12/01/2026
✅দরসকে আকর্ষণীয় করার ৮টি টিপস⁉️
আজ আমাদের জামিয়ায় এসেছিলেন মনোবিজ্ঞানের আলোকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য পরিচিত মুফতি সালমান হাফি.।
তার নিজস্ব প্রশিক্ষণ সেন্টার রয়েছে, যার নাম দ্বীনিয়াত বাংলাদেশ (Deeniyat Bangladesh)। সচরাচর তিনি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ দেন না, তবে জামিয়ার নায়েবে মুহতামিম হযরত মাওলানা Masrur Hasan হাফি.-এর আমন্ত্রণে আজ তিনি জামিয়ায় তাশরিফ আনেন এবং তাদরিসের অঙ্গনে প্রবেশ-উদ্যত তাখাসসুসের ছাত্রদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রাখেন, মাশাআল্লাহ।
তার আলোচনা থেকে এই টিপসগুলো তুলে ধরছি-
১। শিক্ষকতার গুরুত্ব ও দায়িত্ব মাথায় রেখে দরসে বসা। আমরা শুধু শিক্ষকতার আজমত বা মর্যাদা মাথায় রেখে দরসে বসি, ফলে ছাত্র কোনও ছোটখাটো ভুল করলেও আমরা রেগে যাই।
শিক্ষকের উচিত, নিজ কাজের গুরুত্ব ও দায়িত্ব মাথায় রাখা যে, একটি জাতি বিনির্মাণের দায়িত্ব আমার কাঁধে অর্পিত। আমার সামনে যারা বসে আছে, তাদেরকে আদর্শ মানুষ ও ওয়ারিসে আম্বিয়া করে গড়ে তোলার জন্য আমাকে বসানো হয়েছে। এই ভাবনা থাকলে শিক্ষক ছাত্রের প্রতি যত্নশীল হবেন। একটি ইট বানাতেও যত্নের প্রয়োজন, সুতরাং আদর্শ জাতি নির্মাণের জন্য কতটা যত্নের প্রয়োজন হতে পারে!
২। ছাত্রদের আজমত দিলে রেখে দরসে বসা। আমাদের আকাবির নিজদেরকে ‘খাদিমুত তলাবা’ বলতেন। হাদিসে তালিবে ইলমের ফজিলত বেশি বর্ণিত হয়েছে। তালিবে ইলমের জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেওয়া হয়, সকল মাখলুক তালিবে ইলমের জন্য দোয়া করে ইত্যাদি।
উস্তাদের দিলে তালিবে ইলমের আজমত থাকলে তিনি তাকে ‘গাধা’ বলে গালি দেবেন না, তাকে চড়-লাথি মারবেন না। অথচ আমরা মনে করি, তালিবে ইলম আমাদের গোলাম, তাদের সঙ্গে আমরা যে আচরণই করি, সব বৈধ।
দারুল উলুম দেওবন্দের একজন উস্তাদের কথায় কষ্ট পেয়ে এক ছাত্র বাড়ি চলে গিয়েছিল। তিনি ওই ছাত্রের বাড়িতে গিয়ে তাকে খুশি করে তার মালামাল নিজ মাথায় তুলে তাকে মাদরাসায় নিয়ে এসেছিলেন। এমনই ছিল তাদের দিলে ছাত্রদের আজমত।
৩। ছাত্রদের হক মাথায় রেখে দরসে বসা। প্রত্যেক ছাত্রের উস্তাদের উপর চারটি হক রয়েছে; ১। মানুষ হিসেবে, ২। প্রতিবেশি হিসেবে, ৩। মুসলমান হিসেবে, ৪। তালিবে ইলম হিসেবে। ছাত্রটি সাধারণ মেধাবি হলে আরেকটি যুক্ত হবে, ৫। দুর্বল হিসেবে।
শিক্ষক যদি এই হকগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখেন, তাহলে তিনি দরসের সময় ইত্যাদিতে খেয়ানত করবেন না, ছাত্রদেরকে গালিগালাজ করবেন না।
৪। উস্তাদ-ছাত্রের দিলের সংযোগ স্থাপন করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি কৌশলে দিলের সংযোগ স্থাপন করতেন-
