02/01/2026
ভারতীয় ক্ষত্রিয়রা
*****************
ভারতীয়রা যুদ্ধবাজ জাতি নয়। কিন্তু পৌরাণিক কাল থেকেই, ভারতীয়দের, কোন না কোন কারণে, অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে।
ঋগ্বেদের ৭ম মণ্ডলে একটি যুদ্ধের উল্লেখ আছে যা 'দশরাজ্ঞযুদ্ধম্' (অর্থাৎ দশ রাজার যুদ্ধ) নামে পরিচিত। পরুষ্ণী নদীর (বর্তমানে রাভি নদী) তীরে সংঘটিত এই যুদ্ধে, রাজা সুদাস, দশটি উপজাতি রাজার জোটকে পরাজিত করেছিলেন। এ'টাই ভারতের প্রাচীনতম যুদ্ধের ইতিহাস।
যুদ্ধ করে যোদ্ধারা। ভারতে যোদ্ধা জাতি কারা? ভারতীয় যোদ্ধা বলতে সবাই মারাঠা আর রাজপুতদের কথা বলে। আর বলে শিখদের কথা। কিন্তু এদের বাইরে, অনেক যোদ্ধা শ্রেণী আছে ভারতে। এদের কথা সংক্ষেপে বলছি।
পূর্ব ভারতের অহোমদের (বা হা-চাম) দেশ অসম। এক মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। হিমালয়ের কোল ঘেঁষা এই রাজ্যে, প্রকৃতি যেন তার সব সৌন্দর্য উদার হাতে ঢেলে দিয়েছে। সবুজ চা বাগান, সুবিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ, হ্রদ ও নদীদ্বীপ, মনোরম পাহাড় ও জলপ্রপাত, বন্যপ্রাণীসমৃদ্ধ গভীর অরণ্য -- অনুপম সৃষ্টি সৌন্দর্যের সমাহার এখানে।
অসমের আদি বাসিন্দাঅহোমরা। এরা অসম এবং অরুণাচল প্রদেশে বসবাস করা একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী। এরা চিনের য়ুন্নান প্রদেশের চিপচংপান্না দেহং অঞ্চলের রাজকোঁয়র টাই মানুষের বংশধর। অহোমদের নিজস্ব দেবতা ছিল। সময়ের সাথে সাথে, তারা হিন্দু সংস্কৃতির রীতিনীতির সাথে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছে। অহোমরা, অসমে, ১২২৮ থেকে ১৮২৬ -- প্রায় ৬০০ বছর, এক স্বাধীন সাম্রাজ্য গড়েছিল। এই সাম্রাজ্য টিঁকিয়ে রাখতে অনেক লড়াই লড়তে হয়েছে তাদের। অহোমরা মুঘলদের সাথে লড়েছে, বাংলার আফগান সুলতানদের সাথে, লড়েছে। শুধু লড়েনি, অহোমরা, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে ইসলামের বিস্তার রুখে দিয়েছিল।
অহোমরা দারুণ যোদ্ধা। নদীর লড়াইয়ে দারুণ পটু। গেরিলা যুদ্ধ করে, সরাইঘাটের যুদ্ধে (১৬৭১), এরা মুঘলদের একেবারে ঘোল খাইয়ে দিয়েছিল। অহোমদের দাপটে ইসলামিরা বহুদিন ভারতবর্ষের উত্তর- পূর্বাঞ্চলে কোন দাঁত ফোটাতে পারেনি। বর্তমানে, অসম রাইফেলস্, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের শান্তিরক্ষক। এ'টি ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন আধা সামরিক বাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অসম রেজিমেন্টও রয়েছে।
অসমের মত, ভারতের আরেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রাজ্য উত্তরাখণ্ড। উত্তরাখণ্ড রাজ্য পুরোটাই পাহাড়ি জনজাতি -- গাড়োয়ালি ও কুমায়ুনি অধ্যুষিত। রাজ্যটির প্রশাসনিক বিভাগও দু'টি -- গাড়োয়াল (উত্তর পশ্চিম ভাগ, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ লাগোয়া) এবং কুমায়ুন (দক্ষিণ পূর্ব ভাগ, নেপাল ও উত্তর প্রদেশ লাগোয়া)। গাড়োয়ালি ও কুমায়ুনিদের ইতিহাস রামায়ণ-মহাভারতের কাল থেকে চলে আসছে।
