20/07/2026
।।কেন শ্রাবণের প্রথম সোমবারে মহাদেবকে ঘিরে মাতোয়ারা হয় গোটা বাংলা?।।
জানলার বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, বাতাসে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর তার মাঝেই দূর থেকে ভেসে আসা শঙ্খধ্বনি। হ্যাঁ, আজ শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এই দিনটা যখনই আসে, আমাদের চেনা বাঙালি পাড়াগুলোর ছবিটাই যেন এক লহমায় বদলে যায়। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে, ঘটি মেপে গঙ্গার জল আর একটা নিখুঁত বেলপাতা হাতে নিয়ে মন্দিরের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়া—এই তো আমাদের চিরন্তন বাংলার রূপ। কিন্তু কখনো কি এই লাইনে দাঁড়িয়ে আপনমনে ভেবেছেন, বছরের আর পাঁচটা দিন ছেড়ে এই শ্রাবণ মাসের সোমবারে জল ঢালার জন্য কেন এমন মানুষের ঢল নামে? এর পেছনে কি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস, নাকি লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর রহস্য?
আসুন আজ একটু সময় নিয়ে সেই গল্পটাই বলা যাক, যা আমাদের শিকড়ের সাথে জড়িয়ে আছে।
পুরাণের পাতা ওল্টালে আমরা ফিরে যাব সেই সুদূর অতীতে, যখন দেবতা আর অসুরদের মধ্যে সমুদ্র মন্থন চলছিল। অমৃতের খোঁজে যখন সমুদ্র মন্থন করা হচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই চারপাশ ঘন কালো অন্ধকার করে উঠে এল এক কালান্তক বিষ, যার নাম কালকূট। সেই বিষের তীব্রতায় পুরো সৃষ্টি যখন ধ্বংসের মুখে, তখন দেবতারা ছুটে গেলেন দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে। পৃথিবীকে বাঁচাতে পরম দয়ালু শিব সেই সমস্ত বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করলেন। বিষের নীল রঙে তাঁর গলা রাঙিয়ে উঠল, আর তিনি হলেন নীলকণ্ঠ।
কিন্তু বিষের সেই ভয়ানক জ্বালায় মহাদেব ছটফট করতে লাগলেন, তাঁর শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে লাগল মারাত্মকভাবে। তখন তাঁর এই কষ্ট কমাতে এবং শরীরকে শীতল করতে সমস্ত দেবতারা স্বর্গ থেকে পবিত্র গঙ্গার জল এনে তাঁর মাথায় ঢালতে শুরু করেন। পুরাণে বলা হয়, শ্রাবণ মাসের এই যে অবিরাম ধারাবর্ষণ, তা আসলে মহাদেবের সেই তীব্র বিষের জ্বালা জুড়ানোর এক ঐশ্বরিক প্রয়াস। আর সেই কারণেই এই পুরো মাস জুড়ে, বিশেষ করে সোমবারে, ভক্তরা শিবলিঙ্গে জল ও দুধ অর্পণ করে তাঁর শরীর শীতল রাখার এবং তাঁর অসীম করুণা লাভ করার চেষ্টা করেন।
এবার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, মাসের অন্য দিনগুলো ছেড়ে সোমবার কেন এত বিশেষ? সোম শব্দের একটি অর্থ হলো চন্দ্র বা চাঁদ, যা স্বয়ং মহাদেব নিজের জটায় ধারণ করে আছেন। তাই সোমবার হলো ভোলেনাথের অত্যন্ত প্রিয় একটা বার। প্রিয় মাস আর প্রিয় বার যখন একসাথে মিলে যায়, তখন সেই তিথির আধ্যাত্মিক শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায় বলেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা বিশ্বাস করতেন।
বাঙালি সংস্কৃতিতে এই দিনটির গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। মা-ঠাকুমারা সকাল থেকে নির্জলা উপোস করে বসে থাকেন পরিবারের মঙ্গল কামনায়। আবার অনেকে উপোস করেন মহাদেবের মতো একজন শান্ত, যত্নশীল ও আদর্শ জীবনসঙ্গী পাওয়ার আশায়। তবে এই উপবাস বা ব্রতের পেছনে কেবলই যে ধর্মীয় কারণ আছে তা কিন্তু নয়। সনাতন ধর্মের প্রতিটি আচারের পেছনেই লুকিয়ে থাকে নিখুঁত বিজ্ঞান।
আজকের আধুনিক বিজ্ঞান ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বলছে, বর্ষাকালে অর্থাৎ এই শ্রাবণ মাসে আমাদের চারপাশের বাতাসে আর্দ্রতা খুব বেশি থাকে। এর ফলে আমাদের শরীরের হজম ক্ষমতা বা জঠরাগ্নি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাছাড়া এই সময়ে জলবাহিত রোগের প্রকোপও বাড়ে। তাই সপ্তাহে অন্তত একটা দিন সম্পূর্ণ উপোস রাখা বা খুব হালকা সাত্বিক খাবার খাওয়া আমাদের শরীরকে ভেতর থেকে ডিটক্সিফাই করতে এবং লিভারকে বিশ্রাম দিতে সাহায্য করে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই গভীর বিজ্ঞানটাকে ধর্মের মোড়কে খুব সুন্দরভাবে সাধারণ মানুষের রোজকার অভ্যাসে বুনে দিয়েছিলেন। আজকের দিনে যখন আমরা ডিজিটাল দুনিয়াতেই ব্যস্ত, তখন শ্রাবণের এই সোমবার আমাদের একটু থামতে শেখায়, একটু অন্তর্মুখী হতে শেখায়।
আচ্ছা, আজ আপনিও কি আজ উপোস করেছেন, নাকি পরিবারের কেউ জল ঢালতে গেলেন পাড়ার মন্দিরে? বাবার মাথায় জল ঢালার পর সেই অদ্ভুত মানসিক শান্তি আপনিও অনুভব করেন? কমেন্ট বক্সে আপনার আজকের দিনের গল্পটা আমাদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আর এই সুন্দর আখ্যানগুলি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তবে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে তাঁদেরও জানার সুযোগ করে দিন। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। হর হর মহাদেব।