25/01/2026
পূজায় শব্দসন্ত্রাস, ধর্মীয় উৎসব নাকি জাতীয় সংকট?
বাংলাদেশ একটি বহুমুখী ও বহুসংস্কৃতিক রাষ্ট্র। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের রমজান, ঈদ ও কুরবানী যেমন তাদের ধর্মীয় উৎসব, তেমনি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা, কালীপূজা স্বরস্বতী পূজা ও জগদ্ধাত্রী পূজাও তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় যেমন নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় আচার ও উৎসব পালন করতে পারে, তেমনি সমান অধিকার রয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব পালনে। কিন্তু কোনো সম্প্রদায়েরই উৎসবের নামে এমন কিছু করা বাঞ্ছনীয় নয় যা জাতীয় সংকট বা সমস্যা তৈরি করে। অথচ প্রায়ই আমরা দেখতে পাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবগুলোতে একটি ভয়ংকর জাতীয় গুরুতর সমস্যা—শব্দদূষণ। লাউডস্পিকারের অতিরিক্ত ব্যবহার, আতশবাজির বিস্ফোরণ এবং ঢাক-ঢোলের উচ্চ শব্দ শুধু ধর্মের নামে উন্মাদনাই সৃষ্টি করে না, বরং জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সামাজিক সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পূজা-উৎসবের সময় শব্দের মাত্রা প্রায়শই ১০০-১২০ ডেসিবেলে পৌঁছে যায়, যা আইননির্ধারিত সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। গবেষণায় দেখা গেছে, পূজার সময় শব্দের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে ১০০–১২০ ডিবি ছাড়িয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, ৮৫ ডিবির বেশি দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজার শ্রবণশক্তিকে ক্ষয় করে, আর ১২০ ডিবির ওপরে তাৎক্ষণিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে। অথচ পূজায় ব্যবহৃত ফায়ারক্র্যাকার ১৩০–১৫০ ডিবি পর্যন্ত শব্দ ছড়ায়, যা নিঃসন্দেহে শিশু, প্রবীণ ও হৃদরোগীদের জন্য মৃত্যু-ঝুঁকি ডেকে আনে। পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমনিতেই ভয়াবহ শব্দদূষণে আক্রান্ত। তার উপর পূজার সময় শব্দদূষণের হার দ্বিগুণ হয়ে যায়। ঢাকায় পূজাকালে গড়ে ২.৫ গুণ শব্দ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শ্রবণহানি, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের প্রকোপ ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। ইতিমধ্যে দেশে ১১.৭% মানুষ শ্রবণহানিতে ভুগছেন, যার একটি বড় অংশ পূজার শব্দদূষণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
এই শব্দদূষণ কেবল মানুষের জন্য নয়, প্রাণিজগতের জন্যও বিপর্যয়কর। ফায়ারক্র্যাকার ও লাউডস্পিকারের শব্দে পাখি, কুকুরসহ নানা প্রাণীর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, ইকোসিস্টেমে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করে। ফায়ারক্র্যাকার থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস আবার বায়ুদূষণ বাড়িয়ে তোলে, যা হাঁপানি ও হৃদরোগীদের জন্য অতিরিক্ত বিপজ্জনক।
শব্দদূষণ কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং সামাজিক উত্তেজনাও তৈরি করে। ২০১৮ সালে ঢাকার ওয়ারিতে লাউডস্পিকারের বিরোধ থেকে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ডিওই-এর হেল্পলাইনে ২০১৭–২০২২ সালের মধ্যে পূজা-কেন্দ্রিক শব্দদূষণ নিয়ে জমা হয় ৪৫,২৪৯টি অভিযোগ। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পূজার সময়ে ৮৫% মানুষ ঘুমের ব্যাঘাত অনুভব করেন, আর ৯৫% মানুষ প্রকাশ করেন তীব্র অসন্তোষ। অথচ বিদ্যমান শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী, নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ডিবি ও রাতে ৪০ ডিবি সীমা নির্ধারিত। পূজার সময়ে সেই আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ধর্মীয় ছাড়ের অপব্যবহার ও প্রশাসনের উদাসীনতা আইনের প্রয়োগকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। যদিও ২০২৫ সালের নতুন প্রস্তাবিত বিধিমালায় শব্দদূষণে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন ছাড়া এগুলো নিছক কাগজের বর্ণনা হয়ে থাকবে।
এই সমস্যার একটি প্রকট উদাহরণ দেখা যায় সিলেট নগরীতে স্বরস্বতী পূজায়। সেখানে হিন্দুদের ডিজে সাউন্ডে গান-নৃত্যের তালে মনে হয়েছে ওরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর মুসলমানরা হচ্ছেন সংখ্যালঘু। উচ্চস্বরের আওয়াজে রাস্তার পাশের বিল্ডিং কাঁপছে, মধ্যরাত অবধি ওদের আওয়াজে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। কওমী মাদরাসার কেন্দ্রীয় পরীক্ষা চলছে—ছাত্রদের পড়ার ব্যাঘাত ঘটছে। হাসপাতালের সামনে বিকট শব্দে রোগীদের চিকিত্সা ও বিশ্রামে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি জীবনহানির ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া ট্রাফিক জ্যামের কারণে জনজীবন পুরোপুরি ব্যাহত হয়ে পড়ে, যানবাহনের চলাচল থমকে যায় এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে বড় ধরনের অসুবিধা হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে হিন্দুরা ধর্মীয় উৎসব নয়, তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। তাহলে আমরা কি ধরে নিব এটি আমাদের ইসলামী দলের নেতাদের মন্দির পাহারার খেসারত? আর নয়—ওদের থামাতে হবে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পূজা-উৎসবের শব্দদূষণ রোধে তাই কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত ফায়ারক্র্যাকারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে, কারণ এটি শব্দ ও বায়ুদূষণের প্রধান উৎস। দ্বিতীয়ত লাউডস্পিকারের ভলিউম সীমিত করা এবং রাত ৯টার পর এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরি। তৃতীয়ত পূজা কমিটিগুলোকে আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে, আর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের প্রায় সকল হাইকোর্টের রায়ও প্রায় এরকম। জনসচেতনতা বাড়াতে স্কুল, কলেজ ও গণমাধ্যমে বিশেষ প্রচারণা চালাতে হবে। দীপাবলির মতো উৎসব আলোর উৎসব হোক, শব্দ ও বিষাক্ত ধোঁয়ার নয়। এক সম্প্রদায়ের আনন্দ যেন আরেক সম্প্রদায়ের দুঃখে রূপ না নেয়—এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই হবে ন্যায়বিচারের প্রকৃত প্রয়াস।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পূজা-উৎসব তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু তাদের ঐতিহ্যের কারণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নীরবতার অধিকার বিসর্জন দেয়া যায় না। শব্দদূষণ কেবল একটি পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। অতএব প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের সচেতনতার উত্থান। উৎসবের আনন্দ অবশ্যই বজায় থাকবে, কিন্তু সেই আনন্দ যেন অন্যের জীবনে কষ্টের কারণ না হয়—এটিই হোক আমাদের সর্বজনীন অঙ্গীকার।
#স্বরস্বতীপূজা