Green Movement

Green Movement Love The Earth. Love your Home. Love People.

বরফের নিচে নীল জোছনাদ্বিতীয় পর্ব ​রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে ল্যাবরেটরিটা নিঝুম হয়ে এল। বাকি গবেষকেরা একে একে বিদায় ন...
17/07/2026

বরফের নিচে নীল জোছনা

দ্বিতীয় পর্ব

​রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে ল্যাবরেটরিটা নিঝুম হয়ে এল। বাকি গবেষকেরা একে একে বিদায় নিয়েছেন। আহনাফ আর এলিন দুটি ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ নিয়ে আবার বসল মূল মনিটরটার সামনে। স্ক্রিনে তখনো জ্বলজ্বল করছে স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো ডটসন আইস শেল্ফের (Dotson Ice Shelf) সেই রহস্যময় গর্তগুলোর হাই-রেজোলিউশন ছবি। ওপর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন অ্যান্টার্কটিকার সাদা বুকে কেউ একের পর এক অশ্রুবিন্দু এঁকে দিয়েছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মহাপ্রলয়ের সংকেত।
​"জানিস আহনাফ," এলিন কফির কাপে চুমুক দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, "সাধারণ মানুষ একটা ভুল ধারণা নিয়ে বাঁচে। তারা মনে করে এই ভাসমান বরফের আস্তরণ বা আইস শেল্ফগুলো গলে গেলেই বুঝি সমুদ্রের পানির স্তর সরাসরি বেড়ে যাবে। কিন্তু আর্কিমিডিসের সূত্র অনুযায়ী, এগুলো তো অলরেডি মহাসাগরের পানিতে ভাসছে এবং নিজেদের ওজনের সমপরিমাণ পানি স্থানচ্যুত করে রেখেছে। তাই এগুলো সরাসরি গলে পানির উচ্চতা বাড়ায় না।" "ঠিক তাই," আহনাফ এলিনের কথার সূত্র ধরে যোগ করল, "কিন্তু আসল বিপদটা অন্য জায়গায়। এই আইস শেল্ফগুলো আসলে প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অবিকল্প বাঁধ (Dam) হিসেবে কাজ করে। অ্যান্টার্কটিকার মূল ভূখণ্ডে যে হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত বিশাল বিশাল হিমবাহ (Glacier) রয়েছে, এগুলোকে সাগরে পড়তে না দিয়ে আটকে রাখে এই আইস শেল্ফগুলো। এরা পেছনের বরফপ্রবাহের গতিকে ধীর করে দেয়। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মহাসাগরের নিচের দিক থেকে আসা উষ্ণ স্রোত—যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৫ সেলসিয়াস বেশি গরম—এই ডটসন আইস শেল্ফের নিচের অংশকে প্রতি বছর প্রায় ৯০ থেকে ১০০ ফুট করে ক্ষয় করে ফেলছে। এই বাঁধ যদি একবার ভেঙে যায়, তবে পেছনের ‘কোাহলার’ বা ‘স্মিথ’ হিমবাহগুলো বাঁধভাঙা বন্যার মতো স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ থেকে ৫ গুণ দ্রুত গতিতে মহাসাগরে ধেয়ে আসবে।" আহনাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনিটরের একটি গ্রাফিক্সের দিকে ইঙ্গিত করল, "আর পেছনের সেই ল্যান্ড-আইস বা স্থলের বরফ যখন সাগরে এসে মিশবে, তখন গ্লোবাল সি-লেভেল রাইজ (Global Sea Level Rise) ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। অ্যান্টার্কটিকার শুধু এই পশ্চিম অংশটা ভেঙে পড়লে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৩.২ মিটার (১০ ফুটের বেশি) বেড়ে যেতে পারে। আর তখন পৃথিবীর মানচিত্রটাই বদলে যাবে। উপকূলীয় শহরগুলো—তোর ছবির মতো সুন্দর স্টকহোম কিংবা আমার চিরচেনা ব্যস্ত ঢাকা—সব পানির নিচে তলিয়ে যাবে। কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু শরণার্থী হয়ে পড়বে।" ল্যাবের মৃদু আলোয় এলিন আহনাফের কাঁধে মাথা রাখল। এত বড় একটা বৈজ্ঞানিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে বড্ড অসহায় লাগছিল তার। সে ফিসফিস করে বলল, "কখনো কখনো মনে হয়, প্রকৃতির এই আদিম, রুদ্র বিশালতার সামনে আমরা মানুষগুলো কত ক্ষুদ্র, কতটা নগণ্য, তাই না? বিজ্ঞান আমাদের শুধু ধ্বংসের পূর্বাভাস দেয়, কিন্তু বাঁচার শক্তি দেয় না। অথচ এই ক্ষুদ্র মানুষগুলোই যখন ভালোবাসতে জানে, তখন তারা এই বিধ্বংসী প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস পায়। ভালোবাসা হয়তো প্রকৃতিকে বদলাতে পারে না, কিন্তু মানুষকে অপরাজিত রাখে।" আহনাফ এলিনের চুলে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে মৃদু হাসল। তার কণ্ঠে তখন বিজ্ঞানের চেয়েও এক গভীর ধ্রুব সত্যের সুর, "ভালোবাসাও তো একটা সমীকরণ এলিন। যার কোনো নির্দিষ্ট বা সহজ সমাধান নেই, সময়ের সাথে সাথে এর চলকগুলো (Variables) বদলে যায়। কিন্তু প্রতিটা জটিল সমীকরণেই যেমন একটা ধ্রুবক বা ‘কনস্ট্যান্ট’ থাকে, আমার জীবনের সেই জটিল সমীকরণের একমাত্র ধ্রুবকটা হল তুই। চারপাশের এই বরফ গলে গেলেও, এই ধ্রুবকটা অপরিবর্তিত থাকবে।" এলিন মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের কোণে তখন জমে থাকা জলবায়ু পরিবর্তনের আতঙ্ক ধুয়ে মুছে গেছে; সেখানে এখন এক গভীর, নিবিড় অনুরাগের আলো। বাইরে তখন অ্যান্টার্কটিকার মাইনাস ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র শীতল বাতাস আর তুষারঝড় রিসার্চ জাহাজের ধাতব গায়ে কর্কশ আওয়াজে আছড়ে পড়ছিল। প্রকৃতির সেই আদিম, হিংস্র হুঙ্কারের মাঝেও, ল্যাবের এক কোণে দুই মানব-হৃদয়ের এই উষ্ণ প্রেম এক অদ্ভুত সমান্তরাল মহাবিশ্ব তৈরি করেছিল। যেন বাইরের ওই হিমশীতল ধ্বংসযজ্ঞের বিপরীতে এই ভালোবাসাই ছিল পৃথিবীর টিকে থাকার শেষ গোপন সমীকরণ।

