18/09/2022
ফেসবুকে কাউরে উপদেশ দেই না, তবে দুইটা কথা কইবার চাই!
নিজের জীবনরে এমনভাবে গড়ে তোলেন, যাতে ফাইভ স্টার হোটেলে থাকার অভ্যাস ও থাকে আবার রেলস্টেশনে ঘুমানোর অভ্যাস ও থাকে৷ ব্লেজার, স্যুট, টাই পরে মানুষের সামনে স্টেজে দাঁড়াইয়া ইংরেজীতে বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাস থাকে আবার লুঙ্গীটা কাছা মাইরা কাদা পানিতে নাইমা ধান চাষ করা, মাছ ধরার অভ্যাস ও থাকে।
জীবনকে উপভোগ করতে চাইলে প্রচুর ঘুরেন প্রচুর। বেশি বেশি মানুষের সাথে মিশেন। আমি ইন্ট্রোভার্ট কারো সাথে মিশতে পারি না এইসব টার্ম নিয়ে ঘরের ভিতর সারাদিন ভিডিও গেমস খেললে আর প্রেম করলে ডিপ্রেশন আপনার হবে না তো কার হবে?
প্রেম করেন, প্রেম করতে কোন মানা নাই, জীবনে দুই একটা চরম ছ্যাকা না খাইলে অনেক কিছুর অভিজ্ঞতা হয় না। কিন্তু খেয়াল রাখেন প্রেম পিরিতি কইরা যেনো আপনার দুনিয়া শুধু একটা মানুষরে ঘিরে না হয়। যখন একজনরে ঘিরে পৃথিবী আবদ্ধ কইরা ফালাইবেন তখন সে চইল্যা গেলে চোখে সইর্ষা ফুল দেখে আন্ধার লাগবে। মরার চিন্তা ঘুরবো খালি মাথায় কারণ আপনার মাথায় তো আর কিছু নাই। লাইফ টাইম এডভাইস, কোন ছেলে বা মেয়ের জন্যে জীবনটা নষ্ট কইরেন না, জীবনটা বড় দামি।
মরতে তো হইবোই, এমনেই একদিন মইরা যাবেন, মরার আগে পৃথিবীটারে দেখেন, দেশটারে দেখেন, অনেক কিছু শিখার চেষ্টা করেন।
ট্রাভেল কইরা কিছু শিখার ইচ্ছা থাকলে সলো ট্রাভেল করেন, একা বেশি ভয় লাগলে ২-৩ জন লইয়া যান। বিভিন্ন গ্রুপে ট্রাভেল করতে গেলে কিছু শিখা হয় না ঐটা হইছে এনজয়মেন্ট। এক জায়গায় ঘুরতে গেলেন একটা সেলফি তুললেন চলে আসলেন সেইটারে ট্রাভেল বলে না। ঘুরতে যাইয়া আপনার গায়ে একটু ধূলাবালি, মাটি, কাদা, পানি লাগলো না, পরিশ্রম হইলো না ঐটারে ট্রাভেল কয় না।
ট্রাভেলিং করবেন জীবনের অর্থ খুঁজতে, মাটির সাথে মিশতে, প্রকৃতির কোলে ঘুমোতে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস, খাদ্যাভাস ও মানুষকে জানতে। আপনার বন্ধু বানাইবেন ট্রাক ড্রাইভার, বাসের হেল্পার, ট্রলারের মাঝি, কাঠমিস্ত্রি, সিএনজি ড্রাইভার, কৃষক, চা-ওয়ালা, আদিবাসী কারবারি, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, আরো আরো অজস্র আগন্তুককে। বয়স, শিক্ষা, স্ট্যাটাস বাদ দিয়া এদের সাথে দুইটা দিন ঘুরেন, থাকেন, ঘুমান, খান। দেখবেন জীবন কারে কয়! এই জীবন আপনি বারবার চাইবেন ট্রাস্ট মি বার বার। আপনার আর এই সুন্দর দুনিয়া ছাইড়া মরতে ইচ্ছা করবো না।
প্যারেন্টস ঘুরতে যাইতে দেয় না, সন্ধ্যার আগে বাসায় ঢুকতে বলে, ঘুরতে যাওয়ার টাকা নাই, মেয়ে বলে ঘুরতে পারি না!
