17/05/2025
বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার উত্থান কোনো আকস্মিক সামাজিক দুর্ঘটনা নয়—এটি একটি গঠনমূলক ব্যর্থতা। একটি জাতি যখন তার আত্মপরিচয় নির্মাণে ব্যর্থ হয়, তখনই সে বিকল্প মিথ গড়ে তোলে। এবং সেই মিথ যদি হয় "ধর্মীয় বিশুদ্ধতা", তবে সহিংসতা হয়ে ওঠে একধরনের আত্মপ্রতিষ্ঠার পদ্ধতি।
চরমপন্থা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নবী মুহাম্মদের (সা.) দর্শনে ‘রহমতুল্লিল আলামিন’–এর মূলতত্ত্ব কেবল মুসলমানের জন্য নয়, সকল সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহের ভাষা। অথচ আজ, আল-কায়েদা থেকে হিযবুত তাহরীর, কিংবা তাওহিদি জনতার মতো গোষ্ঠী সেই ধর্মকেই অস্ত্রে রূপান্তর করেছে। কীভাবে?
কারণ তারা ধর্মের আধ্যাত্মিকতা নয়, ক্ষমতার কাঠামো খুঁজে পায়। এরা গাজালি, রুমি বা ইবনে খালদুনকে নয়—বরং এমন এক রাজনৈতিক ইসলাম চায়, যেখানে ঈশ্বরের নামে মানুষকে দাসে পরিণত করা যায়। এই চরমপন্থা আসলে আধুনিকতা-বিমুখ এক প্রতিক্রিয়া—reactive identity construction—যার মূল ভিত্তি হলো: নিজের সীমাবদ্ধতাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া।
এটি ইবনে খালদুনের ‘আসরাবিয়ার তত্ত্ব’ যেমন বলে: যখন কোনো গোষ্ঠী শক্তি হারায়, তারা ধর্মীয় আবেগে তা পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। কিন্তু সেই আবেগ যদি অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির শূন্যতায় জন্ম নেয়, তবে তা বর্বরতায় রূপ নেয়।
আমরা ভুলে গেছি, ধর্ম কোনো শূন্যতার স্থলাভিষিক্ত নয়—ধর্ম একটি পরিপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অন্বেষণ, যা দয়ায়, জ্ঞানচর্চায় ও মমত্বে বিকশিত হয়। আজ আমাদের দরকার ইজতিহাদ—নতুন করে চিন্তা করার সাহস। দরকার মুক্তচিন্তার নবজাগরণ, যেখানে তরুণেরা তাদের জীবনকে ব্যাখ্যা করবে দর্শন, বিজ্ঞান, ও শিল্পচিন্তার আলোকে— মধ্যযুগীয় গোঁড়ামির অন্ধ গুহায় নয়।
একটি উদার সমাজ গড়তে হলে—
আমাদের চর্চা করতে হবে সচেতন অসন্তোষ, যেমনটি কাম্য ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দার্শনিকদের কাছে। আমাদের গড়ে তুলতে হবে নৈতিক জনপরিসর, যেখানে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে বিশ্বাসহীনতা সত্ত্বেও। সর্বোপরি, ঈশ্বরকে ব্যবহার নয়, উপলব্ধি করতে হবে।
কারণ একেই বলা হয় তাওহিদের গভীর দর্শন—একতা যা ভেদ নয়, সংহতিতে বিশ্বাস করে।
আমাদের বিকল্প নেই। আমরা যদি এই চিন্তাজগতকে সক্রিয় না করি, তবে যারা ধর্মের নামে অন্ধকার চায়, তারা ঠিকই সেই শূন্যতাকে পূরণ করে ফেলবে।
ধর্ম যদি হয় ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের চূড়ান্ত নৈতিক অন্বেষণ, তবে ধর্মীয় চরমপন্থা সেই সম্পর্কের সবচেয়ে ভয়ানক বিকৃতি—যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষের নিজের ভয়, ক্ষোভ ও আধিপত্যের বাসনা পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পবিত্রতার’ নামে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত সহিংসতা, হিযবুত তাহরীরের খোলামেলা খিলাফত মিছিল, কিংবা তাওহিদি জনতার দরগাহবিরোধী অভিযান—এসব কেবল ধর্মীয় উন্মাদনার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং একটি সভ্যতাগত ব্যর্থতা, যেখানে নৈতিকতা স্থানচ্যুত হয়ে পড়েছে।
ইমাম আল-গাজ্জালী যেমন বলেছিলেন, "ধর্ম যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়, তখন তা নৈতিকতার নয়, ক্ষমতার দাসে পরিণত হয়।" বাংলাদেশ এখন সেই সংক্রমণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আদতে, চরমপন্থা কখনোই নির্জন আত্মজিজ্ঞাসা থেকে আসে না। এটি আসে যখন রাষ্ট্র ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, সমাজ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, এবং তরুণ মন প্রতিস্থাপনের বদলে প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে ‘সত্য’ শিখে। এ যেন প্লেটোর গুহা-রূপকের এক নির্মম বাস্তবায়ন—যেখানে ছায়াই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, আর আলো চোখে লাগার আগে নিষিদ্ধ হয়।
আমরা এই প্রজন্মকে কী দিয়েছি?
একটি সংকীর্ণ, অপ্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রম, যেখানে দ্বিজাতিতত্ত্বের ছায়া থেকে মুক্তি নেই।
একটি অর্থনীতি, যেখানে শ্রমিকের ঘামে রাজনীতিবিদের বিলাস গড়া হয়।
একটি সমাজ, যেখানে ধর্ম ব্যবহৃত হয় ভয় ও নিয়ন্ত্রণের উপকরণ হিসেবে, মুক্তির নয়।
অথচ ইসলাম—যা শব্দতাত্ত্বিকভাবে সালাম/শান্তি থেকে এসেছে—তার মৌলিক চেতনা ছিল আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নৈতিক উত্তরণ। “লা ইকরাহা ফিদ্দীন”—ধর্মে জবরদস্তি নেই—এই আয়াতটি যদি আমরা পাঠ্যপুস্তকে না রাখি, কেবল যুদ্ধ ও দণ্ডবিধি নিয়ে আলোচনা করি, তবে আমরা ধর্ম নয়, আধিপত্যের ভাষা শেখাচ্ছি।
চরমপন্থা দমন করার প্রকৃত পথ শক্তি নয়, বিকল্প স্বপ্ন দেওয়া।
তরুণদের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের রাস্তা। নৈতিকতা-নির্ভর ধর্মচর্চার চর্চা।
সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা—সেই 'জিহাদ' যা আত্মার অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো নিয়ে আসে।
ফুকো বলতেন, "Power is not only repressive, it is productive." সেই ক্ষমতা আমাদের হাতে—আমরা চাইলেই একটি বিকল্প বাস্তবতা নির্মাণ করতে পারি, যেখানে একজন তরুণ ছেলের হাতে থাকবে বই, ক্যামেরা বা কোডিংয়ের ল্যাপটপ—না যে তলোয়ার, যা সে মিথ্যা স্বর্গের প্রতিশ্রুতিতে অন্যের রক্তে রাঙাবে।
বাংলাদেশ এখন একটি নৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা হয়ত ধর্মের নামে অন্ধকারে হারিয়ে যাবো, অথবা যুক্তি, শিক্ষা, ও মানবিকতার আলোয় পথ খুঁজে নেবো।
প্রশ্ন হলো: আমরা কী পছন্দ করবো—ঈশ্বরের নামে মানুষের শত্রু হওয়া, না মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের প্রকৃত অর্থ খোঁজা?