​২৪শে জানুয়ারি, ২০২৪। অ্যান্টার্কটিকার আকাশে তখন গ্রীষ্মের মধ্যগগনেও সূর্যটা দিগন্তের সমান্তরালে ঝুলে ছিল, যা থেকে কোনো ওম মিলছিল না। ডটসন আইস শেল্ফের ওপর স্থাপিত অস্থায়ী মোবাইল ল্যাবরেটরি কন্টেইনারের ভেতরটায় থমথমে নীরবতা। আজ র‍্যানের জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন। স্বয়ংক্রিয় এই সাবমেরিন রোবটটিকে পাঠানো হচ্ছে আইস শেল্ফের এমন এক অন্ধকার কোণে, যেখানে এর আগে পৃথিবীর কোনো যন্ত্র বা মানুষ পৌঁছানোর সাহস করেনি। বরফের পুরুত্ব সেখানে প্রায় চারশ মিটার, যা সম্পূর্ণ সূর্যালোককে অবরুদ্ধ করে নিচের মহাসাগরকে এক চিরন্তন কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত করেছে। এলিন কন্ট্রোল প্যানেলের আল্ট্রা-ওয়াইড মনিটরের সামনে সোজা হয়ে বসে ছিলেন। তাঁর আঙুলগুলো সাবমেরিনের ডপলার ভেলোসিটি লগ (DVL) এবং আল্ট্রা-শর্ট বেসলাইন (USBL) অ্যাকোস্টিক পজিশনিং সিস্টেমের ডেটা স্ট্রীম নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। র‍্যান তখন মূল আইস ফ্রন্ট থেকে বরফের নিচে প্রায় চারশত মিটার গভীরে, এক জটিল সাব-গ্লেসিয়াল ক্যাভিটির (Sub Glacial Cavity) ভেতর দিয়ে নিখুঁতভাবে এগোচ্ছিল। হঠাৎ করেই স্ক্রিনের থ্রি-ডি বাথিমেট্রি গ্রাফগুলো এবং রিয়েল-টাইম হাইড্রোডাইনামিক প্যারামিটারগুলো অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করল।
"আহনাফ! একটু এদিকে এসো! জলদি!" এলিনের কণ্ঠে তীব্র আতঙ্ক, যা ল্যাবের কৃত্রিম উষ্ণতাকেও এক নিমেষে শীতল করে দিল। আহনাফ দ্রুত নিজের কফি কাপটা টেবিলের ওপর রেখে এলিনের পাশে এসে দাঁড়ালেন। স্ক্রিনে র‍্যানের পাঠানো হাই-ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাকোস্টিক টেলিমেট্রি (Acoustic\ Telemetry) লিঙ্কের সিগন্যাল-টু-নয়েজ রেশিও (SNR) আশঙ্কাজনকভাবে কমতে শুরু করেছে। গ্রাফের তরঙ্গগুলো বুনো পশুর মতো ওঠানামা করছিল। "ওখানকার পানির ইন-সিটু (In situ) তাপমাত্রা হঠাৎ ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে, আর ওশেনিক কারেন্টের ভেলোসিটি... ওহ খোদা, প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটারের বেশি!" আহনাফ দ্রুত কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে ডেটা বিশ্লেষণ করতে করতে চিৎকার করে উঠলেন। "এলিন, এই থার্মোহ্যালাইন অ্যানোমালি স্বাভাবিক নয়! র‍্যান কোনো একটা সংকীর্ণ সাব-গ্লেসিয়াল চ্যানেলের ভেতরের তীব্র ঘূর্ণাবর্তে বা 'মেল্টওয়াটার প্লাম'-এর (Meltwater\ Plume) মুখে পড়ে গেছে! ওর প্রপালশন সিস্টেম এই ড্র্যাগ ফোর্স নিতে পারবে না!" এলিন এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ইমার্জেন্সি ওভাররাইড প্রোটোকল অ্যাক্টিভেট করলেন। "আমি 'মিশন অ্যাবোর্ট' এবং 'রিটার্ন টু হোম' (RTH) কমান্ড পাঠাচ্ছি..." এলিনের কণ্ঠ কাঁপছিল, আঙুলগুলো কি-বোর্ডে ঝড় তুলল। "কিন্তু ও রেসপন্ড করছে না। সাউন্ড পালসগুলো আইস-ওয়াটার ইন্টারফেসে রিফ্র্যাক্টেড হয়ে যাচ্ছে। আহনাফ, ও কমান্ড রিসিভ করতে পারছে না!" ল্যাবের বাকি গবেষকরাও কাজ ফেলে মনিটরের সামনে ছুটে এলেন। গোথেনবার্গের প্রধান বিজ্ঞানী অ্যানা ওয়াহলিন এসে এলিনের কাঁধে হাত রাখলেন, তাঁর অভিজ্ঞ চোখেও তখন স্পষ্ট উদ্বেগের ছায়া। কিন্তু ততক্ষণে প্রকৃতির আদিম শক্তির সামনে মানুষের তৈরি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি পরাস্ত হতে শুরু করেছে। অ্যাকোস্টিক মডেমের পিং রেট শূন্যে নেমে এল। স্ক্রিনের মূল নেভিগেশন উইন্ডোটিতে সমস্ত গ্রাফিক্স স্থির হয়ে গেল এবং মাঝখানে বড় বড় লাল অক্ষরে ভেসে উঠল: "SIGNAL LOST"। র‍্যানের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চারশ মিটার বরফের নিচে, শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রার মহাসাগরে উজ্জ্বল কমলা রঙের রোবটটি পুরোপুরি একা হয়ে গেল।

চলবে...

(চার পর্বে সমাপ্য হবে)

বরফের নিচে নীল জোছনাপ্রথম পর্ব ​আন্টার্কটিকার আকাশটা যখন ভাঙা কাচের মতো নীলচে সাদা দেখাত, আহনাফ তখন জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে...
16/07/2026

