08/02/2026
জামাত স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তাদেরকে জন্ম জন্মান্তর ধরে ভোট দেওয়া যাবে না। অনেকে জামাতকে বেটার অল্টারনেটিভ মনে করেন কিন্তু এই কারণে মনস্ত্বাত্বিক দেওয়াল অতিক্রম করতে পারছেন না কিংবা অনেকে জামাতকে ভোট দিতে নিজের কাছে এক ধরণের অপরাধবোধ feel করছেন। চেতনার ফেরিওয়ালা দলকানাদের উদ্দেশ্যে নয়, সাধারণ মানুষ যারা এমনটি ভাবছেন তাদের উদ্দেশ্যে এই লেখা:
১) বাংলাদেশকে অন্য কোন দেশ দখল করে রেখেছিলো, আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি আর জামাত সেই বহিরাগত শক্তিকে স্বাধীনতা যুদ্বে সমর্থন দিয়েছে কিংবা দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে এমন নয়। বাংলাদেশ তখনকার দিনে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব দেশ গঠন করেছে।
২) জামাত বাংলাদেশ নামে আলাদা রাষ্ট্র হউক এটা চায় নি। তারা চেয়েছে উপমহাদেশের একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান অখণ্ড পাকিস্তান হিসেবে টিকে থাকুক আর তৎকালীন দুই পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হউক।
৩) জামাতের এই রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে আমি একমত পোষণ করি না কিন্তু আমি এতে দোষের কিছু দেখি না। এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্বান্ত, ভুল রাজনৈতিক সিদ্বান্ত, এটা কোন অপরাধ না।
৪) পাকিস্তান রাষ্ট্র আকাশ থেকে পড়ে নি। দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে ব্রিটিশ বিরোধী ১৫০ বছরের সংগ্রাম আর ব্রিটিশদের ইন্ধনে লাগাতার হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস জড়িত। দেশ ভাগের পর স্বাধীন ভাবে নিজ ধর্ম পালন করতে দেড় কোটি হিন্দু মুসলমান ১৪ পুরুষের বসত বাড়ি ছেড়ে বর্ডারের অন্য পাশে নতুন করে জীবন গড়েছেন। এই জন্যে জামাত সহ সম মনা অনেক মানুষ ১৫০ বছরের সংগ্রামের প্রাপ্তি স্বাধীন পাকিস্তানকে দেশ বিভাগের ২৪ বছরের মাথায় একদম ছুড়ে ফেলে দিতে চান নি।
৫) মুক্তিযুদ্ব আমরা জামাতের বিরুদ্ধে করি নাই, ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্বে করেছি। ৩০ লাখ শহীদ কিংবা ২ লাখ মা বোনের ইজ্জত হানি পাক সেনাদের উপরে বর্তায়। জামাতের কিছু অতি উৎসাহী মানুষ আল বদর, রাজাকার সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধ করেছেন (৪০ হাজার রেজিস্টার্ড রাজাকার); জামাত রাজনৈতিক দল হিসেবে মুক্তিযুদ্বের সশস্ত্র বিরোধিতা করেনি কিংবা পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সাথে যুদ্ধাপরাধ করেনি। অনেক রাজাকারের বিচার হয়েছে, শেখ মুজিব অনেককে ক্ষমা করেছেন, হাসিনার আমলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জামাতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়েছে।
দেশের ভূখন্ডের বিরুদ্বে অবস্থান নেওয়া, দেশের অখন্ডতা চাওয়া, এমনকি নিজের দেশের বিরুদ্বে যুদ্ব করার ইতিহাস পৃথিবীতে অনেক আছে:
১) ১৯৪৭ সালে মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ভারত রাষ্ট্র চাননি; তারা অখন্ড উপমহাদেশ চেয়েছিলেন
২) ৪৭ সালে শেরে বাংলা আর সুহরাওয়ারদি দুই বাংলা মিলিয়ে অখন্ড বাংলা আলাদা দেশ হিসেবে চেয়েছিলেন
৩) সিলেটবাসী বেঙ্গল প্রদেশ থেকে আসেন নি; তারা গণভোটে আসাম প্রদেশ ত্যাগ করে পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন
৪) আমেরিকার ১১ টা স্টেট আব্রাহাম লিংকন আর ইউনাইটেড স্টেটস এর বিরুদ্ধে ৪ বছর যুদ্ব করেছে; ৭ লক্ষ মানুষ মারা যাবার পরে সেই এগারো স্টেট আবার USA তে যোগ দিয়েছে।
ইতিহাসে এমন মেলা হয়। নেহরু বা মাওলানা আজাদ কে ভারত না চাওয়ার জন্য কেউ কি ভারতের সরকার চালাতে বাধা দিয়েছে?
শেরে বাংলা আর সুহরাওয়ারদি কি বাংলাদেশ বিরোধী?
সিভিল ওয়ার এর ১১ আমেরিকান স্টেট থেকে কেউ কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হয় নি? বাপ বেটা বুশ, ক্লিন্টন, কার্টার এরা সব আমেরিকার বিরুদ্বে সশস্ত্র যুদ্ব করা স্টেটের বাসিন্দা যারা পরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
২৪ সালে গণ মাধ্যম, ব্যবসায়ী, আইন শৃংখলা বাহিনী, সচিবালয়ের কর্মকর্তা এরা কেউই তো গণ অভ্যুত্থানে সমর্থন দেয় নি, আমরা কি বলছি এরা কেউ দেশে ব্যবসায়ী, আমলা, পুলিশ, সাংবাদিক হতে পারবে না? কিংবা এরা হাসিনার সমর্থক ছিলো বলে সবাই খুনী?
জামাতের ঐতিহাসিক দায় আছে কিন্তু অন্যায় ভাবে তাদের ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। সঠিক ইতিহাস জানুন। প্রোপাগান্ডা আর ইতিহাস এক বিষয় নয়!