20/01/2026
স্থপতি-শিক্ষক অধ্যাপক সামসুল ওয়ারেসের আশিতম জন্মদিন উপলক্ষ্যে
১৯৪৫ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন স্থপতি সামসুল ওয়ারেস। তিনি তদানীন্তন ইস্ট পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ১৯৬৮ সালে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তিনিবাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যচর্চার পথিকৃৎ স্থাপত্যাচার্য মাজহারুল ইসলামের উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান ‘বাস্তুকলাবিদ’-এ যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়।
১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীতে তিনি এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে অধ্যাপনা করেন। তিনি দুইবার বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালে শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট ফর এডুকেশন’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৭ সালে তিনি একই প্রতিষ্ঠান থেকে আইএবি স্বর্ণপদক লাভ করেন।
পেশাজীবী স্থপতি হিসেবেও সামসুল ওয়ারেস বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশা প্রণয়ন করেছেন,
বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। শাহবাগের শিশু পার্ক, সাভারে লাইভস্টক রিসার্চ ইন্সটিটিউটের আবাসন, বহু আবাসিক এবং এপার্টমেন্ট ভবনের নকশায় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
তাঁর বেড়ে ওঠা ষাটের দশকে—একটি সময়, যখন শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন মানুষকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করত। আধুনিক, নির্মেদ, যুক্তিনিষ্ঠ এবং এদেশের জলবায়ু ও প্রকৃতিবান্ধব স্থাপত্যচিন্তার যে বোধ তাঁর মধ্যে বিকশিত হয়েছিল, তার উৎস যে স্থাপত্যাচার্য মাজহারুল ইসলামের ভাবনায় প্রোথিত—তা সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশের স্থাপত্যশিক্ষা ও চর্চায় তাঁর ৩১ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ভূমিকা অবিসংবাদিত। প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কেবল স্থাপত্যচর্চার কৌশলই রপ্ত করাননি; একই সঙ্গে সমাজ গঠনে স্থাপত্যের ভূমিকা, স্থাপত্যের ইতিহাস, দর্শন ও নান্দনিকতার ব্যাকরণ সম্পর্কেও তাঁদের সচেতন করে তুলেছেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর অনন্য দক্ষতা ছিল—শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা, স্থাপত্য প্রকল্পের ক্ষুরধার বিশ্লেষণ করা এবং একটি প্রকল্পের ধারণা বা কনসেপ্ট থেকে শুরু করে নির্মাণের সূক্ষ্ম ডিটেইল পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গতার পথ দেখানো।
নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভ পর্যন্ত বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সুরম্য ভবনের স্টুডিওতে দিন-রাত জুড়ে চলত স্থাপত্যশিক্ষার সাধনা। তাঁর পাঠদান ক্লাসঘরের সময়সীমায় আবদ্ধ ছিল না; গভীর রাত পর্যন্ত তাঁকে পাওয়া যেত অক্লান্তভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে।
স্থাপত্য, পরিবেশ, নগরায়ন, শিল্প সমালোচনা বিষয়ে বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষায় তিনি লিখেছেন দেড় শতাধিক নিবন্ধ। শিল্প সমালোচক হিসেবে তিনি সুপরিচিত।
একজন শিক্ষকের সেরা প্রাপ্তি যদি শিক্ষার্থীদের সাফল্য হয়ে থাকে, তবে অধ্যাপক সামসুল ওয়ারেস নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবানদের শীর্ষে। আজ বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চার সুনাম বিশ্বজুড়ে—খুব কম দেশের স্থপতিদের কাজ এভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
তিনি এমন এক সময়ে বেড়ে উঠেছেন, যখন বড় মাপের আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করাই ছিল স্বাভাবিক। সেই সময়ের স্থাপত্য ও অন্যান্য ডিসিপ্লিনের লক্ষ্য ছিল মূলত টেকনোক্র্যাট তৈরি করা; রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো ভাবত অনেকটাই টপ-ডাউন পদ্ধতিতে। পঞ্চাশের দশকে আয়ন র্যান্ডের উপন্যাস দ্য ফাউন্টেনহেড-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র হাওয়ার্ড রোয়ার্ক ছিল সেই সময়ের বহু স্থপতির আরাধ্য এক প্রতীক।
সময়ের সাথে সাথে সে বাস্তবতা বদলেছে। স্থাপত্য আজ অনেকাংশেই বাজার অর্থনীতির ত্রিমাত্রিক রূপকল্পে পরিণত হয়েছে; জনবান্ধব জনপদের সঙ্গে স্থাপত্যের সংযোগ দুর্বল হয়েছে। ঢাকার বসবাসযোগ্যতার সংকট তারই নির্মম প্রমাণ।
তবুও অধ্যাপক সামসুল ওয়ারেসের অনন্য অনুপ্রেরণা ও শিক্ষাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজ ও সভ্যতা পরিবর্তনশীল হলেও স্থায়ী থাকে কেবল উৎকর্ষের সন্ধান, যে সন্ধানের পথে তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন, উপস্থিতির প্রাবল্যে সবল—একাধারে পেশাজীবী, সংগঠক ও শিক্ষক—এমন বিরল ব্যক্তিত্বের বিকল্প নেই।
ধন্যবাদ, ওয়ারেস স্যার!
লেখা: সুজাউল ইসলাম খান
স্থপতি ও শিক্ষক
ছবি: আসিফ সালমান