বরফের নিচে নীল জোছনা

প্রথম পর্ব

​আন্টার্কটিকার আকাশটা যখন ভাঙা কাচের মতো নীলচে সাদা দেখাত, আহনাফ তখন জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ডটসন আইস শেল্ফের অন্তহীন বরফ-প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে থাকত। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস। অ্যান্টার্কটিকায় তখন গ্রীষ্মকাল হলেও মাইনাস বিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। আহনাফ, একজন তরুণ বাংলাদেশি ওশেনোগ্রাফার এবং গ্লেসিয়োলজিস্ট, যে গত তিন বছর ধরে ইউনিভার্সিটি অব গোথেনবার্গের এই বিশেষ অ্যান্টার্কটিকা গবেষণা দলের সাথে যুক্ত। তার মূল কাজ, পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম এবং রহস্যময় এই আইস শেল্ফের নিচে উষ্ণ সমুদ্রের পানির প্রবাহ এবং বরফ গলে যাওয়ার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা। কিন্তু আহনাফের এই বরফ-শীতল নির্জন গবেষণাগারে একমাত্র উষ্ণতা ছিল এলিন। এলিন লিন্ডস্ট্রম, সুইডিশ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এবং রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ। যার সোনালী চুল আর সমুদ্রের মতো নীল চোখ এই ধূসর হিমশীতল প্রান্তরে আহনাফের বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ ছিল। এলিনই তৈরি করেছিল 'RAN' (র‍্যান)—একটি উজ্জ্বল কমলা রঙের স্বয়ংক্রিয় সাবমেরিন রোবট। বরফ-শীতল পানির নিচে নিখুঁতভাবে পথ চলতে সক্ষম এই রোবটটি ছিল এলিনের নিজের সন্তানের মতো।
​"তুমি আবার ওই রোবটটার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছ, যেন ওটা তোমার কোনো পুরোনো প্রেমিকা," আহনাফ কফির মগটা এলিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল। এলিন কফির মগটা হাতে নিয়ে র‍্যানের মসৃণ কমলা রঙের ধাতব গায়ে হাত বুলালো। 'ওহ শোর' (Research Vessel) ল্যাবরেটরিতে র‍্যান তখন তার শেষ অভিযানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। এলিন হেসে বলল, "র‍্যান আমার প্রেমিকা নয় আহনাফ, ও আমাদের স্বপ্নের দূত। মানুষের চোখ যেখানে পৌঁছাতে পারে না, র‍্যান সেখানে যায়। তুমি যে জলবায়ু পরিবর্তনের জটিল সমীকরণ গুলো মেলাতে পারছ না, তার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে র‍্যানের এই যান্ত্রিক মস্তিস্কে।" আহনাফ এলিনের পাশে এসে দাঁড়াল। জাহাজের মৃদু কম্পন আর বাইরে বরফ ভাঙার শব্দ ছাড়া চারপাশটা নিস্তব্ধ। আহনাফ এলিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। গ্লাভসের ওপর দিয়েও সে এলিনের আঙুলের উষ্ণতা অনুভব করতে পারছিল।
​"আমি জানি এলিন," আহনাফ নরম গলায় বলল। "২০২২ সালে র‍্যান যখন ২৭ দিনে বরফের নিচে ১,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ৫৫ বর্গমাইল এলাকার হাই-রেজোলিউশন মানচিত্র এনে দিয়েছিল, আমি তখন প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম—আমরা এক নতুন পৃথিবীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু এবার... এবার ডটসনের আরও গভীরে যাওয়া কি ঠিক হবে? ওখানকার সামুদ্রিক স্রোত বড্ড বেশি অনিশ্চিত।" এলিন আহনাফের চোখে চোখ রাখল। সেই চোখে ছিল এক অদম্য বিজ্ঞানী আর এক প্রেমিকার মিশ্রণ। "বিজ্ঞান কখনো ভয়ে থমকে দাঁড়ায় না আহনাফ। আর তাছাড়া, যতক্ষণ তুমি আমার পাশে আছ, আমার ল্যাপটপের স্ক্রিনে তোমার হিসাব করা স্রোতের মানচিত্র আছে, ততক্ষণ র‍্যান পথ হারাবে না। এটা আমাদের যৌথ মিশন।"
​পরদিন সকালে র‍্যানকে ক্রেনের সাহায্যে নামিয়ে দেওয়া হলো মহাসাগরের কনকনে ঠাণ্ডা পানিতে। কমলা রঙের সিলিন্ডার আকৃতির শরীরটা নিয়ে র‍্যান ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল ডটসন আইস শেল্ফের শত শত মিটার পুরু বরফের আস্তরণের নিচে। ল্যাব রুমে তখন উত্তেজনার চরম মুহূর্ত। প্রধান বিজ্ঞানী অ্যানা ওয়াহলিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। স্যাটেলাইট বা উপগ্রহগুলো মহাদেশটির উপরিভাগ নিখুঁতভাবে দেখাতে পারলেও, এই ভাসমান বরফের নিচের জগতটা চিরকালই অন্ধকার আর অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই র‍্যান থেকে ডেটা আসতে শুরু করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল থ্রি-ডি মানচিত্রের প্রথম অবয়ব। ল্যাবের সবাই এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেল।
​"গড..." এলিন ফিসফিস করে উঠল।
​আহনাফ চশমাটা ঠিক করে স্ক্রিনের আরও কাছে এগিয়ে গেল। "এটা অসম্ভব! এটা কোনো সাধারণ বরফের নিচের তলদেশ নয়। এলিন, দেখ!" স্ক্রিনে যে মানচিত্রটি তৈরি হচ্ছিল, তা বিজ্ঞানীদের পূর্ববর্তী সমস্ত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিল। ডটসন আইস শেল্ফের নিচের অংশটি মসৃণ কোনো বরফের দেয়াল নয়, বরং এক অবিশ্বাস্য এবং জটিল ভূপ্রকৃতি। সেখানে রয়েছে প্রকাণ্ড সিঁড়ির মতো ধাপ, যা কোনো প্রাচীন সভ্যতার স্থাপত্যের মতো ধাপে ধাপে নেমে গেছে সমুদ্রের অতলে। রয়েছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত গভীর খাঁজ, দীর্ঘ ফাটল এবং সবচেয়ে অদ্ভুত যা—অসংখ্য অশ্রুবিন্দুর (Teardrop) মতো আকৃতির বিশালাকার গর্ত।

আহনাফ দ্রুত বোর্ডে বরফ গলে যাওয়ার তাপগতীয় সমীকরণটি লিখতে শুরু করল। সে উত্তেজিত গলায় বলতে লাগল, "অ্যানা, এলিন... দেখ, বরফ এখানে সমানভাবে গলছে না। উষ্ণ সমুদ্রের পানি যখন এই ফাটলগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন কোরিওলিস ফোর্সের (Coriolis force) কারণে পানির স্রোত এক ধরনের ঘূর্ণি তৈরি করছে। এই সামুদ্রিক স্রোত আর উষ্ণ পানির জটিল পথই বরফের গায়ে এই অনন্য নকশা আর অশ্রুবিন্দুর মতো অবয়ব খোদাই করেছে!" অ্যানা ওয়াহলিন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, "আহনাফ, এলিন... তোমরা কি বুঝতে পারছ আমরা কী দেখছি? এটা যেন মানুষ প্রথমবারের মতো চাঁদের দূরবর্তী অংশ (Far side of the Moon) দেখছে। এই প্রথম আমরা জানতে পারলাম অ্যান্টার্কটিকার হৃদপিণ্ডটা কীভাবে স্পন্দিত হচ্ছে।" ল্যাবের করতালির মাঝে আহনাফ এলিনকে জড়িয়ে ধরল। এলিনের ঠোঁটের কোণে তখন জয়ের হাসি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একটা সূক্ষ্ম ক্লান্তি আর উৎকণ্ঠাও ছিল। এই আবিষ্কার জলবায়ু মডেলগুলোকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে। ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকার বরফের আস্তরণ কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানির স্তর কতটা বৃদ্ধি পাবে, তা এবার নিখুঁতভাবে হিসাব করা যাবে।

চলবে...
(চার পর্বে সমাপ্য হবে)

15/07/2026

অবাধ্য প্লাবন

​আকাশ ভেঙেছে আজ শ্রাবণের অবাধ্য প্লাবনে,
নর্দমা উপচে জল জমেছে ভাঙা রাজপথে।
ক্ষুধার্ত শিশুটি কাঁদে বস্তির স্যাঁতসেঁতে কোণে,
জীবন থমকে গেছে বিষাদের এই কালস্রোতে।

​ভেজা জামা গায়ে জড়িয়ে, কাঁপছে বুক ভয়ে,
ঝড়ে ছুটে চলে এসএসসি পরীক্ষার্থী দলে।
শিক্ষা অর্জনের যে স্বপ্ন তারা বোনে হৃদয়ে,
তা আজ ভাসছে শুধু নর্দমার নোংরা জলে।

​দিনমজুরের হাত দুটো আজ অলস পড়ে আছে,
কাজের খোঁজে বৃষ্টিতে ভেজে নিরুপায় সেই পিতা।
উনুন জ্বলবে না আজ বস্তির ভাঙা কুঁড়েঘরে,
পথ চেয়ে বসে আছে ক্ষুধার্ত মা আর সীতা!

​রাস্তার মোড়ে ওই ভেজা বিড়ালটা নিথর পড়ে থাকে,
স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় কুকুরের ছোট ছানা;
গাছের ডাল ভেঙে ডানা ভাঙা পাখিটি শুধু কাঁদে,
ঝড়ের দাপটে আজ তাদেরও বাঁচার পথ অজানা!

​ছিঁড়ে যাওয়া তারে মিশেছে জলে মৃত্যুর নীরব বিষ,
বাতাসে ভেসে আসে অবলা জীবের আর্তনাদের শিস।
কোথায় লুকাবে, কোথায় বাঁচবে—নেই যে কোথাও ত্রাণ,
কর্দমাক্ত এই নর্দমাতেই অকালে হারাচ্ছে প্রাণ!

​অথচ ওদিকের কাচের জানালার ওপাশে বসে কেউ,
ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে খুঁজছে বৃষ্টির কাব্য।
ফেসবুকের দেয়ালে আঁকছে কৃত্রিম আবেগের ঢেউ,
"মেঘপিয়ন" সেজে তারা ভুলেছে সমাজ-কর্তব্য!

