07/05/2020
আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) গুলি ফুসফুস থেকে সমস্ত অঙ্গ এবং শরীরের বাকী অংশে (প্রতিটি কোশে) অক্সিজেন বহন করে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, লোহিত কণিকার হিমোগ্লোবিন নামের মেটালোপ্রোটিন গুলিই (ধাতব আয়রন ও গ্লোবিউলিন প্রোটিন সহযোগে গঠিত) মূলত এই অক্সিজেন পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক ক্রিয়ার মাধ্যমে রক্ত সংবহনের সময় লোহিত রক্তকণিকা গুলি ফুসফুসের অ্যালভিওলি (বা ফুসফুসের ছোট্ট থলি) গুলিতে পৌঁছে যায়, সেখানে সমস্ত গ্যাসের (অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড) বিনিময় ঘটে।
এদিকে ড্রপলেট, এরোসল বা ফোমাইট থেকে অথবা সরাসরি বায়ুবাহিত (সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে SARS CoV-2 বাতাসে প্রায় ৪ মিটার পর্যন্ত বাহিত হয়ে সংক্রমণ ছড়াতে পারে) ভাইরাস গুলো সুস্থ মানুষের দেহে (exposed person) প্রবেশ করার পর নাক, মুখ, শ্বাসনালী, ক্লোমশাখা হয়ে শেষমেশ অ্যালভিওলি গুলিতে আশ্রয় নেয়। এই অ্যালভিওলি গুলিতেই ভাইরাস গুলি প্রথমবারের জন্য রক্তের লোহিত কণিকাগুলির সংস্পর্শে আসে। লোহিত রক্তকণিকার মধ্যে হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন অংশের সঙ্গে ভাইরাসটি তার প্রোটিন বাইন্ডিং সাইট (ক্যাপসিডের গ্লাইকোপ্রোটিন নির্মিত স্পাইক গুলি) দিয়ে আবদ্ধ হয় (সঙ্গের ছবিতে দেখানো হয়েছে) । এইভাবে অ্যালভিওলি গুলিতে আশ্রয় পাওয়া অসংখ্য ভাইরাস বিপুল সংখ্যায় লোহিত কণিকার হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন অংশের সাথে যুক্ত হতে থাকে। ফলস্বরূপ, হিমোগ্লোবিন ভেঙে যায়; তারা অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা একেবারে হারিয়ে ফেলে। উপরন্তু প্রচুর সংখ্যক মুক্ত আয়রন আয়ন (Fe2+ এবং Fe3+) রক্তরসে বা প্লাজমায় মুক্ত হয়। তবে, SARS CoV-2 এর RNA জিনোম বা সেইখান থেকে তৈরী করা DNA-র এইক্ষেত্রে কি ভূমিকা, ভাইরাসটি লোহিত কণিকা কোশের মেশিনারি ব্যবহার করে শুধুমাত্র বংশবৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে কি না; এইরকম অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনও বিজ্ঞানীদের অজানা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন SARS Cov-2 এর আক্রমণে বিপুল সংখ্যায় লোহিত কণিকাগুলি ভেঙে যাওয়ার কারণে দেহে অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দেয়। চিকিৎসা পরিভাষায় যার নাম 'হাইপোক্সিয়া' (Hypoxia) এবং এটাই মূল কারণ হতে পারে মৃত্যুর। প্রসঙ্গত, বলে রাখি আমি চিকিৎসক বা চিকিৎসা বিজ্ঞানী নই, একজন বিজ্ঞান লেখক মাত্র। বিজ্ঞানের দুরূহ বিষয় গুলোকে ল্যাবরেটরি থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার কাজ।
তো যা বলছিলাম, SARS CoV-2 এ আক্রান্ত রোগীর প্রাথমিক লক্ষণ ARDS (Acute Respiratory Distress Syndrome) যা হাইপোক্সিয়ার কারণেই হয়। আবার রক্তে অক্সিজেন কমে গেলে মাথায় অক্সিজেন কম পৌঁছয়। ফলস্বরূপ স্নায়বিক সমস্যা (Neurological Disorder) দেখা দিতে পারে। ব্যাপারটা আমার চিকিৎসক বন্ধুরা বা ICMR এর বিজ্ঞানী বন্ধুরা আরও ভালো বলতে পারবেন। যদি ভুল না বলে থাকি, COVID 19 আক্রান্ত ব্যক্তির আচ্ছন্ন ভাব, স্বাদ বা গন্ধের অনুভূতি হারিয়ে ফেলা, ইত্যাদি লক্ষণ গুলি কি অক্সিজেন ঘাটতির কারণে সৃষ্ট স্নায়বিক সমস্যা (Neuromotor Disorder) থেকে হতে পারে না ? রক্তে অতিরিক্ত মাত্রায় নিঃসৃত মুক্ত আয়রন আয়ন গুলিও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব যকৃতের ওপর পড়ে। এদিকে যকৃতের সঙ্গে বৃক্কের নিবিড় যোগ। SARS CoV-2 এর আক্রমণে বৃক্ক বা কিডনির কাজ থামিয়ে দেওয়া এই রোগের শেষ পর্যায়ের লক্ষণ। আর কিডনি কাজ থামিয়ে দিলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (Cardiac Arrest) শুধু সময়ের অপেক্ষা। অর্থাৎ COVID 19 এর যাবতীয় রোগ লক্ষণ একটা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নয় কি ?
