26/08/2024
দোয়া কবুলের গল্প
ধৈর্যের ফল
বড় চাচির বাচ্চা হবে দীর্ঘ ৯ বছর পর। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বড় চাচা এক ছাগল জবাই করে দিয়ে ফেলছেন। সেই ছাগলের মাংস রান্না করে চালের আটার রুটি বানিয়ে তিনি ইউনিয়নের যত এতিম মিসকিন আছে সবাইকে দাওয়াত করে খাইয়েছেন। খাওয়া শেষে তাদের প্রত্যেকের হাতে ৫০ টাকা করে দিয়ে বলেছেন আমার স্ত্রীর সন্তান হবে আমাদের বিয়ের নয় বছর পর। এর চেয়ে খুশির সংবাদ আমার কাছে আর কিছুই নেই। তোমরা আমার স্ত্রী জন্য দোয়া করবা। আমার সন্তান যদি সহিসালামতে পৃথিবীর আলো দেখে তবে তোমাদেরকে আমি গরু জবাই করে খাওয়া ইনশাআল্লাহ। এতিম আর মিসকিন রা সেদিন খুশি মনে বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে পকেটে টাকা নিয়ে বাড়ি চলে গেল। যাওয়ার সময় শুকরিয়ায় চোখে পানি এনে দোয়া করলো। মাবুদ গো তোমার এই বান্দা যে আমার মত নাদান এক এতিমকে এত বড় সম্মান দিয়ে তার বাড়িতে এনে দাওয়াত খাওয়ালো। আবার খুশি হয়ে হাতে টাকা ও দিল তার মনের আশা তুমি পূরণ করো। দয়াল মাবুদ গো তোমার ইব্রাহিম নবীর অভ্যাস ছিল ফকির মিসকিনকে সম্মান করে দাওয়াত করে খাওয়ানো। তোমার এই বান্দার অভ্যাসও তেমনি। সে কোন ধনী মানুষ খুঁজে দাওয়াত করেনি আমার মত নাদানকে খুঁজে বের করে সম্মান দিয়েছে। ও মাবুদ তোমার যে বান্দা এতিম কে সম্মান দিল তাকে তুমি নিজের সম্মানিত কর। এভাবে প্রত্যেক এতিম আর মিসকিনের দোয়া করলো। কেউ জোরে জোরে কেউ নীরবে। বড় চাচাকে সেদিন দেখে মনে হল জগতে তার মত এমন সুখী মানুষ আর একটিও নেই। সন্ধ্যা বেলায় বড় চাচী যখন জায়নামাজে বসে আল্লার মহিমা প্রকাশ করছিল। তখন বড় চাচা ৪৮ হাজার টাকায় বানানো সোনার চেইনটা বড় চাচির গলায় পরিয়ে বললেন আল্লাহ তোমাকে বিবি হাজেরার মত কবুল করুন। বড় চাচী দুয়া শেষ করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। প্রাণ ভরে অনেকক্ষণ কাঁদার পর বড় চাচাকে জড়িয়ে ধরে বললেন। যে জগতে কোন মেয়ের সন্তান না হলে তাকে নিত্যদিন তার স্বামীর গঞ্জনা সইতে হয়। কত অবহেলা কত অত্যাচার নেমে আসে সেই মেয়ের উপর আর আপনি সেখানে আমায় শুধু সান্তনার অনুপ্রেরণায় দিয়ে গেছেন বছরের পর বছর। কোন কারনে যেন আমার একটুও মন খারাপ না হয় সেই চেষ্টায় করে গেছেন সব সময়। আমার কোন কাজে অসন্তুষ্টি আসে এমন কিছু করেননি কোনদিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। বড় চাচা মৃদু হেসে বড় চাচীকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন রাবেয়া আমরা যদি আজীবন সন্তানহীন থাকতাম তবুও তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা এক বিন্দু কমতো না কোনদিন। বড় চাচি নিজের চোখের পানি আঁচলে মুছে বললেন আল্লাহ আপনার সে ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি করুন। বড় চাচা বললেন আমিন। তারপর দিন যত যেতে লাগলো বড় চাচির প্রতি বড় চাচার যত্ন নেয়া তত বাড়তে লাগলো। এমন কি ঘরের রান্নাবান্না থেকে শুরু করে আর যত গৃহস্থলীর কাজ আছে সবকিছু চাচা নিজের হাতে করতেন। মানুষ এতে খুব হাসি হাসতো বলতো এমন বেকুব পুরুষ জীবনে দেখিনি। চাচা এসব কথা শুনে একটু মন খারাপ করত না তিনি ধৈর্য ধারণ করে নিজেই নিজেকে বলতেন শুনো মতিন, নিজের ঘরের কাজ কেউ করলে সে ছোট হয় না। আর স্ত্রীকে ভালোবাসলেও কেউ বেকুব হয় না। বেকুব তো তারাই যারা নিজের ঘর সংসারের কাজ আর স্ত্রীর প্রতি ভালবাসাকে ভাবে বেকুবের কাজ। বড় চাচী একদিন রাতে চাচা কে বললেন আচ্ছা আমাদের সন্তান যদি মেয়ে হয় তবে তুমি কি খুশি হবে? রাবেয়া সত্যি সত্যি আমি যদি কোন কন্যা সন্তানের বাবা হতে পারতাম । বড় চাচা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে বললেন আমার কি সে কপাল আছে।