​কারো ঘরের মেঝে যখন অথৈ জলে ভাসে,
অন্য কেউ তখন বৃষ্টিবিলাসের মোহে অট্টহাসি হাসে।
মানুষের এই দুই রূপ, একই পৃথিবীর দুই তীরে,
আমরা বড় বেশি মেতে থাকি শুধু নিজেরে ঘিরে।

​নিজের আঙুলের সামান্য আঘাতকে মনে করি পাহাড়,
অথচ অন্যের বুকের রক্তক্ষরণও আমাদের সাধারণ আহার!
নিজের চোখে বিশ্ব দেখি, নিজেরে ভাবি মহৎ,
অন্যের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা হারিয়েছে আমাদের জগৎ।

​আমরা কি সত্যিই মানুষ? নাকি কেবলই মুখোশ?
স্বার্থের টানে ঘুরি মোরা, অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দোষ।
আজ স্বার্থ ফুরিয়ে গেলেই চেনা মানুষও হয় পর,
কেউ কারো নয় এ সংসারে, সবাই যেন বালির ঘর।

​"প্রিয়জন" শব্দটা আজ অভিধানেই কেবল শোভা পায়,
বাস্তবের হাটে সবাই শুধু "প্রয়োজন" খুঁজে বেড়ায়।
প্রয়োজন মেটে যেই, সম্পর্কের সুতো যায় ছিঁড়ে,
আবার নতুন প্রয়োজনের খোঁজে মানুষ ছোটে ভিড়ে।

​হে প্রাচুর্যের কারিগর, খোলো আজ হৃদয়ের দ্বার,
তোমার প্রাসাদের আলোয় মুছুক পথহারা অন্ধকার।
উদ্বৃত্ত সুখের কানাকড়ি যা অলস পড়ে রয়,
তাই দিয়ে হোক আজ কোনো মুমূর্ষু জীবনের জয়।

​ঐশ্বর্যের অহংকার টুটে যাক মানবতার ডাকে,
দাঁড়াও এসে ওই বিবর্ণ, জলমগ্ন বাঁকে।
সোনার খাঁচা ভেঙে বিলিয়ে দাও সহানুভূতির হাত,
ভেঙে যাক জীবনের এই নির্মম ও অসম সংঘাত।

​হায়রে সমাজ, হায়রে মানুষ, হায়রে নিয়তি!
কবে কাটবে আমাদের এই আত্মিক অধঃগতি?
বৃষ্টির জল ধুয়ে দিক মনের সব কালিমা,
মানুষ আবার মানুষ হোক, ছুঁয়ে যাক সহানুভূতির নীল সীমা।

কলমে: উদধি
১৪.০৭.২০২৬
পোর্ট তানজুং পেলেপস, এংকরেজ।

পুরোনো বাতিঘরশেষ পর্ব যখন চোখ খুললাম, চারপাশ সম্পূর্ণ শান্ত। ঝড় নেই, বৃষ্টি নেই। নিজেকে আবিষ্কার করলাম বাতিঘরের ভেতরের প...
14/07/2026

পুরোনো বাতিঘর

শেষ পর্ব

যখন চোখ খুললাম, চারপাশ সম্পূর্ণ শান্ত। ঝড় নেই, বৃষ্টি নেই। নিজেকে আবিষ্কার করলাম বাতিঘরের ভেতরের পাথুরে মেঝেতে। আমার সারা শরীর ভেজা, মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। পাশে একটা পুরোনো হারিকেন টিমটিম করে জ্বলছিল। আমার মনে পড়ল, বিকেলে যখন এসেছিলাম, তখন তো একটা জেনারেটর চালু ছিল। তবে কি বাকিরা জেনারেটর বন্ধ করে দিয়েছে? রাইয়ান, সাব্বির, বালাম ওরা কোথায়?
​আজকের রাতটা অন্যরকম। আজ আকাশে চাঁদ নেই, চারপাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা। ঘন কুয়াশায় সমুদ্রের জল আর আকাশের সীমানা এক হয়ে গেছে। তবে বাতিঘরের চূড়া থেকে সেই শক্তিশালী আলোর রোশনাই কুয়াশার বুক চিরে সাগরের বুকে আছড়ে পড়ছে। দেয়ালঘড়ি না থাকলেও আমার ভেতরের সামুদ্রিক সহজাত বুদ্ধি বলল—রাত তখন ঠিক বারোটা। আমি উঠে দাঁড়িয়ে জেনারেটর রুমের দিকে পা বাড়াতে যাব, ঠিক তখনই আমার কানের কাছে খুব কাছ থেকে কেউ একজন বরফ-ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল—
​"সে এসেছে... সে এসেছে..."
ভয়ে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। আমি পাগলের মতো জেনারেটর রুম থেকে দৌড়ে বাইরে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে চলে এলাম। আর তখনই থমকে গেলাম। বাতিঘরের প্রাচীন কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচ থেকে ওপরে উঠে আসছে একজোড়া ভেজা পায়ের শব্দ।
টপ... টপ... টপ...
মেঝেতে পানির ফোঁটা পড়ার শব্দ সুষ্পষ্ট।
​বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। সাগরের সুনামি, সহকর্মীদের হারিয়ে যাওয়া—সবকিছু ভুলে এক আদিম আতঙ্ক আর কৌতুহল আমাকে গ্রাস করল। হাতে থাকা হারিকেনটা উঁচিয়ে আমি সিঁড়ির অন্ধকারের দিকে তাকালাম। নিচ থেকে কুয়াশার একটা ঠান্ডা স্রোত সাপের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠে এলো। আর তার সাথে ভেসে এলো তীব্র এক সুবাস—বুনো ফুলের গন্ধ। এই নোনা বাতাসের দ্বীপে এই সুবাস কোনোভাবেই পাওয়ার কথা নয়। ধীরে ধীরে সিঁড়ির অন্ধকার ভেদ করে ওপরে উঠে এলো এক অবয়ব। কোনো কঙ্কাল বা বীভৎস ভূত নয়। আলো-ছায়ার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারী। তার পরনে প্রাচীন ধাঁচের মখমলের উপর মনি, মুক্তা খচিত গাউন, যা সমুদ্রের পানিতে সম্পূর্ণ ভেজা। তার দীর্ঘ কালো চুল বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে মেঝেতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত ঠান্ডাতেও মেয়েটি কাঁপছে না। তার চোখ দুটো যেন এই সমুদ্রের মতোই গভীর, নীল আর রহস্যময়। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "কে... কে আপনি? এই দ্বীপে মাঝরাতে কীভাবে এলেন? কোনো জাহাজডুবি হয়েছে? আমার বাকি সঙ্গীরা কোথায়?" মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু তার মায়াবী চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময়, অলৌকিক হাসি। সে ধীরে ধীরে তার ফর্সা, হিমশীতল হাতটি বাড়িয়ে দিল আমার দিকে।

