28/04/2017
ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের করণীয়
প্রতিবছরই বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যায় ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের ঘূর্ণিঝড়। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রলয়ংকরী এসব ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের। বিজ্ঞানের ভাষায়, ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, প্রচন্ড ঘূর্ণি বাতাস ও বৃষ্টি সম্বলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে তাকেই ঘূর্ণিঝড় বলে। এই ঝড়ের একটি লক্ষণীয় দিক হচ্ছে – এটি যখন সৃষ্টি হয় তখন থেকে এটি গোল বাতাসের কুন্ডলী পাকিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। ঘুরতে ঘুরতে এটি অগ্রসর হয় বলে এর নামকরণ করা হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত সহায়-সম্বল হীনেরা পুনরায় ঘুরে দাড়াতে পারলেও প্রিয়জন হারানো মানুষগুলো ফিরে পায়না তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে। তবে আমরা যদি একটু সচেতন হই তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুলাংশে হ্রাস পেতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত কোনো পূর্বাভাস পাওয়া গেলে সাথে সাথে উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন ধরনের বিপদ সংকেত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন –
দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত নম্বর-১ (সমুদ্রে প্রবাহিত বাতাস ঝড়ে রুপান্তর হচ্ছে।)
দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত নম্বর-২ (সমুদ্রে ঝড় উঠেছে)
স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ (বন্দর দমকা হাওয়ার সম্মুখীন হতে পারে)
স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৪ (বন্দরে ঝড় আঘাত আনার সম্ভাবনা রয়েছে)
বিপদ সংকেত নম্বর-৫ (বন্দরে ঝড়ো হ্ওয়া বইছে এবং ঝড় উপকুলের বন্দর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে)
বিপদ সংকেত নম্বর-৬ (বন্দর সমূহতে ছোট বা মাঝারি হাওয়া বিরাজ করছে এবং সমুদ্র বন্দর দিয়ে ঝড় অতিক্রম করার আশঙ্কা করা হচ্ছে)
বিপদ সংকেত নম্বর-৭ (বন্দরের উপরে বা নিকটে প্রত্যাশিত ছোট বা মাঝারি হাওয়ার তীব্রতা বিরাজ করা শুরু করেছে)
মহাবিপদ সংকেত নম্বর-৮ (উপকুলের বন্দর সমূহতে তীব্র ঝড় আঘাত হানতে যাচ্ছে)
মহাবিপদ সংকেত নম্বর-৯ (তীব্র ঝড় হাওয়া উপকুলের বন্দর গুলোতে বইতে শুরু করেছে)
মহাবিপদ সংকেত নম্বর-১০ (বন্দরের উপর বা নিকট দিয়ে অতিক্রমকারী তীব্র গতি সম্পন্ন ঝড়ের কারণে বন্দরে তীব্র ঝড়হাওয়া বিরাজ করছে)
মহাবিপদ সংকেত নম্বর-১১ (আবহাওয়া সতর্ক কেন্দ্রের সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হ্ওয়ার ফলে প্রবল ঘুর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে)
ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে যদি আমরা আগে থেকেই কিছু বিষয়ে ভালভাবে নজর দেই। আর তা হলো :
১. বসত বাড়ির আশেপাশে এবং রাস্তায় নারিকেল গাছ, কলাগাছ, বাঁশ, তাল, কড়ই ও অন্যান্য শক্ত গাছপালা লাগাতে হবে। এসব গাছ ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের বেগ কমাতে সাহায্য করে।
২. অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে শক্ত করে ঘর তৈরি করতে হবে। পাকা ভিত্তির ওপর লোহার বা কাঠের পিলার এবং ফ্রেম দিয়ে তার উপর ছাউনি দিতে হবে। ছাউনিতে টিন ব্যবহার না করাই ভালো। এতে করে ঝড়ের সময় টিন উড়ে মানুষ ও গবাদি পশু হতাহতের সম্ভাবনা থাকে।
৩. ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পেলে দেরী না করে সাথে সাথে মহিলা ও শিশুদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। গবাদি পশুগুলোকে যথাসম্ভব উচু জায়গায় কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
৪. নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার সময় অবশ্যই প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী যেমন—ডাল, চাল, দিয়াশলাই, শুকনো কাঠ, পানি ফিটকিরি, চিনি, নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধ, বইপত্র, ব্যান্ডেজ, তুলা, ওরস্যালাইন ইত্যাদি পলিথিন ব্যাগে ভরে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করুন।
৫.টিউবওয়েলের মাথা খুলে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করুন এবং টিউবওয়েলের খোলা মুখ পলিথিনদিয়ে ভালভাবে আটকে রাখুন হবে যাতে করে ময়লা বা লবণাক্ত পানি টিউবওয়েলের মধ্যে প্রবেশ না করতে পারে।
তবে সর্বোপরি যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে তাহলো অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন না হয়ে সাহসিকতারসাথে আসন্ন বিপদ মোকাবেলা করার মানসিকতা তৈরী করা।
ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে ঝড়ের প্রভাব শেষ হয়ে গেছে মনে করে তড়িঘড়ি না করে বরং ভালো করেজেনেশুনে ধীরে সুস্থে বসত বাড়ীতে ফিরতে হবে।ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে শিশুদেরকে বাইরে বেরনা করাই ভালো। কারণ, এসময় বাতাসে বিভিন্ন রোগের জীবাণু মিশে থাকে। পুকুর বা নদীর পানি অবশ্যই ফুটিয়ে পান করতে হবে। ঘূর্ণিঝড় শেষ হয়ে গেলে সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবেতা হলো ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্তদের উদ্ধারের চেষ্টা করা।
সার্বক্ষনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য রাস্তার উপর পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ত্রাণের প্রতি নির্ভরতা যতটা সম্ভব কমিয়ে নিজে নিজেই ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করাই সবচেয়ে উত্তম। সর্বোপরি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবকে ভুলিয়ে দিয়ে নতুন করে ঘুরে দাড়াতে সাহায্য করে অনেকখানি।