বড় চাচি অবাক হয়ে বললেন কি অদ্ভুত কথা? যেখানে মানুষ মেয়েদের ভাবে অপয়া সেখানে আপনি বলছেন আপনার মেয়ে সন্তান হলে আপনি সফল! তুমি কি জানো না আমার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলে গেছেন মেয়ে সন্তান তার পিতার জন্য জান্নাত। বড় চাচীর চোখ মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল চাচা বললেন মেয়ে সন্তান হলে সে হবে আমার জান্নাতে যাওয়ার সহজ পথ তারপর সেদিন এসে বললো যেদিন বড় চাচির পেটে অসম্ভব ব্যাথা। গ্রামের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ধাইমা বললেন বাচ্চা আছে উল্টো হয়ে। বলা যায় না কি হয় মা বাচ্চা দুজনই জুকির মধ্যে আছে। ভাগ্য ভালো হলে একজন বাঁচতে পারে। সব আত্মীয়-স্বজনেরা অস্থির হয়ে উঠল কেউ কেউ কান্নাকাটি করছে কিন্তু বড় চাচা মোটেও কাঁদলেন না। তিনি বললেন সব আল্লাহর ইচ্ছা। আমি তার উপর ভরসা রাখি আল্লাহ যা চান তাই হবে। সেদিনও সবাই চাচাকে বললেন বেকুব। বড় চাচা নিজেকে নিজে বললেন মতিন তুমি বেকুব না। বেকুব তো তারা যারা বিপদে আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে পারেনা। সবশেষে সবাই যখন নিরাশ হয়ে গেল একে একে তখন বড় চাচা সিজদায় পড়ে গেলেন। সেজদায় পরে বললেন আল্লাহ গো তুমি যা কর তাই আমি মেনে নিব। আমি তোমার এমন গোলাম যে কোনদিন কোন ভাবে কোন কারনে তোমার উপর নারাজ হবো না। চাচা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে অঝোর ধারায় কাঁদছেন চোখের জলে যায় নামাজ ভিজে চুপসে গেছে, চাচা শুধু বারবার একটি কথাই বলেছেন আল্লাহ তুমি যা করো তাই মঙ্গলময়। আমি তোমার উপর সর্বদাই রাজি। চাচা কাঁদছেন, আমরা
কাঁদছি। যখন বাড়ির সব জন মানুষ নিরুপায় তখন জমিনে এসে লুটিয়ে পড়ল পৃথিবীর নবীনতম এক মানুষ। একটি কন্যা সন্তান ওয়াও ওয়াও শব্দের কান্নাই নিস্তব্ধ বাড়িটি তখন কানায় কানায় ভরে ওঠলো। বড় ছাতা তখনও সিজদায়। চাচার কাছে দৌড়ে গিয়ে তার পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে আমি বললাম, চাচা কারোর কোন ক্ষতি হয়নি। চাচী সুস্থ আছেন। আর আপনি কন্যা সন্তানের পিতা হয়েছেন। চাচার সঙ্গে সঙ্গে সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে চিৎকার করে তিনবার বললেন আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।
◑ হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো। আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ২০০)
◑ হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (পারা: ২, সূরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
ধৈর্য ধারণকারীর সাফল্য সুনিশ্চিত, কারণ আল্লাহ তাআলা ধৈর্য ধারণকারীর সঙ্গে থাকেন; আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যার সঙ্গে থাকবেন, তার সফলতা অবধারিত।