​আশ্চর্য! সেই হাতটি দেখার সাথে সাথে আমার মনের ভেতরের সব ভয় এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। এক অদ্ভুত টান, এক প্রাচীন চেনা অনুভূতি আমার পুরো অস্তিত্বকে গ্রাস করতে লাগল। মনে হলো, এই মেয়েটিকে আমি আজ নতুন দেখছি না। এই চোখ, এই হাসি আমার হাজার বছরের চেনা। প্রতিটা জন্মে, প্রতিটা শতাব্দীতে আমি যেন এই মেয়েটির জন্যই সমুদ্রের তীরে অপেক্ষা করে আছি।
​"তুমি এসেছ?" আমার মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো কথাটা।
​আমার কণ্ঠস্বর এখন আর পঞ্চাশ বছরের এক পোড়খাওয়া ক্যাপ্টেনের নয়; যেন কোনো তরুণের আবেগে ভরপুর, যা যুগের পর যুগ ভালোবাসার কাঙাল।
​মেয়েটি এবার কথা বলল। তার গলার আওয়াজ যেন কোনো প্রাচীন বাঁশির সুর, যা সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে।
​"আমি তো প্রতি রাতেই আসি, লিসান্দর। তুমিই শুধু আলোর পেছনে লুকিয়ে থাকো, আমার দিকে তাকাও না।"
​লিসান্দর? নামটা শোনার সাথে সাথে আমার মনে হলো মগজের কোনো এক অন্ধকার কুঠুরির তালা খুলে গেছে। স্মৃতির বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আমি তাহলে উদধি নই! উদধি তো মাত্র কয়েক দশকের এক ছদ্মবেশ। আমি লিসান্দর—সেই প্রাচীন গ্রিক সওদাগর, যিনি তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে খোঁজার জন্য, তাকে পথ দেখানোর জন্য এই বাতিঘর বানিয়েছিলেন। আর এই মেয়েটি হেলেনা, আমার সেই মৃত স্ত্রী, যাকে সমুদ্র কেড়ে নিয়েছিল।
​"হেলেনা..." আমি এক কদম এগিয়ে গেলাম।
​হেলেনা তার হিমশীতল হাতটি বাড়িয়ে আমার গালে ছোঁয়াল। সেই স্পর্শে কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল এক তীব্র, অবশ করে দেওয়া ঠান্ডা। কিন্তু আমার মনে হলো, এই ঠান্ডার মাঝেই লুকিয়ে আছে পরম শান্তি, যা আমি শত জনমেও পাইনি।
​"অনেক শতাব্দী কেটে গেছে, লিসান্দর," হেলেনা ফিসফিস করে বলল, "এই সমুদ্র আমাকে আটকে রেখেছে। আলো জ্বেলে তুমি আমাকে পথ দেখিয়েছ, কিন্তু নিজে আমার কাছে আসোনি। আজ রাতে আলো নিভিয়ে দাও। চলো, আমার সাথে চলো।" হঠাৎ করেই বাতিঘরের ঘূর্ণায়মান আলোটা থমকে গেল। এক জায়গায় স্থির হয়ে রইল আলোটা—ঠিক দ্বীপের কিনারায় বড়ো একটা সমতল কালো পাথরের ওপর। তীব্র আলোয় দেখতে পেলাম, সেই পাথরের ওপর অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে সাব্বির, রাইয়ান, বালাম আর শফিক। ওরা বেঁচে আছে, কিন্তু এক অলৌকিক মায়ায় ওরা অচেতন। সমুদ্রের ঢেউ ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভাসিয়ে নিচ্ছে না। যেন হেলেনাই ওদের রক্ষা করেছে, শুধু আমাকে এই বাতিঘরে টেনে আনার জন্য। "ওরা... আমার সঙ্গীরা?" আমি লিসান্দরের স্মৃতি আর উদধির কর্তব্যের মাঝে শেষবারের মতো দোলা খেলাম। "ওরা মুক্ত, লিসান্দর। সকাল হলেই ওরা নিজেদের জাহাজে ফিরে যাবে। কিন্তু তুমি? তুমি কি আবার আমাকে একা রেখে চলে যাবে এই আলোর খাঁচায়?" হেলেনার চোখে জল ছলছল করে উঠল। বাতিঘরের আলোটা এবার সম্পূর্ণ নিভে গেল। হাড়কাঁপানো বাতাস এসে আছড়ে পড়ল পুরোনো কাঁচের জানালায়। একটা তীব্র আর্তনাদের মতো শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। গা ছমছমে সেই অন্ধকারে হেলেনার চোখ দুটো অলৌকিক নীলাভ আলোয় জ্বলতে লাগল। সে আমার হাত ধরে বাতিঘরের খোলা বারান্দার দিকে টানতে লাগল।

​বারান্দার বাইরে তখন উত্তাল সমুদ্র ফুঁসছে। নিচের কালো পাথরগুলোর ওপর আছড়ে পড়ছে বিশালাকার ঢেউ। সেখান থেকে যেন হাজারো ফিসফিসানি আওয়াজ ভেসে আসছে—চলে এসো... চলে এসো...
​আমার ভেতরের সাধারণ মানবীয় যুক্তি-বুদ্ধি শেষবারের মতো আমাকে সতর্ক করার চেষ্টা করল—'তুমি মানুষ, ও এক প্রেতাত্মা! ও তোমাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে!'
​কিন্তু হেলেনার ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো যুক্তি খাটল না। ভালোবাসার এক আদিম, ভুতুড়ে মোহ আমাকে সম্পূর্ণ অন্ধ করে দিল। মৃত্যুর চেয়ে হেলেনাকে আবার হারানোটা আমার কাছে কোটি গুণ বেশি ভয়ানক মনে হলো। এই বাতিঘর, এই সমুদ্রের চাকরি, এই পঞ্চাশ বছরের শরীর—সবকিছু এক মুহূর্তের তুচ্ছ মায়া বলে মনে হলো। "আমি আর তোমাকে ছেড়ে যাব না, হেলেনা," আমি হাসলাম। এক পরম তৃপ্তির হাসি। ​আমরা দুজনে বারান্দার একদম কিনারায় এসে দাঁড়ালাম। তীব্র বাতাসে হেলেনার মখমলের পোশাক ডানা মেলে দিল। সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। সেই আলিঙ্গনে জীবনের কোনো স্পন্দন ছিল না, ছিল মৃত্যুর হিমশীতল আমন্ত্রণ। কিন্তু উদধি বা লিসান্দর, যে নামেই হোক না কেন, আমার কাছে সেটাই মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক আশ্রয়।
​"এবার ঝাঁপ দাও, আমার ভালোবাসা," হেলেনা ফিসফিস করে বলল।
​আমি চোখ বন্ধ করলাম। অন্ধকার আর সমুদ্রের অতল গভীরতা আমাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হলো। আমরা একসাথে শূন্যে পা বাড়ালাম।

​পরদিন সকালে মূল ভূখণ্ড থেকে যখন কোস্টগার্ডের একটি উদ্ধারকারী নৌকা এবং আমাদের জাহাজের অন্য নাবিকরা বাতিঘরে এসে পৌঁছাল, তখন চারপাশ একদম শান্ত। রাতের সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের কোনো চিহ্নই নেই। কুয়াশা কেটে গিয়ে ঝলমলে সোনা রোদ উঠেছে সাগরের বুকে। কোস্টগার্ড প্রথমে দ্বীপের পূর্ব দিকের সেই কালো পাথরের ওপর থেকে থার্ড অফিসার সাব্বির, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার রাইয়ান, বালাম এবং শফিককে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে। ওরা অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিল, যদিও রাতের ঝড়ের আর সুনামির কোনো স্পষ্ট স্মৃতি ওদের মনে ছিল না। ওরা শুধু বলেছিল, এক তীব্র আলোর ঝলকানি ওদের পাথরের ওপর টেনে এনেছিল।
​কিন্তু ক্যাপ্টেন উদধি? ​তারা তন্নতন্ন করে খুঁজল পুরো দ্বীপ। বাতিঘরের ওপরে উঠে দেখল, বাতিঘরের আলোটা বন্ধ, জেনারেটর সম্পূর্ণ অকেজো। আর বাতিঘরের খোলা বারান্দার মেঝেতে পড়ে আছে দুটো জিনিস—একটি প্রাচীন গ্রিক মুদ্রা, যার ওপর টলেমি রাজবংশের চিহ্ন খোদাই করা, আর এক জোড়া ভেজা পায়ের ছাপ, যা বারান্দার কিনারা পর্যন্ত গিয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন উদধিকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাগরের কোথাও তার মৃতদেহও ভেসে ওঠেনি। তবে আজো, স্থানীয় জেলেরা বলে—কোনো কোনো বিশেষ অমাবস্যার রাতে, যখন ঘন কুয়াশায় বাতিঘরের আলো ঢাকা পড়ে যায়, তখন সমুদ্রের বুকে দুটি ছায়ামূর্তিকে হাত ধরাধরি করে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। বাতিঘরের প্রাচীন পাথুরে দেয়ালে তখন বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে ভেসে আসে এক ভুতুড়ে, অমর প্রেমের ফিসফিসানি। লিসান্দর তার হেলেনাকে খুঁজে পেয়েছে, আর বাতিঘরটি আজো দাঁড়িয়ে আছে সেই অনন্ত প্রেমের সাক্ষী হয়ে।