ক. উত্তম সম্বোধনের মাধ্যমে। সেটা হতে পারে ভালোবাসাপূর্ণ ব্যাপক সম্বোধন, যেমন, يا غلام إني أعلمك كلمات إلخ কিংবা সরাসরি নাম দ্বারা সম্বোধন, যেমন, يا أبا ذر، يا معاذ ইত্যাদি।
খ. অধিক ইন্দ্রীয়কে সক্রিয় করার মাধ্যমে। ছাত্রদের সামনে এমন কথা বা এক্টিভিটি করা, যার মাধ্যমে তাদের অধিক ইন্দ্রীয় সচল হয়। যেমন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من يأخذ مني خمس خصال। এই ‘দেওয়া-নেওয়া’ শব্দের মাধ্যমে অধিক ইন্দ্রীয় সচল করেছেন।
গ. ব্লকিং টেকনিকের মাধ্যমে। যেমন উক্ত হাদিসে ‘পাঁচ’ সংখ্যা বলার মাধ্যমে সাহাবিদের মনোযোগ পাঁচে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সবাই পাঁচটি বিষয়ের জন্য প্রতীক্ষমান ছিল। এভাবে আমাদেরও ক্লাসের শুরুতে বলতে হবে, আজ আমি তোমাদেরকে তিনটি বিষয় শেখাব বা তিনটি আলোচনা করব। এভাবে ছাত্ররা মনোযোগী হবে। অন্যদিকে এর জন্য উস্তাদের মুতালায়া করতে হবে এবং সবকের পরিকল্পনা করতে হবে।
৫। শিক্ষকের মনে করতে হবে যে, আমি আমার জানা বিষয় শোনাতে এসেছি। শেখাতে এসেছি, এই ধারনা নিয়ে না রাখা। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক জানা বিষয় বারবার চর্চা করতে বিরক্তিবোধ করে। ফলে শেখানোর ধারনা নিয়ে দরসে গেলে এক কথা বারবার বলতে বিরক্তিবোধ হবে। দুর্বল ছাত্রদের জন্য বারবার বলতে মন চাইবে না। অন্যদিকে শোনানোর ধারনা থাকলে কাজটি আনন্দদায়ক মনে হবে। যেমন, হেফজখানার ছাত্র এক পড়া বারবার শোনাতে বিরক্ত হয় না। এমনিভাবে পেশাদার বক্তারাও এক ওয়াজ বারবার করতে বিরক্তিবোধ করেন না।
৬। নিজকে ছাত্রদের সমবয়সী মনে করে দরসে বসা। কারণ, মানুষকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সময়বয়সী মানুষের প্রয়োজন হয়। শিশুরা শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে, কিন্তু বড়দের সঙ্গে পারে না। কাজেই নিজকে সমবয়সী মনে করলে ক্লাস আনন্দময় হবে।
শিশুর সঙ্গে শিশুসুলভ আচরণ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ নাতির জন্য ঘোড়া সেজেছেন, হযরত আয়শার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। শিশুদের দুষ্টুমিকে অপরাধ মনে করা যাবে না, কারণ দুষ্টুমিই তার স্বভাবের দাবি।
৭। ছাত্রের আকলকে নিজের আকলের সমান মনে না করা। শিক্ষক যদি নাহবেমির পড়ান, আর তাকরির করেন কাফিয়ার, তার কারণ হল তিনি ছাত্রকে নিজের সমান ভাবছেন। সুতরাং তাদেরকে তাদের আকল অনুযায়ী পড়াতে হবে।
৮। ছাত্রদের প্রতি দয়াপ্রবণ ও স্নেহশীল হতে হবে। তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ না করে নম্রতাপূর্ণ আচরণ করা। তাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করা।
(ইতোপূর্বে আমি ছাত্রদেরকে শাসনের বিষয়ে একাধিকবার লিখেছি। অনেকে বলেছেন, শাসন-পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতে। এখন থেকে কেউ পরামর্শ চাইলে তাকে দ্বীনিয়াতের কোর্স করতে বলে দেব, ইনশাআল্লাহ।)