15/08/2026
সীরাত সিরিজ (পর্ব - ১ : রাসূল (ﷺ) এর বংশ পরিচিতি ও জন্ম)
◼️ রাসূল (ﷺ) এর বংশ পরিচিতি
রাসূল (ﷺ) এর পবিত্র বংশধারা পৃথিবীর সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাশীল।(৩) এটি এমন এক বাস্তব সত্য যে, মক্কার সকল কাফির এমনকি তাঁর চরম শত্রুও তা অস্বীকার করতে পারেনি। আবু সুফিয়ান রা. ইসলামগ্রহণের আগে রোম সম্রাটের সামনে এ সত্য গোপন করতে পারেননি; বরং সত্যটাই স্বীকার করতে হয়েছিল তাঁকে। অথচ তখন তিনি মনে মনে চাচ্ছিলেন, যদি কোনো সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে রাসূল (ﷺ) এর ওপর কোনো না কোনো দোষ চাপাবেন।
◼️ রাসূল (ﷺ) এর বংশধারা
◾পিতার দিক থেকে রাসূল (ﷺ) এর বংশপরিক্রমা
মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল মুত্তালিব ইবনু হাশিম ইবনু আবদি মানাফ ইবনু কুসাই ইবনু কিলাব ইবনু মুররা ইবনু কাআব ইবনু লুওয়াই ইবনু গালিব ইবনু ফিহর ইবনু মালিক ইবনু নাজার(৪) ইবনু কিনানা ইবনু খুজায়মা ইবনু মুদরিকা ইবনু ইলয়াস ইবনু নিজার ইবনু মাআদ ইবনু আদনান।
এ পর্যন্ত রাসূল (ﷺ) এর বংশধারা সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত ও প্রমাণিত। এর পর থেকে আদম আ. পর্যন্ত তাঁর বংশধারা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, তাই সেটুকু আর উল্লেখ করা হলো না।
◾মায়ের দিক থেকে রাসূল (ﷺ) এর বংশপরিক্রমা
মুহাম্মাদ ইবনু আমিনা বিনতু ওয়াহাব ইবনু আবদি মানাফ ইবনু জুহরা ইবনু কিলাব।
উপরিউক্ত আলোচনার পর জানা গেল যে, কিলাব ইবনু মুররা পর্যন্ত পিতা-মাতার দিক থেকে বংশপরিক্রমা ভিন্ন হলেও এর পর থেকে একসঙ্গে মিলে গেছে।
◾রাসূল (ﷺ) এর জন্মপূর্ব বরকতের সুবাস
প্রভাত হওয়ার আগে সুবহে সাদিকের আলো এবং রক্তিম পুবাকাশ যেমন পৃথিবীকে আলোকোজ্জ্বল সূর্যোদয়ের জানান দেয়, তেমনি নবুওয়াতি সূর্যের উদয়-মুহূর্ত যখন একেবারে নিকটে, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এমন সব ঘটনা ঘটতে লাগল, যা রাসূল (ﷺ) এর শুভ জন্মের আগমনী-সংবাদ দিচ্ছিল। মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদদের পরিভাষায় সেগুলোকে 'ইরহাসাত' বা অপেক্ষমাণ নিদর্শন বলা হয়।
রাসূল (ﷺ) এর সম্মানিত মা আমিনা থেকে বর্ণিত; রাসূল (ﷺ) এর যখন তাঁর মাতৃগর্ভে, তখন আমিনাকে স্বপ্নে সুসংবাদ দেওয়া হয়- 'তোমার গর্ভে যে শিশু রয়েছে, সে এ উম্মাহর নেতা হবে। শিশুটি যখন ভূমিষ্ঠ হবে, তখন তুমি এ দুআ করবে-“আমি তাঁকে এক আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি" এবং তাঁর নাম রাখবে মুহাম্মাদ।'
আমিনা আরও বলেন, মুহাম্মাদ যখন আমার গর্ভে আসেন, তখন আমি একবার এমন একটি আলো দেখতে পাই, যে আলোতে শামের বসরা শহরের বড় বড় প্রাসাদ আমার দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল!(৫)
তিনি আরও বলেন, আমি এমন কোনো মহিলাকে দেখিনি, যারা গর্ভবতী হয়ে আমার মতো এত হালকা ও সহজবোধ করেছেন। কেননা, গর্ভে সন্তান থাকলে মহিলাদের যে বমি বমি ভাব, অসুস্থতা-অলসতা ইত্যাদি বিষয় পরিলক্ষিত হয়, আমার ক্ষেত্রে সে রকম কিছুই হয়নি। এ ছাড়া এমন আরও অসংখ্য ঘটনা নবিজির জন্মের আগে প্রকাশ পেয়েছে, যেগুলো এই ছোট গ্রন্থে উল্লেখের সুযোগ নেই।
◼️ রাসূল (ﷺ) এর জন্ম
এ বিষয়ে সবাই একমত যে, রাসূল (ﷺ) সে বছরের রবিউল আউয়ালে জন্মান, যে বছর 'আসহাবে ফিল' বা আবরাহার হস্তিবাহিনী পবিত্র কাবায় হামলা করতে এসেছিল।(৬) তবে আল্লাহ তাআলা কতিপয় ক্ষুদ্র আবাবিলের মাধ্যমে পাথরকণা নিক্ষেপ করে তাদের পরাস্ত করেছিলেন। কুরআনেও এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে। মূলত এ ঘটনা রাসূল (ﷺ) এর জন্মপূর্ব বরকতের সূচনা হিসেবে প্রকাশ পেয়েছিল। রাসূল (ﷺ) যে ঘরে জন্মান, পরবর্তী সময়ে সে ঘর হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের ভাই মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফের অধিকারে এসেছিল।(৭)