​হঠাৎ করেই চারপাশের দৃশ্যপটটা কেমন যেন কাঁপতে শুরু করল। লিসান্দর, হেলেনা, প্রাচীন গ্রিক মুদ্রা আর বাতিঘরের সেই অতিপ্রাকৃতিক আবহটা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। বাতিঘরের ঠান্ডা মেঝে নয়, আমি ক্যাপ্টেন উদধি শুয়ে আছি নিজের জাহাজের ক্যাবিনের আরামদায়ক বাঙ্কে! লান্স করে একটু ভাত ঘুমের জন্য বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়েছিলাম।আমি হয়তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম, আর আমার কানের কাছে মোবাইলের রিংটোনটা একটানা কর্কশ আওয়াজে বেজেই চলেছে। রিংটোনের শব্দে ধড়ফড় করে ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। কপালে জমে থাকা ঘামটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে, কিছুটা বিভ্রান্ত জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম। বুকটা তখনও দুলছে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে। হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়ে কলটা রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে শিপিং এজেন্টের চেনা ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল: "গুড ডে ক্যাপ্টেন, আমি এজেন্ট। চটজলদি ইঞ্জিন রেডি করো, ভিএইচএফে তোমার ডিউটি অফিসারকে কল করে পাওয়া যাচ্ছে না। একটু পরেই পাইলট পেয়ে যাবা পোর্টে বার্থিংয়ের জন্য। অল ক্লিয়ার!" আমি, ক্যাপ্টেন উদধি, ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখতে পেলাম ঝলমলে রোদ। রাতের সেই প্রলয়ংকরী ঝড়, বাতিঘর, কিংবা শত বছরের পুরোনো সেই অতৃপ্ত প্রেম—সবটাই কি তবে একটা বাস্তবসম্মত দুঃস্বপ্ন ছিল? এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বার্থিংয়ের প্রস্তুতি নিতে ব্রিজে ডিউটি অফিসারকে ফোন দিলাম।

​সমাপ্ত

13/07/2026

হৃদয়ের মানচিত্র

​জীবনানন্দের সেই নাটোরের বনলতা সেনের চুল,
হয়তো এনে দিতে পারবো না কভু, ক্ষণিকের ভুল।
কিংবা পারবো না এনে দিতে রবিঠাকুরের 'উর্বশী'র রূপের আলো,
তবু এই বুকে যেটুকু আছে, তা কেবলই তোমায় বাসে ভালো।

​শেক্সপিয়রের সনেটের মতো অমর কাব্য হয়তো আমার নয়,
নয়কো আমার গালিবের কোনো গজল-মাখানো অনিন্দ্য জয়।
পাবলো নেরুদার তীব্র আকুল বিষাদমাখা একশটি গান,
হয়তো আমি পারবো না লিখতে সঁপে দিয়ে মোর এই পরান।

তবে জেনো প্রিয়, আমার এই অতি সাধারণ পঙ্‌ক্তিমালায়,
আজীবন শুধু তোমাকেই খুঁজি গভীর রাতের ছায়ায় ছায়ায়।
​তাজমহলের শ্বেতপাথরের অহংকার আমি দিতে পারবো না জানি,
হব না শাহজাহান, গড়বো না কোনো প্রেমের অমর সৌধ-কাহিনি।

কিংবা ক্লিওপেট্রার সেই অমূল্য, নীলকান্তমণির হার,
আমার সাধ্যের বাইরে যে রবে, স্বীকারোক্তি এই তো আমার।
তবে দিতে পারি এক জোড়া চোখ, যা শুধু তোমাতেই হবে শান্ত,
দিতে পারি এক বিশ্বস্ত হাত, যা ছুঁয়ে ঘুচবে তোমার পথ ক্লান্ত।

​মেঘদূতের সেই মেঘে ভেসে যাওয়া বিরহের কোনো চিঠি,
হয়তো আমার পাঠানো হবে না, ভুলে যাবো সব চাতুরী-মিছিমিছি।
ভ্যান গঘের তুলির সেই বিখ্যাত আকাশের তারা-ভরা রাত,
ক্যানভাসে এঁকে দিতে পারবো না আমি, বাড়িয়ে আমার হাত।

তবে মেঘলা দুপুরে যখনই তোমার আকাশটা হবে ভারী,
এক বুক ওম নিয়ে পাশে বসে আমি এক নিমেষেই হতে পারি—
তোমার একান্ত এক চিলতে রোদ, তোমার নিজস্ব নীল আকাশ,
যেখানে ব্যাকুল হৃদয়ে কেবলই বইবে প্রেমের সুবাস।

​সুফিয়া কামালের ‘সাঁঝের মায়া’র মতো কোনো মায়াবী সাঁঝ,
হয়তো আমার সাজানো হবে না ভেঙে ফেলে সব কাজ।
কিংবা পারবো না কিনে দিতে কোনো দূর আকাশের রূপালি চাঁদ,
যে চাঁদকে ঘিরে কবিরা বুনেছেন কতশত মায়াজাল, কতই ফাঁদ।

​কিন্তু জেনো প্রিয়, এই বুকে আছে এক মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর নদী,
যার প্রতি ফোঁটা জলে তোমারই নাম লেখা থাকবে নিরবধি।
সুনীলের সেই পাহাড় ভাঙা ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু,
আমার এ মন অজান্তে রোজ ধেয়ে চলে শুধু তোমারই পিছু।

কিছু না থাকার এই রিক্ত নগরে, এক বুক নিঃশর্ত ভালোবাসায়—
আমি তোমাকেই চেয়েছি চিরকাল, আমার শেষ জীবনের পরম আশায়।

কলমে: উদধি
১৩.০৭.২০২৬
পোর্ট তানজুং পেলেপস, এংকরেজ।

পুরোনো বাতিঘরপ্রথম পর্ব আকাশী নীল সাগরের বুকে যখন দুপুরের সোনাঝরা রোদ এসে পড়ত, তখন মনে হতো কোটি কোটি হিরে একসাথে জ্বলছে।...
12/07/2026