এগুলা হইছে একেকটা উছিলা, এইসব ফালতু লজিক দেখায়েন না আল্লাহর ওয়াস্তে। আপনার বাপ-মা ঘুরতে না দিলে সেইটা আপনার ব্যর্থতা। আপনি নিজেকে আপনার বাপ-মার কাছে সেভাবে রিপ্রেজেন্ট করতে পারেন নাই, আপনি ঘুরে যে কিছু জ্ঞান অর্জন করবেন সেটা বুঝাইতে পারেন নাই। আপনি যে যথেষ্ট ম্যাচিউরড হইছেন এটা শো করতে পারেন নাই। দরকারে প্যারেন্টসের হাত-পা ধইরা বইসা থাকেন। প্রথম প্রথম আমারেও ঘুরতে যাইতে দিতো না। কিন্তু এখন আমার সব মিশনে আমাকে এপ্রিশিয়েট করে।
দেশের ভিতর ট্রাভেলিং করতে আহামরি টাকা লাগে না। এখন আপনে চড়বেন এসি গাড়িতে, খাইবেন উন্নতমানের হোটেলে, থাকবেন বিশাল কটেজ বা রিসোর্টে। টাকা তো আপনার লাগবেই। আপনে তো আর ট্রাভেলিংয়ে যান নাই, আরাম আয়েশ করতে গেছেন, বন্ধুদের সাথে ফূর্তি করতে গেছেন, শুধু ছবি তুলতে গেছেন।
আমি অনেক মেয়ে ট্রাভেলারদের চিনি যারা ৬৪ জেলা ঘুরে বড় বড় প্রজেক্ট নামাইসে, সেসবের জন্যে এওয়ার্ড ও পাইছে। অনেকে এখনো ৪০-৫০ জেলা ঘুরায় রানিং আছে। ডিয়ার, ইউর জেন্ডার ডাজেন্ট মেইক ইউ উইক৷ ইউ হেভ টু আর্ন ইট। আমি অনেক ট্রাভেলার চিনি যারা সামান্য কিছু টাকা দিয়া ট্রাভেল করে। পাঁয়ে হেটে মাত্র ৮-১০ হাজার টাকায় ৬৪ জেলা ঘুরে ফেলছে এমন লোক ও আছে। আপনাকে ঘর ছাইড়া বাহির হইতে হবে। বাইরের দুনিয়ায় কিভাবে ফাইট করে চলতে হয় সেটা শিখতে হবে। আমাদের কারো বাপ মা এত কোটিপতি না। বেশিরভাগেই মিডল ক্লাস ফ্যামিলির ছেলে-মেয়ে।
অনেকেই মনে করে আমার অনেক অনেক টাকা, যা দিয়ে ৬৪ জেলা ঘুরছি, কিন্তু না ভাই না। আমি এখনো এক কাপ চা খাইতে গেলে ৫ টাকার বেশি ৬ টাকা নিলে খাই না। ২ মাস ধরে জুতা সেলাইয়া পইরা ঘুরি, গুলিস্তানের লোকাল মার্কেট থেকে জুতা কিনি, নিউমার্কেটের দুই তালায় গরমে সিদ্ধ হইয়া ঘুইরা ঘুইরা কম দামে শার্ট প্যান্ট কিনি। টাকা বাঁচাইতে লোকাল বাসে চড়ি, বাংলা হোটেলে শুধু ডিম-ডাল দিয়া ভাত খাই, মেইল ট্রেনে চড়ি, লঞ্চের চিপায়চুপায় থাকি। আমি কোন ট্রাভেলার না আমি মুসাফির, ভবঘুরে, যাযাবর যেখানে রাইত সেখানেই কাইত৷ মুসাফির নামক জীবনের আনন্দই অন্যরকম...