কোনো কোনো ইতিহাসবিদ লিখেছেন, হস্তিবাহিনীর ঘটনা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল ঘটেছিল।(৮) এর মাধ্যমে জানা গেল যে, ইসা আ.-এর জন্মের ৫৭১ বছর পর রাসূল (ﷺ) এর জন্ম হয়।
ইবনু আসাকির(৯) রাহ, পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, আদম ও নূহ আ.-এর মধ্যখানে ১ হাজার ২০০ বছরের ব্যবধান ছিল। নুহ আ. ও ইবরাহিম আ.-এর মধ্যখানে ছিল ১ হাজার ১৪২ বছরের ব্যবধান। ইবরাহিম থেকে মুসা আ. পর্যন্ত ৫৬৫ বছরের। মুসা থেকে দাউদ আ. পর্যন্ত ৫৬৯ বছরের। দাউদ থেকে ইসা আ. পর্যন্ত ১ হাজার ৩৫৬ বছর এবং ইসা আ. থেকে শেষ নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত ৬০০ বছরের ব্যবধান ছিল।
এ হিসাবে আদম থেকে আমাদের নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত ৫ হাজার ৩২ বছরের ব্যবধান ছিল। তা ছাড়া প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী আদম আ.-এর বয়স হয়েছিল ৯৬০ বছর। তাই আদম আ.-এর পৃথিবীতে আগমনের প্রায় ৬ হাজার বছর পর অর্থাৎ, সপ্তম সহস্রাব্দে নবিজির জন্ম হয়।(১০)
মোটকথা, আসহাবে ফিল কাবায় আক্রমণের বছরের ১২ রবিউল আউয়াল(১১) সোমবার পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য এক দিন ছিল; যে দিন পৃথিবী সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য, দিন ও রাতের পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য, আদম আ. ও তাঁর সন্তানদের গৌরব, নুহ আ.-এর কিশতি রক্ষার মূল রহস্য, ইবরাহিম খলিলুল্লাহর দুআ, মুসা ও ইসা আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অর্থাৎ, আমাদের রাসূল (ﷺ) এ ধরায় শুভাগমন করেন।
তখন একদিকে পৃথিবীতে নববি সূর্যের আলোকরশ্মি কিরণ ছড়ায়, অন্যদিকে পারস্য- সাম্রাজ্যে কিসরার শাহি প্রাসাদে ভূ-কম্পন সৃষ্টি হয়। এর ফলে কিসরার শাহি প্রাসাদের ১৪টি চূড়া(১২) ভূপাতিত হয়। পারস্যের সাওয়া উপসাগর আচমকা শুকিয়ে যায়। এ ছাড়া পারস্যের সেই অগ্নিকুন্ড, যা ১ হাজার বছর ধরে একমুহূর্তের জন্যও নেভেনি, তা-ও নিজ থেকেই নিভে যায়।(১৩)
বস্তুত, এসব ঘটনা ছিল অগ্নিপূজা এবং সর্বপ্রকার অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির পরিসমাপ্তির সূচনা। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য পতনের ইঙ্গিত।
সহিহ হাদিসে(১৪) বর্ণিত আছে, রাসূল (ﷺ) এর জন্মের সময় তাঁর সম্মানিত মায়ের উদর থেকে এমন একটি নূর প্রকাশিত হয়েছিল, যার আলোয় পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত আলোকিত হয়ে যায়। এ ছাড়া কোনো বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল (ﷺ) তাঁর জন্মের সময় দুহাতের ওপর ভর দেওয়া ছিলেন। এরপর হাতে একমুঠো মাটি নিয়ে আকাশের দিকে তাকান।(১৫)
টীকা :
(৩) দালায়িলে আবু নায়িমে মারফু সূত্রে বর্ণিত আছে; জিবরিল আ. বলেছেন, 'আমি পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত সফর করেছি; কিন্তু বনু হাশিমের চেয়ে সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাশীল কোনো বংশ দেখিনি। মাওয়াহিব।
(৪) ইবনু হিশামের মতে, নাজারের অপর নাম কুরাইশ। তাঁর বংশধররাই 'কুরাইশি' বলে খ্যাত। তাঁর বংশোদ্ভূত না হলে কাউকে কুরাইশি বলা যায় না। তবে অনেকে বলেন, ফিহর ইবনু মালিকের অপর নাম কুরাইশ।- অনুবাদক।
