15/05/2026
ইরানের ২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা The Song of Sparrows পুরোটা জুড়েই এক ধরনের নীরব বাস্তবতা বয়ে নিয়ে চলে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়ন, সততা থাকা সত্ত্বেও কাজ হারানোর বেদনা, রিযিকের ব্যাপারে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা, প্রতিবেশীর হক, পারিবারিক বন্ধন সবকিছু এত সূক্ষ্ম আর আন্তরিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, সিনেমাটা শুধু দেখা হয় না; অনুভব করা যায়।
মুভির ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই যেন সবচেয়ে বড় কথা বলে। যেমন চাকরির শেষ দিনে পাওয়া উটপাখির ডিম। একটি ডিমকে ঘিরে পুরো পরিবারের আনন্দ, একা না খেয়ে প্রতিবেশীদের মাঝে ভাগ করে দেওয়ার যে চিত্র তা আমাদের সমাজের বহু হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্যকে মনে করিয়ে দেয়। আবার সময়ের সাথে সাথে যখন অভাব মানুষকে কিছুটা স্বার্থপর করে তোলে, প্রতিবেশী থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখনও সিনেমা সেটাকে খুব মানবিকভাবেই দেখিয়েছে।
চাকরি হারানোর পর উটপাখির দিকে তাকিয়ে বাবার সেই “It’s not fair” বলা দৃশ্যটার মাঝেও এক ধরনের অসহায় হতাশা ছিলো। সেখানে শুধু একজন কর্মহীন মানুষের ক্ষোভ ছিলো না, ছিলো একজন বাবার শত চিন্তা, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, নিজের অক্ষমতার নীরব চাপ। পুরো সিনেমাজুড়েই আসলে একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাবার মানসিক যুদ্ধ খুব নিঃশব্দে ফুটে উঠেছে যে মানুষটা নিজের সুখকে আলাদা করে ভাবার সুযোগই পায় না।
সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিলো পরিবারটার ভেতরের সম্পর্কগুলো। অর্থনৈতিক টানাপোড়ন থাকা সত্ত্বেও স্বামী-স্ত্রীর সহজ প্রেম, সন্তানের প্রতি বাবার মমতা, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে পরিবারকে আগলে রাখার চেষ্টা সবকিছু খুব স্বাভাবিক অথচ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। এমনকি বাবা কর্মহীন হয়ে পড়ার পরও স্ত্রী ও সন্তানদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, তাকে তুচ্ছ না করে পাশে দাঁড়ানো এটাও ছিলো অসাধারণ এক পারিবারিক সমন্বয়।
মোটকথা, নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের ধার, অভাব, অনিশ্চয়তা, ভালোবাসা, সন্তান, শাসন, পারিপার্শ্বিকতা সবকিছুর মাঝেও একসাথে টিকে থাকার যে নীরব সুর, সেটাই যেন সিনেমাটার মূল শক্তি। অভাব-অনটনের মাঝেও সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার ভেতর যে এক ধরনের তৃপ্তি আর আনন্দবোধ থাকে, সিনেমাটা সেটাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বৃহৎ পরিসরে দেখলে, একজন পুরুষের সমস্ত সুখ যে তার স্ত্রী, সন্তানের হাসি, নিজের ত্যাগ আর পরিবারের নিরাপত্তা ঘিরেই তৈরি হয় এই নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের ছায়ার ভেতর সেই বাস্তব ছাপটাই পরিচালক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।
মুভিটা আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়, ছোটদের ইচ্ছা ও অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তখনকার সময়টায় মোবাইল ফোন এত সহজলভ্য ছিলো না, তাই পরিবারের বিনোদন, টিভির এন্টেনা ঠিক করা, একসাথে সময় কাটানো - এসব ছোট ছোট বিষয়ও জীবনের বড় আনন্দ হয়ে উঠতো। সেই সরলতার আবহ পুরো সিনেমাজুড়ে খুব সুন্দরভাবে উপস্থিত ছিলো।
শেষদিকে ট্রাকের পেছনে বসে গান গাইতে গাইতে বাবার সেই হাসি যেন পুরো গল্পটার সারাংশ হয়ে ওঠে জীবন কঠিন, তবুও মানুষ বেঁচে থাকে প্রিয় মানুষগুলোর হাত ধরে।
বাংলাদেশের বিকেল বেলার পাখি নাটকের কথাও মনে পড়ে যায়, যেখানে পরিবার ও বাবাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত আবেগগুলো একইভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। দুটো সৃষ্টিই যেন মনে করিয়ে দেয় অভাব মানুষকে ক্লান্ত করতে পারে, কিন্তু একে অপরের পাশে থাকার শক্তিটাই পরিবারকে টিকিয়ে রাখে।