তার মানে কি আমার বাপের টাকা পয়সা একেবারেই নাই? না ভাই না। আমারে খাইতে, শপিং করতে, পড়াশুনা করতে যেই টাকা দেয় সেগুলা সব ঘুরার জন্যে সেভিং করি। এক জুতা কিনতে আমারে ৩ বার টাকা দিছে ৩ বারেই আমি দেশ ঘুইরা ঘুইরা ভাংছি, ঈদের সালামীর টাকা দিয়া ঘুরছি। আমারে এইজন্যে বাসা থেকে নগদ ক্যাশ দিতে চায় না ডাইরেক্ট জামাকাপড় কিনে দেয়৷ ১২০ টাকা খরচা হইবো বইলা আমি ৮-৯ মাস পর পর চুল কাটি। বড় চুল গোফ বইলা বাপ মা আমারে নিয়া গ্রামে যাইতে চায় না। আমারে এক বান্ধবী একবার আমারে বলছিলো আমি বাথরুমের স্যান্ডেল পইরা ক্যাম্পাসে কেন আসছি। আমি লজ্জা পাই নাই ভাই, এইসবে লজ্জা পাইতে নাই। এখন আমার নাম দেশের নিউজপেপারে আছে আমার বান্ধবীর নাম কিন্তু নাই।
জীবনে অনেক বড় হতে হলে, আপনাকে আগে অনেক ছোট হতে হবে...
আমি জীবনে বড় বড় অফিসার, বিসিএস ক্যাডার, ক্যাপ্টেন, মেজর, এসপি, নামকরা ডাক্তার, সাংবাদিক, কোটিপতি বিজনেসম্যানের সাথেও মিশছি, থাকছি, খাইছি আবার ৬৪ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে থাকা কৃষক, দিনমজুর, বাসের হেল্পার, চাওয়ালা, সিএনজি ড্রাইভার, মাঝি, জেলে এদের বন্ধু বানাইছি, তাদের বাসায় ডাল-ভাত খাইসি। ৬৪ জেলার এমন কোন জেলা নাই যেখানে একটা অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত লোক আমার পরিচিত নাই৷ তারা এখনো প্রায়শই আমারে ফোন দেয়, জীবনের গল্প বলে দুঃখ বলে, সুখের কথা বলে। আমি শুনি আর হাসি, এটাই যে জীবন।
আমাদের সমাজের আশেপাশের কিছু লোকজন একেকটা নিম্নরুচিসম্পন্ন মানুষজন। বেশিরভাগেই "তুই এটা পারবি না" বলে আপনারে ডিমোটিভেট করবে।
ইন্টারে একটা সংগঠন করতাম। বন্যায় ত্রাণ দিতে ঢাকার বাইরে যাবে আমারে বলছিলো আমি ছোট তাই আমি যেতে পারবো না।
তার ৩ বছরের মাথায় আমি ৬৪ জেলা ঘুরে ফেলছি। এখন সেই সংগঠনের সব মেম্বারের যত নেটওয়ার্ক আছে ৬৪ জেলায় আমার তার চেয়ে বেশি নেটওয়ার্ক আছে আই ক্যান বেট। আগামী ২ বছরে বাংলাদেশের ৪৯২ উপজেলায় নেটওয়ার্ক তৈরী করব ইনশাআল্লাহ।
ইন্টারে ফেল করার পর দুলাভাই বলছিলো আমারে দিয়া পড়ালেখা হবে না। তার পরের দেড় বছরের মাথায় ৪ টা পাব্লিক ভার্সিটিতে ৬ টা সিট দখল করছি৷
পারবো না মানে পারবো না আবার কোন জিনিষ? "আমি পারি না" এই টার্মরে যাদুঘরে তুলে রাখেন৷