(৫) সিরাত ইবনি হিশাম।
(৬) রাসূল (ﷺ) এর জন্মের সঙ্গে হস্তিবর্ষ বা হাতিবাহিনীর ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে। এটা হলো সুরা ফিলে বর্ণিত ইয়ামেনের বাদশাহ আবরাহা কর্তৃক কাবাঘর ধ্বংস করার অভিযানের বছরের কথা। বেশির ভাগ সিরাত-রচয়িতার অভিমত অনুযায়ী, এ ঘটনা রাসূল (ﷺ) এর জন্মের ৫০ অথবা ৫৫ দিন আগে ঘটেছিল।
(৭) সিরাতে মুগলতাই: ৫।
(৮) দুরুসুত তারিখিল ইসলামি: ১৪।
(৯) এ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা রয়েছে, তবে ইবনু আসাকির এ বর্ণনাটি সঠিক বলেছেন।
(১০) মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাকের সূত্রে তারিখু ইবনি আসাকির: ১/১৯-২০। (আদম আ. থেকে রাসূল (ﷺ) পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান-সংক্রান্ত যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, এই বর্ণনার নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র নেই। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে ইমাম ইবনু হাজমের আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল গ্রন্থ দেখতে পারেন।- অনুবাদক।)
(১১) এ বিষয়ে সবাই একমত যে, রাসূল (ﷺ) এর জন্ম রবিউল আউয়ালের সোমবার দিনে হয়েছিল; কিন্তু কোন তারিখে, সেটা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে জন্মতারিখ নিয়ে চারটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে-২, ৮, ১০ ও ১২ রবিউল আউয়াল। হাফিজ মুগলতাই রাহ, ২ তারিখকে গ্রহণ করে অন্যগুলোকে দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন। তবে প্রসিদ্ধ হচ্ছে ১২ তারিখের বর্ণনা। ইবনু ইসহাকও এ তারিখ গ্রহণ করেছেন। ইবনু হাজার আসকালানি রাহ, ১২ তারিখের বর্ণনার ওপর সবাই একমত বলে দাবি করেছেন। এমনকি আল্লামা ইবনুল আসির তাঁর আল কামিল ফিত তারিখ গ্রন্থে এ তারিখই গ্রহণ করেছেন। গবেষক মাহমুদ পাশা মিসরি জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে ৯ তারিখ গ্রহণ করেছেন। এটি সবার মতের বিপরীত এবং সূত্রবিহীন উক্তি। যেহেতু চাঁদ উদয়ের স্থান বিভিন্ন, তাই গণনার ওপর এতটুকু বিশ্বাস ও নির্ভরতা জন্মায় না যে, এর ওপর ভিত্তি করে সবার বিরোধিতা করা যাবে।
(১২) আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া।
(১৩) সিরাতে মুগলতাই: ৫। (রাসূল (ﷺ) এর জন্ম-সংক্রান্ত এ ধরনের বিভিন্ন ঘটনা সিরাত ও ইতিহাসের অনেক গ্রন্থে রয়েছে; কিন্তু এগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ তাঁদের রচনায় এসব বর্ণনা উল্লেখ করলেও অনেকে বর্ণনার মান যাচাই করেননি। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মোল্লা আলি কারি রাহ.-এর আল-মাসনু ফি মারিফাতিল হাদিসিল মাওজু গ্রন্থের ভূমিকায় শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর আলোচনাটি দেখে নিতে পারেন। এ ছাড়া আল্লামা সাফিউর রাহমান মুবারকপুরি রাহ.-এর আর-রাহিকুল মাখতুমেও এ সংক্রান্ত আলোচনা দেখতে পারেন।- অনুবাদক।)
(১৪) ইবনু হাজার আসকালানি রাহ, বলেন, ইবনু হিব্বান ও হাকিম এ বর্ণনাকে সহিহ বলেছেন। আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, নাশরুত তিব: ১/১৮।
(১৫) আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া।
লেখা :
বই - সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া ﷺ ; পৃষ্ঠা : ১৮-২১
লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
অনুবাদক : ইলিয়াস মশহুদ
চলবে ইনশাআল্লাহ ...
#সীরাত_সিরিজ
#সীরাহ