06/08/2026
প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরই আমার স্বামী আমাকে ডিভোর্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
আমি অবাক হলাম না। জানতাম এটা হওয়ারই ছিল। ঝড়ের আগেই ঝড়ের পূর্বাভাস তো পাওয়া যায়। চারদিকে নীরব, থমথমে তারপর সব লন্ডভন্ড।
যে মেয়েটার সাথে ওর পরকীয়ার সম্পর্ক সেই মেয়েটাকে আমি চিনি।
দুই বছর আগে যেদিন আমার স্বামীর সাথে ধবধবে ফর্সা সেই মেয়েটার নগ্ন ছবি দেখেছিলাম আমার কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না তৎক্ষনাৎ।
আমার স্বামীর অতি গোপনীয়তা আমাকে আগেই যেন সতর্ক বাণী শুনিয়েছিল, যেকোনো দিন যেকোনো জিনিস আমাকে দেখতে হবে৷
আমি পেট পুরে ভাত খেলাম। ঘর ঝাড়ু দিলাম তারপর অল্প চোখে দেখা, পা ভাঙা শ্বাশুড়ির ঘরে ভাতের প্লেট নিয়ে গেলাম।
তার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, ঐ মেয়েটা কি এই বুড়ো মানুষটার যত্ন করবে? এই ঘরের যে নীল পর্দা এগুলোও আমার কেনা। ছাড়াছাড়ির পর এগুলো কি আমার সাথে দিয়ে দেবে?
আমার দোষে ঘরছাড়া হব নাকি জোর করে ঘর থেকে বের করে দিবে ও হিসেব করার আগে যে মেয়েটার দখলে সব চলে যাচ্ছে তাকে গিয়ে মিনতি করে বলতে ইচ্ছে করছিল, শোনো মেয়ে, এই ঘর থেকে আমাকে বিদেয় করে তোমার সুখ হবে?
এই যে হাড়ি -পাতিল,খুন্তি,বালতি, জগ, মগ সব আমার কেনা।
এই দেয়ালের প্রতিটি ইট আমার কথা জানে । মাকড়সার জাল আমি নিয়ম করে ঝাড়ি। ফুল গাছে পানি দেই৷ কবুতরগুলোকে খাবার দেই সময় করে। ওরা আমাকে ছাড়া থাকবে কী করে?
ভাতের প্লেট টেবিলে রেখে আমি শ্বাশুড়ির পায়ের কাছে বসলাম। পা দুটো স্পর্শ করলাম।
শ্বাশুড়ি বলে উঠলেন,কী হইছে গো মা?
আমার এতক্ষণ যাবৎ আটকে রাখা বিন্দু বিন্দু চোখের জল জলোছ্বাসের মত ফুলে ফেঁপে উঠলো। আমি হাউমাউ করে কেঁদে বললাম, আমার ঘর ভেসে গেছে মা৷
অল্প চোখে দেখা সরল মানুষটা আমার অত শক্ত কথার মানে বুঝলো না। সে পরামর্শ দিলো, জানালা আটকে দেও বউ। বৃষ্টির পানি ঢুকতে পারবে না।
আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বললাম,আমার জানালা চুরি হয়ে গেছে।
হ্যাঁ আমার সেই জানালা যে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে জোছনা দেখতাম। জানালার পাশে ছিল একটা হাসনাহেনা। ঘ্রাণে ম -ম করতো। সেই মানুষটাই আমাকে ছুঁয়ে বলতো, তুমি এই হাসনাহেনার মত।
আজ কোনো ঘ্রাণ নেই৷ হাসনাহেনার প্রাণ নেই৷ ছাদে দাঁড়িয়ে বিরহী হুতোমের মত পায়চায়ী করি। আমার ঘুম আসে না।
তীরবিদ্ধ পায়রার মত ছটফট করে ভাবি এখন কী করা উচিত ছাদ থেকে লাফ দিব নাকি ব্লেড দিয়ে শিরা কেটে ফেলব?
নয়নতারার গাছটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভাবি আমি যদি গাছ হতাম! মানুষ হলাম বলেই আমাদের এত দুঃসহ যন্ত্রণা! প্রচন্ড ভালোবাসতো যে মানুষটা সে কী করে এমন করলো? ও প্রশ্নের জবাব কার কাছে চাইব?
