04/06/2026
বনলতা এক্সপ্রেস ;
এই গল্পটার সঙ্গে আমার পরিচয় অবশ্য অনেক পুরোনো।
২০১৫ সালের দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে কিছুক্ষণ উপন্যাসটা পড়েছিলাম। তখন উপন্যাস হাতে দেখলেই আম্মার রাগ উঠত। তাঁর কাছে এগুলো ছিল "সময় নষ্ট করার জিনিস"। পাঠ্যবই ফেলে উপন্যাসের বই পড়ছি এটাই ছিল সবচেয়ে বড় অপরাধ। তাই বইটা পড়তাম চোরের মতো,আড়ালে-আবডালে।
আজ এত বছর পরও মনে আছে, চরিত্রগুলোর মধ্যে আমি নিজের একটা ছায়া খুঁজে পেতাম।
কখনো নিজেকে চিত্রা ভাবতাম। মনে হতো, আহা😉 কোনো খোঁজাখুঁজি / প্রেম-ভালোবাসার ঝামেলা ছাড়াই একদিন হয়তো একজন সুদর্শন ডাক্তার যুবক এসে আমাকে বিয়ে করবে।😄
আবার কখনো আফিয়ার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভাবতাম,আমি এমন এক স্ত্রী হব,যে স্বামীর চেয়ে একটু বেশি বোঝে,একটু বেশি চিন্তা করে, আর একটু বেশিই ভালোবাসে। এমন ভালোবাসা, যা মাঝে মাঝে খিটখিটে রাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। যে স্বামীকে চোখের আড়াল হতে দিতে চায় না, যতই সে দূরে ছুটে বেড়াক না কেন। তখন এসব কল্পনা করতে করতে নিজেই হাসতাম।😂
সিনেমা দেখতে বসে বারবার সেই ছোটবেলার আমিটাকে মনে পড়ছিল।
উপন্যাস পড়ার সময় চরিত্রগুলোকে আমি নিজের কল্পনার রঙে এঁকেছিলাম। তাদের মুখ, তাদের কণ্ঠ, তাদের হাসি-কান্না সবকিছু ছিল আমার নিজের তৈরি। তাই হয়তো বই পড়ার আনন্দটা একটু বেশি ছিল।
কিন্তু সিনেমাটিও চরিত্রগুলোর আবেগকে যথাসাধ্য সম্মান করেছে। পুরো টিমের আন্তরিকতা অনুভব করা যায়।
তবে সিনেমার শেষদিকে এসে আমি আর গল্প দেখছিলাম না, আমি অনুভব করছিলাম।
আজিজ চরিত্রটি যখন ট্রেনে বসে তার শেষ সংলাপে বলছিল:
"আল্লাহ আমাকে মেয়ের শাসন বেশি দিন দিল না..."
ঠিক তখন বুকের ভেতর কোথাও একটা হাহাকার জমে উঠেছিল। চোখের কোনে পানি আসলো...
বাবা-মেয়ের সম্পর্কটা পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ অথচ গভীর সম্পর্কগুলোর একটি। অনেক বাবাই হয়তো মুখে খুব বেশি ভালোবাসি বলেন না, কিন্তু মেয়ের সামান্য কষ্টেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন। আর যারা বাবার খুব আদরের মেয়ে, তারা এই দৃশ্যটা দেখে চোখের পানি আটকে রাখতে পারবে না।
সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল :
সন্তানকে জন্ম দিয়ে, বুকের ভেতর আগলে বড় করে, একদিন তার লাশ কাঁধে নেওয়ার কষ্ট বেশি?
নাকি সারাজীবন সন্তানহীনতার শূন্যতা বয়ে বেড়ানোর কষ্ট বেশি?
হয়তো এই প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই।
কিন্তু কিছু গল্প উত্তর দেওয়ার জন্য আসে না, কিছু গল্প আসে মানুষের ভেতরে প্রশ্ন জাগিয়ে দেওয়ার জন্য। কিছুক্ষণ উপন্যাসটা ও বনলতা এক্সপ্রেস মুভি ঠিক তেমনই একটি গল্প।
সিনেমা হল থেকে বের হয়ে আসার পরও গল্পটা মাথা ছেড়ে যায়নি। কিছু সংলাপ কানে বাজছিল, কিছু দৃশ্য চোখে ভাসছিল, আর কিছু অনুভূতি বুকের ভেতর নিঃশব্দে রয়ে গিয়েছিল।
যারা এখনো দেখেননি, সময় করে দেখে নিতে পারেন। পরিবার,বন্ধুদের সাথে বসে দেখার মতো একটি সিনেমা।
কারণ কিছু সিনেমা শুধু দেখা হয় না
অনুভব করা হয়।