পুরোনো বাতিঘর

প্রথম পর্ব

আকাশী নীল সাগরের বুকে যখন দুপুরের সোনাঝরা রোদ এসে পড়ত, তখন মনে হতো কোটি কোটি হিরে একসাথে জ্বলছে। চারপাশের বাতাস তখন সমুদ্রের নোনা গন্ধ আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে নিয়ে আসত। জায়গাটা যেন আদিম প্রকৃতির এক অপূর্ব লীলাভূমি, যেখানে মানুষের কোলাহল এখনো পৌঁছায়নি। ​চারিদিকে অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড় শান্ত প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়গুলোর গায়ে জড়িয়ে থাকা ঘন সবুজ অরণ্য দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সমুদ্রের নীল ক্যানভাসে কেউ গাঢ় সবুজের আলপনা এঁকে দিয়েছে। বিকেলের দিকে যখন সূর্য পাহাড়ের আড়ালে ঢলে পড়ে, তখন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জমে ওঠে মায়াবী ছায়া। তবে এই শান্ত, রূপালী সাগরের নিচেই লুকিয়ে ছিল এক আদিম ও রহস্যময় বিপদ—বেশ কয়েকটি তীক্ষ্ণ ডুবো পাহাড় মাথা চাড়া দিয়ে থাকত জোয়ার-ভাটার খেলায়। জোয়ারের সময় তারা লুকিয়ে থেকে বুক কাঁপাত দূরন্ত জাহাজের, আর ভাটার সময় শ্যাওলা জড়ানো পাথুরে পিঠ উঁচিয়ে জানান দিত নিজেদের ভয়ঙ্কর অস্তিত্বের। আমি উদধি, পেশায় জাহাজি, বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন। দেখতে দেখতে জীবনের তিরিশটা বছর সমুদ্রের এই নোনা জলেই কেটে গেল। কত উত্তাল ঝড়, কত রূপালী পূর্ণিমার রাত কেটেছে এই দিগন্তহীন জলরাশিতে। জীবনে বহু সমুদ্র দেখেছি, দেখেছি বহু বাতিঘর—যারা রাতের ঘন অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে এক বুক আলো নিয়ে পথভোলা জাহাজকে দিশা দেখায়। একসময় আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল, কোনো এক নির্জন পাহাড়ের চূড়ায়, ঠিক বাতিঘরের আদলে নিজের একটা বাড়ি তৈরি করব। যেখানে বসে প্রতিদিন সাগরের গর্জন শোনা যাবে, আর দূর আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখা যাবে। সেখানে একটা লাইব্রেরী থাকবে, বিভিন্ন শ্রুতি মধুর গানের গুন গুনা চলতে থাকবে, পূর্ণিমার রাতে প্রিয়তমার পাশে বসে চলবে কবিতা উৎসব। কিন্তু কল্পনা আর বাস্তবতা তো কখনো এক হয় না; সংসারের টানে আর সমুদ্রের ডাকে বাতিঘর আর বাঁধা হলো না। তবে বাতিঘরের প্রতি আমার সেই আদিম লোভটা একটুও কমেনি। এখনো সুযোগ পেলেই, জাহাজের নোঙর ফেলে, কোনো এক নামকরা বাতিঘরের প্রাচীন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাই—শুধু বুক ভরে সাগরের ওই অসীম সৌন্দর্য আর প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ দেখার জন্য।

এমনি মনোমুগ্ধকর এক জায়গায় এবার আমাদের জাহাজ এংকর করে ছিল। প্রকৃতির এক অদ্ভুত, মায়াবী ক্যানভাসে এসে যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল আমাদের বিশাল ধাতব জলযানটি। চারপাশের আদিগন্ত আকাশি নীল জলরাশি আর নিস্তব্ধতা যেন এক মায়াজাল বুনে রেখেছিল। কিন্তু এই অপার্থিব সৌন্দর্যের মাঝেও আমাদের বন্দিদশা কাটছিল না। কার্গো লোডিংয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই, আর জাহাজ কবে নাগাদ বন্দরের ভিতরে যেতে পারে তাও অনিশ্চিত। ফলে এই দ্বীপাঞ্চলের নোঙর ফেলে কতকাল অলস প্রহর গুনতে হবে, তা কেউ জানত না। জাহাজের চার দেয়ালে বন্দী জীবনটা ক্রমে একঘেয়ে আর শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠছিল। লোহার তৈরি এই ভাসমান প্রাসাদে প্রতিটি মুহূর্ত যেন স্থবির, ভারী পাথরের মতো চেপে বসছিল বুকের ওপর। ঠিক তেমনই এক অবরুদ্ধ দুপুরে, ডেকে দাঁড়িয়ে দিগন্তে চোখ রাখতেই নজরে এল মাইল তিনেক দূরে কুয়াশায় মোড়ানো সেই রহস্যময় পাথুরে দ্বীপটি। দ্বীপের চারধারে জলের নিচে লুকিয়ে আছে অজস্র প্রবাল আর ঘাতক ডুবোপাহাড়, যারা জলযানের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত। কিন্তু সেই রুক্ষতার বুকেই মূল দ্বীপটি সেজেছিল মখমলের মতো ঘন, আদিম সবুজের চাদরে। আর সেই সবুজের বুক চিরে, আকাশের দিকে নেতার উদ্ধত তর্জনীর মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন, জরাজীর্ণ বাতিঘর। দ্বীপটিতে স্থায়ী কোনো বসতি ছিল না তবে সপ্তাহয়ান্তে একজন কেয়ারটেকার এসে প্রয়োজনীয় কাজ করে চলে যেতেন। সবচেয়ে অলৌকিক আর বিভ্রান্তিকর ছিল সেই বাতিঘরের আচরণ। দিন হোক বা রাত—সেখানকার বিশালাকার যান্ত্রিক লণ্ঠনটি এক মুহূর্তের জন্যও নিভত না। মধ্যগগনের তীব্র সূর্যালোকে হয়তো তার রশ্মির প্রখরতা ধরা পড়ত না, কিন্তু আঁধার নামতেই শুরু হতো তার আসল সম্মোহন। রাতের নিবিড় অন্ধকারে সেই ঘূর্ণায়মান, অতিপ্রাকৃতিক আলোর চাকাটি কিছুক্ষণ পর পর এসে আছড়ে পড়ত আমার কেবিনের আয়াতাকার পোর্টহোলে। আলোটা যখনই ঘরের দেয়ালে তার তীব্র বৃত্তাকার ছায়া ফেলে ঘুরে যেত, আমার অবচেতন মনের ভেতর এক চেনা অথচ অব্যাখ্যায়িত অস্থিরতা মোচড় দিয়ে উঠত। বিগত দুই-তিন দিন ধরে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টান আমাকে গ্রাস করেছিল। রাতের সেই ঘূর্ণায়মান আলোর ঝলকানি যেন ফিসফিসিয়ে বলত—সেখানে কেউ একজন আছে। জনমানবহীন ওই প্রাচীন স্তম্ভের চূড়ায় কেউ একজন একা দাঁড়িয়ে পরম আকুলতায় আমারই প্রতীক্ষা করছে। এই অতিপ্রাকৃতিক অবসেসশন আর জাহাজের দমবন্ধ করা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে, একদিন ভরদুপুরের পর পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম। আমি এই জাহাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা—ক্যাপ্টেন; তাই আমার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের অবাধ্য হওয়ার বা পথ আগলে দাঁড়ানোর দুঃসাহস কারোর ছিল না। অভিযানের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলাম থার্ড অফিসার সাব্বিরকে, যার চোখে সবসময় অ্যাডভেঞ্চার আর কৌতূহলের ছায়া; টেকনিক্যাল যেকোনো বিপদের জন্য সাথে নিলাম ক্ষুরধার বুদ্ধির সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার রাইয়ানকে। আর কায়িক শ্রমের ভরসা হিসেবে রইল দুই বিশ্বস্ত ডেক রেটিং—বালাম আর শফিক। দ্বীপের অজানা বিপদের কথা মাথায় রেখে আমরা সাথে নিলাম শক্তিশালী টর্চলাইট, কয়েক বোতল পানীয় জল আর কিছু শুকনো রসদ। লাইফবোটটি যখন সমুদ্রের বুকে নামানো হচ্ছিল, তখন ডেকের রেলিংয়ে ঝুঁকে থাকা বাকি ক্রুদের উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বললাম, "আজ আমরা দ্বীপের রহস্যটা একটু পরখ করে আসি। সব ঠিকঠাক থাকলে কাল তোমরা বাকিরা পালা করে ঘুরে এসো।" ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন তুলে আমাদের ছোট বোটটি যখন সেই সবুজ-পাথুরে দ্বীপের অভিমুখে যাত্রা শুরু করল, তখনো বাতিঘরের সেই রহস্যময় আলোটা তীব্র রোদেও ফিকে এক আভা নিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে যেন ক্রূর হাসছিল। আমরা জানতাম না, সেই মখমলে সবুজের আড়ালে কী ভয়ংকর বা অতিপ্রাকৃতিক বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