মুনীর চৌধুরী এজন্যই কি লিখেছিলেন, মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়। কারণে, অকারণে বদলায়।
আমার স্বামী বোধ হয় কারণে বদলে গেছে। তার এখন যশ-খ্যাতি। চাইলেই যেকোনো মেয়েকে সে পেতে পারে অতটুকু আস্থা তার ভেতরে জন্মেছে নিশ্চয়ই।
ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠে এক বছরের মেয়েটা। ওকে কোলে নেই।
আরেক হাতে পাঁচ বছরের ছেলেটার ঝলমলে চুলে হাত বুলাই। আর কিছুদিন পর এই চুলে হাত বুলানোর কেউ থাকবে না।
এই চুলের মুঠো ধরেই হয়ত ঐ মেয়েটা আমার বাচ্চা দুটোকে বের করে দিবে। সারাদিন ভিখিরির মত ঘুরে ঘুরেও ওরা দুটো ভাত পাবে না। মায়ের কবরের পাশে গিয়ে ভাত চাইবে।
নীরবে নীরবে সেই মেয়েটার সবকিছু জানার পরও আমি মামুনকে কিছুই বললাম না। ও ভাত খাওয়ার সময় আমি কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।
আমার ইচ্ছে করে আমি ওর পা জড়িয়ে বলি, তুমি ঐ মেয়েটাকে ছেড়ে দাও। আমি সব ক্ষমা করে দেব।
বলতে ইচ্ছে করে, আমি তোমার সব কথা শুনব। সন্ধ্যা বেলায় ছোট মাছ আনলে আমি কখনও গাল ফুলাব না। ফোন দাওনি কেন বলে অভিমান করব না। ওষুধ আনতে ভুলে গেলে অভিযোগ জানাবো না।
আমি তোমার ভাগটা কাউকে দিতে পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আমার কিছুই বলা হয় না। কী যেন একটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে বসে থাকে।
মেয়ের ফিডারে কুসুম গরম পানি ঢেলে বসে থাকি। গুড়ো দুধ দিতে আর মনে থাকে না ৷
স্কুলে যাওয়ার সময় ছেলের জুতোর ফিতে বাঁধতে মনে থাকে না। মামুন আমার মাথায় হাত রেখে একদিন বললো, এমন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছো কেন নাবিহা?
আমি হাউমাউ করে কেঁদে ওকে জড়িয়ে ধরে বলি, আমি মরে যাচ্ছি।
আমি গোপনে ওকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম। ও ফেরার আগে ঘর পরিপাটি করে রাখতাম,পছন্দের খাবার রাঁধতাম, চোখে কাজল দিতাম কিন্তু সেই কাজল চোখের জলে ভেসে যেত বারবার!
সেই জল মুছে মামুনের জিজ্ঞেস করার ফুরসৎ হলো না আমার কী হয়েছে? আমার সমস্ত চেষ্টাকে সে কেবল ন্যাকামো উপাধি দিত।
তখনই বুঝলাম ঠোঁটের রঙ কিংবা চোখের কাজলে কাউকে আটকে রাখা যায় না।
যে নারীর চোখ নেই তার জন্যও তো পুরুষ বেলী ফুলের মালা নিয়ে আসে। আমার চোখ আছে তবুও কপালে জুটেছে কাঁটা।
আহা! প্রেম তুমি চোখের জলে ধুয়ে যাও।
সেদিন মাছ কাটতে বসেছিলাম৷ এমন নরম মাছ আনায় মেজাজ খারাপ করে বলেছিলাম,চোখ কোথায় রেখে বাজার করো? এসব আমি কাটতে পারব না।
চিলের মত উড়ে এসে মামুন আমার চুলের মুঠি ধরলো। আমার লম্বা চুলের খোপা খুলে গেল। হাতে শিং মাছের কাঁটা বিঁধলো। মাছের কাঁটা খুলতে পারছিলাম না কিছুতেই।
ধারালো কাঁটা টেনে টেনে খুলতে গিয়ে মনে হচ্ছিলো মাংস ছিঁড়ে আসছিল ভেতর থেকে। এত কঠিন ব্যথা অথচ আমার কাছে কিছুই মনে হচ্ছিলো না৷ আমার হৃদয়ের ব্যথা কি এরচেয়েও বেশি?
হাতে মাছের ছাই নিয়েই খোপা বাঁধছিলাম আর তখনই কী হলো জানি না অগ্নিমূর্তি হয়ে মামুনকে চিৎকার করে বলেছিলাম,আজ কি ঐ বেশ্যার কাছে গিয়ে শুতে পারোনি এই জন্য সব রাগ আমার উপর ঢালছো?
তার প্রেমিকা সম্পর্কে আমার এমন জঘন্য কথা শুনে মামুন পিঁড়িটা ঢিল দিলো আমার কপাল বরাবর। কপাল কেটে গিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছিলো৷ বিস্মিত হলাম না, আমার কপাল তো বহু আগেই কেটে গেছে৷
এই প্রথমই সে জানলো তার গোপন প্রেমের কথা আমি আগেই জেনেছি।
এরপর থেকে আমার কোনো জীবন ছিল না। নিজেকে মনে হত বঙ্গমার্কেটের সামনে ওভার ব্রিজের নিচটায় বেঁধে রাখা শীর্ণ ঘোড়া। যাদের মন চাইলেই পিটিয়ে জখম করা যায়৷
আমার কপালও হলো এমন। কখনও মামুন মুচড়ে আঙুলের হাড় ভেঙে দিত, কখনও গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, কখনও বা বুট জুতোর লাথি খেয়ে মনে হত আর কত?
