08/10/2015
হঠাৎ একদিন। চৌরাস্তায় ভীড়ের মধ্যে লোকজনের চলাচলের পথের উপরেই ঘটনাটা ঘটল। আমি থেমে দাঁড়ালাম, চোখ পিটপিট করে তাকালাম। আর তারপর হঠাৎ করে কোনকিছুর মানেই আর বুঝতে পারলাম না। কিচ্ছু না। কোন বিষয়েই কোনকিছু না। মানুষজন, দুনিয়াদারি, কোনকিছুর পিছনেই আমি কোন কারন খুঁজে পাচ্ছিলাম নাঃ সবকিছুই অর্থহীণ আর উদ্ভট মনে হচ্ছিল। আমি হেসে উঠলাম। আমার কাছে যেটা আজব মনে হচ্ছিল, তা হল আমি ঐ মুহূর্তের আগে যে জিনিষটা উপলব্ধি করিনি। ঐ মুহূর্তের আগে পর্যন্ত আমি এতদিন সবকিছুই বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছিলামঃ ট্রাফিক লাইট, গাড়িঘোড়া, পোস্টার, ইউনিফর্ম, মনুমেন্ট, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে যেকোন বোধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সবকিছুই। মেনে নিয়েছিলাম যেন এসবের কোন প্রয়োজনীয়তা আছে, যেন কোন কার্যকারনের শৃঙ্খল এদের একসাথে বেঁধে রেখেছে।
তারপর আমার হাসি মুছে গেল। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে উঠল। লোকজনের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আমি হাত নাড়তে লাগলাম। “সবাই একটু দাঁড়ান!” চেঁচিয়ে উঠলাম, “কিছু একটা ভুল হচ্ছে!সবকিছুই ভুল হচ্ছে! আমরা উদ্ভটতম কাজকারবার করে যাচ্ছি। এটা সঠিক পথ হতে পারে না। এর শেষ কোথায়?”
লোকজন আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো, মেপে নিল। শুনতে উৎসুক। আমি সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিলাম। নিজেকে ব্যাখ্যা করতে,যে অন্তর্দৃষ্টির ঝলক আমাকে হঠাৎ করেই আলোকিত করে তুলেছে সেটি ভাগাভাগি করে নিতে উদ্গ্রীব আমি। অথচ... কিছুই বললাম না শেষ পর্যন্ত। কিছু বললাম না, কারন যে মুহূর্তে আমি হাত তুলেছি আর মুখ খুলেছি, সেই মুহূর্তেই আমার –দিব্যদৃষ্টি যাকে বলা যায় – বেমালুম গায়েব হয়ে গেল।... কিন্তু ততক্ষণে ঝোঁকের মাথায় মুখ দিয়ে ডাক দিয়ে ফেলেছি।
“তো?” লোকজন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি বলতে চান? সবকিছুই তো জায়গামত আছে। ঠিক মতই চলছে সব। সবকিছুই কার্যকারন সূত্রে অন্যকিছুর ফলাফল। সবকিছুই অন্য সবকিছুর সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। আমরা তো কিছুই ভুল বা উদ্ভট দেখছি না।”
আমি বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম ওখানে। কারন এখন আমিও দেখছি সবকিছুই আবার ঠিকঠাক মত চলছে, সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে – ট্রাফিক লাইট, মনুমেন্ট, ইউনিফর্ম, টাওয়ারব্লক, ভিক্ষুক, মিছিল। কিন্তু, এসবের কিছুই আমাকে শান্ত করতে পারল না, বরং যন্ত্রণা দিয়েই যেতে লাগল।
“আমি দুঃখিত,” বললাম আমি, “হয়তো আমারই ভুল হয়েছে। তখন আমার ওরকমই মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন সব ঠিক আছে। আমি দুঃখিত।” এরপর আমি পাব্লিকের অগ্নিদৃষ্টির সামনে থেকে কেটে পড়লাম।
এতকিছুর পরেও, আজও, যখনই (এবং এটা প্রায়ই হয়) আমার মনে হয় আমি কোনকিছু বুঝতে পারছি না, একটা আশা আপনা-আপনি মনে জেগে উঠে – হয়তো আবারও আমি আমার সেই তুরীয় মুহূর্তটা ফিরে পেতে যাচ্ছি। হয়তো আবারও একবার – যখন আমি কিছুই বুঝবো না, সেই অনন্য অন্য জ্ঞানে প্লাবিত হব – যা একদিন মুহূর্তের জন্য পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়েছিলাম।