এখনকার সময়ে তো সাজেক, কক্সবাজার, সিলেট যাইয়াই একেকজন ট্রাভেল গ্রুপের এডমিন হইয়া বিশাল ট্রাভেলার হইয়া যায়। ৬৪ জেলার প্রান্তিক পর্য্যায়ে ঘুরে, ৩০০ কি.মি. হাইকিং করেও নিজেরে এখনো ট্রাভেলার বলতে লজ্জা লাগে৷ কারণ এখনো সত্যিকারের ট্রাভেলারের পর্যায়ে যাইতে পারি নাই। ট্রাভেলার হইতে অনেক গুণ লাগে, যা আমার মধ্যে নাই। অনেক বিনয়ী, নম্র, হেল্পফুল মাইন্ডের হতে হয়, অহংকারী ও ঈর্ষাপরায়ণ মানুষ কখনো ট্রাভেলার হতে পারে না।
এমন মানুষ ও আছে, নিজেরে দাবী করে ট্রাভেলার আবার বিভিন্ন দিকে র্যুট প্লান সেল করে বিগেনার ট্রাভেলারদের কাছে, হাস্যকর৷ ট্রাভেল করবেন নিজে শিখতে এবং অপরকে শিখাতে, মানুষকে ভালবাসতে সেলিব্রেটি হইতে না, শুধু টাকা কামাইতে না। আমাকে যারা ফলো করেন আপনারা কেউ আমার ফলোয়ার না সবাই ভাই-ব্রাদার লিস্ট ফুল বলে এড করতে পারি না। বহু ট্রাভেলার দেখছি একটু ঘুরলেই আর কারো মেসেজ রিপ্লাই দিতে চায় না। নিজেরে বিশাল হেডম ভাবে। লোকগুলার সাথে প্রাণ খুইলা কথা কন, আড্ডা দেন, ভালবাসেন দেখবেন আপনারাও মানুষের ভালবাসা পাইবেন। জীবনের মূল্য বাড়বে। নয়তো সামনে সম্মান দেখাইয়া পিছনে মানুষের গালি খাইবেন।
প্রচুর ট্রাভেলিং করলে, ভিন্ন মত, ধর্ম, বর্ণের মানুষের সাথে মিশলে ব্যক্তিজীবনেও অনেক সুবিধা আছে। অন্তত কিছু মানুষ আপনাকে আলাদা চোখে সম্মান করবে। অহংকার করতেছি না তবে একটা কথা বলতেই হয়, ক্যাম্পাসের স্যার একটা ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের জন্যে ফিল্ডওয়ার্ক করতে আমারে ডাকছে, কিন্তু ডিপার্টমেন্টের অনেক টপার আছে, অনেক ভাল ভাল ছাত্র আছে কিন্তু তাদের ডাকে নাই। কারণ স্যার শুধু এইটুকু জানে আমার ট্রাভেলিং করার অভ্যেস আছে, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে যেটা এখানে কাজে লাগাতে পারবো। এরপর এক পরিবেশবিদ বড় ভাই ডাকছে সুন্দরবনে তার সাথে একটা রিসার্চের কাজে যাইতে। কারণ একটাই এই সব পরিবেশেই আমার হাতেখড়ি হইছে।
জীবন অনেক সুন্দর, এই জীবনরে হারায়ে যাইতে দিয়েন না। পুরো জীবনটা দিয়ে মানুষের কল্যাণে, মানুষকে ভালবেসে, মানুষের থেকে কিছু শিখতে বেরিয়ে যান। আজই বের হয়ে পরুন। ঘুরেন আর শিখেন, পরিশ্রম করেন, চিল করেন আনন্দ করেন, মুসাফির হইয়া যান, এইটার ফিডব্যাক একদিন না একদিন পাইবেন। জীবন তো একটা কি আছে জীবনে।
প্যারা নাই জাস্ট চিল...
🖊 - B.d. Rayhan