পরক্ষণেই মনে হত বাচ্চা দুটোর কী হবে? সবাই বলবে ভাঙা ঘরের নষ্ট বাচ্চা। ছেলেটার সাথে কেউ মিশবে না, মেয়ের বিয়ে হবে না৷
এই আমার সেই মামুন যার এক সময় কিছু ছিল না। বেকার ছেলে বলে মা-বাবা বিয়ে দিতে চায়নি। আমার কত কাকুতি মিনতি। ছয় বছর ধরে চিনি। আমার একটু কণ্ঠ না শুনলে যে ব্যাকুল হয়ে যায় সে আমাকে ছাড়া বাঁচবে কী করে?
দরজা বন্ধ করে ভাত না খাওয়া মেয়েটার জিদের কাছে মা-বাবা হার মেনেছিল।
খন্ডকালীন একটা চাকরি করে তখন সংসার চালাতাম৷ পেটে বাচ্চা নিয়েও বিশ টাকার রিকশা ভাড়া বাঁচিয়েছি।
আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যেত যখন দেখতাম ঘরে ফেরার পর আমার স্বামী লেবুর শরবত বানিয়ে অপেক্ষা করত৷ পা দুটো কোলে নিয়ে মালিশ করতো। ওসব কথা ভাবলে আমার বুক এখন ভরা প্লাবনের মত থই থই করে উঠে।
এরপর একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম এই পুরুষকে খুন করব আমি। ঘুমের ঘোরে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দিব কিংবা টাকার বিনিময়ে কাউকে দিয়ে খুন করাব।
বাইকের পেছন পেছন ট্রাক পাঠিয়ে দিব। দেখে মনে হবে নিছকই একটা এক্সিডেন্ট কিন্তু এর পেছনে থাকবে আমার পরিকল্পণা৷
অবশেষে,এক ট্রাক ড্রাইভারের সাথে চুক্তি করলাম। পাঁচ লাখ টাকার চুক্তি।
দুইদিন পর নিউজে দেখলাম, মধুপুরের রক্তিপাড়ায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা।
আমি একটা প্রাইভেট কলেজে জয়েন করলাম। বাবার বাড়ি চলে এসেছি। ছেলে-মেয়েদের ভর্তি করালাম বাবার বাড়ির কাছের এক স্কুলে। হোম টিউটর রেখেছি। উনি এসে নিয়ম করে পড়ায় বাচ্চাদের।
আজ আমার মনটা ফুরফুরে! মাসখানেক পর সেজেছি বেশ। কোর্টে হাজির হতে হবে যথাসময়ে। জানি মামলার রায়ে আমিই জিতব৷
কোর্টেই দেখা হলো আমার প্রাক্তন স্বামীর সাথে। না সেদিন খুন তাকে করিনি। ড্রাইভারের সাথে চুক্তি বাতিল করেছিলাম।
মধুপুরের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে ইদানীং। ওসব দেখেই মনে হয়েছিল মৃত মানুষের প্রতি এক সময় আমাদের অভিযোগ ম্লান হয়ে যায়। আমাদের অভিযোগ জীবিতদের জন্য।
কিছু মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে তার শাস্তি ভোগ করার সুযোগ দিতে হবে। এই বেঁচে থাকাই তার মৃত্যু।
তার মা মারা গেছেন৷ তার পাশে স্ত্রী, পুত্র,কন্যা কেউ নেই। দুধের মাছির মত উড়ে আসা সেই মেয়েটাও উধাও হয়ে গেছে।
চাকুরীহীন, অর্থহীন একজন লোকের কাছে থাকাটা সাহসের ব্যাপার। ও সাহস সব নারীর নেই৷
ওরা আসে যশ -খ্যাতি, প্রতিপত্তির লোভে। সুসময়ে এরা কীট-পতঙ্গ খেকো উদ্ভিদ ফ্লাইপেপার ট্র্যাপের মত উন্মুখ হয়ে বসে থাকে। কাছে যেতেই পোকার মত খপ করে খেয়ে ফেলে লোভী পুরুষদের।
ও হ্যাঁ নৈতিক স্খলন,নারী নির্যাতনের অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় তার বিসিএসের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
কিছু মানুষকে স্রষ্টা উপহার স্বরূপ সবকিছুই দান করেন কিন্তু মানুষ লোভে পড়ে তার দুঃসময়ের সঙ্গীকে ভুলে যায়। ভুলে যায় তার অতীত।
লোভে হোক, সখে হোক,জেদে হোক, বাজিতে হোক মানুষ কখনও কখনও নিজেকে এতটা তলানীতে নিয়ে যায় যে সেখান থেকে উঠার কূল- কিনারা খুঁজে পায় না।
ফুলের মত সুশোভিত হতে পারতো যে জীবন শুধু নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে যা সে পায় তার নাম শাস্তি।
শাস্তি
Tuffahul Jannat
05/08/26
Tuffahul Jannat