19/08/2026
আজ ১৯ আগস্ট। জহির রায়হানের জন্মদিন।
ফেনীর মাজুপুর গ্রামের এক ছেলে, নাম ছিল মোহাম্মদ জহিরউল্লাহ। কে জানতো, এই ছেলেই একদিন হয়ে উঠবে বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সাহসী কণ্ঠস্বরগুলোর একটা। ছোটবেলা কেটেছে কলকাতায়, দেশভাগের পর ফিরে আসেন ফেনীতে। সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু, লেখালেখি দিয়ে শুরু, কিন্তু তার মনের ভেতর যে আগুনটা ছিল, সেটা খুঁজে পেয়েছিল ক্যামেরার ভাষায়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন, আমতলার সেই ঐতিহাসিক সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেই আন্দোলনের আগুন তার বুকে সারাজীবন জ্বলেছিল, আর সেটাই পরে রূপ নিয়েছিল তার সবচেয়ে বড় কাজে।
১৯৬১ সালে "কখনো আসেনি" দিয়ে পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু। তারপর একের পর এক ইতিহাস গড়েছেন। ১৯৬৪ সালে বানিয়েছেন "সঙ্গম", তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি। পরের বছরই "বাহানা" দিয়ে প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি নির্মাণ করেন। "কাঁচের দেয়াল" ছবিটা পাকিস্তান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ১১টা পুরস্কার জিতে নেয়। "বেহুলা", "আনোয়ারা" সহ একের পর এক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলা সিনেমা কতটা গভীর হতে পারে, কতটা সাহসী হতে পারে।
কিন্তু ১৯৭০ সালের "জীবন থেকে নেয়া", এটা শুধু একটা চলচ্চিত্র ছিল না, এটা ছিল প্রতিবাদের ভাষা। একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পের আড়ালে তিনি তুলে ধরেছিলেন আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে পুরো একটা জাতির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা যন্ত্রণা। ভাষা আন্দোলনের আবেগ, রাজনৈতিক দমনপীড়নের কষ্ট, সব একসাথে বুনে দিয়েছিলেন একটা পর্দায়।
তারপর এলো ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই তিনি নিজের অসমাপ্ত ইংরেজি ছবি "লেট দেয়ার বি লাইট" ফেলে রেখে কলকাতায় চলে যান। সেখানে বসে, প্রায় কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই, এক মাসেরও কম সময়ে বানান "স্টপ জেনোসাইড"। মাত্র বিশ মিনিটের একটা তথ্যচিত্র, যেটা সারা পৃথিবীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা। এই ছবির প্রদর্শনী থেকে যা টাকা এসেছিল, পুরোটাই তিনি দিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিলে। নিজে তখন উদ্বাস্তু, আর্থিক কষ্টে জর্জরিত।
দেশ স্বাধীন হলো। তিনি ফিরলেন ঢাকায়। কিন্তু তার লড়াই তখনও শেষ হয়নি। বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনে কারা জড়িত, সেই সত্য উদঘাটনে নেমে পড়লেন। আর তখনই, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, নিজের ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে মিরপুরে যান। আর কখনও ফেরেননি।
আজও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ৫৪ বছর পার হয়ে গেছে। একজন মানুষ, যিনি গোটা জাতির গল্প বলার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তার নিজের গল্পের শেষটাই আমরা কখনো জানতে পারলাম না।
মাত্র ৩৬ বছরের জীবন। অথচ কতটা রেখে গেছেন, উপন্যাস, গল্প, বারোটা ছবি, একটা জাতির আত্মপরিচয়ের দলিল। জহির রায়হান প্রমাণ করে গেছেন, শিল্প শুধু বিনোদন নয়, শিল্প হতে পারে সত্যের সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর।
জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করছি এই কিংবদন্তিকে। আপনার ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখা বাংলাদেশ, আজও আমাদের মধ্যে জীবন্ত। 🕯️🎬