আর সংক্রমণ যদি আগে থেকেই শরীরে থেকে থাকে (asymptomatic carrier) কিন্তু রোগী ARDS বা নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে বা ডায়ালিসিসের উদ্দেশ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মারা গেলে, মৃত্যুর কারণ হিসেবে Co-morbidity র তত্ত্বটা একটু বোকা বোকা লাগছে না শুনতে? তাই লালারসে বা রক্তের নমুনায় ভাইরাসটির উপস্থিতি প্রমাণিত হলে ব্যক্তিটি যে SARS CoV-2 এ আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন তা বলতেই হবে; Lancet যা বলে বলুক !
যাক সেসব কথা। এখন SARS CoV-2 এর কাজের প্রণালীর সঙ্গে ম্যালেরিয়ার কিছু মিল পাচ্ছেন কি? আলবৎ পাওয়া যাচ্ছে! ম্যালেরিয়ার পরজীবী Plasmodium spp. রক্তের লোহিত রক্তকণিকাতে প্রবেশ করে এবং হিমোগ্লোবিনকে তার খাদ্য উৎস হিসাবে খাওয়া শুরু করে। কিন্তু ক্লোরোকুইন বা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে বলতে এসে ম্যালেরিয়ার কথা বলতে শুরু করলাম কেন? তাহলে, ক্লোরোকুইন বা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কিভাবে কাজ করে? ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে যেমন হয় তেমনভাবে। অর্থাৎ, ম্যালেরিয়ার জন্য ক্লোরোকুইন যে কারণে কাজ করে একই কারণে এটি COVID19 এর জন্য কাজ করে ! তার উপরে, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সালফেট (পুরোনো ক্লোরোকুইনের একটি উন্নত সংস্করণ) মাধ্যমের pH কমিয়ে দেয় যা ভাইরাসের প্রতিরূপ (multiplication) সৃষ্টিতে বাধা দেয় । তবে SARS CoV-2 এর চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহার যে ১০০ শতাংশ ফলদায়ী তা কিন্তু কেউ দাবি করছেন না। কারণ SARS CoV-2 বারে বারেই তার চরিত্র বদলাচ্ছে মিউটেশনের দ্বারা। তাই কেমোথেরাপির পাশাপাশি বিভিন্ন রেট্রোভাইরাল থেরাপির প্রয়োগ ও চিকিৎসকরা করে চলেছেন। তবে একটা বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই একমত হয়েছেন যে, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের সম্পূর্ণ কার্যপ্রণালী জানা না গেলেও, যে টুকু বুঝতে পারা গেছে তা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখিয়েছে।
এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের উতলা হয়ে উঠে ভারতকে হুমকি দেওয়ার কারণটা! বিশ্বব্যাপী COVID 19 এর চিকিৎসায় ভ্যাকসিন বা টিকার ব্যবহার দূর অস্ত। SARS CoV-2 এর আক্রমণ এড়িয়ে বেঁচে ফেরা ব্যক্তির প্লাজমা ব্যবহার করে চিকিৎসা - সেও হিউমান ট্রায়াল এর অপেক্ষায়। ঢাল-তরোয়াল বিহীন এই অসম যুদ্ধে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা তাই পুরোনো অস্ত্রেই ( হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনেই) ভরসা রাখছেন।
সবশেষে আজকের বক্তব্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশে এসে উপনীত হয়েছি। আগের দিন শেষ করেছিলাম এই বলে, 'সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ' ! আজ বলবো, শুধু বিচিত্র নয়, কি স্বার্থপর কিছু দেশবাসী ! ভারত সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ICMR এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থা, রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর, চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বার বার বলছেন বা প্রচার চালাচ্ছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নির্দিষ্ট মাত্রায় একটা নির্দিষ্ট সময়কাল যাবৎ ব্যবহার করবেন শুধুমাত্র চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ল্যাব টেকনিশিয়ান, কোয়ারেনটাইনে থাকা রোগীর আত্মীয় বা এমন কোনো ব্যক্তি যিনি COVID 19 এ আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে (exposed person) এসেছেন। তা সত্ত্বেও, এক শ্রেণীর মানুষ মুড়ি মুড়কির মতো হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সালফেট ট্যাবলেট নিজেই বাহাদুর সেজে কিনে খাচ্ছেন বা ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাড়িতে মজুত করছেন। ফলে, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের চাহিদাও বেড়েছে, অথচ সেই অনুপাতে বাজারে যোগান নেই। পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো যে, লুপাস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষ ( ছোট থেকে প্রবীণ) যারা এই ওষুধটি নিয়মিত সেবন করেন, বৈধ প্রেসক্রিপশন দেখিয়েও ওষুধটি পাচ্ছেন না। এমনকি এই সব স্বশিক্ষিত ব্যক্তিরা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কোন তোয়াক্কা করছেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া না জেনে বুঝে যথেচ্ছ সেবন করলে হিতে বিপরীত হতে পারে, এমন কি প্রাণ সংশয় দেখা দিতে পারে কে বোঝাবে? একটা সত্যি ঘটনার কথা বলে শেষ করি। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ফসফেট আমরা মাছ চাষের পুকুরে বা বাড়ির একুয়ারিয়ামে ব্যবহার করি। এটি কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক দম্পতি হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সালফেট খুঁজতে গিয়ে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ফসফেট কিনে আনেন এবং সেগুলি খাওয়ার পর দুজনেই মারা যান।