গাড়োয়ালি ও কুমায়ুনি -- দুই জাতিই যোদ্ধা জাতি। এরা ইতিহাসের অনেক লড়াইয়ের অংশীদার। মুঘল, রোহিল্লা, তিব্বতি, গোরখা, মারাঠা -- সবার বিরুদ্ধেই বুক চিতিয়ে লড়েছে এরা। নিজেদের মধ্যেও বহু যুদ্ধ করেছে। বর্তমান ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে দু'টি আলাদা রেজিমেন্ট রয়েছে -- গাড়োয়াল রাইফেলস ও কুমায়ুন রেজিমেন্ট।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, ব্রিটেনের হয়ে এই দুইটি জাতি তাদের শৌর্যবীর্য প্রদর্শন করেছে। ১৯৬২ সালের চীনের সাথে, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সাথে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যুদ্ধে এবং অতি সাম্প্রতিক, পাকিস্তানের সাথে কারগিল সংঘর্ষেও (১৯৯৯), গাড়োয়ালি ও কুমায়ুনি যোদ্ধারা অসাধারণ প্রদর্শন করেছিল। ভারতের প্রথম প্রতিরক্ষা প্রধান (সিডিএস) জেনারেল বিপিন রাওয়াত (যিনি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন) ছিলেন গাড়োয়ালি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে, কুমায়ুনিরা, ফ্রান্সে ট্রেঞ্চের লড়াইয়ে এবং মেসোপটেমিয়ায় মরুভূমিতে অসাধারণ লড়াই করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও, কুমায়ুনিরা উত্তর আফ্রিকা, ইতালি ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় দুর্ধর্ষ লড়াই করেছিল।
'মহিয়াল ব্রাহ্মণ' নামটা শুনেছেন? হয়তো বা শুনেছেন। পঞ্জাব, রাওয়ালপিণ্ডি, জলন্ধর, হোসিয়ারপুর অঞ্চলে বসবাসকারী মহিয়াল যোদ্ধারা আসলে সারস্বত ব্রাহ্মণ। তাই এদের 'মহিয়াল ব্রাহ্মণ' বলা হয়। এরা বর্ণে ব্রাহ্মণ হলেও, পুজো-আর্চার চেয়ে যুদ্ধেই বেশি পটু। খ্রীষ্টোত্তর নবম থেকে একাদশ শতকের গান্ধারদেশের (আফগানিস্তান) হিন্দু শাহী রাজারাও মহিয়াল ব্রাহ্মণ ছিলেন। এই মহিয়াল ব্রাহ্মণ শাহী রাজারা, তিনশো বছর ধরে পুরো ভারতবর্ষকে গজনী ও আরবদের আক্রমণ থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এ'ছাড়া, শিখ সাম্রাজ্যের খুঁটি ছিল মহিয়াল ব্রাহ্মণরা। বাবরের সাথে তিনটে যুদ্ধ লড়েছিল তারা। ব্রিটিশ বাহিনীর নবম, একাদশ, ত্রয়োদশ এবং ঊনবিংশ ল্যান্সার হিসেবেও লড়েছে মহিয়াল ব্রাহ্মণেরা।
আরো একটি হিন্দু, ব্রাহ্মণ বর্ণগোষ্ঠী হল ভূমিহার। 'ভূমিহার' মানে 'ভূমি-মালিক'। এরাও একটি সামরিক জাতি। এদের বাস মূলত বিহার, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড এবং নেপালের পূর্বাঞ্চলে। ভূমিহাররা ঐতিহাসিকভাবে ভূমি মালিকানা, কৃষিকাজ এবং রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিল। তবে পুরোহিতগিরি ছেড়ে, এরা কৃষিকাজ ও যুদ্ধবিদ্যায় নিয়োজিত থাকত।
ভূমিহারদের বিশ্বাস, ভগবান পরশুরাম ছিলেন তাদের আদিপুরুষ।
মৌর্য সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ একজন ভূমিহার ছিলেন। ইনি মৌর্যসাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে শুঙ্গসাম্রাজ্যের সূচনা করেন। সিপাহি বিদ্রোহের মঙ্গল পাণ্ডেও ভূমিহার ছিলেন।
ডোগরারা হল জম্মু ও কাশ্মীরের একটি ইন্দো-আর্য জাতিগোষ্ঠী। এরা ডোগরি ভাষায় কথা বলে। এরা জম্মু ও কাশ্মীরের দুগ্গার অঞ্চলে প্রধানত বাস করত। এছাড়া পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশেও এরা ছিল। ডোগরা রাজবংশ ১৮৪৬-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীর শাসন করেছিল।
