16/12/2025
"মহান বিজয় দিবসের চেতনা-
বাঙালী ও বাংলা ভাষার অনুপ্রেরণা"
মোঃ আব্দুস শহীদ (লেখক ও বিশ্লেষক)
১৬ই ডিসেম্বর'২০২৫ খ্র্রিঃ
""""""""""""""""""""""""""""""""""""
আজ ১৬ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস, প্রতিবছরই যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ৫৪ বছরের বর্ণাঢ্য ইতিহাসের সূতিকা বিনির্মিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে সেটি ছিল বাঙালির প্রথম পথ হাঁটা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ছাত্র জনতা ১ম বিপ্লবে বিজয়ের মধ্য দিয়ে নিজেরা বাঙালী জাতিকে সামর্থবান করে তুলে এবং বাংলা ভাষার চুড়ান্ত বিজয় বিশ্বের ইতিহাসে একটি নজির সৃষ্টি করে। ১৯৫৬ সালে সালে শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দান করে।
তার ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে গনতন্ত্রের বুকে প্রথম পেরেকটি বিদ্ধ করেছিলো। একটানা ১১টি বছর ক্ষমতায় থেকে নিজেকে স্বৈরশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এর মানুষ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আস্তে আস্তে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের মুক্তির সনদ। আইয়ুব খান বাঙালীদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। জেল, জুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে তাঁরা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত হলো। মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় দেশদ্রোহী হিসেবে আসামী করে গ্রেফতার কর হলো।
জেলের বাইরে থেকে মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আন্দোলনক বেগবান করে। ১১ দফার ছাত্র আন্দোলন গন বিস্ফোরণে রূপান্তরিত হলো। ৬৯-এর গন অভ্যুত্থানে মতিউর রহমান নামে একজন ছাত্র প্রাণ দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসাদ ও শহীদ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমান সহ সকল রাজ বন্দীদের দিয়ে ১৯৬৯-এর ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান এর উপর ক্ষমতান দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে ১০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর সারাদেশের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি সহ মোট ১৬৭টি, জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি ৮৮ টি ও অন্যান্য দল ৫৮টি আসন পেয়েছিল ।
ইয়াহিয়া খান ভোট ভুট্টো সাহেবের প্ররোচনায় পূর্ব পাকিস্তানের নেতা মুজিবুরকে শাসক হিসাবে নিরাপদ মনে করলেন না।
৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলেও একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের স্মরণে ফুল দিতে আসা বাঙালির ঢল দেখে তিনি বিস্মিত হলো এবং ১লা মার্চ অধিবেশন স্থগিত করলো। শেখ মুজিবুর রহমান ৫ দিনের হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা দিলেন।
২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করলেন এবং ৩রা মার্চ ছাত্রলীগের জনসভায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি" গানটি পরিবেশন করলেন।
৫দিন হরতালের পর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল সমুদ্রে ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা রুপরেখা ঘোষণা করলেন। ৯ই মার্চ পল্টন ময়দানে পশ্চিম পাকিস্তানিদের স্বতন্ত্র শাসনতন্ত্র প্রস্তুত করার প্রস্তাব দিলেন। ১৫ই মার্চ ইয়াহিয়া খান নিজেই ঢাকায় আলোচনার জন্য আসার কথা বলে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে শুরু করলেন। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে বাঙালী সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাঁদের সাথে ঢাকা থেকে আগত সেনাদের সংঘর্ষে অনেক মানুষ শহীদ হন। ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। ২৪ শে মার্চ ঢাকা শহর ছিল একদমই থমথমে।
গণহত্যার জন্য জেনারল ইয়াহিয়া ২৫ শে মার্চকে শুভ রাত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিল। গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে এবং ঢাকা শহরে বোমা ও গ্রেনেড হামলা করে নরকীয় ভাবে গনহত্যা চালানো হয়।
২৬শে মার্চ চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের গ্রেফতার করে স্বাধীনতার পক্ষে বিদ্রোহ ঘোষণা কর হয়। ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু পক্ষে মেজর জিয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
দীর্ঘ ৯মাস ও মুক্তি সংগ্রামের পর ৩রা ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আকাশ ও স্থল সীমানায় সৈন্য প্রেরণ করে।
পাক হানাদার বাহিনী তাদের পরাজয় নিশ্চিত ভেবে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় সারাদেশে সাংবাদিক, লেখক ও সমাজে এলিটদের হত্যা করে এবং ১৪ই ডিসেম্বর এক রাতে ঢাকা শহরে প্রায় ১৫০ জন বুদ্ধিজীবীকে টেনে হেচড়ে নিয়ে মিরপুরের ডোবা ও রায়ের বাজার ইট খোলায় গুলি করে ও গ্রনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
সুদীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ বাঙালি বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দেয় এবং ২লক্ষ মা বোন তাঁদের সম্ভ্রম হারায়। সর্বপরি, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বাঙালী বিজয় অর্জন করে। আজ সেই গর্বিত দিবস।
ভাষা আন্দোলন বাঙালী জাতির বৈষম্য বিরোধী প্রথম আন্দোলন। তাই বলা হয় মহান বিজয় দিবসের চেতনা বাঙালীর বাংলা ভাষার অনুপ্রেরণা" থেকেই জন্ম লাভ করেছে।
মোঃ আব্দুস শহীদ