কোকড়ানো চুলের ছেলেটি সবার শিরায় একই লাল রক্ত, সবার একটাই পরিচয়—আমরা মানুষ।
আমাদের পৃথিবীটা আসলেই অনেক ছোট, আর আমাদের জীবনটা আরও ছোট। যত বেশি আমরা চোখ মেলব, যত বেশি হৃদয়টা বড় করব, ততই এই ধর্ম-বর্ণ আর ভৌগোলিক বিভেদগুলো আমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হবে। দিনশেষে আমরা সবাই একই আকাশের নিচে, একই মাটির সন্তান।