দোগরা রেজিমেন্ট, ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়েছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও তাই। বর্তমানে, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে দোগরা রেজিমেন্ট নামে একটি পদাতিক বাহিনী আছে। স্বাধীনোত্তর সময়ে ভারতের হয়ে প্রতিটি যুদ্ধে কৃতিত্বের সাথে লড়াই করেছে দোগরা রেজিমেন্ট। ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘর্ষের সময়, টাইগার হিল বিজয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল এই দোগরা রেজিমেন্ট।
এবার আসি ভারতের দক্ষিণে।
গৌড়া (বা গোণ্ডা) হল উত্তর কর্ণাটকের লিঙ্গায়েত ও দক্ষিণ কর্ণাটকের ভোকালিঙ্গা সম্প্রদায়ভুক্ত যোদ্ধা জাতি। গৌড়ারা, বিজাপুর সুলতান, মহীশূরের রাজা এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। গৌড়ারা গেরিলা লড়াই লড়ত।
কেরলের নায়াররাও যোদ্ধা জাতি। এরা নৌযুদ্ধে বিশেষ পারদর্শী ছিল। ওলন্দাজদের ভারত থেকে তাড়ানোর পেছনে নায়ারদের অবদান সবচেয়ে বেশি। পর্তুগিজরাও এই নায়ারদের দাপটে ভারতবর্ষ থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছিল। ১৭৪১ সালে কোলাচেলের নৌযুদ্ধে, নায়াররা, ডাচ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিদায়ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছিল। দক্ষিণ ভারতে, হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের অত্যাচার থেকে সাধারণ মানুষকে অনেকাংশে রক্ষা করেছিল নায়াররা। স্বাধীনতার পর, ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের 'নায়ার ব্রিগেড', মাদ্রাজ রেজিমেন্টের ৯ম ও ১৬শ ব্যাটালিয়নে মিশে যায়।
আরেক যোদ্ধা জাতি হল গোর্খারা। পাহাড়ি যুদ্ধে, রাতের লড়াইয়ে ওস্তাদ এরা। সাথে প্রচণ্ডরকমের হার না মানার দৃঢ়তা। হাতাহাতি লড়াইয়ে এরা কুকরি (বাঁকানো ছোরা) নিয়ে ভয়ংকর। তবে গোর্খাশক্তি বেশিরভাগ সময়েই ব্যয়িত হয়েছিল, নিজেদের স্বতন্ত্র দেশগঠন ও তার বিস্তারের কাজে, যার ফলশ্রুতিতে আধুনিক নেপালের সৃষ্টি। দেশগঠনের কাজে গোর্খারা চীনা এবং তিব্বতিদের সাথে লড়াই লড়েছে। অনেক লড়াই শেষে, গোর্খারা নিজেদের দেশ নেপালকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। গোর্খাদের এখনো ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে, রয়েল গোর্খা রাইফেলস্ (RGR) হিসেবে মোতায়েন করা রয়েছে। ভারতের সামরিক বাহিনীতেও গোর্খাদের সাত-সাতটি রেজিমেন্ট আছে।
অনেকে বলেন, জার্মান জুট (Jutes) জাতি হতে এদের উৎপত্তি, তাই এদের নাম জাঠ। আবার কেউ কেউ বলেন, এদের আদি বাসস্থান ভারতবর্ষ। শিবের 'জটা' থেকে এদের নামকরণ হয়েছে 'জাট' বা 'জাঠ'। উত্তর ভারতে, বিশেষ করে পঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান হল জাঠেদের বাসভূমি। পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশ ও পঞ্জাবেও জাঠেদের দেখা যায়। কৃষি ও পশুপালন এদের মূল জীবিকা হলেও, যুদ্ধে বিশেষ পারঙ্গম এই জাঠেরা। সপ্তদশ শতকে মুঘল আধিপত্য উপেক্ষা করে, আওরঙ্গজেবের নাকের ডগায় প্রতিষ্ঠা করেছিল ভরতপুর রাজ্য। এই লড়াকু জাঠেরাই গজনীর মামুদকে, তার দেশে ফেরার পথে নাস্তানাবুদ করেছিল। আর ঘোরির মামুদকে তো তার দেশে ফেরার পথে একেবারে খতম করে দিয়েছিল খোখর জাঠেরা। বাবরের সাথেও প্রচণ্ড লড়াই হয়েছিল জাঠেদের। অবশ্য তৈমুর বাহিনীর কাছে পর্যুদস্ত হতে হয়েছিল তাদের। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে জাঠ রেজিমেন্টের একটি পদাতিক বাহিনী আছে।
#সংগৃহীত