দেখতে কাছে মনে হলেও পাথুরে ডুবো পাহাড়ের খাঁজ কেটে দ্বীপে পৌঁছাতে আমাদের পুরো একটা ঘণ্টা লেগে গেল। দ্বীপের তটরেখা এতটাই পাথুরে আর ধারালো যে, লাইফ বোটটা সমতলে ভেড়ানো গেল না। আমরা একটা বিশালাকার পাথর খণ্ডের খাঁজের সাথে বোটের দড়িটা শক্ত করে বেঁধে রেখে দ্বীপে পা রাখলাম। ডুবো পাহাড়ে আটকে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে আমাদের ভাটা শুরু হওয়ার আগেই এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে, নেমে যাওয়ার আগে এই সিদ্ধান্ত নিলাম। দ্বীপটি আসলেই অপূর্ব। চারদিকে বুনো গাছের সুবাস আর সবুজের সমারোহ। আমরা পাঁচজন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে বাতিঘরের পাদদেশে পৌঁছালাম। বাতিঘরের ঠিক নিচ থেকেই একটা ছোট পাহাড়ি ঝর্ণা কলকল শব্দে নেমে এসে সাগরে মিশে যাচ্ছে। বাতিঘরটি খুব প্রাচীন, এর গায়ে লোনা ধরা পাথরের খাঁজে খাঁজে শ্যাওলা জমে আছে। ইতিহাসে পড়েছিলাম, পৃথিবীর প্রথম বাতিঘর মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার ফারোস (Pharos of Alexandria), যা টলেমি রাজবংশের আমলে নির্মিত হয়েছিল। স্থানীয় লোকগাথা বলে, হাজার বছর আগে এক গ্রিক সওদাগর তার রূপবতী স্ত্রীর স্মরণে ওই বিশালাকার বাতিঘরটি বানিয়েছিলেন। কিন্তু তৈরির কিছুদিন পরেই এক অমাবস্যার রাতে সেই সওদাগর সমুদ্রের বুকে নিখোঁজ হন। তারপর থেকে নাকি ওই দ্বীপের বাতাস একটু বেশিই ভারী, একটু বেশিই ঠান্ডা। আমরা বাতিঘরের ভেতরে ঢুকলাম। পুরোনো জং ধরা লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই পুরো সমুদ্র চোখের সামনে ভেসে উঠল। দূরে আমাদের জাহাজটাকে একটা খেলনা নৌকার মতো দেখাচ্ছিল। বাতিঘরের ভেতরে একটা পুরোনো জেনারেটর ঘরের সন্ধান পেলাম, যা অদ্ভুতভাবে সচল ছিল এবং নিচুস্বরে একটা কম্পন তৈরি করছিল। সেখানে ঘুরে দেখতে দেখতে কখন যে বিকেল হয়ে গেল, আমরা টেরই পাইনি। সমুদ্রের গর্জন যখন বাতিঘরের পাথুরে দেয়ালে আছড়ে পড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল কোনো প্রাচীন দৈত্য খাঁচায় বন্দি হয়ে ছটফট করছে। "স্যার, এবার ফেরা দরকার। আকাশ ভালো ঠেকছে না, তাছাড়া ভাটা শুরু হয়ে যাবে" থার্ড অফিসার সাব্বির বলে উঠল। আমি জানালার বাইরে তাকালাম। সত্যি, কয়েক মিনিটের মধ্যে আকাশ পুরো তামাটে রঙ ধারণ করেছে। আমরা দ্রুত নিচে নেমে লাইফ বোটের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কিন্তু প্রকৃতি যেন আমাদের আটকে দেওয়ার জন্য ওত পেতে ছিল।

​হঠাৎ করেই চারিদিক কালো করে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বাতাসের বেগ এতটাই বেশি ছিল যে, আমরা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক পা-ও সামনে এগোতে পারছিলাম না। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা তীরের মতো এসে গায়ে বিঁধছিল সেই সাথে ঝড়ো হাওয়া। দেখতে দেখতে বিকেলেই যেন মাঝরাত নেমে এলো চারপাশে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। "তাড়াতাড়ি চলুন! লাইফ বোটটা ঠিক আছে তো?" সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার রাইয়ান চিৎকার করে বলল।
​ঝড় একটু কমতেই আমরা কাদা আর পাথর ভেঙে কোনোমতে সেই ঘাটের কাছে পৌঁছালাম, যেখানে লাইফ বোট বেঁধে রেখেছিলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছে আমাদের সবার রক্ত হিম হয়ে গেল। পাথর খণ্ডের সাথে দড়ির ছেঁড়া অংশটা ঝুলছে, কিন্তু আমাদের লাইফ বোটটা উধাও! "সর্বনাশ হয়েছে! বোট তো নেই!" বালাম আর শফিক আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। চারিদিকে তখন রাতের অন্ধকার। দূরে আমাদের জাহাজের আলো দেখা যাচ্ছিল বটে, কিন্তু এই উত্তাল সাগরে তা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ এবং পৌঁছানোর অসাধ্য। আমরা প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কাঁপতে লাগলাম। আমি সান্ত্বনা দিলাম, "ভয় পেও না। আমি বললাম চলো আমরা দু-ভাগে ভাগ হয়ে আশপাশের খাঁড়িগুলোতে খুঁজি। হয়তো বোটটা কোথাও আটকে আছে। সাব্বির আমার সাথে এসো। রাইয়ান, তুমি বালাম আর শফিককে নিয়ে ডানদিকের খাঁড়িতে দেখো।" আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। সাব্বির আর আমি টর্চের আলো ফেলে পাথরের খাঁজে খুঁজছি, ঠিক তখনই পায়ের নিচের মাটি তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। সমুদ্রের গর্জন এক নিমেষে বদলে গেল এক ভয়ঙ্কর গুমগুম শব্দে।
​"স্যার! ভূমিকম্প হচ্ছে!" সাব্বির আতঙ্কে আমার হাত চেপে ধরল।
​ভূমিকম্পের কয়েক মিনিটের মধ্যেই চোখের সামনে যা দেখলাম, তার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। সাগরের পানি এক বিশাল দেয়ালের মতো উঁচু হয়ে, সমস্ত আলো শুষে নিয়ে আমাদের দিকে তেড়ে আসছে।
​"সুনামি! সুনামি! সাব্বির, কোথাও উঁচুতে আশ্রয় নাও!" আমি চিৎকার করে উঠলাম। ​কিন্তু সেই চিৎকার বাতাসের গর্জনে হারিয়ে গেল। এক বিশালাকার কালো ঢেউ পাহাড়ের মতো এসে আমাদের ওপর আছড়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে আমি নিঃশ্বাস হারিয়ে ফেললাম। তীব্র নোনা জল আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল পাথরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতে করতে। চেতনা হারানোর ঠিক আগে, হাতের কাছে শক্ত লোহা বা কাঠের মতো কিছু একটা পেয়ে আমি অবশ হয়ে আসা হাত দুটো দিয়ে তা আঁকড়ে ধরলাম। তারপর সব অন্ধকার।

চলবে...
(দুই পর্বে সমাপ্য হবে)

Address

Khulna
9100

Telephone

+8801911173656

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Green Movement posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Green Movement:

Share

Category