13/04/2025
এক বিকেলের প্রতিচ্ছবি
যাত্রা
বেলা তখন পড়ন্ত। সূর্যের রোদ নরম হয়ে এসেছে, যেন দিনের ক্লান্তি নিয়ে একটু বিশ্রাম চায়। মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখি বারবার, অথচ কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। আজকের গন্তব্য হঠাৎ করেই ঠিক হয়নি, মন চেয়েছে একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে। তাই পায়ে পায়ে হেঁটে এসেছি নদীর পাড়ে।
এই জায়গাটার একটা আলাদা টান আছে। শহরের মধ্যে থেকেও শহরের বাইরে মনে হয়। পানির উপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর তার সঙ্গে বয়ে যাচ্ছে আমার মনও। চারপাশে মানুষের ভিড়, কিন্তু আমি একা। নিজের ইচ্ছায় একা হওয়া, এই একাকীত্ব বড় শান্তির।
থেমে থাকা
একটা ফাঁকা বেঞ্চ চোখে পড়তেই বসে পড়লাম। পা তুলে বসলাম ইটের উপর, জুতো না খুলেই। সামনে বিস্তীর্ণ জলরাশি, তার উপর আকাশের প্রতিবিম্ব। রোদটা ঢলে পড়েছে, আলোটা নরম—মনটা কেমন যেন হালকা হয়ে এলো।
এই বসে থাকা কোনো অলসতা নয়, বরং এ এক ধরণের খোঁজ। ভিতরে ভিতরে একটা প্রশ্ন: আমি কি ভালো আছি? আমি কি ঠিক জায়গায় আছি? চারপাশের কোলাহল আমাকে স্পর্শ করে না। আমি যেন এক টুকরো স্তব্ধতার ভিতরে ঢুকে গেছি।
প্রতিফলন
জলের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঢেউগুলো যেন আমার পুরোনো দিনের কথা বলে।
হঠাৎ মনে পড়ে যায় এক বিকেলের কথা—অনেক বছর আগে। আমার জীবন ছিল অন্যরকম। পাশে ছিল কেউ একজন, যার হাত ধরে এমন বিকেলকে আমি চিরকাল নিজের করে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জীবন কখনো আমাদের ইচ্ছার ওপর চলে না।
তার নাম ছিল রায়া। হাসলে চোখ দুটো আধবোজা হয়ে যেত, আর কথা বলার সময় মুখের একপাশে যে মৃদু হাসিটা লেগে থাকত—সেইটুকুই ছিল আমার দিন বাঁচানোর ওষুধ। নদীর পাড়টা ছিল আমাদের নির্দিষ্ট ঠিকানা। দুপুরের পর ক্লাস শেষ করে এসে দুজনে বসে থাকতাম এই পাড়ে, নিরবতায় মুখ ভরে কথা বলতাম।
আজ সে নেই, শুধু আমি আর এই জল। তবু তার স্মৃতি কোথাও না কোথাও প্রতিফলিত হচ্ছে—এই জলরেখায়, এই বাতাসে। প্রতিটি ঢেউ যেন তার অনুপস্থিতির কথাই বলছে।
নিজের সঙ্গে দেখা
এই বসে থাকাটা যেন নিজের সঙ্গে একটা মৃদু আলাপ। আমরা প্রতিদিন এতটাই ব্যস্ত থাকি যে নিজের সঙ্গে কথা বলার সময়টুকু পাই না। আজ, এই বিকেলে, আমি নিজেকে সময় দিচ্ছি।
আসলে আমরা সবাই নিজের মধ্যে এক পৃথিবী নিয়ে বাঁচি, যেখানে কেউ ঢুকে দেখে না। নদীর পাড়ে বসে আজ সেই পৃথিবীর দরজাটা একটু খুলে দেখলাম। আবিষ্কার করলাম—আমি এখনো অনুভব করতে পারি, এখনো স্বপ্ন দেখি, এখনো হেরে যাই, আবার জিতেও উঠি।
ফিরে আসা
সূর্যটা তখন প্রায় নেই। আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। সময় আমাকে ডাকছে ফিরে যেতে। বেঞ্চ থেকে উঠি, ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকি। কিন্তু এই ফিরে যাওয়া আগের মতো নয়। এবার আমি একটু বদলে গেছি।
নদীর পাড়ে বসে থাকা এই এক বিকেল আমাকে শেখাল, থেমে যাওয়াও একটা পথ। প্রতিদিনের ছুটে চলার মাঝখানে একটু থেমে নিজের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আমি আসলে কোথায় যাচ্ছি?
শেষ কথা
একটা বিকেল, একটা নিরবতা, আর নিজের সঙ্গে দেখা—এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই জীবনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি এনে দেয়। নদীর জলের মতোই, জীবনের গভীরতা মাপা যায় না তার গর্জনে, মাপা যায় তার নিঃশব্দ প্রতিফলনে।
রায়ার অনুপস্থিতি আমাকে ভেঙে ফেলেনি, বরং আরও উপলব্ধি শিখিয়েছে। কিছু মানুষ চলে যায়, কিছু স্মৃতি রয়ে যায়, আর কিছু বিকেল—মনের এক কোণে চিরকাল স্থির হয়ে বসে থাকে।